আর্সেনিক দূষণ কি ? আর্সেনিক দূষণের কারণ ও ফলাফল

আর্সেনিক দূষণ কি ? আর্সেনিক দূষণের কারণ ও ফলাফল: ভৌমজল আমাদের পৃথিবীর এক অমূল্য সম্পদ হিসাবে বিবেচিত হয় কারণ এই ভৌমজলকেই আমরা পানীয় জলের একমাত্র স্বচ্ছ উৎস হিসাবে ব্যবহার করে থাকি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও তার সাথে সাথে আধুনিক পাম্পীয় সিস্টেমের আবিষ্কারের ফলে মানুষ অতিসহজেই অবিবেচনা প্রসূত প্রচুর পরিমানে ভৌমজল উত্তোলন করে ফেলছে। যার ফলে শিলা মধ্যস্থিত বিষাক্ত যৌগ আর্সেনিক অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে একপ্রকার দ্রবীভূত পদার্থ উৎপন্ন করে যা পরবর্তীকালে ভৌমজল তলের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে সেই জলের সাথে সহজেই মিশে গিয়ে জলের আর্সেনিক দূষণ ঘটায়। সেই দূষিত জল পানীয় হিসাবে, সেচের কাজে ব্যবহারের ফলে পানীয়ের মাধ্যমে ও উৎপাদিত ফসলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে বিষক্রিয়া ঘটাচ্ছে। এখানে আর্সেনিক দূষণের কারণ ও আর্সেনিক দূষণের ক্ষতিকারক প্রভাব গুলি সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করা হল। 

আর্সেনিক দূষণ কী ?

পৃথিবীর ভূত্বকের গঠনগত উপাদান গুলির মধ্যে অন্যতম একটি উপাদান হল আর্সেনিক। প্রকৃতিতে আর্সেনিক কে মুক্ত মৌল হিসাবে পাওয়া যায় না। আর্সেনিক প্রধানত অক্সিজেন, ক্লোরিন ও সালফার প্রভৃতির সাথে সংযুক্ত হয়ে অক্সাইড, সালফাইড, হাইড্রেড ও আর্সেনেট অজৈব যৌগ রূপে অবস্থান করে। তবে মূলত তিনটি খনিজের মধ্যে আর্সেনিক সবচেয়ে বেশি পরিমানে থাকে, এগুলি হল – রিয়েলগার, সালফাইড ও আয়রন। যে সব শিলায় লৌহের পরিমান বেশি থাকে সেখানে আর্সেনিকের উপস্থিতি বেশি হয়। এই শিলা মধ্যস্থ আর্সেনিক ভূগর্ভস্থ অ্যাকুইফারের সাথে যুক্ত হয়ে ভৌমজলকে দূষিত করে। এই আর্সেনিকের বিষক্রিয়ার ক্ষমতা এতো বেশি যে World health Organization আর্সেনিককে King of Poison হিসাবে ভূষিত করে। সাধারনত পানীয় জলে দ্রবীভূত আর্সেনিকের পরিমান প্রতি লিটারের 10µg (মাইক্রোগ্রাম) বা ০.০০১ মিলিগ্রামের বেশি হল তাকে আর্সেনিক দূষিত জল হিসাবে গন্য করা হয়। জলের মধ্যে আর্সেনিক দুটি অবস্থায় পাওয়া যায় – ট্রাইভালেন্ট আর্সেনিক বা আর্সেনাইট (As3+) ও পেনটাভালেন্ট আর্সেনিক (As5+)। আর্সেনাইট এর বিষক্রিয়ার মাত্রা আর্সেনেটের চেয়ে অনেক বেশি।

ভৌমজলে আর্সেনিক দূষণ প্রভাবিত দেশ সমূহ 

পৃথিবীর প্রায় ৭০ টি দেশ ভৌমজলের আর্সেনিক দূষন দ্বারা কম বেশি প্রভাবিত। এই দেশ গুলির বেশির ভাগটাই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকায় অবস্থিত। আর্সেনিক দূষণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায় যে সব দেশ গুলিতে সে গুলির মধ্যে অন্যতম হল বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, চীন, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি। এছাড়া আর্জেন্টিনা, চিলি, হাঙ্গেরি, কানাডা, পাকিস্তান, মেক্সিকো প্রভৃতি দেশও কমবেশি আর্সেনিক দূষণ দ্বারা কবলিত।  

ভারতে আর্সেনিক দূষণ 

ভারতের মতো বিশাল দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের পানীয়, শিল্প ও জলসেচ প্রভৃতি ক্ষেত্রে জলের বিপুল চাহিদা মেটাতে ভৌমজল গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। ভারতের গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পলি গঠিত অঞ্চল ভৌমজলের প্রধান উৎস। আবার এই অঞ্চলেই মানুষের দ্বারা ভৌমজলের অত্যাধিক উত্তোলন ভৌমজলতলের অবনমন ঘটাচ্ছে। এই জলতলের অবনমন ভৌমজলের আর্সেনিক দূষণের প্রধান কারণ। তাই ভারতের প্রায় ৫ কোটি মানুষের আর্সেনিক দূষণের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারতের ১০ টি রাজ্যের অগভীর অ্যাকুইফারের জলে অতিমাত্রায় (>10 ppb)আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ভারতে প্রথম আর্সেনিক দূষিত জলের সন্ধান পাওয়া যায় চণ্ডীগড় এবং এরপর ভারতের নিম্নগাঙ্গীয় সমভূমিতে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গে আর্সেনিক দূষিত জল পাওয়া যায়। বর্তমানে ভারতের প্রায় ২০ টি রাজ্য ও ৪ টি কেন্দ্র শাসিত রাজ্য আর্সেনিক দূষণ দ্বারা প্রভাবিত। যেমন – বিহার, অরুনাচল প্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, আসাম, মনিপুর, মেঘালয়, সিকিম, ত্রিপুরা, পাঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ ও নাগাল্যান্ড প্রভৃতি রাজ্য। 

পশ্চিমবঙ্গে আর্সেনিক দূষণ 

সাধারণত পলি গঠিত সমভূমি অঞ্চল গুলিতে সঞ্চিত ভৌমজলে সবচেয়ে বেশি আর্সেনিক পাওয়া যায়। তাই  নিম্ন গাঙ্গেয় সমভূমি বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বর্তমানে আর্সেনিক যুক্ত জলের সন্ধান পাওয়া গেছে। ১৯৮৩ সালে উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাত ব্লকের দুটি গ্রামে এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার বারুইপুর ব্লকে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম আর্সেনিক সংক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের আর্সেনিক কবলিত জেলা গুলি হল – উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, মালদা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, হাওড়া ও হুগলি। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলা গুলিতেও  ভৌমজলে আর্সেনিক পাওয়া গেছে। 

আর্সেনিকের উৎস 

প্রধানত দুটি উৎস থেকে আর্সেনিক ভৌমজলের সাথে মেশে – প্রাকৃতিক উৎস ও অপ্রাকৃতিক বা মনুষ্য সৃষ্ট উৎস। প্রাকৃতিক উৎস গুলির মধ্যে অন্যতম হল – ভূতাত্ত্বিক গঠন অর্থাৎ শিলার প্রকৃতি ( পাললিক শিলা, আগ্নেয় শিলা ও মৃত্তিকা), ভূতাপীয় জল, অগ্ন্যুৎপাত প্রভৃতি অজৈব আর্সেনিকের অন্যতম উৎস।মানবিক কার্যাকলাপের ফলে পৃথিবীর প্রায় ৫৪ টি দেশের ভৌমজল আর্সেনিক দ্বারা দূষিত হয়েছে। মূলত বিভিন্ন খনিজ পদার্থ, কয়লা উত্তোলন কেন্দ্র ও সোনার খনিজে উপস্থিত সালফাইড আর্সেনিকের গুরুত্বপূর্ন উৎস। 

ভৌমজলে আর্সেনিকের মিশ্রন 

ভৌমজলে কী পরিমান আর্সেনিক থাকবে তা নির্ভর করে জলের pH, পলিতে জৈব পদার্থের পরিমান, ভৌমজলতলের উত্থান পতন, প্রবেশ্য শিলার সম্পৃক্তকরন, সালফারের পরিমান, ভৌমজলের প্রবাহের দিক ও সঞ্চিত জলের বয়স প্রভৃতির উপর।

ভৌমজলে আর্সেনিক মিশ্রিত হওয়ায় প্রক্রিয়া গুলি হল – ১) আর্সেনিক ও লৌহ বহনকারী খনিজ গুলির অক্সিডেশন বা জারন ও দ্রবনীকরনের মাধ্যমে মিশ্রন।  ২) জৈব পদার্থের উপস্থিতিতে আর্সেনিক বহনকারী প্রাথমিক ও গৌন খনিজের আবহবিকার ও দ্রবনীকরন।  ৩) নাইট্রেট, ফসফেট ও বাইকার্বনেট আয়ন দ্বারা আর্সেনিকের ভৌমজলে বিনিময়। 

আর্সেনিক দূষণের ক্ষতিকারক প্রভাব

প্রচুর বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলে জানা গেছে যে দীর্ঘদীন যাবৎ আর্সেনিক যুক্ত জল পান করলে মানুষের শরীরে আর্সেনিকের বিষক্রিয়ার বিভিন্ন লক্ষন দেখা যায়। আর্সেনিক একটি মারাত্মক বিষ। মানবদেহে আর্সেনিক ধীর গতিতে ক্রিয়া করে। এর তীব্রতা ও মাত্রা নির্ভর করে কতদিন ধরে আক্রান্ত ব্যক্তি আর্সেনিক যুক্ত জল পান করেছেন এবং সেই জলে কতটা আর্সেনিক আছে। 

মানুষের ওপর প্রভাব

দীর্ঘ দিন আর্সেনিক দূষিত জল পান করলে মানব দেহে বিষক্রিয়ার লক্ষন গুলি ধীরে ধীরে দেখা যায়। আর্সেনিকের প্রভাবে প্রথমে চামড়ার রঙের পরিবর্তন দেখা যায়। তারপর আসে Keratosis, Hyperkeratosis । এর পরেও আক্রান্ত ব্যক্তি দূষিত জল পান করলে বিভিন্ন ধরণের ক্যানসার (চামড়ার, লিভার, ফুসফুস, প্লিহা) হতে পারে। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুও ঘটতে পারে। আর্সেনিকের বিষক্রিয়ার লক্ষন গুলিকে সামগ্রিক ভাবে আর্সেনিকোসিস বলে। এছাড়া অন্যান্য যে সকল প্রভাব পরে সেগুলি হল – 

১) ফুসফুসের প্রদাহ, আজমা ও বঙ্কাইটিস।

২) অবসাদ ও ক্লান্তি।

৩) হাত ও পায়ের আঙুল গুলিতে অসংখ্য সাদা খাঁজ তীরি হয়। এগুলিকে Mees line বলে।

৪) গায়ে মুখে নীলচে ছোপ দেখা যায়।

৫) পায়ের পাতায় কালো রঙের ঘা দেখা যায়, একে ব্ল্যাক ফুট ডিসিস বলে। 

৬) স্মৃতি শক্তি হ্রাস থেকে শুরু করে হৃদযন্ত্র ও শ্বাস তন্ত্রের সমস্যা দেখা যায়। 

কৃষিজ দ্রব্যের ওপর প্রভাব

ভূ- গর্ভের মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক ফসলেও পাওয়া গিয়েছে। চাল, গম, আলু, ওল, মুলো ইত্যাদি তে বিপদ জনক মাত্রায় আর্সেনিক পাওয়া গেছে। এসব আর্সেনিক যুক্ত ফসলের মাধ্যমে আর্সেনিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। 

উদ্ভিদ ও জীবজন্তুর ওপর প্রভাব 

আর্সেনিক যুক্ত জল উদ্ভিদের শেকড়ের মাধ্যমে গ্রহন করলে তা উদ্ভিদ কোশে গিয়ে জমা হয় ও কোশ গুলিকে নষ্ট করে দেয়। মানুষের ন্যায় অন্যান্য জীবজন্তুরা আর্সেনিক যুক্ত জল গ্রহন করলে তাদের চর্ম রোগ হয় এবং ফুসফুস ও যকৃৎ জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। 

পরিবেশ দূষণ – আর্সেনিকের প্রভাবে মাটি ও ভৌম জল দূষিত হয়। 

আর্সেনিক সমস্যা সমাধানের উপায় ও পদ্ধতি

আর্সেনিক দূষিত জল পানের ফলে মানুষের যেসব বিষক্রিয়া দেখা দেয় তা থেকে মুক্তি পেতে হলে একমাত্র উপায় হল আর্সেনিক মুক্ত জলপান করা। আর্সেনিক যুক্ত জল ব্যবহারের বিপদ সম্পর্কে মানুষ কে অবহিত করতে হবে। একই সঙ্গে জলের আর্সেনিক দূরীকরনের প্রযুক্ত ও পদ্ধতি সম্পর্কেও মানুষকে অবহিত করতে হবে। 

আর্সেনিক সমস্যা সমাধানের জন্য যে সব উপায় ও পদ্ধতি বিবেচিত হয়েছে সেগুলি হল – 

১) ভূগর্ভের নিরাপদ জল সরবরাহের জন্য গভীর  নলকূপ খনন।

২) নলকূপ গুলিতে আর্সেনিক দূরীকরনের যন্ত্র স্থাপন।

৩) নদীর জল পরিশোধন করে পাইপের সাহায্যে সরবরাহ করা হল আর্সেনিক সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে সহজ উপায়। যদিও এটি ব্যয় বহুল ও সময় সাপেক্ষ। 

৪) ভূপৃষ্ঠের জল পরিশোধন করে বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহের জন্য হরাইজোনটাল রকিং ফিলটার নির্মান করতে হবে। 

৫) আক্রান্ত অঞ্চলের লোকেদের  বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করে সেই জল গুলি সেচের কাজে ব্যবহার করাতে পারলে আক্রান্তের সংখ্যা হ্রাস পাবে।

৬) গ্রামীন লোকে দের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে সহজে ব্যবহার করা যায়, এমন ফিলটার তৈরি ও তার ব্যবহার সম্পর্কে সকলকে সচেতন করতে হবে। 

Leave a Comment