বাঘা যতীন জীবনী – যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় | Bagha Jatin Biography in Bengali

বাঘা যতীন জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Bagha Jatin Biography in Bengali. আপনারা যারা বাঘা যতীন (যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়) সম্পর্কে জানতে আগ্রহী বাঘা যতীন এর জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

বাঘা যতীন কে ছিলেন? Who is Bagha Jatin?

যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (৭ ডিসেম্বর ১৮৭৯ – ১০ সেপ্টেম্বর ১৯১৫) ছিলেন একজন বাঙালি ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবী নেতা। তিনি বাঘা যতীন নামেই সকলের কাছে সমধিক পরিচিত। ভারতে ব্রিটিশ-বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। বাঘা যতীন ছিলেন বাংলার প্রধান বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর দলের প্রধান নেতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে কলকাতায় জার্মান যুবরাজের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করে তিনি জার্মানি থেকে অস্ত্র ও রসদের প্রতিশ্রুতি অর্জন করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জার্মান প্লট তারই মস্তিস্কপ্রসূত।

বাঘা যতীন জীবনী – যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় – Bagha Jatin Biography in Bengali

নামবাঘা যতীন (যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়)
জন্ম7 ডিসেম্বর 1879
পিতাউমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
মাতাশরৎশশী
জন্মস্থানকুষ্টিয়া, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমানে বাংলাদেশ)
জাতীয়তাভারতীয়
পেশাভারতীয় বিপ্লবী
মৃত্যু10 সেপ্টেম্বর 1915 (বয়স 35)

বাঘা যতীন এর জন্ম: Bagha Jatin’s Birthday

বাঘা যতীন 7 ডিসেম্বর 1879 জন্মগ্রহণ করেন।

বাঘা যতীন এর পিতামাতা ও জন্মস্থান: Bagha Jatin’s Parents And Birth Place

বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন প্রশস্তি রচনা করে “বাঙ্গালীর রণ দেখে যা রে তোরা রাজপুত, শিখ, মারাঠী জাত, বালাশোর, বুড়ি – বালামের তীর নবভারতের হলদিঘাট।” নব ভারতে হলদিঘাট বুড়ি বালামের তীরে যে সংগ্রামের কথা কবি উদাত্ত কন্ঠে ঘোষণা করেছেন, তার সেনাপতি ছিলেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়— বাঘা যতীন নামেই যিনি সমধিক পরিচিত।

বাঙ্গালী ভীরু জাতি, অকর্মন্য, ইংরাজের এই অপপ্রচারের উপযুক্ত জবাব দিয়েছিলেন বাঘা যতীন ও তার অনুগামী যুবকেরা ১৯১৫ খ্রিঃ বালেশ্বরে মারণাস্ত্র হাতে সম্মুখসমরে যুদ্ধ করে। জাতির ইতিহাসে সেই কাহিনী স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে। অবিভক্ত বাংলার কুষ্টিয়া মহকুমার ছোট্ট শান্ত গ্রাম কয়া। এই গ্রামেই ১৮৮০ খ্রিঃ ৮ ই ডিসেম্বর যতীন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, মাতা শরৎশশী দেবী।

বাঘা যতীন এর প্রথম জীবন: Bagha Jatin’s Early Life

অল্প বয়সেই পিতৃহারা হয়েছিলেন যতীন্দ্রনাথ। তার জীবনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল মাতা শরৎশশী। পরোপকার বৃত্তি, দুঃসাহস ও অন্যায় প্রতিরোধ করার শিক্ষা যতীন্দ্রনাথ কৈশোরেই মায়ের কাছ থেকে লাভ করেছিলেন। বাঘা যতীনের মা নিজেও ছিলেন বাঘিনী। গ্রামের পাশেই গড়াই নদী। তিনি বালক যতীন্দ্রনাথকে স্নান করাতে নিয়ে গিয়ে ছুঁড়ে দূরে ফেলে নিজেই সাঁতারে গিয়ে নিয়ে আসতেন। এভাবে সাঁতার শিখে যতীন্দ্রনাথ একদিন বর্ষার ভরানদী সাঁতার পার হবার সাহস ও শক্তি অর্জন করেছিলেন। বাঘিনী মায়ের শিক্ষাতেই গড়ে উঠেছিলেন দেশপ্রেমিক যতীন্দ্রনাথ, বিপ্লবী বাঘা যতীন।

বাঘা যতীন এর শিক্ষাজীবন: Bagha Jatin’s Educational Life

কৃষ্ণনগরে মামার বাড়িতে থেকে স্কুলের পড়া শেষ করেছিলেন যতীন্দ্রনাথ। পড়াশোনার চেয়ে নানান খেলা, শরীরচর্চা প্রভৃতিতেই ছিল তার বেশি উৎসাহ স্থানীয় স্কুলে পড়বার সময়েই একদিন একটি পাগলা ঘোড়াকে কব্জা করে অসমসাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যতীন্দ্রনাথের শক্তি সাহস উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেলেও তার মন ছিল, স্নেহ, মায়া দয়ায় ভরা। যত সামান্য লোকই হোক, কারো কোন উপকার করার সুযোগ পেলে তিনি তা সানন্দে করতেন।

তার পরোপকারের বহু ঘটনা এখনো প্রবাদ হয়ে আছে। যতীন্দ্রনাথের বাঘা যতীন নামটি কে দিয়েছিল তা জানা যায় না, কিন্তু নামকরণের ইতিহাসের সঙ্গে নামটিও অমরত্ব লাভ করেছে। একবার নিজের জন্মস্থান কয়া গ্রামে এসেছেন যতীন্দ্রনাথ। সেই সময় গ্রামে বাঘের খুব উৎপাত চলছিল। একদিন গ্রামবাসীরা বাঘের আস্তানায় হানা দিয়েছে। তাদের সঙ্গে বন্দুক হাতে আছেন যতীন্দ্রনাথের এক জ্ঞাতি ভাই।

একখানা পেন্সিলকাটা ছুরি সঙ্গে নিয়ে যতীন্দ্রনাথও আছেন তাদের সঙ্গে। হঠাৎ বাঘ দেখা গেল, কিন্তু গুলি ছোঁড়া হলেও, গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। ক্রুদ্ধ বাঘ লাফিয়ে এসে যতীন্দ্রনাথের ওপরে ঝাপিয়ে পড়ল। তিনি একহাতে বাঘের গলা জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে ছোরা চালাতে লাগলেন। অসম সাহসে রীতিমত মরণপণ লড়াই করে শেষ পর্যন্ত বাঘটিকে তিনি মেরে ফেললেন। নিজেও ক্ষতবিক্ষত হলেন।

এরপর দীর্ঘদিন কলকাতায় চিকিৎসাধীন থাকতে হয়েছিল তাঁকে। এই দুঃসাহসিক অভিযানের পর থেকেই তিনি বাঘা যতীন নামে অভিহিত হতেন। এর পরেও একবার এক বাঘিনীর মুখে পড়তে হয়েছিল যতীন্দ্রনাথকে। সেবার গুলি করে বাঘিনী মেরে তার তিনটি শাবককে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন।

১৮৯৮ খ্রিঃ যতীন্দ্রনাথ এন্ট্রান্স পাশ করে কলকাতা এসে সেন্ট্রাল কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু কিছুদিন পরেই পড়া ছেড়ে স্টেনোগ্রাফী শিক্ষা করেন।

বাঘা যতীন এর কর্ম জীবন: Bagha Jatin’s Work Life

পরে বাংলা সরকারের সেক্রেটারি হুইলার সাহেবের স্টেনোগ্রাফার নিযুক্ত হন। শুরু হল যতীন্দ্রনাথের কর্মজীবন। কিশোর বয়সেই পরাধীনতার গ্লানি, দাসত্বের অপমান যতীন্দ্রনাথের মনে গভীর বেদনার সৃষ্টি করেছিল। যুবক বয়সে সেই বেদনা তার মনে আরও গভীর রেখাপাত করল। তিনি বুঝতে পারছিলেন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হল পরাধীনতা। কি করে দেশ স্বাধীন করে মানুষের মত মানুষ হয়ে বাঁচার পথ করা যায়, দেশের অগণিত মানুষের দুঃখ দূর করা যায় এই চিন্তাই যতীন্দ্রনাথকে সংগ্রামের পথ, বিপ্লবের পথের সন্ধান দেখিয়ে দিল।

১৯০৫ খ্রিঃ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশাত্মবোধের প্রেরণায় জেগে উঠল সারা দেশ। সেই আবর্তে যতীন্দ্রনাথ ভেসে গেলেন। অনুশীলন সমিতিতে যোগদান করলেন। এই ভাবেই স্বাধীনতার বৈপ্লবিক আন্দোলনের সঙ্গে যতীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপিত হল। এই সময় থেকে যতীন্দ্রনাথের অবশিষ্ট জীবন হল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক আপোশহীন সংগ্রামের ইতিহাস।

১৯১০ খ্রিঃ কলকাতায় আলিপুর বোমার মামলার তদ্বিরকারী বিখ্যাত সি – আই ডি অফিসার মৌলভী শামসুল আলমকে গুলি করে হত্যা করলেন বীরেন্দ্র দত্ত গুপ্ত নামে এক যুবক। পরে তিনি ধরা পড়লে, পুলিশ জানতে পারে যতীন্দ্রনাথের নির্দেশেই এই হত্যাকান্ড হয়েছে। এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আরো কয়েকজনের সঙ্গে পুলিশ যতীন্দ্রনাথকেও গ্রেপ্তার করে।

পুলিশ নানা প্রলোভন ও ভয় দেখিয়ে যতীন্দ্রনাথের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরে তাঁকে চালান করে দেওয়া হয় আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। যতীন্দ্রনাথ ও আরো কয়েকজন বিপ্লবীকে জড়িয়ে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ যে মামলা করেছিল তা হাওড়া ষড়যন্ত্র মামলা নামে অভিহিত। ১৯১০ খ্রিঃ মার্চ মাসে শুরু হয়ে ১৯১১ খ্রিঃ এপ্রিল মাসে হাওড়া ষড়যন্ত্র মামলা শেষ হয়।

এক বছর জেলে থাকার পর প্রধান বিচারপতি জেঙ্কিন্সের বিচারে অভিযুক্তগণ সকলেই নিরপরাধী সাব্যস্ত হন। হাওড়া ষড়যন্ত্র মামলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়বার ফলে যতীন্দ্রনাথের নাম সরকারের বিরাগভাজন ব্যক্তিদের তালিকায় উঠে গেল। ফলে তিনি মিঃ হুইলারের অধীন চাকরিটি খোয়ালেন। জেল থেকে বেরিয়ে এসে তাই জেলা বোর্ডের কনট্রাকটরের কাজ নিতে হল। এই কাজের জন্য নানা স্থানে ঘোরাঘুরির সময় যতীন্দ্রনাথ বুঝতে পারলেন, সরকাবী গুপ্তচরেরা তাঁকে সর্বক্ষণ নজরে রাখছে।

এতে যতটা অস্বস্তি তার হল, তার চেয়ে বেশি উদ্রেক হল বিরক্তি। ইংরাজদের ওপরে ছিল যতীন্দ্রনাথের মর্মান্তিক বিতৃষ্ণা। কারণ যে কোন ইংরাজই সুবিধা পেলে এদেশীয়দের ওপর অত্যাচার করতে ছাড়ত না। দিনে দিনে তার ইংরাজের প্রতি বিতৃষ্ণ ঘৃণা ও বিদ্বেষে পরিণত হল। একবার ফোর্ট উইলিয়ামের কাছে গোরাবাজারে অন্যায় কাজের জন্য একগোরা সৈন্যকে বেধড়ক পিটুনি দিয়েছিলেন তিনি।

আর একবার সরকারি কাজে দার্জিলিং যাবার পথে এক স্টেশনে কয়েকজন ইংরাজ সৈন্যের সঙ্গে খুবই মারামারি হয়েছিল। বলা বাহুল্য অসম্ভব দৈহিক শক্তির অধিকারী যতীন্দ্রনাথ গোরা সৈন্যদের লাঞ্ছনার চূড়ান্ত করেছিলেন। জাতীয় মর্যাদার প্রতি সজাগ দৃষ্টি ছিল যতীন্দ্রনাথের। সে কারণেই তিনি জাতীয় জীবনের সকল মান অপমানকে নিজের মান অপমান বলে গ্রহণ করতে শিখেছিলেন।

তাই সমগ্র সত্তা তার ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল দেশের স্বাধীনতা অর্জন করে নষ্ট সম্মান পুনরুদ্ধার করবার জন্য। উত্তরকালে এই উদ্দেশ্যের বেদীমূলেই তিনি নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন। অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর, সন্ধ্যা প্রভৃতি বিপ্লবী দলগুলির সংস্পর্শে এসে যতীন্দ্রনাথ বিভিন্ন গুপ্ত সমিতিতে কাজ করতে থাকেন। আলিপুর বোমা মামলায় যখন বহু বিপ্লবী গ্রেপ্তার হলেন, তখন যতীন্দ্রনাথের ওপরেই অবশিষ্ট দলের নেতৃত্বের ভার পড়ল।

বাংলার গুপ্ত সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে যতীন্দ্রনাথই প্রথম উপলব্ধি করেন যে শক্তিশালী ইংরাজকে ভরতভূমি থেকে চিরদিনের মত দূর করতে হলে এক শক্তিশালী এবং ব্যাপক সশস্ত্র বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের প্রয়োজন। এই কাজেব জন্য বাংলার প্রধান বিপ্লবী গ্রুপগুলোকে একত্রিত করা দরকার।

তিনি আরও উপলব্ধি করলেন, অভ্যুত্থানের কাজে ইংরাজ বিরোধী রাষ্ট্রশক্তিগুলির সাহায্য ও সহযোগিতা লাভের চেষ্টা করে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে। বস্তুতঃ এর পর থেকেই সে যুগের বাংলার বিপ্লববাদী চিন্তাধারা যে সঙ্কীর্ণ খাত বেয়ে চলেছিল যতীন্দ্রনাথ তার গতি অন্যপথে চালিত করলেন। বৈদেশিক সাহায্য চেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ কাজের ভার যতীন্দ্রনাথ নিজের কাঁধেই তুলে নিলেন। বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলসে কাজ করতেন স্বদেশী ভাবধারার এক তরুণ অবনী মুখার্জি।

যতীন্দ্রনাথ তাঁকে দলে টানলেন এবং বাংলার বিপ্লব প্রচেষ্টাকে সাহায্য করার জন্য জাপানে যেতে অনুরোধ করেন। সেই সময় ব্যবসা ক্ষেত্রে জাপান ছিল ইংরাজের প্রত্যক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই যতীন্দ্রনাথ তার বাস্তববুদ্ধি বলে বুঝতে পেরেছিলেন ইংরাজের বিরুদ্ধে গুপ্ত আন্দোলনে জাপানের সহানুভূতি পাওয়া যেতে পারে। যতীন্দ্রনাথের পরামর্শে অবনী মুখার্জী ১৯১০ খ্রিঃ জাপান গেলেন কিন্তু তাকে নিরাশ হয়েই ফিরতে হল।

১৯১৪ খ্রিঃ ইউরোপের আকাশ মহাযুদ্ধের মেঘ আচ্ছন্ন করে ফেলল। জার্মানীর সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধল ইংরাজের। এদিকে একই সময়ে অত্যাচারিত বিক্ষুব্ধ বাংলার শহরে শহরে সন্ত্রাসবাদী তরুণেরা ইংরাজ শত্রু নিধনের কাজে তৎপর হয়ে উঠল। * ইতিমধ্যে জার্মানিতে ভারতীয় ছাত্রদের উদ্যোগে জার্মান থেকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রচারকার্য চালাবার জন্য বার্লিন কমিটি নামে একটি সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যতীন্দ্রনাথ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ১৯১৫ খ্রিঃ পুনরায় অবনী মুখার্জীকে জাপানে রাসবিহারী বসুর কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

এইভাবে একের পর এক যথাযোগ্য স্থানে যোগাযোগ ঘটিয়ে চীনের নেতা ডাঃ সান – ইয়াৎ – সেনের কাছ থেকে ৫০ টি পিস্তল, অনেকগুলি কার্তুজ ও বহু টাকা সাহায্য বাবদ পাওয়া গেল। বিদেশ থেকে অস্ত্র আমদানি করতে হলে প্রচুর টাকার দরকার। যতীন্দ্রনাথ সেই টাকার সুরাহা করলেন স্বদেশী ডাকাতির মাধ্যমে। রডা কোম্পানির ৫০ টি মশার পিস্তল এবং ৪৬,০০০ রাউন্ড গুলি এবং ৪০,০০০ টাকা সংগৃহীত হল।

অস্ত্রগুলি তৎকালীন বাংলার ৯ টি বিপ্লবী উপদলের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হয়েছিল। ইতিমধ্যে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য (এম.এন.রায়) ও জীতেন্দ্রনাথ লাহিড়ীর যোগাযোগের ফলে জার্মান সরকার এক জাহাজ অস্ত্রশস্ত্র বাংলার বিপ্লবীদের পাঠিয়ে দিলেন। সেই সঙ্গে পাঠালেন বেশ কিছু অর্থসাহায্য। স্থির হয়েছিল, হাতিয়া – সন্দীপ, বালকা ও বালেশ্বর এই তিন জায়গায় জার্মান জাহাজ থেকে অস্ত্র নামিয়ে নেওয়া হবে। দুর্ভাগ্য যে ম্যাভরিকি নামের এই জাহাজ ১৯১৫ খ্রিঃ জুন মাসে ওয়াশিংটনের কাছে খানাতল্লাসীর ফলে সব অস্ত্রশস্ত্র আমেরিকান সরকার বাজেয়াপ্ত করল।

এরপব জার্মান কনসাল আরও তিন জাহাজ অস্ত্র ভারতে পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন। এ বিষয়ে যতীন্দ্রনাথের নির্দেশে সমস্ত যোগাযোগ করলেন রাসবিহারী বসু, ভগবান সিংহ ও অবনী মুখার্জী। স্থির হল অস্ত্রবোঝাই জাহাজ তিনটির একখানা বালেশ্বরে এবং অপর দুটি গোয়া ও রায়মঙ্গলের কাছে আসবে। বালেশ্বরে যে জাহাজটি আসছিল তাতে ছিল ২০০ পিস্তল, প্রচুর কার্তুজ, হাতবোমা ও বিস্ফোরক পদার্থ ও দুলাখ টাকা। অন্য দুটি জাহাজেও ছিল অনুরূপ পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ৷

দুর্ভাগ্য যে প্রথম জাহাজটি ১৯১৫ খ্রিঃ ১৭ নভেম্বর আন্দামানের কাছে এলে, ব্রিটিশ রণতরী সেটিকে ডুবিয়ে দেয়। এই সংবাদ পেয়ে অপর দুটি জাহাজ পথ ঘুরিয়ে মেকসিকো উপসাগরের দিকে মৃত্যুভয়হীন মুক্তি পাগল বিপ্লবীদের অবিশ্রান্ত গুলি বর্ষণের সামনে টেগার্টের বাহিনী বেশিক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারিল না। তারা পিছু হটতে বাধ্য হল। এই যুদ্ধ বালেশ্বরের যুদ্ধ বা Balasore Trench Fight নামে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেছে।

বিপ্লবীরা এই সুযোগে গ্রাম ছাড়িয়ে সাঁতরে নদী পার হলেন। কিন্তু তারা জানতেন না এক ভিখারীবেশী দারোগা তাঁদের অনুসরণ করে চলেছিল। সে নদী পার হয়ে একটা গাছের ওপরে উঠে বিপ্লবীদের লক্ষ করতে লাগল ৷ ছদ্মবেশী এই দারোগাটির নাম চিন্তামণি সাহু। ফাকা মাঠের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে বিপ্লবীরা একটি বিরাট উই ঢিবি পেয়ে তার অন্তরালে আশ্রয় নিলেন।

ইতিমধ্যে অনুসরণকারী পুলিসবাহিনী দারোগা চিন্তামণির কাছে বিপ্লবীদের অবস্থানস্থল জানতে পেরে সেখানে এসে উপস্থিত হল। তিনশত রাইফেলধারী পুলিস। এদের পরিচালনায় রয়েছে বালেশ্বরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিলবি ও মিলিটারি লেফ্‌টেনান্ট রাদারফোর্ড। কিছু সংখ্যক দেশীয় অফিসার তাদের সহায়তা করছিল। দারোগা চিন্তামণি হাত দিয়ে উইটিবিটি দেখিয়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে তিন শত রাইফেল গর্জন করে উঠল। গুলি বর্ষণ করতে করতে তারা এগিয়ে চলল।

বিপ্লবীদের পক্ষ থেকে কোন বন্দুকের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল না। এতে পুলিসের ধারণা হল বিপ্লবীদের হাতে দূরপাল্লার অস্ত্র নেই। বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ যে কত বড় সুদক্ষ সেনাপতি ছিলেন, এই যুদ্ধের বিবরণ থেকে যুদ্ধবিশারদগণ তা মুক্তকন্ঠে স্বীকার করেছেন। যতীন্দ্রনাথ তাঁদের মসার পিস্তল গুলিভর্তি করে নীরবে প্রতীক্ষা করছিলেন। এই পিস্তলের গঠন কৌশল এমনই যে বাঁট বাড়িয়ে নিলেই রাইফেলের মত কাজ করে। এই অদ্ভুত অস্ত্রটি হাতে নিয়ে বিপ্লবীরা প্রশস্ত ঢিবির আড়ালে বেশ নিরাপদেই রয়েছেন। বিপক্ষের সমস্ত গুলিই ঢিবির গায়ে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

একসময় পুলিস বাহিনী নাগালের মধ্যে পৌঁছে গেল। অমনি যতীন্দ্রনাথ আদেশ দিলেন— Fire— পাঁচটি মসার পিস্তল সঙ্গে সঙ্গে বিপুল গর্জনে গুলি বর্ষণ শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে লেফটেনান্ট রাদারফোর্ডের ফৌজ হতাহত অবস্থায় মাঠের জলকাদায় গড়াগাড়ি যেতে লাগল। কেউ আলের আড়ালে আশ্রয় নিল, কেউ মাঠে বুক মিশিয়ে পড়ে থেকে গুলি চালাতে লাগল। বিপ্লবীদের সহায় ছিল বীরত্ব, সাহস, নৈপুণ্য আর জ্বলন্ত দেশপ্রেম। ব্রিটিশ পক্ষে ছিল রাইফেলধারী তিনশত সৈন্য।

সেদিনের লড়াইতে বিপ্লবীরা যে পরিমাণ সৈন্য সংহার করলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তার নজির নেই। সহসা শত্রুপক্ষের বুলেটের আঘাতে যতীন্দ্রনাথের বাঁ হাতের বুড়ো আঙ্গুলটি চূর্ণ হয়ে গেল। ডান হাতেই তিনি মসার পিস্তল চালাতে লাগলেন। সহসা একটি বুলেট চিত্তপ্রিয়র মাথায় বিদ্ধ হল। ‘দাদা’ বলে শেষ কথা উচ্চারণ করে তিনি যতীন্দ্রনাথের কোলে ঢলে পড়লেন। বিপ্লবীজীবনের চরম আনন্দ ও গৌরব লাভ করে চিত্তপ্রিয় চিরপ্রিয় দলনেতার কোলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে স্বদেশের ইতিহাসে চির অমরত্ব অর্জন করলেন।

যুদ্ধক্ষেত্রে শোকের অবকাশ নেই। বিগতপ্রাণ সহযোদ্ধার মৃতদেহ পাশে রেখেই চার বিপ্লবীকে অস্ত্রচালনা করে যেতে হল। এই অসম যুদ্ধ চলল প্রায় তিন ঘন্টা। এই সময়ে রাদারফোর্ডের বাহিনী অজস্র গুলিবর্ষণ করেছে। জ্যোতিষ মারাত্মকভাবে আহত হলেন। যতীন্দ্রনাথের পেটে একটি এবং চোয়ালে একটি গুলি বিদ্ধ হল। সঙ্গের টোটাও সব ফুরিয়ে গেল। বিপ্লবীদের গুলি ফুরিয়ে গেছে, রাদারফোর্ডের বুঝতে বিলম্ব হল না।

তারা ক্রমে এগিয়ে এসে বিপ্লবীদের ঘিরে ফেলল। যতীন্দ্রনাথের শরীর থেকে প্রচুর রক্তপাত হচ্ছে। তিনি ফিলবিকে বললেন, The entire responsibility is mine. These boys are innocent, they have simply carried out my orders. Please see that no injustice is done to them under the British Raj.” যতীন্দ্রনাথ সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে শেষ চেষ্টা করেছিলেন যাতে মনোরঞ্জন, নীরেন ও জ্যোতিষকে ফাসি থেকে বাঁচাতে পারেন।

বাঘা যতীন এর মৃত্যু: Bagha Jatin’s Death

মুমূর্ষু যতীন্দ্রনাথকে বালেশ্বর হাসপাতালে পাঠানো হল। একদিন পরে, ১৯১৫ খ্রিঃ ৯ ই সেপ্টেম্বর তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে বিশেষ আদালতের বিচারে মনোরঞ্জন ও নীরেনের ফাঁসির হুকুম হয়, জ্যোতিষের হয় যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর।

মাত্র ৩৬ বছর বয়সেই বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথের নেতৃজীবন শেষ হয়। বিস্ময়কর ছিল তার প্রতিভা, অচিন্তনীয় ছিল শক্তি ও বীরত্ব আর অপরিমেয় দেশ প্রেম। যতীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর পুলিশ কমিশনার টেগার্ট তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করে বলেছিলেন, “ I have met the bravest Indian I have the greatest regard for him but I had to do my duty. “

Leave a Comment