ভারতে অসম জনবণ্টনের কারণ সমূহ

ভারতে অসম জনবণ্টনের কারণ সমূহ: 2011 সালের জনগণনা অনুসারে ভারতের মোট জনসংখ্যা প্রায় 121 কোটি। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যা ভারতের সর্বত্র সমান ভাবে বঞ্চিত নেই। পশ্চিমবঙ্গ, কেরাল, বিহার, তামিলনাড়ু প্রভৃতি রাজ্যে জনসংখ্যার ঘনত্ব খুব বেশি আবার কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ ও উত্তর পূর্ব ভারতের রাজ্য গুলির জনঘনত্ব অনেক কম। সাধারণত মানুষ যেখানে জীবন যাপনের সুযোগ সুবিধা বেশি পায় সেখানে জনবসতি গড়ে তোলে আবার যেখানে সুযোগ সুবিধা কম থাকে সেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব কম থাকে। বেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক কারণ জনসংখ্যার বণ্টনে গুরুত্ব পূর্ন ভূমিকা পালন করে। ভারতে অসম জনবণ্টনের কারণ গুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। 

ভারতের জনসংখ্যা বণ্টনের তারতম্যের কারণ – ভারতের অসম জনবিন্যাসের কারণ গুলিকে দুভাগে ভাগ করা যেতে পারে – প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক কারণ। এই কারণ গুলি কখনও একক ভাবে কখনও সম্মিলিত ভাবে জনসংখ্যা বণ্টনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। 

প্রাকৃতিক কারণ – যে সব প্রাকৃতিক কারণ জনসংখ্যা বণ্টনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে সেগুলো হল 

A) ভূ প্রকৃতি – ভূ প্রকৃতির তারতম্যে জনসংখ্যা বণ্টনের তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন হিমালয়ের  উঁচু পার্বত্য অঞ্চল ও  দাক্ষিনাত্যের মালভূমি অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি বন্ধুর ও দুর্গম। যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব, কৃষিকাজ ও শিল্পের বিকাশের অভাবে এই অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত ভাবে জনবসতি গড়ে উঠেছে। তবে পর্যটন কেন্দ্র ও মালভূমি অঞ্চলের খনি ও শিল্প কেন্দ্র গুলিতে কিছু কিছু জন বসতি গড়ে উঠতে দেখা যায়। অপর দিকে সমভূমি অঞ্চলে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষি ও শিল্পের বিকাশ ও সহজেই জীবিকা নির্বাহ করা যায় বলে অধিক জন বসতি গড়ে উঠেছে। যেমন সিন্ধু গঙ্গা সমভূমি অঞ্চল। 

B) জলবায়ু – জলবায়ুর প্রভাবে জনসংখ্যা বণ্টনের তারতম্য ঘটে। অতি উষ্ণ, অতি শীতল, অবিরাম বৃষ্টিপাত প্রভৃতি চরমভাবাপন্ন জলবায়ু যুক্ত অঞ্চল গুলিতে জীবন ধারণ এর অনুকূল পরিবেশ থাকে না বলে জনসংখ্যা খুব কম হয়। যেমন – ভারতের উষ্ণ মরু অঞ্চল ও শীতল শুষ্ক লাদাখ অঞ্চলে জন ঘনত্ব সবচেয়ে কম। কিন্তু এই অঞ্চল গুলি ব্যতীত ভারতের সর্বত্র জলবায়ু মনুষ্য বসতি র অনুকূল হওয়ায় লোক সংখ্যা অনেক বেশি। 

C) নদ নদী – গঙ্গা, গোদাবরী, কৃষ্ণা, নর্মদা, ব্রহ্মপুত্র প্রভৃতি নদী অববাহিকা গুলি ঘন জনবসতিপূর্ণ কারণ এই সব নদ নদী জলসেচ, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, পানীয় সরবরাহ, পরিবহন ও যাতায়াতের সুবিধা, শিল্প বিকাশ প্রভৃতি ক্রিয়াকলাপে সাহায্য করে। 

D) মৃত্তিকা – উর্বর মাটিতে কৃষি কাজ ভালো হয় বলে ওই অঞ্চলে জন বসতি ঘন হয়। মধ্য ও নিম্ন গঙ্গা সমভূমির উর্বর পলিমাটি, দাক্ষিণাত্যের উর্বর কালো মাটি প্রভৃতি ঘন জন বসতি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। লাল মাটি, ল্যাটেরাইট মাটি প্রভৃতি অনুর্বর বলে ওই মাটি অঞ্চলে জনবসতির তেমন বিকাশ হয় নি। 

E) ভৌগলিক অবস্থান – ভৌগোলিক অবস্থান কোনো অঞ্চলের জনবসতি বণ্টনে প্রভাব বিস্তার করে। দক্ষিণ ভারতের উপকূলীয় অবস্থানের ফলে বন্দর ও বহি: বাণিজ্যের বিকাশ ঘটায় জন বসতির বিকাশ ঘটেছে। 

F) প্রাকৃতিক সম্পদ – বনভূমির নিকটবর্তী অঞ্চলে, খনিজ উত্তোলন ও আনুষাঙ্গিক শিল্প বিকাশ কে কেন্দ্র করে, উন্নত পশুপালন ব্যবস্থা কে কেন্দ্র করে জনবসতির অপেক্ষাকৃত অধিক বিকাশ ঘটে। 

সাংস্কৃতিক কারণ – বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কারণ ভারতের জনবসতি বণ্টনে প্রভাব বিস্তার করে, সেই কারণ গুলি নিয়ে আলোচনা করা হল।

A) ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত – প্রাচীন কাল হতেই ভারতের বিভিন্ন স্থানে রাজশক্তির বিকাশ ও পুনর্গঠনের ফলে জনবসতির বিকাশ ঘটেছে। যেমন – দিল্লি, পাটনা, গৌড়, বিজয়নগর, মহীশূর প্রভৃতি স্থান গুলি প্রাচীনকাল থেকেই জনবসতির মূল কেন্দ্র রূপে গড়ে উঠেছে। 

B) সামাজিক ও ধর্মীয় কারণ – ধর্মীয় আচরণ ও সামাজিক ক্রিয়াকলাপ কে ভিত্তি করে বারাণসী, আজমীর, পুরী, তিরুপতি, হরিদ্বার প্রভৃতি ঘনবসতি যুক্ত শহর গড়ে উঠেছিল। 

C) অর্থনৈতিক কারণ – উন্নত কৃষি ব্যবস্থা যুক্ত অঞ্চল, দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল গুলিতে বিভিন্ন অর্থনৈতিক কার্যকলাপ কে কেন্দ্র করে প্রচুর লোক বসতি গড়ে উঠেছে। যেমন – দুর্গাপুর, জামশেদপুর, মুম্বাই, আমেদাবাদ প্রভৃতি শিল্প শহর। 

D) রাজনৈতিক কারণ – রাজনৈতিক কারণে দেশের বিভিন্ন অংশে গঠিত প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলি ঘো জন বসতির মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

Leave a Comment