বারীন্দ্রকুমার ঘোষ জীবনী | Barindra Kumar Ghosh Biography in Bengali

বারীন্দ্রকুমার ঘোষ জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Barindra Kumar Ghosh Biography in Bengali. আপনারা যারা বারীন্দ্রকুমার ঘোষ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এর জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

বারীন্দ্রকুমার ঘোষ কে ছিলেন? Who is Barindra Kumar Ghosh?

বারীন্দ্রকুমার ঘোষ (৫ জানুয়ারি ১৮৮০ – ১৮ এপ্রিল, ১৯৫৯) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের বিপ্লবী।

বারীন্দ্রকুমার ঘোষ জীবনী – Barindra Kumar Ghosh Biography in Bengali

নামবারীন্দ্রকুমার ঘোষ
জন্ম5 জানুয়ারী 1880
পিতাডাঃ কৃষ্ণধন ঘোষ
মাতাস্বর্ণলতা
জন্মস্থানব্রিটেন, লন্ডন
জাতীয়তাভারতীয়
পেশাবিপ্লবী, সাংবাদিক
মৃত্যু18 এপ্রিল 1959 (বয়স 79)

বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এর জন্ম: Barindra Kumar Ghosh’s Birthday

বারীন্দ্রকুমার ঘোষ 5 জানুয়ারী 1880 জন্মগ্রহণ করেন।

বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এর পিতামাতা ও জন্মস্থান: Barindra Kumar Ghosh’s Parents And Birth Place

বিপ্লবী যুগের বিশিষ্ট বহ্নিশিখা বারীন্দ্রকুমার ঘোষ – এর অন্যতম পরিচয় তিনি অগ্নিপুরুষ ঋষি অরবিন্দের কনিষ্ঠ ভ্রাতা। তার জন্ম ১৮৮০ খ্রিঃ ৫ ই জানুয়ারি। ইয়ংবেঙ্গলের উত্তর – সাধক ডাঃ কৃষ্ণধন ঘোষ আই.এম – এস এবং স্বাধীন ভারতের মন্ত্রদ্রষ্টা মনীষী রাজনারায়ণ বসুর কন্যা স্বর্ণলতা দেবী — এঁরা হলেন শ্রী অরবিন্দ ও বারীন্দ্রকুমারের জনক ও জননী।

ছেলেদের বাল্যকালেই কৃষ্ণধন দার্জিলিং – এর সেন্টপলস স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। পাঁচ থেকে সাত বছর বয়স হলে, তিন ছেলেকে নিয়ে তিনি ১৮৭৯ খ্রিঃ সস্ত্রীক ইংলন্ড যাত্রা করেন। সমুদ্র বক্ষে জাহাজেই জন্ম হয় বারীন্দ্রকুমারের। এক বছর বয়স হলে তিনি মা ও দিদির সঙ্গে ভারতে আসেন ৷

বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এর শিক্ষাজীবন: Barindra Kumar Ghosh’s Educational Life

১৯০১ খ্রিঃ দেওঘর বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পাস করেন। পাটনা কলেজে এফ . এ . ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু ছয় মাস পড়ার পর ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু পড়াশুনা সম্পূর্ণ না করেই পাটনা কলেজের কাছে একটি চায়ের দোকান খোলেন ৷ সেই সময়ে অরবিন্দ বরোদা কলেজে অধ্যাপনা করছেন। বারীন্দ্রকুমার ব্যবসায়ের মূলধনের আশায় বরোদায় অরবিন্দের কাছে আসেন।

বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এর কর্ম জীবন: Barindra Kumar Ghosh’s Work Life

এরপর থেকেই তার জীবনের গতি পরিবর্তিত হয় — তিনি বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। সেই সময় বঙ্গ দেশে পূর্ণ উদ্যমে আরম্ভ হয়েছে স্বদেশী আন্দোলন। দিনে দিনে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে। এরই পাশাপাশি সঙ্গোপনে আরম্ভ হয়েছে বৈপ্লবিক গুপ্ত সমিতি প্রসারের কাজ। ১৯০২ খ্রিঃ প্রথম অনুশীলন সমিতি নামে যে গুপ্ত সমিতি স্থাপিত হল, তার সভাপতি ছিলেন ব্যারিস্টার পি মিত্র। পি . মিত্রের বাড়ি নৈহাটিতে এবং তিনি ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের শিষ্য।

বঙ্কিমচন্দ্রের কাছেই তিনি পেয়েছিলেন রাজনৈতিক প্রেরণা ও দীক্ষা। তাই তিনি বঙ্কিমের অনুশীলনবাদের জীবন দর্শনের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গুপ্ত সমিতির নাম দিয়েছিলেন অনুশীলন সমিতি। ভারতে সশস্ত্র বিপ্লব সংগঠনের দ্বারা ইংরাজ বিতাড়নের প্রথম স্বপ্ন দেখেন বর্ধমান জেলার চান্না গ্রামের বীর যুবক যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তীকালে তাঁরই নাম হয়েছিল নিরালম্ব স্বামী।

যতীন্দ্রনাথ বরোদায় এসে সৈন্যবিভাগে কাজ নিয়ে কয়েক বৎসর মিলিটারি ট্রেনিং গ্রহণ করে নিজেকে বৈপ্লবিক আন্দোলন পরিচালনার উপযোগী করে তোলেন। এই সময়েই তার সঙ্গে পরিচয় হয় অরবিন্দের। তারই প্রভাবে অরবিন্দ বৈপ্লবিক আন্দোলনের নেতারূপে ভারতের কর্মক্ষেত্রে আবির্ভূত হন। বস্তুতঃ যতীন্দ্রনাথই ছিলেন বাংলার বৈপ্লবিক আন্দোলনের ‘ভগীরথ’।

বরোদায় অবস্থান করেই গোড়ার দিকে অরবিন্দ কলকাতার গুপ্তসমিতির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছিলেন। বারীন্দ্র বিহার থেকে তাঁর কাছে এলে তিনি তাঁকে সংগঠনের দায়িত্ব দিয়ে কলকাতায় পাঠান। কয়েক বছর পরেই তিনি বরোদার চাকরি ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় চলে এসেছিলেন এবং নিজেকে সর্বতোভাবে রাজনৈতিক আন্দোলনে নিমজ্জিত করেন। কলকাতায় যুগান্তর দলের কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হয়েছিল মানিকতলায়, মুরারিপুকুরের বাগানবাড়িতে ৷

এখানে এসেই বারীন্দ্র, অবিনাশ ভট্টাচার্য, উল্লাসকর দত্ত, হেমচন্দ্ৰ দাস, উপেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, হৃষীকেশ কাঞ্জিলাল প্রভৃতি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সংগঠনের কাজে সক্রিয় হয়ে উঠলেন। দলে শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য তখন চারদিক থেকেই ছেলে সংগ্রহ করা হচ্ছে। কলকাতার সঙ্গে সঙ্গে মেদিনীপুরে যুগান্তর দলের শাখাও খুব সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গুপ্ত সমিতিগুলিতে কর্মীদের লাঠিখেলা, অসিচালনা, সাইকেল অভ্যাস, অশ্বারোহণ, বক্সিং, বন্দুক ছোঁড়া প্রভৃতি শিক্ষা দেওয়া হত।

বাংলার বিপ্লবপন্থীদের প্রেসিডেন্ট পি.মিত্রের কলকাতার আপার সার্কুলার রোডে একটি বাড়ি ছিল। এখানেই আগে থেকে অনুশীলন সমিতির কার্যালয় ছিল। সেখানে কুস্তি, লাঠিখেলা প্রভৃতির অনুশীলন চর্চা হত। বারীন্দ্রকুমার প্রথমে এখানে এসেই কাজ আরম্ভ করেছিলেন যুগান্তর দলের কর্মী হিসেবে। এখানকার প্রধান কর্মী ছিলেন যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। নেতৃত্বের প্রশ্নে কিছুদিনের মধ্যেই যতীন্দ্রনাথের সঙ্গে বারীন্দ্রের অন্তর্বিরোধ শুরু হয়। তা গড়াল অনেকদূর পর্যন্ত।

শেষ পর্যন্ত বরোদা থেকে অরবিন্দ কলকাতায় এলে এই বিরোধের নিষ্পত্তি হয়। যুগান্তর দলের কার্যালয় স্থানান্তরিত হয় মানিকতলার মুরারিপুকুরে। তাঁরই পরিকল্পনায় এখানে বোমা তৈরির কারখানা স্থাপিত হয়। বিপ্লবী সংগঠনের অন্যতম স্তম্ভ স্বরূপ অমরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় নিজের স্ত্রীর অলঙ্কার বিক্রি করে মানিকতলার বাগানে বোমার কারখানা স্থাপনের অর্থ সরবরাহ করেছিলেন।

কেবল তাই নয়, পরবর্তী সময়ে বারীন্দ্রকুমার যখন ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্লচাকীকে বোমা দিয়ে মজঃফরপুরে ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে মারবার জন্য পাঠান, তার যাবতীয় ব্যয় অমরেন্দ্রনাথ সরবরাহ করেছিলেন উত্তরপাড়ার রাজা প্যারিমোহনের পুত্র মিছরীবাবুর কাছে অর্থ সংগ্রহ করে। এসব কাজ তিনি এমনই সংগোপনে করেছিলেন যে গোয়েন্দা পুলিশ কিছুই জানতে পারে নি। সংগঠন গড়ার কাজে বারীন্দ্র বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা সহ ওড়িশা ও আসামে ভ্রমণ করেন। তাঁর চেষ্টায় বিভিন্ন স্থানে ঘাঁটিও তৈরি হয়।

পূর্ববঙ্গের ছোটলাট র্যামফীল্ড ফুলার ছিলেন খুবই অত্যাচারী। ভারতীয়দের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করবার উদ্দেশ্যে তার অত্যাচার ও উৎপীড়ন বিপ্লবীদের শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে উঠেছিল। বারীন্দ্র ফুলার হত্যার পরিকল্পনা নিলেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি রংপুর থেকে বিপ্লবী তরুণ প্রফুল্লচাকীকে নির্বাচন করে কলকাতায় নিয়ে আসেন। কিন্তু প্রফুল্ল চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এরপর মজঃফরপুরের ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার জন্য বারীন্দ্র ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকীকে মজঃফরপুরে পাঠালেন।

বিপ্লবীদের এই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্লর বোমায় নিহত হন মিসেস ও মিস কেনেডি নামে দুজন ইংরাজ মহিলা। কিংসফোর্ডের ফিটনগাড়িতেই বাড়ি ফিরছিলেন এই দুজন, গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না। বোমা ছুঁড়ে দিয়েই প্রফুল্ল ও ক্ষুদিরাম পলায়ন করেন। দুজন দুদিকে যান। সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ বোমা বিস্ফোরণের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করার জন্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ওয়াইনি স্টেশনের কাছে ক্ষুদিরাম ধরা পড়লেন, প্রফুল্লও কয়েকদিনের মধ্যে।

পুলিশের লোক তাকে গ্রেপ্তার করতে উদ্যত হলে মোকামাঘাট স্টেশনে প্লাটফর্মের ওপরে নিজের রিভলবার দিয়ে আত্মহত্যা করেন। মজঃফরপুরেই ক্ষুদিরামের বিচার হল। বিচারে তার ফাঁসির হুকুম হয়। ক্ষুদিরাম হাসতে হাসতে ফঁসির দড়ি গলায় পরে নেন। মজঃফরপুরের বোমা বিস্ফোরণের পরেই ইংরাজ সরকার দেশের চতুর্দিকে খানাতল্লাসী করে বিপ্লবী আন্দোলনের ও গুপ্তসমিতির ঘাঁটি আবিষ্কারের জন্য উঠে পড়ে লেগে গেল।

কিছুদিনের মধ্যেই কলকাতা মানিকতলায় মুরারিপুর বাগানে বিপ্লবী আন্দোলনের এক প্রধান ঘাঁটি পুলিশ আবিষ্কার করে ফেলল। এখানে পাওয়া গেল বোমা তৈরীর যন্ত্রপাতি, ডিনামাইট, বন্দুক, পিস্তল, রাইফেল প্রভৃতি অস্ত্রশস্ত্র এবং বোমা তৈরি ও গুপ্ত সমিতি সংগঠন শিক্ষার আবশ্যকীয় বই ও কাগজপত্র। মুরারিপুকুরের পর কলকাতার বিভিন্ন স্থান থেকে এবং বিভিন্ন জেলা থেকে খানাতল্লাসী করে সরকার বহু বিপ্লবী নেতা ও কর্মীকে গ্রেপ্তার করে ফেলল। অরবিন্দ, বারীন্দ্র, উপেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, হৃষীকেশ কাঞ্জিলাল, উল্লাসকর, সত্যেন বসু, কানাইলাল দত্ত, হেমচন্দ্র দাস, নরেন গোঁসাই, চারুচন্দ্র রায়, অবিনাশ ভট্টাচার্য প্রভৃতি জনা যাটেক গ্রেপ্তার হলেন।

সরকার এঁদের নামে ষড়যন্ত্রের মামলা রুজু করলেন। এই মামলা মানিকতলা বোমার মামলা নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই মামলার বিচার হয়েছিল আলিপুর আদালতে ইংরাজ জজ বীচক্রফটের এজলাসে। মানিকতলা বোমার মামলা ১৯০৮ খ্রিঃ আরম্ভ হয় এবং প্রায় দুই বৎসর পরে শেষ হয়। মামলা আরম্ভ হবার পরেই ধৃত আসামীদের মধ্যে শ্রীরামপুরের নরেন গোস্বামী নিজে মুক্তিলাভ করার আশায় রাজসাক্ষী হয়ে সকল আসামীর বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবার জন্য প্রস্তুত হয়।

গ্রেপ্তার হবার পরেই বারীন্দ্র নিজেও পুলিসের কাছে স্বীকারোক্তি করেন এবং অন্যান্য সহকর্মীদেরও স্বীকারোক্তি দিতে প্ররোচিত করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল দেশবাসীকে বিপ্লব প্রচেষ্টার কথা জানানো। আর সবকিছু দায়িত্ব নিজেদের মাথায় টেনে নিয়ে অরবিন্দকে আড়াল করে রাখা। বারীন্দ্র তার স্বীকারোক্তির সপক্ষে বলেছিলেন ‘‘Who did not mean or esepect to liberate our country by killing a few English men. We wanted to show people how to dare and die. My mission is osver’’ দলের একমাত্র হেমচন্দ্র দাস (কানুনগ) স্বীকারোক্তি করেন নি।

১৯০৫ -১৯০৬ খ্রিঃ থেকেই ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বৈপ্লবিক কাজকর্ম শুরু হয়ে গিয়েছিল। বি.এন.আর লাইনের নারায়ণগড় স্টেশনে ছোটলাটের স্পেশাল ট্রেন উড়িয়ে দেবার জন্যে যুগান্তর দলের বিপ্লবীরা ডিনামাইট পাতেন। কিন্তু কার্যকালে ডিনামাইট ভালভাবে ফাটল না। কেবল প্রচন্ড একটা শব্দ হয়। ফলে লাটসাহেবের গাড়ি সামান্য দুলে উঠেছিল মাত্র ৷ পরে পুলিশ তদন্ত করে গোটাকতক নির্দোষী কুলিকে ধরে চালান দেয় এবং আদালতে উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণে কুলিদের অপরাধ প্রমাণিত হয়ে সাত বৎসর থেকে দশ বৎসর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড হয়।

মানিকতলা বোমার মামলা চলার সময়ে বারীন্দ্র তাঁর জবানবন্দিতে এই ট্রেন ওড়াবার রহস্য প্রকাশ করে বলেন এবং ওটা যে তাঁদেরই কাজ তা স্বীকার করেন। তাঁর এই জবানবন্দির ফলে নির্দোষ কুলিরা মুক্তিলাভ করে। বিশ্বাসঘাতক নরেন গোঁসাই চেষ্টা করেও ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তার স্বীকারোক্তি সম্পূর্ণ করতে পারেনি। তার আগেই জেলের ভেতরে বাইরে থেকে বিপ্লবীদের পাঠানো রিভলবার দিয়ে সত্যেন বসু ও কানাইলাল দত্ত মিলিতভাবে তাকে হত্যা করে চিরতরে তার কন্ঠরোধ করে দেন।

বিচারে সত্যেন ও কানাই – এর ফাসি হল। মানিকতলা বোমার মামলার অভিযুক্তদের মধ্যে দুজন এভাবেই বিদায় নিলেন, মামলার রায় বেরবার আগেই। ১৯০৯ খ্রিঃ ৬ ই মে মামলার রায় বেরলো। বারীন ও উল্লাসকরকে দেওয়া হল মৃত্যুদন্ড। উপেন্দ্রবন্দ্যোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র দাস, বিভূতি সরকার, বীরেন্দ্র সেন, সুধীর সরকার, ইন্দ্রনাথ নন্দী, অবিনাশ ভট্টাচার্য, শৈলেন্দ্রনাথ বসু, ঋষীকেশ কাঞ্জিলাল, ইন্দুভূষণ রায়কে দেওয়া হল যাবজ্জীবন দীপান্তর। পরেশ মৌলিক, নিরাপদ রায় ও শিশির ঘোষের দশ বছর কারাদন্ড ৷

অশোক নন্দী, বালকৃষ্ণ হরিকানে আর শিশির সেনের সাত বছর। কৃষ্ণজীবন সান্যাল এক বছর। বাকী সকলে মুক্ত। অরবিন্দও মুক্তি পেলেন, তবে তখন তিনি আর শুধু বিপ্লবী নায়ক অরবিন্দ নন। কারা জীবনে ইতিমধ্যেই তার মধ্যে প্রকাশ লাভ করেছেন জ্যোতির্ময় ঋষি অরবিন্দ। বারীন্দ্র আর উল্লাসকরের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করা হল হাইকোর্টে। ফলে মৃত্যুদন্ডের পরিবর্তে এই দুজনকে দেওয়া হল যাবজ্জীবন দীপান্তর।

আলীপুর কোর্টের সরকারী উকিল আশুতোষ বিশ্বাস মানিকতলা বোমার মামলা পরিচালনায় সরকার পক্ষের একজন বড় কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি বিপ্লবী দলের রীতিমত একজন ভয়ঙ্কর প্রতিদ্বন্দ্বী। অরবিন্দ বারীন্দ্র প্রভৃতি প্রধান নেতৃবৃন্দ কারারুদ্ধ হবার পর বিপ্লবীদলের পরিচালনার দায়িত্ব এসে পড়ে যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের ওপর। তিনি প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য পাঠালেন চারু বসুকে।

তিনি দিনদুপুরে আলিপুর আদালতে আশু বিশ্বাসকে গুলি করে হত্যা করেন। আশু বিশ্বাসকে শেষ করে যতীন্দ্রনাথ নজর দিলেন সামশুল আলমের ওপরে। সামশুল আলম ছিলেন কলকাতা পুলিসের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট। মানিকতলা বোমার মামলা পরিচালনায় সরকার পক্ষের সবচেয়ে বড় করিতকর্মা লোক। ইনি প্রাণপণে চেষ্টা করেছিলেন বোমার মামলার আসামীদের যেন অনেক কয়জনকে ফাসিতে লটকাতে পারেন। মিথ্যা প্রমাণ এবং সাক্ষী প্রস্তুত করার কাজে ইনি ছিলেন মহা ধুরন্ধর।

বারীন্দ্রপ্রমুখ বোমার মামলার আসামীরা আদালতের খাঁচাব ভেতরে দাঁড়িয়ে সামশুল আলমকে দেখে গান করতেন— ওহে সামণ্ডল তুমি সরকারের শ্যাম, আমাদের শূল। কবে ভিটেয় তোমার চরবে ঘুঘু তুমি চোখে দেখবে সরষের ফুল।। সামশুলের ভিটেয় ঘুঘু চরাবার গুরুভার নিয়েছিলেন যতীন্দ্রনাথ। তাঁর মৃত্যু দন্ডই নির্ধারণ করেছিলেন তিনি। মানিকতলা বোমার মামলার তদন্তের কর্তৃত্ব নিয়ে তিনি বিপ্লবীদের সর্বনাশ করবার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। তাঁকে রেহাই দেওয়া যায় না।

কিন্তু সামণ্ডল মস্ত ঘুঘু, তাকে বাগে পাওয়া ভয়ানক শক্ত। তিনি সর্বদা অতি সাবধানে থাকেন। ইংরাজ সরকার তাঁকে সদাসর্বদা সতর্ক প্রহরায় রাখার ব্যবস্থা করেছে। তাকে নাগালে পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু বিপ্লবীদের অভিধানে তো অসম্ভব কথাটা লেখা থাকে না। অসম্ভবকে সম্ভব করাই তাদের কাজ। সামশুল আলমকে হত্যার জন্য যতীন্দ্রনাথ নির্বাচন করলেন তার প্রাণাধিক প্রিয় শিষ্য বীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তকে। ১৯১০ খ্রিঃ ২৪ শে জানুয়ারি দুপুরবেলা বীরেন তার অপর সঙ্গী সতীশ সরকারকে নিয়ে হাইকোর্টে এলেন।

বীরেন সামশুলকে চিনতেন না, সতীশ চিনতেন। বীরেনকে দেখিয়ে দিয়ে তিনি চলে গেলেন। বীরেন হাইকোর্টের বারান্দায় অপেক্ষা করতে লাগলেন। সামশুল যখন সিঁড়ি দিয়ে ওপরে যাচ্ছিলেন, তখন বীরেন তার সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি সামশুল আলম ? সামশুল হাঁ বলে জবাব দেবার সঙ্গে সঙ্গেই বীরেন পকেট থেকে রিভলবার বার করে সামণ্ডলের বুকে গুলি কবলেন। পলক মধ্যে বিপ্লবীদের শত্রু সামশুল আলম বারান্দায় লুটিয়ে পড়লেন।

আর চারদিক থেকে খুন খুন বলে চিৎকার করে রক্ষী, প্রহরী, চাপরাশী আরদালীর দল ছুটে এল বীরেনকে ধরতে। তখনো বীরেনের রিভলবারে কয়েকটি গুলি অবশিষ্ট ছিল। সেই গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে তিনি বারান্দা দিয়ে নিচে নামবার সিঁড়ির দিকে অগ্রসর হলেন। কিন্তু এক সময় গুলি ফুরিয়ে গেল, বীরেন ধরা পড়ে গেলেন।

বন্দি অবস্থায় পুলিসের অকথ্য নির্যাতন সহ্য করেও দলের কোন কথা প্রকাশ করেন নি বীরেন। বিচারে তার ফাসি হয়েছিল। মানিকতলা বোমার মামলার আসামী বারীন্দ্রকুমার ১৯০৯ খ্রিঃ থেকে ১৯২০ খ্রিঃ পর্যন্ত কারারুদ্ধ ছিলেন। মুক্তিলাভের পর পন্ডিচেরীতে অরবিন্দর আশ্রমে কিছুদিন ছিলেন বারীন। সেই সময় বিখ্যাত বিজলী পত্রিকা প্রকাশ করেন। প্রৌঢ় বয়সে বিবাহ করে সংসারী হয়েছিলেন তিনি।

বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এর রচনা: Written by Barindra Kumar Ghosh

১৯৫০ খ্রিঃ থেকে দৈনিক বসুমতী পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। বারীন্দ্রকুমারের রচিত গ্রন্থগুলি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল, দ্বীপান্তরের বাঁশি, পথের ইঙ্গিত, আমার আত্মকথা, অগ্নিযুগ, ঋষি রাজনারায়ণ, The Tale of My Exile, Sri Aurobindo প্রভৃতি।

বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এর মৃত্যু: Barindra Kumar Ghosh’s Death

১৯৫৯ খ্রিঃ ১৮ ই এপ্রিল বারীন্দ্রকুমারের মৃত্যু হয়।

Leave a Comment