1942 খ্রিস্টাব্দ ভারত ছাড়ো আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করো।

1942 খ্রিস্টাব্দ ভারত ছাড়ো আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করো। অথবা, ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পটভূমি, ব্যর্থতার কারণ ও গুরুত্ব আলোচনা করো।

ভূমিকা

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা বৃহৎ গণআন্দোলন হল 1942 খ্রিষ্টাব্দের ভারত ছাড়ো আন্দোলন।ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতার পর ভারতীয় জনমানসে এক তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয় এবং সারা দেশ চরম হতাশা ও ক্ষোভে কেটে পড়ে। এমত অবস্থায় 1942 খ্রিস্টাব্দের 26 এপ্রিল তোমার গান্ধী হরিজন পত্রিকায় ভারত ছাড়ো পরিকল্পনা পেশ করেন এবং ব্রিটিশ সরকারকে অনুরোধ করেন তাঁরা যেন ভারতের স্বার্থে ভারতকে ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দিয়ে ভারত ছেড়ে চলে যান।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পটভূমি

আনুষ্ঠানিক ভাবে 1942 খ্রিস্টাব্দের 8ই আগস্ট ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হলেও এর পূর্বেকার কিছু ঘটনা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পটভূমি তৈরি করেছিল। সেগুলি হল-

1)ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতা-1942 খ্রিস্টাব্দের 23শে মার্চ স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসের নেতৃত্বে ক্রিপস মিশন ভারতে এলে ভারতীয়রা আশা করেছিল ভারতকে অবিলম্বে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেওয়া হবে এবং অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। কিন্তু ক্রিপসের প্রস্তাবে এই বিষয়গুলির প্রতিশ্রুতি না থাকায় ক্রিপস মিশন ব্যর্থ হয় টিপস মিশন ব্যর্থ হয় এবং ভারতীয়রা বুঝতে পারে ব্রিটিশ সরকার কখনোই স্বেচ্ছায় তাদেরকে স্বাধীনতা দেবে না। তাই স্বাধীনতা পেতে হলে সরাসরি ইংরেজদের সাথে সংগ্রাম লিপ্ত হওয়া ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো পথ নেই।

2)স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা-ক্রিপস প্রস্তাবের ব্যর্থতার পর স্বাধীনতার জন্য ভারতবাসী আর বিন্দুমাত্র অপেক্ষা করতে রাজি ছিল না। অসহযোগ আন্দোলন ও আইন অমান্য আন্দোলন ভারতবাসীর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তীব্রতর করে তুলেছিল। তারা চেয়েছিল শেষবারের মতো এক সর্বভারতীয় গণ আন্দোলন গড়ে তুলে ইংরেজদের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে।

3)নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রয়োজনের তুলনায় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির যোগান কম হওয়ায় সেগুলির অস্বাভাবিক মূল্যবৃত্তি ঘটে। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা কালোবাজারি ও মজুদদারির দ্বারা অধিক মুনাফা অর্জন করতে থাকে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এই অপপ্রচেষ্টা আটকাতে তেমন উদ্যোগী হয়নি। ফলে ব্রিটিশ সরকারের ওপর থেকে ভারতবাসীর আস্থা সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়। এবং তারা ব্রিটিশ শাসনের অবসানের লক্ষ্যে গণআন্দোলনে সামিল হয়।

4)জাপানি আক্রমণের সম্ভাবনা-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন রণাঙ্গনে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জাপানের অগ্রগতি ভারতবাসীর মনে আশঙ্কা সৃষ্টি করেছিল। তারা আশঙ্কা করেছিল জাপানিরা ব্রিটিশ শাসিত ভারতেও আক্রমণ চালাবে এবং ব্রিটিশদের রক্ষার যুদ্ধে ভারতবাসীকে মরতে হবে। তাই সম্ভাব্য জাপানি আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ইংরেজদের ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তা মেনে না নেওয়া ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পরিকল্পনা করে।

5)শীর্ষ নেতাদের সংগ্রামী মনোভাব-ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ভারতের শীর্ষ নেতারদের সংগ্রামী মানসিকতা বিশেষত মহাত্মা গান্ধীর অনুমানীয় মনোভাব ভারতছাড়ো আন্দোলনের পটভূমি রচনা করেছিল। জহরলাল নেহেরু ও মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ভারতে জাপানি আক্রমণ মোকাবেলা করার জন্য ভারতবাসীকে সর্বশক্তি নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের পাশে দাঁড়ানোর আবেদন জানালেও মহাত্মা গান্ধী, বল্লভ ভাই প্যাটেল, রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রমুখ ব্রিটিশ শক্তিকে উৎখাত করে জাপানি আক্রমণের সম্ভাবনা দূর করতে চেয়েছিলেন ‌।শেষ পর্যন্ত গান্ধীজীর অনমনীয় মনোভাবের কাছে জহরলাল নেহেরু ও মৌলানা আবুল কালাম আজাদ নতি স্বীকার করেন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পরিকল্পনা মেনে নেন।

6)আন্দোলনের প্রস্তাব ঘোষণা-1942 খ্রিস্টাব্দের 8ই আগস্ট নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির বৈঠকে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রস্তাব পাস করা হয় এবং ঘোষণা করা হয় 9ই আগস্ট থেকে ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হবে। ইংরেজরা ভারতবর্ষ না ছাড়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।মহাত্মা গান্ধী জাতির উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন, “পূর্ণ স্বাধীনতা অপেক্ষা কম কোন কিছুতেই আমি সন্তুষ্ট হবো না।”তিনি ধ্বনি তোলেন “করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গ”।তিনি ভারতের আপামর ভারতের মুক্তিকামী মানুষকে নিজ সিদ্ধান্ত অনুসারে ও বিবেকের টানে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান।

7)জাতীয় নেতাদের গ্রেপ্তার-ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সিদ্ধান্ত ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ সরকার অতি দ্রুততার সঙ্গে তীব্র দমন নীতি চালিয়ে আন্দোলনের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেওয়ার চেষ্টা করেন।9ই আগস্ট সকালে বোম্বাই রেল স্টেশন থেকে মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহের, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, বল্লভ ভাই প্যাটেল, জে.বি.কৃপালিনী প্রমুখ ও জাতীয় নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বভারতীয় স্তর থেকে জেলা স্তর পর্যন্ত সব কংগ্রেস নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের কংগ্রেস সংগঠন ছাড়া জাতীয় কংগ্রেস ও তার সকল শাখাকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। হরিজন পত্রিকা সহ অন্যান্য কয়েকটি পত্রিকার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

8)ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সূচনা-1942 খ্রিস্টাব্দে 9ই আগস্ট জাতীয় নেতাদের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভারতছাড়ো আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। দেশজুড়ে হরতাল, বিক্ষোভ, মিছিল ও গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়। নেতৃত্বের অভাবে জনসাধারণ নিজেরাই আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রসার

বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মাদ্রাজ কেরালা, মহীশূর প্রকৃতস্থানের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভারতছাড়ো আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বাংলার তমলুক ও বালুরঘাট; বিহারের পাটনা, ভাগলপুর ও জামশেদপুর; উত্তরপ্রদেশের বালিয়া ও আজমগড়; অসমের নওগাঁও, উড়িষ্যার তালচের প্রভৃতি স্থানে এই আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে।কলকাতা, বোম্বাই, লখনউ, দিল্লি, কানপুর, আমেদাবাদ প্রভৃতি স্থানে আন্দোলনকারী জনতার সঙ্গে পুলিশের সপ্তাহব্যাপী রক্তাক্ত সংঘর্ষ চলে।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সহিংস পথ গ্রহণ

অহিংসার পথ ধরে ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হলেও এই আন্দোলন সহিংস পথ গ্রহণ করে। টেলিফোন ও টেলিগ্রাফের লাইন কাটা, ডাকঘর, থানা ও সরকারি অফিস আদালতে অগ্নিসংযোগ চলতে থাকে। স্কুল-কলেজ হাসপাতাল ও বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মচারীটা ধর্মঘট শুরু করে। এমনকি গান্ধীজিও তার অহিংসার সংখ্যা পাল্টে ফেলে বলেন, “যদি কোন ব্যক্তি একাকী তরবারি নিয়ে একদল বিষদাঁত বিশিষ্ট ডাকাতের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করে, আমি বলব যে সে অহিংস ভাবে সংগ্রাম করছে”।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ

জাতীয় নেতারা গ্রেপ্তার হলেও গান্ধীজীর ডাকে জয়প্রকাশ নারায়ণ, রাম মনোহরের লোহিয়া, অচ্যুত পট্টবর্ধন, অজয় মুখার্জি, সুশীল ধারা, সতীশ চন্দ্র সামন্ত ভারতছাড়ো আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এছাড়া অরুণা আসফ আলী, সুচেতা কৃপালিনী, মাতঙ্গিনী হাজরা, কনকলতা বড়ুয়া, ভোগেশ্বরী ফুকোননি প্রমুখ মহিলারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। অবশ্য মুসলিম লীগের মহম্মদ আলী জিন্নাহ, কমিউনিস্ট পার্টি, হিন্দু মহাসভা, মানবেন্দ্রনাথ রায়ের র‍্যাডিকাল ডেমোক্রেটিক পার্টি এই আন্দোলনের বিরোধিতা করে এবং ব্রিটিশ সরকারের সাথে সহযোগিতা করার কথা বলেন।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় জাতীয় সরকার গঠন

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কিছু জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। মেদিনীপুরের তমলুকে সতীশচন্দ্র সামন্তের নেতৃত্বে গঠিত তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার 1942 খ্রিস্টাব্দের 17ই ডিসেম্বর থেকে 1944 খ্রিষ্টাব্দের 8ই আগস্ট পর্যন্ত কার্যকর ছিল। সুতাহাটা, নন্দীগ্রাম, মহিষাদল ও তমলুক-এই চারটি থানা এলাকা তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। এছাড়া দিনাজপুরের বালুরঘাটেও জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ভারতছাড়ো আন্দোলন চলাকালীন সময়ে বাংলার বাইরে উত্তর প্রদেশের বালিয়া, আজমগড় ও গাজীপুরে, উড়িষ্যা তালচের, মধ্যপ্রদেশের ভাগলপুর, মহারাষ্ট্রের সাতারা ও আসামের নাওগাঁও এ জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারি দমননীতি

আশ্রয় গ্রহণ করেন। গ্রেপ্তার, জরিমানা, লাঠি, গুলি ইত্যাদি ছিল সাধারণ ব্যাপার। সারা দেশে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর তান্ডব শুরু হয়। এমনকি বিমান থেকেও গুলি বর্ষণ করা হয়। ভারত আন্দোলন ভয়াবহ রূপ ধারণ করলে সরকারি দমনন নীতিও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা নির্বিচারে চলতে থাকে। জহরলাল নেহেরুর মতে, “সৈন্যদল ও এরোপ্লেন এসে গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে গ্রামগুলিকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। তারপর তারা লাঙ্গল চালিয়ে সেই গ্রামগুলির অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে মুছে দেয়।”পুলিশ হাজতেও নির্মম অত্যাচার, দৈহিক নির্যাতন, এমনকি শিশুদের উপরেও চরম অত্যাচারের ঘটনা চলতে থাকে। এইভাবে সরকারি দমননীতির ব্যাপকতায় 1942 খ্রীঃ সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই ভারতছাড়ো আন্দোলন তার গতি হারিয়ে ফেলে। আন্দোলনকারীদের সহিংস কার্যকলাপের নিন্দা করার জন্য ব্রিটিশ সরকার গান্ধীজিকে চাপ দিতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত 1944 খ্রিস্টাব্দের 5ই মে গান্ধীজী জেল থেকে মুক্তি পান এবং আন্দোলন প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করেন। এইভাবে ভারত ছাড়ো আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ

চারিদিকে সাড়া জাগিয়ে প্রবল গণ উন্মাদনার মধ্য দিয়ে ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হলেও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের এই ব্যর্থতার পিছনে ছিল একাধিক কারণে সমাবেশ। সেগুলি হলো-

1)নেতৃত্বের অভাব-ভারত ছাড়ো আন্দোলনের শুরুতেই দেশের প্রথম সারির অধিকাংশ নেতাদের গ্রেপ্তার করার ফলে জনসাধারণ সম্পূর্ণভাবে নেতৃত্বাধীন হয়ে পড়েন। আন্দোলনকারীদের কোন সংগঠন বা পরিকল্পনা ছিল না। গান্ধীজি ও এই আন্দোলনের কোন সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দেননি।মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মতে, “আন্দোলনের পরিকল্পনা সম্পর্কে গান্ধীজীর কোন সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। বিদ্রোহী জনগনের মধ্যে কোন সমন্বয় ছিল না। তাই এক এক শহরে বিদ্রোহের চেহারা ছিল এক এক রকম”। এইভাবে বিক্ষিপ্ত আন্দোলনের মাধ্যমে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সাফল্য লাভ কোনমতেই সম্ভব ছিল না। এ প্রসঙ্গে জয় প্রকাশ নারায়ণও “সংগঠন ও সমন্বয়ের অভাব”কে ভারতছাড়ো আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ হিসাবে দাবি করেছেন।

2)জাতীয় নেতৃত্বের দায়িত্বহীনতা-1942 খ্রিস্টাব্দের 14ই জুলাই জাতীয় কংগ্রেস ভারতছাড়ো আন্দোলনের প্রস্তাব করলেও তাঁরা আন্দোলন শুরু করেন 9ই আগস্ট। ফলস্বরূপ এই সময়ের মধ্যে সরকার নিজেকে প্রস্তুত করে নেয় এবং তীব্র দমন নীতির দ্বারা এই আন্দোলনকে ব্যর্থ করে দেয়। তীব্র দমন নীতির ফলে আন্দোলন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়লে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ এই আন্দোলনে দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন। এমনকি জওহরলাল নেহেরু, বল্লভ ভাই প্যাটেল, গোবিন্দ বল্লভ পন্থ যৌথ বিবৃতি দিয়ে ঘোষণা করেন, “No movement had been officially taken by AICC or by Ghandhiji.” অর্থাৎ “কংগ্রেস বা গান্ধীজী সরকারিভাবে কোন আন্দোলন শুরু করেননি।”

3)নিষ্ঠুর সরকারি দমন নীতি-নিষ্ঠুর সরকারি দমননীতি ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে নিরস্ত্র জনসাধারণের অসম লড়াইয়ে সরকার যে জয়যুক্ত হবে তা শতসিদ্ধ। আন্দোলনের শুরু থেকেই ব্রিটিশ সরকার আন্দোলনকারীদের ওপর নিষ্ঠুর ও অমানবিক দমন নীতি চালাতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ভারতের আগে থেকেই প্রচুর মোতায়েন আইন ছিল। তাই সরকার পুলিশের সঙ্গে সেনাবাহিনী নিয়োগ করে আন্দোলনের মেরুদন্ড ভেঙে দেয়।

4)বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা-ভারতের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এই আন্দোলনকে সমর্থন করেনি। মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, হিন্দু মহাসভা, অনুন্নত সম্প্রদায়, লিবারেল ফেডারেশন, র‍্যাডিকাল ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রকৃতির রাজনৈতিক দল ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করে। কমিউনিস্ট পার্টি ও র‍্যাডিকাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করতে থাকে। মুসলিম লীগের মহম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলমানদের এই আন্দোলনে যোগদান না করার পরামর্শ দেন। অনুন্নত সম্প্রদায়ের নেতা ডঃ বি.আর. আম্বেদকর এ আন্দোলনকে “অযৌক্তিক ও দায়িত্ব জ্ঞানহীন” বলে মন্তব্য করেন। এইভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিরোধতার কারণে ওইসব রাজনৈতিক দলের বিপল সংখ্যক অনুগামী এই আন্দোলন থেকে দূরে থাকে। ফলে ভারত ছাড়ো আন্দোলন ব্যর্থ হয়।

5)মহাত্মা গান্ধীর অনুপস্থিতি-অনেকে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে ব্যর্থতার জন্য মহাত্মা গান্ধীর অনুপস্থিতিকে দায়ী করেছেন। তাদের মতে আন্দোলনের শুরুতে গান্ধীজী গ্রেপ্তার হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে গান্ধীজীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার যে ক্যারিশমা ছিল তা কাজে লাগানো যায়নি।অবশ্য ডঃ রমেশ চন্দ্র মজুমদার এই মতের বিরোধিতা করেছেন। তার মতে, “গান্ধীজী উপস্থিত থাকলেও ভারতছাড়ো আন্দোলন ব্যর্থ হতো।”

6)প্রাকৃতিক দুর্যোগ-1942 খ্রীঃ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র মেদিনীপুরে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা এবং 1943 খ্রীঃ সারা বাংলা জুড়ে পঞ্চাশের মন্বন্তর ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে দুর্বল করে দেয়। এইসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে দেশে চরম খাদ্যাভাব দেখা দেয় এবং অগণিত মানুষের মৃত্যু হয়। ফলস্বরূপ প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত মানুষ আন্দোলন সম্পর্কে উদাসীন হতে বাধ্য হয়।

7)মুসলমান সম্প্রদায়ের ভূমিকা-মুসলমান সম্প্রদায়ের আন্দোলন বিমুখতা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ধার ও ভার অনেকটাই কমিয়ে দেয়। মুসলিম লীগ ও মুসলিম সম্প্রদায় এই আন্দোলন থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখায় এই আন্দোলন প্রকৃত গণআন্দোলন হয়ে উঠতে পারেনি।উল্টে মুসলিম লীগ নেতা মহম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলমান সম্প্রদায়কে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার পরামর্শ দেন।ফলে বিপুল সংখ্যক মুসলিম জনতা এই আন্দোলন থেকে দূরে থাকায় এবং ব্রিটিশ সরকারকে সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করায় এই আন্দোলন অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ব্যর্থতায় পর্যবসিত ঘোষিত হয়।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের গুরুত্ব

ভারত ছাড়ো আন্দোলন ব্যর্থ হলেও এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এই আন্দোলনের গুরুত্বগুলি হল নিম্নরূপ-

1)সর্বস্তরের মানুষের যোগদান-ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কৃষক, শ্রমিক, নারী, পুরুষ, ছাত্র-ছাত্রী নির্বিশেষে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগদান করেছিল।স্বয়ং বড়োলাট লর্ড লিনলিথগো এই আন্দোলনের জনসমাবেশ সম্পর্কে স্বীকার করেছেন যে, এত ব্যাপক সরকার বিরোধী আন্দোলন সিপাহী বিদ্রোহের পর আর দেখা যায়নি।

2)কংগ্রেসের প্রভাব বৃদ্ধি-ভারত ছাড়ো আন্দোলন থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। জাতীয় কংগ্রেসের ডাকে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে দেশের সর্বস্তরের মানুষের যোগদানের ফলে জনমানসে কংগ্রেসের প্রভাব ব্যাপক ও সর্বাত্মক হয়।কংগ্রেসী নেতাদের দুঃখবরণ ও আত্মত্যাগ ভারতবাসীকে আপ্লুত করে। শুধু তাই নয়, আন্দোলন চলাকালে গান্ধীজীর অনশন ভারতবাসীর হৃদয়ে কংগ্রেসের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।

3)স্বাধীনতার ভিত্তি স্থাপন-ভারত ছাড়ো আন্দোলন প্রমাণ করে যে ভারতবাসী স্বাধীনতা অর্জনের জন্য প্রস্তুত এবং তা অর্জনের জন্য তারা সব ধরনের ত্যাগ, তিতিক্ষা, অত্যাচার, লাঞ্ছনা এমনকি মৃত্যুবরণ করতেও প্রস্তুত। এ প্রসঙ্গে অরুন চন্দ্র ভূঁইয়া তাঁর ‘The Quite India Movement’ গ্রন্থে বলেছেন যে, “এই আন্দোলনের ফলে একটি স্বতঃস্ফূর্ত জাতীয় জাগরন ও জাতীয় ঐক্যবোধ গড়ে ওঠে!” এর ফলে ইংরেজরা 1947 খ্রিস্টাব্দে ভারত ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।।

4)সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রসার-মুসলিম লীগ ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ না দিলেও অসংখ্য মুসলমান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই আন্দোলনকে সমর্থন করে। মুসলিম লীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও উত্তর প্রদেশ, বিহার, চট্টগ্রাম, শিলচর প্রভৃতি স্থানের মুসলমানরা এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। এছাড়া এই আন্দোলন চলাকালীন সময়ে ভারতের কোথাও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। তাই হিন্দু মুসলমান সম্প্রীতির প্রসার ছিল এই আন্দোলনে একটি উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব।

5)গণআন্দোলনের রূপ গ্রহণ-ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কৃষক-শ্রমিকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামিল হয়ে একে গণআন্দোলনের রূপদান করেছিল। জহরলাল নেহেরুর মতে, “নেতা নেই, সংগঠন নেই, উদ্যোগ আয়োজন নেই, কোন মন্ত্র বল নেই-অথচ একটি অসহায় জাতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্ম প্রচেষ্টার বিকল্প পথ না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠল। এ দৃশ্য সত্যিই বিস্ময়কর।”

6)ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি-ভারত ছাড়ো আন্দোলন প্রমাণ করে যে মুক্তি সংগ্রামে ভারতের জয় অনিবার্য। কখন ও কি অবস্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে এবং স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর ভারতে কি ধরনের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে-এরপর কেবলমাত্র এটুকুই অমীমাংসিত থাকে। এই আন্দোলন যে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের মৃত্যু ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছিল তা বোঝা যায় বড়লাট লর্ড ওয়াভেলের একটি চিঠি দেখে। ওই চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দিন শেষ হয়েছে। পুনরায় এই ধরনের একটি আন্দোলন হলেই তা মোকাবিলা করার শক্তি সরকারের নেই। ব্রিটিশ সরকার আয়ারল্যান্ড ও মিশরে যেভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে ভারতের এখনই তা করা দরকার।”

7)বামপন্থীদের জনপ্রিয়তা হ্রাস-ভারত ছাড়া আন্দোলন ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলিতে পৃথক পৃথক প্রভাব ফেলেছিল। এই আন্দোলন জাতীয় কংগ্রেসের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছিলো। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের প্রতি কমিউনিস্ট নেতাদের আনুগত্য দেখে তাদের দেশপ্রেম সম্পর্কে ভারতবাসীর মনের সন্দেহের উদ্রেক করে। ফলে তাদের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায় এবং গ্রামীন বামপন্থী সংগঠনগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে।

8)নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব-ভারত ছাড়ো আন্দোলনের শুরুতেই ব্রিটিশ সরকার দেশের অধিকাংশ প্রথম সারির নেতাকে গ্রেফতার করায় জনসাধারণ সম্পূর্ন ভাবে নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছিল। এই পরিস্থিতিতে আন্দোলন পরিচালনার প্রয়োজনে অনেক নতুন নেতার আবির্ভাব ঘটে। এই নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব ভারতবাসীর সংগ্রামী শক্তি ও স্বাধীনতা লাভের ইচ্ছা যে কত প্রবল তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়ে যায়।

Leave a Comment