আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় জীবনী – Acharya Prafulla Chandra Ray Biography in Bengali

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় জীবনী: gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Acharya Prafulla Chandra Ray Biography in Bengali. আপনারা যারা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় সম্পর্কে জানতে আগ্রহী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এর জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

Table of Contents

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় কে ছিলেন? Who is Acharya Prafulla Chandra Ray?

আচার্য স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (২ আগস্ট ১৮৬১ – ১৬ জুন ১৯৪৪) সিআইই, এএনআই, এফআরএএসবি, এফআইএস, এফসিএস. যিনি পি সি রায় নামেও পরিচিত ছিলেন একজন প্রখ্যাত বাঙালি রসায়নবিদ, শিক্ষক, দার্শনিক ও কবি। তিনি বেঙ্গল কেমিক্যালসের প্রতিষ্ঠাতা এবং মার্কারি নাইট্রেটের আবিষ্কারক।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বিখ্যাত জমিদার পরিবারের সন্তান। শিক্ষায় দীক্ষায় কর্মকৃতিত্বে ভারতের শ্রেষ্ঠ পুরুষদের অন্যতম, বিশ্রুত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সফল অধ্যাপক, অথচ চলনে বলনে, বেশভূষায়, জীবনযাপনে ছিলেন এমনই সাধারণ যে তাঁকে দেখলে বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যেত না।

মনে হত ফোন সওদাগরী অফিসের করণিক। এমনই অত্যাশ্চর্য মানুষ ছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্ৰ রায়। দেশে বিদেশে সম্মানিত প্রখ্যাত রসায়নবিদ এই মানুষটিই ভারতে প্রথম রাসায়নিক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দেশে রসায়নচর্চা এবং গবেষণার পথ উন্মুক্ত করেন।

অধ্যাপনার দুর্লভ আকর্ষণী শক্তিতে ছাত্রদের আকৃষ্ট করে একটি ভারতীয় রাসায়নিক বিজ্ঞানী গোষ্ঠীর সৃষ্টি ঊনবিংশ শতকের ভারতীয় নবজাগরণের পথে গতি সঞ্চার করেছিলেন।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় জীবনী – Acharya Prafulla Chandra Ray Biography in Bengali

নামআচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়
জন্ম2nd আগস্ট 1861
পিতাহরিশচন্দ্র রায়
মাতাভুবনমোহিনী দেবী
জন্মস্থানরারুলি-কাটিপাড়া, যশোর জেলা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমানে খুলনা জেলা, খুলনা বিভাগ, বাংলাদেশ)
জাতীয়তাভারতীয়
পেশাবৈজ্ঞানিক
মৃত্যু16th জুন 1944 (বয়স 82)

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এর জন্ম: Acharya Prafulla Chandra Ray’s Birthday

প্রফুল্লচন্দ্র রায় ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এর পিতামাতা ও জন্মস্থান: Acharya Prafulla Chandra Ray’s Parents And Birth Place

ঋষিপ্রতিম বিজ্ঞান সাধক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের জন্ম অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলার রাডুলি গ্রামে ১৮৬১ খ্রিঃ ২ রা আগস্ট। তাঁর পিতার নাম হরিশচন্দ্র রায়, মাতা ভুবনমোহিনী দেবী।

ইংরাজি সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনুরাগী ছিলে হরিশচন্দ্র। কিন্তু তাঁর নাড়ির যোগ ছিল ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে। ফলে বাড়ির পরিবেশে ছিল দেশীয় ঐতিহ্য চেতনার সঙ্গে পাশ্চাত্য জ্ঞান – গরিমার প্রভাব।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এর ছোটবেলা: Acharya Prafulla Chandra Ray’s Childhood

এই দুই সমান্তরাল ভাবধারার মধ্যেই তৈরি হয়েছিল ভাবীকালের প্রফুল্লচন্দ্রের মানসিক গঠন। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন মধ্যম। আদর যত্নে মানুষ হয়েও ছেলেবেলা থেকেই শরীর ছিল রুগ্ন। তবু প্রাণশক্তির অভাব ছিল না বালক প্রফুল্লচন্দ্রের। গ্রামের পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে ছেলেবেলা থেকেই নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল তাঁর। রাডুলির বাল্যস্মৃতি পরিণত বয়সেও গভীর আবেগের সঙ্গে স্মরণ করতে দেখা যেত তাঁকে।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এর শিক্ষাজীবন: Acharya Prafulla Chandra Ray’s Educational Life

প্রতিষ্ঠিত জমিদার বংশ, অর্থের অনটন কোন কালেই ছিল না। তবু বিভিন্ন সময়ে নানান চাকরি করে জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেছেন হরিশচন্দ্র। মধ্যবয়সে তিনি সপরিবারে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় এসে বসবাস করতে থাকেন। সময়টা ১৮৭০ খ্রিঃ বাংলা তথা ভারতের সমাজ সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সেটা নবজাগরণের ঊষাকাল। প্রাতঃস্মরণীয় বিদ্যাসাগরের সংস্কারমূলক কাজের মধ্য দিয়ে জন্ম লাভ করছে এক নতুন জাতি।

শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে তিনি গ্রামে গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা করছেন, স্ত্রী শিক্ষার বাধা দূর করে তাদের জন্যও স্কুল স্থাপন করছেন, দিগবিজয়ী পণ্ডিত হয়ে নিজেই শিশু শিক্ষার বই লিখছেন, বিধবাবিবাহ প্রচলনের উদ্দেশ্যে প্রাচীনপন্থীদের সঙ্গে সমান দাপটে লড়াই চালিয়ে চলেছেন। সমাজের সর্বস্তরে আরম্ভ হয়েছে প্রচণ্ড আলোড়ন।

অপর দিকে খ্রিস্টান মিশনারিদের ধর্মান্তরকরণের ফাঁদ থেকে দেশবাসীকে স্বধর্মে অবিচলিত রাখবার জন্য দেবেন্দ্রনাথ ও কেশবচন্দ্র ব্রাহ্মধর্মের পতাকা উত্তোলন করে সমাজের ভাঙ্গন রোধ করবার প্রাণপণ প্রয়াস চালাচ্ছেন। স্বদেশী স্কুল গড়ে উঠছে নানা স্থানে, জাতীয়তা বোধের চেতনা ধীরে ধীরে জেগে উঠছে দেশবাসীর মনে।

ক্রান্তিকালের এই মহালগ্নে প্রফুল্লচন্দ্রকে ভর্তি করে দেওয়া হল কলকাতার হেয়ার স্কুলে। কিন্তু কলকাতার নতুন জল – হাওয়ায় অল্পদিনের মধ্যেই রোগে পড়ে গেলেন বালক প্রফুল্লচন্দ্র। কঠিন রকম – আমাশায় মরণাপন্ন হল তাঁর অবস্থা। বাধ্য হয়ে শরীর সুস্থ করার জন্য তাঁকে ফের নিয়ে আসতে হল রাডুলির গ্রাম – ঘরে।

হেয়ার স্কুলের ফোর্থ ক্লাশের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু বেশিরভাগ পড়া তিনি করতেন বাড়িতেই। তাঁর আগ্রহের বিষয় ছিল, ইংরাজি, গ্রিক, ল্যাটিন, ইতিহাস ও প্রত্নবিদ্যা। পড়াশুনার প্রতি গভীর আগ্রহ থাকায় অতি দ্রুত এই সব বিষয়ে নিজেকে তৈরি করে নিতে পারছিলেন।

ভবিষ্যতে যিনি দেশের মানুষকে বিজ্ঞান শিক্ষার নতুন পথ দেখাবেন, ছেলেবেলায় বিজ্ঞানের প্রতিও যে তাঁর স্বাভাবিক আকর্ষণ থাকবে এটা সহজেই অনুমান করে নেওয়া যায়। ভাষা সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে বিজ্ঞানও যে তাঁর বিদ্যাচর্চার অন্যতম বিষয় ছিল তা বলাই বাহুল্য। গ্রামের জল – হাওয়ার মুক্ত পরিবেশে ক্রমে শরীরের সুস্থতা ফিরে পেলেন প্রফুল্লচন্দ্র। ১৮৭৪ খ্রিঃ পুনরায় কলকাতায় এলেন, এবারে ভর্তি হলেন অ্যালবার্ট স্কুলে।

এই স্কুলের পরিচালক ছিলেন ব্রহ্মবান্ধব কেশবচন্দ্রের ছোট ভাই কৃষ্ণবিহারী সেন। ওখানে পাঠ্যাবস্থাতেই প্রফুল্লচন্দ্র ব্রাহ্মধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁর চিন্তা ও মননে প্রগতির পরিশীলন সংঘটিত হয়।

১৮৭৯ খ্রিঃ এন্ট্রাস পাস করলেন প্রথম বিভাগে। ভর্তি হলেন বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশনে। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রতিষ্ঠানে ইংরাজির অধ্যাপনায় নিযুক্ত ছিলেন। তখনো অবশ্য তিনি রাষ্ট্রগুরু হয়ে ওঠেন নি। তবে তাঁর শিক্ষায় ছাত্রদের মধ্যে একদিকে যেমন ইংরাজের সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ জন্মাত, তেমনি স্বাদেশিকতার আবেগে উদ্বুদ্ধ হত তারা।

এইভাবেই অন্ধকার ভারতবর্ষে জন্মলাভ করছিল নবভারতের আলোর শিশুরা। প্রফুল্লচন্দ্রও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। তাঁর কিশোর রক্তেও প্রবাহিত হল ইংরাজি প্রেমের সঙ্গে দেশপ্রেম। ১৮৮০ খ্রিঃ এফ.এ. পাস করে প্রেসিডেন্সি কলেজে বি . এ . কোর্সে ভর্তি হলেন। এখানেই তিনি রসায়নের অধ্যাপক আলেকজাণ্ডার পেজলারের সান্নিধ্য লাভ করেন এবং রসায়ন বিজ্ঞানের প্রতি গভীরভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

বি.এ. পরীক্ষার আগে গিলক্রাইস্ট বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৮৮০ খ্রিঃ প্রফুল্ল চন্দ্র উচ্চতর শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে বিলাত যাত্রা করেন। প্রফুল্লচন্দ্র ভর্তি হলেন এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। লন্ডনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছেড়ে এডিনবার্গে ভর্তি হবার কারণ ছিল। তখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের পাঠ দিতেন বিশ্রুত রসায়নবিদ ক্রাম ব্রাউন। সমমাত্রিকতার বা আইসোমেরিজম – এর সূত্র আবিষ্কার করে তিনি বিশ্বখ্যাতি লাভ করেছিলেন। এই সূত্রেই তিনি লন্ডনের রয়াল সোসাইটির ফেলো মনোনীত হয়েছিলেন।

প্রফুল্লচন্দ্র ১৮৮৫ খ্রিঃ বি.এসসি. পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হলেন। ১৮৮৭ খ্রিঃ রসায়ন শাস্ত্রে মৌলিক গবেষণার জন্য এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.এস.সি উপাধি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হোপ পুরস্কার লাভ করেন।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এর কর্ম জীবন: Acharya Prafulla Chandra Ray’s Work Life

১৮৮৮ খ্রিঃ দেশে ফিরে আসেন এবং ১৮৮৯ খ্রিঃ প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপকের পদ লাভ করেন। এখানে তিনি সহকর্মী হিসেবে পেলেন জগদীশচন্দ্র বসুকে। কেমব্রিজেই ইতিপূর্বে আলাপ পরিচয় হয়েছিল, এবারে কর্মসূত্রে বন্ধুত্ব তৈরি হল। অধ্যাপনার পাশাপাশি প্রফুল্লচন্দ্র গবেষণার কাজও আরম্ভ করলেন।

সেই সময়ে প্রেসিডেন্সিতে গবেষণাগারের অবস্থা বিশেষ ভাল ছিল না। উপযুক্ত পরিসর এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির যথেষ্ট অভাব ছিল। এই অসুবিধার মধ্যেই কাজ করতে হতো প্রফুল্লচন্দ্রকে।

একেই তো চিররুগ্ন চেহারা, সময়ে অসময়ে ছোট বড় অসুস্থতা লেগেই আছে। তার ওপর অপরিসর গবেষণা কক্ষের মধ্যে ধোঁয়া গ্যাস – এর আক্রমণ। বাধ্য হয়েই তাঁকে শুভানুধ্যায়ীদের পরামর্শে এবং ভবিষ্যৎ গবেষকদের স্বার্থে নতুন একটি ল্যাবরেটরির কথা জানাতে হল। প্রফুল্লচন্দ্রেরই উদ্যোগে এবং তৎপরতায় ১৮৯২ খ্রিঃ প্রেসিডেন্সিতে গড়ে উঠল নতুন ল্যাবরেটরী। একেবারে আধুনিক ল্যাব। মহাউৎসাহে এবারে সহকর্মীদের নিয়ে গবেষণায় মেতে উঠলেন প্রফুল্লচন্দ্র। সালফেট যৌগের আণবিক সংযুক্তি বিষয়ে শুরু হল অক্লান্ত পরিশ্রম।

১৮৯৩ খ্রিঃ থেকে জয়যাত্রা শুরু হল। এই সময়ে একদিন পরীক্ষাগারে নানারকম পরীক্ষা করছেন। বিশেষ প্রয়োজনে পারদ পরিশ্রুত করছেন। এজন্য প্রথমে জলীয় নাইট্রিক অম্লকে ঠাণ্ডা করে নিয়েছেন। সেই ঠাণ্ডা তরলে বিন্দু বিন্দু করে পারদ ফেলতে হচ্ছে। এই সময়ে একটা অদ্ভুত ব্যাপার নজরে পড়ল তাঁর। লক্ষ করলেন পারদের সঙ্গে জলযুক্ত নাইট্রিক অম্লের সূক্ষ্ম একটা বিক্রিয়া ঘটছে। তার ফলে পারদের ওপরে পড়ছে অদ্ভুত একটা হলদে সর। ধীরে ধীরে সেই সর কঠিনে রূপান্তরিত হচ্ছে।

জিনিসটা পরীক্ষা করেই আনন্দে মন নেচে উঠল। জিনিসটা নাইট্রাইট- মারকিউরাস নাইট্রাইট। এই নতুন লবন আবিষ্কার করতে পেরে স্বতঃই উৎসাহিত হয়ে উঠলেন প্রফুল্লচন্দ্র। এশিয়াটিক সোসাইটির পত্রিকায় এ সম্পর্কে একটা লেখা ছাপালেন। পরে বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা জার্নাল অব দ্য কেমিক্যাল সোসাইটিতেও নতুন লবন তৈরির কলাকৌশল ব্যাখ্যা করে প্রবন্ধ পাঠালেন। প্রবন্ধটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বিজ্ঞানী মহলে সাড়া পড়ে গেল। রাতারাতি প্রফুল্লচন্দ্র সারা বিশ্বে বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিতি লাভ করলেন।

এরপর ক্ষারীয় ধাতুর বিভিন্ন নাইট্রাইট লবণ তৈরির কাজ নিয়ে অগ্রসর হতে লাগল তাঁর বিজ্ঞান – সাধনা। ১৯০৯ খ্রিঃ পর্যন্ত এই নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। প্রফুল্লচন্দ্র বিশুদ্ধতা সহ ডবল নাইট্রাইট যেমন পারদ ও ক্যালসিয়ামের কেলাসিত ডবল নাইট্রাইট পারদ ও বেরিয়ামের কেলাসিত ডবল নাইট্রাইট, পারদ ও লিথিয়ামের ডবল নাইট্রাইট, প্রভৃতি তৈরি করলেন।

ম্যাগনেসিয়াম নাইট্রাইট যে খুবই অস্থায়ী তা – ও তিনি নির্ণয় করেন। একের পর এক পরীক্ষা – নিরীক্ষায় সফল হয়েছেন, সেসব নিয়ে ক্রমাগত প্ৰবন্ধ লিখেছেন কেমিক্যাল সোসাইটির জার্নালে। নাইট্রাইট সংক্রান্ত তাঁর পর্যায়ক্রমিক সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে মাস্টার অব নাইট্রাইটস নামে পরিচিত হলেন তিনি। * প্রফুল্লচন্দ্রের বিখ্যাত গ্রন্থ হিন্দু রসায়ন চর্চার ইতিবৃত্ত প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয় ১৯০২ খ্রিঃ।

এই গ্রন্থে তিনি প্রধানতঃ প্রাচীন মধ্য ও তান্ত্রিক যুগের রসায়ন চর্চার ইতিবৃত্ত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে গিয়ে চরক, সুশ্রুত, নাগার্জুন, প্রভৃতি প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞানীদের অবদানের বিচার বিশ্লেষণ করেছেন।

প্রফুল্লচন্দ্র বিভিন্ন প্রমাণের সাহায্যে বিশ্ববিজ্ঞানের মঞ্চে ঘোষণা করেন ধাতু নিষ্কাশন, বারুদ তৈরি ইত্যাদি বিষয়ে প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞানীদের দক্ষতা কিছু কম ছিল না। প্রফুল্লচন্দ্রের দীর্ঘ পরিশ্রমের ফল এই গ্রন্থটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হল। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা গুলোতে বিখ্যাত বিজ্ঞানীরাই প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিবৃত্তের এই গ্রন্থটির বিষয়ে সপ্রশংস আলোচনা প্রকাশ করলেন। ফলে পশ্চিমের বিজ্ঞানী মহলেও যথেষ্ট সাড়া পড়ল। এই গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৯ খ্রিঃ। এই খন্ডে বৌদ্ধ তান্ত্রিকদের রসায়ন চর্চা বিশেষ করে নাগার্জুনকে নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে।

সেই সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে ভৌত রসায়নের তত্ত্ব নিয়ে মধ্যযুগীয় রসায়নবিদদের গবেষণার বিষয়াদি। হিন্দু রসায়ন শাস্ত্রের ইতিবৃত্ত গ্রন্থের ভূমিকায় প্রফুল্লচন্দ্র লেখকের বক্তব্যে যা বলেছিলেন তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তার এক অংশে তিনি বলেছেন, “হিন্দু জাতির গৌরব উদ্দীপিত অতীত ও বিশাল সুপ্ত সম্ভাবনা আরও এক গৌরবোজ্জ্বল ভবিষ্যতের মুখাপেক্ষী। বইটি লিখেছি আমার দেশবাসীকে অতীতের শ্রেষ্ঠত্ব ফিরে পাবার চেতনায় উদ্ভাসিত করে তুলতে, যদি তাই – ই হয় — ভাববো শ্রম মাঠে মারা যায়নি ….. ”

দুই খন্ড বইই প্রকাশিত হয়েছিল প্রফুল্লচন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত্ব বেঙ্গল কেমিক্যাল এর পক্ষ থেকে। পরবর্তী সময়ে দুই খন্ড জুড়ে একখন্ডে প্রকাশিত হয় পরিবর্তিত শিরোনাম ‘ প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতের রসায়ন চর্চার ইতিবৃত্ত ‘ নিয়ে।

১৯০৪ খ্রিঃ প্রফুল্লচন্দ্র বিলেত যাত্রা করেন। লন্ডনে কিছুদিন কাটালেন ডেভি ফ্যারাডে – এর ল্যাবরেটরিতে। সেখানের দুই বিখ্যাত রসায়নবিদ ডেবার ও র‍্যামসের সঙ্গে এই সময়েই তাঁর ঘনিষ্ঠতা জন্মে। এছাড়াও অন্যান্য স্বনামধন্য রসায়নতাত্ত্বিকদের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে নতুন নতুন বিষয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে।

বিলেত থেকে যান জার্মানিতে। সেখানে রয়েছেন বিখ্যাত রসায়নবিদ জেকোবান হেনরিকাস ভ্যান্টহয়। রাসায়নিক গতিবিদ্যা ও অভিস্রাবণ ঘটিত চাপ – সংক্রান্ত সূত্র আবিষ্কার করে ভৌত রসায়নের ক্ষেত্রে তিনি তখন বিশ্ববিশ্রুত নাম। এছাড়া ১৯০১ খ্রিঃ রসায়নে প্রথম নোবেল পুরস্কার তাঁকেই দেওয়া হয়েছিল।

হেনরিকাস ভ্যান্টহয় – এর সঙ্গে বার্লিনে সাক্ষাৎকার ঘটে শ্রীকুল্লচন্দ্রের। দেশে ফিরে এসে তিনি আবার নিজের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়ন বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপকের পদে ছিলেন, ১৯১১ খ্রিঃ বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯১৬ খ্রিঃ পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এর পুরস্কার ও সম্মান: Acharya Prafulla Chandra Ray’s Awards And Honors

ইতিপূর্বেই প্রফুল্লচন্দ্রকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞানক্ষেত্রে অবদানের জন্য সাম্মানিক ডক্টরেট উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেছিল। ১৯১২ খ্রিঃ প্রফুল্লচন্দ্র দুটি বিরল সম্মান লাভ করলেন। ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে অনারারি ডি.এস – সি উপাধি দিয়ে সম্মানিত করল। ব্রিটিশ সরকার দিল সি.আই.ই ও নাইট উপাধি। এছাড়াও, পরবর্তিকালে রসায়ন বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র দেশ ও বিদেশের বহু সম্মান লাভ করেন।

লন্ডন ও মিউনিক বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক সদস্য রূপে গ্রহণ করে। ১৯৩১ খ্রিঃ মিউনিক শহরের ডয়টসে আকাদেমি ও ১৯৪৩ খ্রিঃ লন্ডন কেমিক্যাল সোসাইটি তাঁকে সাম্মানিক সভ্যরূপে নির্বাচিত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাণারস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পান অনারারি ডি.এসসি উপাধি।

১৯২৪ খ্রিঃ ভারতে ইন্ডিয়ান কেমিক্যাল সোসাইট প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি হন তার প্রথম সভাপতি। বিজ্ঞান চর্চার উন্নতিকল্পে ১৯১৬ খ্রিঃ কলকাতায় স্বয়ং সম্পূর্ণ সায়েন্স কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্সি কলেজের কাজে পদত্যাগ করে প্রফুল্লচন্দ্র এখানে পালিত অধ্যাপকের পদ গ্রহণ করেন।

বাংলা তথা ভারতীয় বিজ্ঞানের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছিল এই কলেজেই বিশ্ববিশ্রুত ভারতীয় বিজ্ঞানীদের অধ্যাপনায়। গোড়া থেকেই রসায়নের দায়িত্বে ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। জগদীশচন্দ্র ছিলেন পদার্থবিদ্যার দায়িত্বে। পরে এই ধারায় এসে যুক্ত হয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ, শিশির দাশ, নীলরতন সরকার প্রমুখ। আরও এসেছিলেন রামন ও কৃষ্ণনের মত প্রতিভাবান গবেষক অধ্যাপকেরা।

প্রফুল্লচন্দ্রের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস লিঃ – এর প্রতিষ্ঠা। এই প্রতিষ্ঠানই ভারতের প্রথম রাসায়নিক দ্রব্য ও ওষুধ প্রস্তুতের কারখানা। কর্মবিমুখ বাঙালী জাতিকে ব্যবসা – বাণিজ্যে উৎসাহিত করবার জন্য এবং দেশে বিবিধ শিল্পোন্নতি বিধানের চেষ্টায় প্রফুল্লচন্দ্র নানাভাবে উৎসাহিত ও উদ্দীপিত করবার চেষ্টা করেছেন। জাতি গঠনের সেই মানসিকতা নিয়েই তিনি জন্ম দিয়েছিলেন বেঙ্গল কেমিক্যালের।

প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের সঙ্গে নিজের নতুন রসায়ন ভাবনার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রফুল্লচন্দ্র দেশীয় ওষুধ বাজারে ছেড়েছিলেন। বিজ্ঞানের পাশাপাশি সাহিত্যেও গভীর অনুরাগ ছিল প্রফুল্লচন্দ্রের। বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা তাঁর বহু প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। অধিকাংশ প্রবন্ধের মধ্যেই তিনি বিজ্ঞানের জগতে ভারতীয় অবদানের কথা সগর্বে তুলে ধরবার চেষ্টা করেছেন।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এর রচনা: Written by Acharya Prafulla Chandra Ray

প্রকৃতপক্ষে সাহিত্য সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি পরাধীন জাতির ধমনীতে জাত্যাভিমান ও জাতীয়তাবোধের চেতনা প্রবাহিত করতে চেয়েছিলেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার তিনি ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ।

প্রফুল্লচন্দ্রের রচিত বিখ্যাত দুটি গ্রন্থ হল, বাঙ্গালীর মস্তিষ্ক ও তাহার অপব্যবহার এবং অন্নসমস্যায় বাঙ্গালীর পরাজয় ও তাহার প্রতিকার। বলাবাহুল্য বইগুলির শিরোনামের মধ্যেই লেখকের গভীর স্বজাতিপ্রীতি পরিস্ফুট। ১৯১০ খ্রিঃ রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের মূল সভাপতি হয়েছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। নিজে ছিলেন অকৃতদার। অর্জিত অর্থ অকাতরে মানব কল্যাণের কাজে ব্যয় করেছেন।

সকল প্রকার জাতীয় শিক্ষা ও শিল্পোদ্যোগের ক্ষেত্রে তাঁর উদার হস্ত সাহায্য ও উৎসাহ নিয়ে প্রসারিত হত। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী বীরদের প্রতি প্রফুল্লচন্দ্রের গভীর সহানুভূতি ছিল। ১৯২১ খ্রিঃ অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে গান্ধীজির খদ্দর – প্রচারের উদ্যোক্তাদের অন্যতম প্রধান ছিলেন তিনি।

দেশের বিজ্ঞানচর্চার উন্নতিকল্পে তাঁরই উৎসাহ ও অর্থসাহায্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলইন্ডিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন শিক্ষার উন্নতির জন্য তিনি দুলক্ষ টাকা দান করেছিলেন। দরিদ্র মেধাবী ছাত্ররা তাঁর কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ সাহায্য পেত। এছাড়া দুর্ভিক্ষ, বন্যা, মিকম্প প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়ে তাঁর ত্রাণকার্য দেশবাসীর সামনে নিঃস্বার্থ সেবার আদর্শ তুলে ধরেছে।

বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র ছিলেন সকল কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে। হিন্দুসমাজের জাতিভেদ, বাল্যবিবাহ, পণপ্রথা ইত্যাদির ঘোরতর বিরোধী ছিলেন তিনি। এই কু প্রথাগুলি যে আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ তা তিনি নানাভাবে দেশবাসীকে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন। বারবার বলেছেন, নারীমুক্তির ও নারী স্বাধীনতার কথা।

জাতীয় দেহের সর্বনাশা ক্ষত বলে তিনি মনে করতেন জাতিভেদ প্রথাকে। তিনি বলতেন “কুকুর – বেড়াল আস্তাকুঁড় থেকে ঘরে এলে আমাদের মনে ঘেন্না হয় না তেমন, কিন্তু ছোটজাতের কেউ ঘরে এল তো হল – আমাদের গা রি রি করে। চিরদিনই যে ওদের ধর্মহীন ও ঘৃণ্য ভেবে একঘরে করে রেখেছি, সমাজে তাই ধরেছে ঘুন। এসেছে দুর্বলতা ……….”।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এর মৃত্যু: Acharya Prafulla Chandra Ray’s Death

কর্মযোগী এই বিজ্ঞান সাধকের জীবন ছিল অতি সহজ সরল ও অনাড়ম্বর। নিয়মনিষ্ঠা ও সর্ববিষয়ে শৃঙ্খলা ছিল তাঁর জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ১৯৪৪ খ্রিঃ ১৬ ই জুন বিজ্ঞানতাপস ও কর্মযোগী প্রফুল্লচন্দ্র চিরশান্তিময় ধামে মহাপ্রয়াণ করেন।

Leave a Comment