অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং জীবনী – Alexander Fleming Biography in Bengali

অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং জীবনী: gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Alexander Fleming Biography in Bengali. আপনারা যারা অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং সম্পর্কে জানতে আগ্রহী অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং এর জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং কে ছিলেন? Who is Alexander Fleming?

স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং (৬ আগস্ট ১৮৮১ – ১১ মার্চ ১৯৫৫) ছিলেন এক বিশ্ববিশ্রুত স্কটিশ চিকিৎসক, অণুজীব বিজ্ঞানী, বিশ্বের প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক ‘বিংশ শতকের বিস্ময়’ পেনিসিলিন আবিষ্কারের জন্য সমধিক পরিচিত ছিলেন। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের তাঁর এই আবিষ্কার পরবর্তীতে বেঞ্জিলপেনিসিলিন তথা পেনিসিলিন-জি নামে নামাঙ্কিত হয়। ‘পেনিসিলিয়াম রুবেনস’ নামক এক শ্রেণীর ছত্রাক নিঃসৃত তরলকে বিশুদ্ধ করে তৈরি করেন অ্যান্টিবায়োটিক শ্রেণীর ওষুধ।

এই আবিষ্কারের জন্য তিনি ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে অপর দুই ইংরেজ রসায়ন বিজ্ঞানী হাওয়ার্ড ফ্লোরি ও অ্যার্নেস্ট চেইনের সাথে যৌথভাবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে লাভ করেন নোবেল পুরস্কার। চিকিৎসা বিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে নাইট উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে টাইম পত্রিকার সমীক্ষায় বিশ শতকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একশো ব্যক্তিত্বদের অন্যতম বিবেচিত হন। এছাড়া ও ২০০২ খ্রিস্টাব্দের বিবিসি টেলিভিশনের সমীক্ষায় গ্রেট ব্রিটেনের একশো ব্যক্তিত্বদের অন্যতম ও ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে এসটিভি টিভি চ্যানেলের বিচারে রবার্ট বার্নস ও উইলিয়াম ওয়ালেসের পর তিনি তৃতীয় গ্রেটেস্ট স্কট নির্বাচিত হন।

অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং জীবনী – Alexander Fleming Biography in Bengali

নামঅ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং
জন্ম6 আগস্ট 1881
পিতাহিউ ফ্লেমিং
মাতাগ্রেস স্টার্লিং মর্টন
জন্মস্থানডারভেল, পূর্ব আয়রশায়ার, স্কটল্যান্ড
জাতীয়তাব্রিটিশ
পেশাচিকিৎসক, অণুজীব বিজ্ঞানী
মৃত্যু11 মার্চ 1955 (বয়স 73)

অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং এর জন্ম: Alexander Fleming’s Birthday

অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং 6 আগস্ট 1881 জন্মগ্রহণ করেন।

আলেকজান্ডার ফ্লেমিং যেসব রোগ জীবাণুঘটিত, তার মোক্ষম ওষধি হল পেনিসিলিন। এটি এমন এক রাসায়নিক যে মানুষ বা পশু কারো শরীরেই এর কোন অশুভ প্রতিক্রিয়া ঘটে না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক মহৎ আবিষ্কার পেনিসিলিন ৷ এটি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনার পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়।

এই ধরনের আরও জীবাণুনাশক আবিষ্কারের জন্য উদ্ভিদ ও ছত্রাক নিয়ে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এমন কিছু জীবাণুর অস্তিত্বও ক্রমে আবিষ্কৃত হল যা জৈবরসায়নিক পেনিসিলিনের প্রয়োগেও বিনষ্ট হয় না। এই ভাবেই জীবাণুনাশক রাসায়নিকের একটি শ্রেণীবিভাগ তৈরি হল, যার নাম দেওয়া হয় অ্যান্টিবায়োটিক। এই শ্রেণীর জীবনদায়ী ওষধিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল স্টেপ্টোমাইসিন, টেরামাইসিন, ক্লোরোমাইসিটিন, ক্লোরামপেনিকল, পিউরোমাইসিন ইত্যাদি।

অ্যান্টিবায়োটিক গ্রুপের ওষুধ যে মানবজীবনকে ভয়ানক সব রোগের কবল থেকে রক্ষা করতে পারে, একথা আজ সুবিদিত।মানবসভ্যতার ইতিহাসে পেনিসিলিন আবিষ্কার এক যুগান্তকরী ঘটনা। এটি আবিষ্কার করেছিলেন আলেকজান্ডার ফ্লেমিং। একজাতীয় ছত্রাকের নাম হল পেনিসিলিয়াম। এই ছত্রাকের রস থেকে যে জীবাণুনাশক রাসায়নিকটি আবিষ্কার করেছিলেন ফ্লেমিং তার নাম দিয়েছিলেন পেনিসিলিন।

অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং এর পিতামাতা ও জন্মস্থান: Alexander Fleming’s Parents And Birth Place

গ্রেট ব্রিটেনের স্কটল্যান্ডের আয়ারশায়ারে দারভেল নামক গ্রামে ১৮৮১ খ্রিঃ ৬ ই আগষ্ট আলেকজান্ডার ফ্লেমিং – এর জন্ম। বাবা আর্ল অব লাউডাউন, মায়ের নাম গ্রেস মর্টন। পুরুষানুক্রমে ফ্লেমিংরা ছিলেন চাষী। লেখাপড়ার চল এই পরিবারে ছিল না বললেই চলে। ফ্লেমিং – এর ছেলেবেলাটাও তাই ছিল লেখাপড়াবর্জিত।

অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং এর শিক্ষাজীবন: Alexander Fleming’s Educational Life

মাত্র সাতবছর বয়সেই পিতৃহারা হন ফ্লেমিং। ফলে মস্ত বড় সংসারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব এসে পড়ে তার মায়ের ওপরে। দক্ষ হাতে তিনি সব সামলে স্নেহ যত্নে ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে থাকেন। মায়ের তত্ত্বাবধানে থেকে সবরকম দুঃখকষ্টকে জয় করার মত মনোবল ছেলেবেলা থেকেই লাভ করেছিলেন ফ্লেমিং। প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে সহজভাবে অগ্রসর হবার শিক্ষাও তিনি লাভ করেছিলেন মায়ের কাছ থেকে।

উত্তরকালে যিনি জগদ্বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী হয়েছিলেন, পাঁচ বছর বয়সে তার লেখাপড়া শুরু হয়েছিল নিতান্তই এক সাধারণ গ্রাম্য স্কুলে। তীক্ষ্ণ ধীশক্তি নিয়ে জন্মেছিলেন ফ্লেমিং। আর ছিল অসাধারণ মেধা। ফলে সহজেই তিনি স্কুলের শিক্ষকদের প্রিয় ছাত্র হয়ে উঠেছিলেন। তাঁদের উৎসাহ ও প্রশংসা তাঁকে পড়াশোনার প্রতি আগ্রাহান্বিত করে তোলে। পড়াশোনার ফাঁকে ফ্লেমিং – এর অভ্যাস ছিল বনে – জঙ্গলে ঘুরে নানা পশুপাখি ও জীবজন্তু মনোযোগ দিয়ে দেখা।

কখনো কখনো ফুল আর প্রজাপতির খেলা দেখে তন্ময় হয়ে যেতেন। এই ভাবেই প্রতিটি সজীব পদার্থ খুঁটিয়ে দেখার চোখ তৈরি হয়ে গিয়েছিল তার ছেলেবেলাতেই। উত্তরকালের এই খুঁটিয়ে দেখার অভ্যাসের ফলেই ছত্রাকের নিঃসৃত পদার্থ থেকে পেনিসিলিন আবিষ্কার করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। দশবছর বয়সে ফ্লেমিং ভর্তি হলেন দারভেলের হাইস্কুলে।

কিন্তু এই স্কুল বাড়ি থেকে খুব দূরে হওয়ায় কিছুদিন পরেই মা তাঁকে ভর্তি করিয়ে দেন কিলমারনক আকাদেমিতে। এটি ছিল খুবই নামকরা স্কুল। ফ্লেমিং বাড়ি থেকে স্কুলের ছাত্রাবাসে এসে ওঠেন। মাধ্যমিক স্কুল হিসেবে কিলমারনক আকাদেমির নামডাক ছিল খুব। রবার্ট বার্নস ও রবার্ট সুইস স্টিভেনসন — এই দুজন জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী এই স্কুলেরই ছাত্র ছিলেন। এমন এক স্কুলে ভর্তি হয়ে ফ্লেমিংও যে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেন তা বলাই বাহুল্য।

ফ্লেমিং – এর দাদা টমাস ফ্লেমিং স্থানীয় স্কুল থেকে পাশ করে গ্লাসগোতে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখান থেকে বেরোলেন চোখের ডাক্তার হয়ে। মেরিলিবোনে চেম্বার খুলে বসার কিছুদিনের মধ্যে নিজের প্রতিভা ও কর্মকুশলতার গুণে তার পসার জমে ওঠে। তখন তিনি অন্যান্য ভাইদের দারভেল থেকে লন্ডনে নিয়ে আসতে লাগলেন।

তাঁর তত্ত্বাবধানে ভাইরাও চশমা সম্পর্কে নানা জ্ঞান লাভ করেন। সকলে মিলে তখন গড়ে তুললেন চশমার কাচ তৈরির মস্ত ব্যবসা। ফ্লেমিং যখন লন্ডনে দাদার কাছে এলেন তখন তাঁর বয়স চোদ্দ। সময়টা ১৮৯৫ খ্রিঃ। সেই বছরই জার্মান বিজ্ঞানী রন্টগেন এক্স – রে আবিষ্কার করে পদার্থ বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুগান্তর ঘটিয়েছেন।

লন্ডনে এসে ফ্লেমিং ভর্তি হলেন রিজেন্ট স্ট্রিটের পলিটেকনিক স্কুলে। এখানে শিক্ষা অত্যন্ত মামুলি ধরনের হলেও বিজ্ঞানের নানা বিষয়ের সঙ্গে ফ্লেমিং – এর পরিচয় ঘটল। পাশ করে বেরুলেন দু বছর পরে। সঙ্গে সঙ্গে চাকরিও পেয়ে গেলেন লন্ডনের এক জাহাজ কোম্পানিতে। কিন্তু বেশিদিন এখানে কাজ করা হল না।

দাদা টমাস তখন শহরের নামী চক্ষুবিশারদ। ভাইকে তিনি চাকরি থেকে ছাড়িয়ে এনে ভর্তি করিয়ে দিলেন সেন্ট মেরি মেডিক্যাল কলেজে ৷ সেই সময় ফ্লেমিং – এর বয়স কুড়ি। এই কলেজে পড়ার সময়ে ফ্লেমিং গভীরভাবে একজন অধ্যাপকের দ্বারা প্রভাবিত হন। তিনি হলে প্যাথোলজির প্রধান অধ্যাপক ডঃ আলমোর্থ রাইট।

যুক্তিবাদী এই অধ্যাপকের চিন্তাভাবনায় ছিল আধুনিকতার আলো। সেই যুগের আবহাওয়ায় তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। অধ্যাপক রাইট টাইফয়েড জ্বরের প্রতিষেধক হিসেবে টিকা দেবার চল করেছিলেন। তাঁর প্রতিভা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবপ্রেম ফ্লেমিংকে সহজেই আকৃষ্ট করেছিল। এই প্রিয় অধ্যাপকের প্রভাবেই ধীরে ধীরে ফ্লেমিং – এর প্রতিভা বিকশিত হতে লাগল, তিনি বিজ্ঞানীতে রূপান্তরিত হতে লাগলেন।

১৯০৮ খ্রিঃ ফ্লেমিং সেন্টমেরি থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ডাক্তারি পাশ করলেন। কৃতিত্বের জন্য পেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণপদক। সেই সময়ে জীবাণুবিদ্যায় শারীরের রোগ প্রতিরোধের কারণ নিয়ে দুটি মত প্রচলিত ছিল। একটিকে বলা হত প্যারিস ধারা, যার নেতৃত্বে ছিলে ফরাসী বিজ্ঞানী ডাক্তার মেটনিকভ। তার মতে শরীরের প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে শ্বেত কণিকাদের প্রভাবই সর্বাধিক। শরীরে কোন জীবাণু প্রবেশ করলে, শ্বেতকণিকারা তাদের ঘিরে ধরে ধ্বংস করে।

এ কারণে শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, শ্বেতকণিকাদের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে। শ্বেতকণিকার সংখ্যা কম হলে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায়। ফলে সামান্য ঠাণ্ডা লাগলেই শরীর সর্দি – কাশিতে কাবু হয়ে যায়। জীবাণুর সামান্য আক্রমণও তখন শরীর ঠেকাতে পারে না। দ্বিতীয় মতটিকে বলা হয় বার্লিন ধারা। এই ধারার নেতৃত্ব দিচ্ছেন রবার্ট কখ।

তিনি শ্বেত কণিকার চাইতে শরীরের রক্তরসকেই রোগ প্রতিরোধের ব্যাপারে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। ডাঃ রাইট মেটনিকভের মতামতের সমর্থক হলেও, তাঁর বক্তব্য, শ্বেতকণিকার কাজ অনেক বেশি জটিল। জীবাণু বা অ্যান্টিজেনকে যে শ্বেতকণিকারা ধ্বংস করে তার মূলে রয়েছে রক্তরসের বিশেষ প্রভাব। শরীরের এই স্বাভাবিক বা প্রকৃতিগত ক্ষমতাকে বলেছেন opsonin. এই ক্ষমতার বলেই শরীরে কোনও একটি রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। অপসোনিন বেশি হলে শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশি হয়।

অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং এর কর্ম জীবন: Alexander Fleming’s Work Life

ডাক্তারি পাশ করবার পর ফ্লেমিং ডাঃ রাইটের ল্যাবরেটারিতেই গবেষণা শুরু করলেন। তার বিষয় হল, স্বাভাবিক ভাবেই রক্তের শ্বেতকণিকা। রোগজীবাণুকে লড়াই করে তারা কিভাবে কাবু করে, অণুবীক্ষণের লেন্সে চোখ রেখে তিনি তন্ময় হয়ে দেখতে থাকেন। অচিরেই তিনি বুঝতে পারলেন, শ্বেতকণিকা বাহিনীই শরীরের নিরপত্তা রক্ষার জন্য সংগ্রাম করে। রক্তরসের সেখানে কোন ভূমিকাই নেই।

এবিষয়ে অধ্যাপক রাইটের মতামতই যে যথার্থ এ সম্পর্কে তাঁর আর কোন সন্দেহই থাকে না। রাইটের পথ অনুসরণ করে ১৯১৪ খ্রিঃ ফ্লেমিং একটা ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে ফেললেন। এর টিকা শরীরে নিলে অল্প সময়ের মধ্যেই মুখের ব্রন সম্পূর্ণ মিলিয়ে যায় ৷ এই সময়েই পৃথিবীব্যাপী শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী হানাহানি। রণাঙ্গনের সামরিক শিবিরগুলিতে দলে দলে আহত সৈনিকরা গ্যাস – গ্যাংগ্রীনে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারাতে লাগল।

সেবা শিবিরে যোগ দিয়ে ফ্লেমিং প্রাণপণে মৃত্যুপথযাত্রী সৈনিকদের সেবায় আত্মনিয়োগ করলেন। সেই সময়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানী লিস্টারের আবিষ্কৃত কার্বলিক অ্যান্টিসেপটিকই ছিল এই জীবাণুবাহিত রোগটির একমাত্র ওষুধ। কিন্তু দেখা গেল, এই ওষুধও এঁটে উঠতে পারছে না। আহত সৈনিকরা মারা পড়ছে বেঘোরে। সে মৃত্যু এমন মর্মান্তিক যে দেখে সহ্য করা যায় না। ফ্লেমিং – এর ভাবনা শুরু হল, যে করেই হোক জীবাণুবাহিত রোগটিকে জব্দ করার উপায় বার করতে হবে।

গ্যাংগ্রিন রোগীর পায়খানা পরীক্ষা করে জীবাণুর সন্ধান পাওয়া গেল। ফ্লেমিং বুঝতে পারলেন, এই পথেই রোগসংক্রমণ ঘটে থাকে। তিনি শিবিরের সকলকে এ বিষয়ে সতর্ক করে দিলেন। পরীক্ষায় বসে আরও একটি অদ্ভুত বিষয় আবিষ্কার করলেন ফ্লেমিং। লিস্টার গ্যাংগ্রিনের জীবাণুনাশক হিসেবে কার্বলিক অম্ল ব্যবহার করেছিলেন। অস্ত্রচিকিৎসায়ও তা ব্যবহার করার পক্ষপাতী ছিলেন তিনি। ফ্লেমিং লক্ষ করলেন, একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় কার্বলিক অ্যাসিডকে গ্যাংগ্রিন জীবাণুর কালচারে মেশালে, তা বিপরীত কাজ করে।

আশ্চর্য দ্রুততায় জীবাণুর বংশবৃদ্ধি ঘটে। বিস্মিত ফ্লেমিং আরও কয়েকটি জীবাণুর ক্ষেত্রেও একই প্রতিক্রিয়া লক্ষ করেন। কার্বলিক অম্লের ব্যবহার সম্পর্কে সতর্ক হয়ে গেলেন ফ্লেমিং। সহযোগী চিকিৎসকদেরও এ বিষয়ে সাবধান করতে ভুললেন না। একটি জীবাণুনাশক ওষুধের এমন বিপরীত প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে স্বভাবতঃই কৌতূহলী হয়ে উঠলেন ফ্লেমিং। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন, শ্বেতকণিকারাই এই অস্বাভাবিকতার জন্য দায়ী।

রক্তে কার্বলিক অম্লের পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে শ্বেতকণিকার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। শ্বেতকণিকার সংখ্যা কমে যাবার ফলে রোগ জীবাণুরা শরীরে প্রবল হয়ে ওঠে, নিরাপদে তারা বংশ বিস্তার করতে পারে। এর পরে কার্বলিক অম্ল প্রয়োগের ক্ষেত্রে মাত্রা সম্পর্কে বিশেষ সচেতন থাকার ব্যাপারে ফ্লেমিং সাবধানবাণী ঘোষণা করলেন। এইভাবে অধ্যাপক রাইটের নীতি অনুসরণ করে ফ্লেমিং নতুন নতুন সত্যের সম্মুখীন হতে লাগলেন।

সেই সময়ে অর্থাৎ বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে শরীরের প্রাণ – রাসায়নিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার কোন ধারণা গড়ে ওঠেনি। সেই অবস্থায় জীবাণুনাশক নানা রাসায়নিক সম্পর্কে ফ্লেমিং – এর সতর্কবার্তা চিকিৎসকদের খুব মনঃপুত হল না। অনেকেই তা অগ্রাহ্য করলেন। দেখতে দেখতে চার বছর কেটে গেল। এল ১৯১৮ খ্রিঃ। মহাযুদ্ধের আগুন নিভে গেল। ইতিমধ্যে যুদ্ধচলাকালীন সময়েই

১৯১৫ খ্রিঃ ফ্লেমিং বিয়ে করেছেন। তার স্ত্রীর নাম সারা মরিসন ম্যাকেলরয়। অধ্যাপক রাইটের জীবাণুবিদ্যা বিভাগে সহকারীর পদে চাকরি নিয়ে ঢুকেছিলেন ফ্লেমিং। ১৯২৮ খ্রিঃ লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাণুবিদ্যা বিভাগে অধ্যাপকের পদে উন্নীত হলেন। এই সময়ে ফ্লেমিং স্টাফাইলোকক্কাস নামে এক ধরনের জীবাণু নিয়ে গবেষণা আরম্ভ করলেন। একদিন টেবিল থেকে উঠবার সময় কালচারের একটা প্লেট ঢাকা দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। পরে এসে দেখেন, জীবাণুর কালচারের ওপর ভাগে কেমন নীলাভ ছাতা পড়ে গেছে।

আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলেন, নীল ছাতার ধার বরাবর কোন জীবাণু নেই। কৌতুহলী হয়ে অণুবীক্ষণের তলায় নিয়ে এসে বিস্ময় একেবারে চরমে উঠল। দেখেন একটা জীবাণুও জীবিত নেই। কারণটা ঠিক বুঝতে না পারলেও কৌতূহল তীব্র হয়ে উঠল। নীলাভ ছাতাটার খানিকটা করে অংশ নানা জীবাণুর কালচারে প্রয়োগ করে দেখতে লাগলেন। প্রতিক্ষেত্রেই একই ফলাফল ঘটল, জীবাণুরা গুষ্ঠীসুদ্ধ প্রাণ হারাল। এবারে ওই নীলভা ছাতা নিয়ে উঠে পড়ে লাগলেন।

কয়েক মাস পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ফ্লেমিং দেখতে পেলেন, যে নীলাভ ছাতা তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছে তার সঙ্গে সাধারণ পেনিসিলিয়াম ছত্রাকের যথেষ্ট মিল। নষ্ট পনীরের ছত্রাকই হল সাধারণ পেনিসিলিয়াম ছত্রাক। জেলি বা জ্যামের ওপরে যে ছাতা পড়ে তাও সেই একই ধরনের ছত্রাক। ফ্লেমিং লক্ষ করলেন, এই ছত্রাক থেকে যে বিশেষ ধরনের তরল নিঃসৃত হয় তাই নানা ভয়ঙ্কর রোগের জীবাণুদের ধ্বংস করছে। জীবাণুনাশক এই তরলটি পেনিসিলিয়াম ছত্রাক থেকে পাওয়া গেছে। ফ্লেমিং তাই এটির নাম রাখলেন পেনিসিলিন

ফ্লেমিং – এর জীবনের এই আকস্মিক আবিষ্কারটি মানবসভ্যতার কল্যাণের পথ উন্মুক্ত করে দিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা হাতে পেয়ে গেলেন প্রাণ – রাসায়নিক জীবাণুনাশক বা বায়োলজিক্যাল অ্যান্টিসেপটিক। ছত্রাকের গা থেকে নিঃসৃত তরলকে বিশুদ্ধ করে তৈরি হল অ্যান্টিবায়োটিক শ্রেণীর ওষুধ। এই ওষুধ গ্রহণ করলে মানব শরীরের প্রহরী শ্বেত কণিকাদের কোন ক্ষতি হয় না, উপরন্তু রোগের জীবাণু ধ্বংস করে ফেলে।

এই বিশেষ ক্ষমতা কার্বলিক অম্ল বা অন্যান্য জীবাণুনাশকের মধ্যে অনুপস্থিত। যাইহোক, ছত্রাকের বিশেষত্বটি আবিষ্কারের পর ফ্লেমিং বসলেন পেনিসিলিনকে পৃথক করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু ক্রমাগত কয়েক বছর চেষ্টার পরও সফল হতে না পেরে বিরক্ত হয়ে জীবাণুবিদ্যার অন্য গবেষণায় মনোযোগ দিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কিছু আগে বাজারে দেখা দিল সালফা ড্রাগস ৷

গন্ধকঘটিত এই ওষুধগুলোর ক্ষমতা অপরিসীম। এরা সরাসরি রোগজীবাণুকে ধ্বংস করে না। এদের প্রভাবে রোগজীবাণু নিস্তেজ হয়ে পড়ে ও বংশবৃদ্ধি রোধ হয়। ফলে এই দুর্বল রোগজীবাণুকে শ্বেতকণিকারা সহজেই কাবু করে ফেলতে পারে। ফ্লেমিং তাঁর গবেষণা অসম্পূর্ণ অবস্থাতেই ছেড়ে দিয়েছিলেন।

১৯৩৮ খ্রিঃ দুই ইংরাজ রসায়ন বিজ্ঞানী হাওয়ার্ড ফ্লোরি এবং ই.বি. চেইন পেনিসিলনকে পৃথক করে ফ্লেমিং – এর গবেষণা সম্পূর্ণ করলেন। ফলে অনতিবিলম্বেই ওষুধ হিসেবে পেনিসিলিন বাজারে প্রবেশ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালেই ১৯৪১ খ্রিঃ থেকে চিকিৎসায় পেনিসিলিনের ব্যবহার শুরু হল। বিজ্ঞানীরা পেনিসিলিনের নাম দিলেন ‘ বিশ শতকের বিস্ময় ‘। আসলে তার কাজও ছিল সত্যিই বিস্ময়কর। অ্যান্টিবায়োটিকস – এর মতো পেনিসিলিনও জীবাণুদের বংশবিস্তার রোধ করে।

কিন্তু তার কাজ সম্পন্ন হয় অধিকতর দ্রুততায়। তাছাড়া বিভিন্ন জীবাণুঘটিত রোগের চিকিৎসায় পেনিসিলিন অ্যান্টিবায়োটিকস – এর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকরী। পেনিসিলিন আবিষ্কার করে ফ্লেমিং বিশ্বখ্যাতি লাভ করলেন। সেই সঙ্গে এল পদ ও পুরস্কার। ১৯৪৩ খ্রিঃ লন্ডনের রয়াল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হলেন। পরের বছর পেলেন ইংলন্ডের নাইটহুড। ১৯৪৫ খ্রিঃ হাওয়ার্ড ফ্লোরি ও ই.বি. চেইনের সঙ্গে ফ্লেমিং পেলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার।

অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং এর পুরস্কার ও সম্মান: Alexander Fleming’s Awards And Honors

পৃথিবীর নানা দেশের আমন্ত্রণ পেয়ে ফ্লেমিং ঘুরে ঘুরে অ্যান্টিবায়োটিক সংক্রান্ত ভাষণ দিয়ে বেড়ালেন কিছুকাল। ১৯৪৯ খ্রিঃ ফ্লেমিং – এর সুখ – দুঃখের সঙ্গিনী সারা মরিসনের মৃত্যু হল। তাঁদের একমাত্র পুত্রও অবশ্য ততদিনে ডাক্তারি পাশ করে বেরিয়েছে। কিছুকাল পরে ফ্লেমিং পুনর্বার বিয়ে করলেন জীবাণুতাত্ত্বিক ডক্টর আমেলিয়া কোৎসুরিসকে। সেটা ১৯৫৩ খ্রিঃ। সেই সময় তার বয়স বাহাত্তর। এক বছর পরেই এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় ফ্লেমিংকে দিল ক্যামেরুন পুরস্কার। হার্ভাড, ভেরোনা প্রভৃতি সহ বহু বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানজনক ডক্টরেট দিয়ে সম্মান জানিয়েছে।

অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং এর মৃত্যু: Alexander Fleming’s Death

১৯৫৫ খ্রিঃ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মানবসভ্যতার মহান পরিত্রাতা আলেকজান্ডার ফ্লেমিং – এর জীবনাবসান ঘটে।

Leave a Comment