চৈতন্য মহাপ্রভু জীবনী | Chaitanya Mahaprabhu Biography in Bengali

চৈতন্য মহাপ্রভু জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Chaitanya Mahaprabhu Biography in Bengali. আপনারা যারা চৈতন্য মহাপ্রভু সম্পর্কে জানতে আগ্রহী চৈতন্য মহাপ্রভু র জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

চৈতন্য মহাপ্রভু কে ছিলেন? Who is Chaitanya Mahaprabhu?

চৈতন্য মহাপ্রভু (১৪৮৬ খ্রিঃ – ১৫৩৩ খ্রিঃ) ছিলেন ভারতবর্ষে আবির্ভূত এক বহু লোকপ্রিয় বৈষ্ণব সন্ন্যাসী ও ধর্মগুরু মহাপুরুষ এবং ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক। তিনি গৌড়বঙ্গের নদিয়া অন্তর্গত নবদ্বীপে (অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলা) হিন্দু ব্রাহ্মণ পণ্ডিত শ্রীজগন্নাথ মিশ্র ও শ্রীমতী শচীদেবীর গৃহে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।তাঁকে শ্রীরাধাকৃষ্ণের যুুগল প্রেমাবতার বলা হয়। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ছিলেন শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ও শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় উল্লিখিত দর্শনের ভিত্তিতে ভক্তিযোগ ভাগবত দর্শনের বিশিষ্ট প্রবক্তা ও প্রচারক।

তিনি বিশেষত পরম সত্ত্বা রাধা ও কৃষ্ণের উপাসনা প্রচার করেন। জাতিবর্ণ নির্বিশেষে ব্রাহ্মণ থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পর্যন্ত শ্রীহরি নাম, ভক্তি ও হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র বিতরণ করেন যা শ্রীকলিসন্তরন উপনিষদে ও শ্রীপদ্মপুরাণের হরপার্বতী সংবাদে উল্লেখিত রয়েছে। হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্রকে এই কলিযুগে জড়জগৎ থেকে মুক্তি পেয়ে পারমার্থিক ধামে যাবার একমাত্র পন্থা হিসেবে গন্য করা হয়।

চৈতন্য মহাপ্রভু জীবনী – Chaitanya Mahaprabhu Biography in Bengali

নামচৈতন্য মহাপ্রভু
জন্ম18 ফেব্রুয়ারি 1486
পিতাজগন্নাথ মিশ্র
মাতাশচী দেবী
জন্মস্থাননবদ্বীপ, নদিয়া, গৌড়বঙ্গ (অধুনা পশ্চিমবঙ্গ)
জাতীয়তাভারতীয়
পেশাবৈষ্ণব সন্ন্যাসী ও ধর্মগুরু মহাপুরুষ
মৃত্যু14 জুন 1534 (বয়স 48)

চৈতন্য মহাপ্রভু র জন্ম: Chaitanya Mahaprabhu’s Birthday

চৈতন্য মহাপ্রভু 18 ফেব্রুয়ারি 1486 জন্মগ্রহণ করেন।

ভারত ইতিহাসের এক সংকটাপন্ন সময়ে পরিত্রাতা রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন শ্রীচৈতন্য। তাই তাঁকে বলা হয় যুগাবতার। অর্থাৎ যুগের প্রয়োজনে অবতীর্ণ মহামানব। সেই সময়ে ভারতের শাসন দন্ড মুসলমানদের হাতে। ইসলাম ছিল রাজধর্ম। এক ঈশ্বরের উপাসনা ও সরল উদার এক মতবাদ হল ইসলাম।

এতে ছিল না জাতি বা বর্ণ নিয়ে ভেদাভেদ, ধনী দরিদ্রের পার্থক্য। শিক্ষিত অশিক্ষিত ধনী দরিদ্র সকলেরই ছিল মসজিদে প্রবেশের অবাধ অধিকার। মক্তব বা মাদ্রাসায় সকলেই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারত। এর পাশাপাশিই এদেশের হিন্দু সমাজ ছিল সংকীর্ণ গোঁড়ামিতে শতধাবিভক্ত।

জাতিভেদ প্রথা ছিল এতই প্রবল যে সমাজের নিম্নবর্ণের মানুষদের ছিল না শিক্ষালাভ বা মন্দিরে প্রবেশের অধিকার। অস্পৃশ্য বলে সমাজের উচ্চবর্ণ ও তথাকথিত শিক্ষিত সম্প্রদায়ের নানা অত্যাচার উৎপীড়ন তাদের সইতে হত। ধর্মের ক্ষেত্রেও ছিল নানান সম্প্রদায়। আর সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে বিরোধ। সমাজের এই নিষ্ঠুর নিপীড়নে অবহেলিত অবমানিত অস্পৃশ্য মানুষদের কাছে ইসলামের উদার মতবাদ স্বভাবতঃই নিরাপদ ও মর্যাদাকর মনে হয়েছিল।

তারা কেউ স্বেচ্ছায়, কখনো সুলতানী সৈন্যদের অত্যাচারের ভয়ে দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে লাগল। হিন্দুসমাজের এই অবক্ষয়ের যুগেই আবির্ভাব হয় শ্রীচৈতন্য দেবের।

চৈতন্য মহাপ্রভু র পিতামাতা ও জন্মস্থান: Chaitanya Mahaprabhu’s Parents And Birth Place

নবদ্বীপের মায়াপুরে এক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পরিবারে ১৪৮৬ খ্রিঃ ১৯ ফ্রেব্রুয়ারী শ্রীচৈতন্যের জন্ম। তার ছেলেবেলার নাম ছিল নিমাই। পিতা জগন্নাথ মিশ্র, মাতা শচীদেবী। নিমাইয়ের দাদা বিশ্বরূপ ষোল বছর বয়সেই সন্ন্যাস নিয়ে সংসার ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তার আর কোন সংবাদ পাওয়া যায় নি। বিশ্বরূপের গৃহত্যাগের কয়েক বছরের মধ্যেই জগন্নাথ মিশ্র মারা গেলেন। বালক নিমাইকে লালন পালনের সব দায়িত্ব চাপল শচী দেবীর ওপরে।

বাল্যকাল থেকেই নিমাই ছিলেন যেমনি মেধাবী তেমনি চঞ্চল। তাকে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হল গঙ্গাদাস পন্ডিতের চতুষ্পাঠীতে। কয়েক বছরের মধ্যেই নিমাই নানা শাস্ত্রে সুপন্ডিত হয়ে উঠলেন। সেই সঙ্গে হলেন অত্যন্ত অহংকারী। বিদ্যাশিক্ষা সমাপ্ত হলে নিজেই এবারে টোল খুললেন কিশোর নিমাই। অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর পান্ডিত্যের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। দলে দলে ছাত্র এসে ভর্তি হতে লাগল তার টোলে।

চৈতন্য মহাপ্রভু র প্রথম জীবন: Chaitanya Mahaprabhu’s Early Life

কৈশোর বয়স উত্তীর্ণ হলে শচীদেবী পুত্রের বিবাহ দিলেন। নিমাইয়ের স্ত্রীর নাম লক্ষ্মী দেবী। সেই সময়ে নবদ্বীপের পন্ডিতদের খ্যাতি ছিল ভারতজোড়া। কেশব ভারতী নামে এক মহাপন্ডিত এলেন নবদ্বীপে। তিনি তর্কযুদ্ধে দেশের অন্যান্য পন্ডিতদের পরাস্ত করেছেন। এবারে লক্ষ নবদ্বীপের পন্ডিতমন্ডলী, তাহলে ভারতবিজয় সম্পূর্ণ হয়। কেশব ভারতীর নামডাক শুনে নবদ্বীপের পন্ডিতবর্গ তো তটস্থ। কেবল নিমাই তাঁর সঙ্গে বিচারে অবতীর্ণ হলেন।

কেশব মুখে মুখে গঙ্গার স্তব রচনা করলেন। তা শুনে সকলেই মুগ্ধ। কিন্তু নিমাই তার শ্লোকে নানা প্রকার অশুদ্ধি নির্ণয় করে বিদেশী পন্ডিতকে পরাস্ত করলেন। এর ফলে নিমাইয়ের পান্ডিত্যের খ্যাতি আরও বাড়ল। এরপরে নিমাই কিছুদিনের জন্য পূর্ববঙ্গ ভ্রমণে গেলেন। সেই সময় নবদ্বীপে ঘটল এক দুর্ঘটনা ৷ সর্পদংশনে লক্ষ্মীদেবী মারা গেলেন। ফিরে এসে এই সংবাদ পেয়ে নিমাই শোকে দুঃখে ভেঙ্গে পড়লেন। কিছুদিন পরে শচীদেবী নিমাইয়ের আবার বিবাহ দিলেন। এবারে মিশ্রপরিবারে গৃহলক্ষ্মী হলেন বিষ্ণুপ্রিয়া।

বিবাহের অল্পকাল পরে নিমাই স্বর্গত পিতার পিন্ডদান করতে গেলেন গয়া ধামে ৷ সেখানে বিষ্ণু পাদপদ্ম দর্শনের পর তার মধ্যে অভূতপুর্ব পরিবর্তন দেখা দিল। তার মধ্যে জন্ম হল কৃষ্ণ অনুরাগী এক প্রেমিক সাধকের। অহঙ্কারী পন্ডিত নিমাই হলেন কৃষ্ণসাধক। নবদ্বীপে ফিরে এলে সকলেই নিমাইয়ের পরিবর্তন দেখে বিস্মিত হল। কৃষ্ণনাম করতে করতে বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হয়ে যায় তার। কখনো টোলের ছাত্রদের নিয়ে নামসংকীর্তনে মেতে ওঠেন। সদা বিনয় নম্র শাক্তভাব। শচীদেবী ও বিষ্ণুপ্রিয়া উদ্বেগে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন।

সেকালে নবদ্বীপে বৈষ্ণব সমাজের প্রধান ছিলেন অদ্বৈত আচার্য। জ্ঞান ও ভক্তির সমন্বয় মূর্তি বৃদ্ধ আচার্য ভাবোন্মত্ত নিমাইকে দেখেই চিনতে পারলেন। এ যে মানব দেহধারী তঁতারই আরাধ্য দেবতা। পাদ্য অর্ঘ্য দিয়ে তিনি নিমাইকে বরণ করলেন। নিমাই হয়ে উঠলেন নবদ্বীপ বৈষ্ণব সমাজের প্রধান পুরুষ। এবার থেকে হরিনাম গানে মুখর হয়ে উঠল কেবল অদ্বৈত প্রভুর গৃহাঙ্গনই নয়, নবদ্বীপের আকাশ বাতাস।

সাধারণ মানুষের মধ্যেও জাগল নামের জোয়ার। তারাও জাতিবর্ণের বিভেদ ভুলে সংকীর্তনে যোগ দিলেন। নিমাইয়ের মানব প্রেমই ছিল এই কীর্তনানন্দের প্রধান আকর্ষণ। তিনি সমাজের উচ্চনীচ সকলকেই সমান জ্ঞান করতেন — সকলের মধ্যেই তার আরাধ্য দেবতা শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করতেন। তাই অস্পৃশ্যতা ভেদাভেদ কিছুই তিনি মানলেন না। প্রেমানন্দে সকলকে বুকে টেনে নিলেন। সমাজের অস্পৃশ্য অবহেলিত মানুষদের মধ্যে এবারে যেন নতুন জোয়ার জেগে উঠল।

ব্রাহ্মণ আর উচ্চবর্ণের মানুষদের কেবল ঘৃণাই যারা এতদিন পেয়ে এসেছে, মানুষ হিসাবে তারাও যে কারু চেয়ে ছোট নয়, নিমাইয়ের উদার ধর্মমত সেকথাই তাদের জানিয়ে দিল। কিছুদিনের মধ্যেই নিমাই অনুরাগী বিরাট এক ভক্তমন্ডলী গড়ে উঠল নবদ্বীপে। তাদের মধ্যে তাঁর অন্তরঙ্গ পার্ষদ ছিলেন অদ্বৈত আচার্য সহ শ্রীবাস, মুরারী, গদাধর ও যবন হরিদাস। নগর কীর্তনের খোল করতালের শব্দে নবদ্বীপের আকাশ বাতাস যখন মুখর হয়ে উঠেছে সেই সময়ে নবদ্বীপে উপস্থিত হলেন এক তরুণ অবধৃত। তাঁর নাম নিত্যানন্দ ৷

নিত্যানন্দের জন্ম রাঢ় অঞ্চলের একচাকা গ্রামে। পিতার নাম হাড়াই ওঝা, মায়ের নাম পদ্মাবতী ৷ এঁরা ছিলের রাঢ়ীয় শ্রেণীর ব্রাহ্মণ। বৃন্দাবন থেকে নানাস্থান ভ্রমণ করতে করতে তিনি উপস্থিত হয়েছেন নবদ্বীপে। নিমাইকে দেখেই আকৃষ্ট হলেন তিনি। নিত্যানন্দ হলেন নিতাইয়ের অন্তরঙ্গ পার্ষদদের প্রধান। আচার্য শ্রীবাসের অঙ্গনেই প্রতিদিন সমবেত হয়ে ভক্তরা নামগান করেন। নিতাই এবারে স্থির করেন এই প্রেমময় কৃষ্ণনাম ছড়িয়ে দিতে হবে আচন্ডালে।

তিনি যবনভক্ত হরিদাস আর নিত্যানন্দের ওপরে দিলেন নগরকীর্তনের ভার। নিত্যানন্দ হিন্দু ব্রাহ্মণ আর হরিদাস মুসলমান। তাদের ওপরে বৈষ্ণব ধর্মের প্রচারের দায়িত্ব দিয়ে নিমাই তৎকালীন হিন্দু সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় গোঁড়ামীর বিরুদ্ধে এভাবেই জানালেন তীব্র প্রতিবাদ। বৈষ্ণবরা নগরের পথে পথে ঘুরে কীর্তন করেন। কেউ দু’বাহু তুলে হরিনামে মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন তাঁদের সঙ্গে। আবার কেউ দূরে দাঁড়িয়ে উপহাস করে, নিমাইয়ের ঔদ্ধত্যে সমাজের আশু সর্বনাশের কথা ভেবে শঙ্কিত হয়।

সমাজপতিরা এবারে নিমাইকে জব্দ করবার মতলব আঁটে। জগাই মাধাই দুই নগর কোটাল; এদের তারা নিমাইয়ের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে তোলে। পাপাচারী ব্রাহ্মণ সন্তান জগাই মাধাই একদিন নিমাইয়ের কীর্তন দলে হামলা চালাল। মাধাই কলসীর ভাঙ্গা টুকরো ছুঁড়ে নিত্যানন্দের মাথায় আঘাত করল। অঝোরে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল। এই আঘাত অগ্রাহ্য করেও নিত্যানন্দ দুই অত্যাচারীকে হরিনাম করার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন— মেরেছ কলসীর কানা তাই বলে কি প্রেম দেব না।

রক্তাক্ত নিত্যানন্দকে দেখে ক্রুব্ধ হয়ে ওঠেন নিমাই। সকাতর অনুনয়ে তাঁর ক্রোধ শান্ত করেন নিত্যানন্দ। এই দৃশ্য দেখে অনুতাপে লজ্জায় মাথা নত হয় জগাই মাধাইয়ের। তারাও মুখে হরিনাম নিয়ে নিমাইয়ের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। জয় ঘোষিত হয় প্রেমধর্মের। উদ্ধার হয় অত্যাচারী জগাই মাধাই। এই ঘটনার পর থেকে চতুর্দিকে সমবেত কীর্তন আর নামগানের জোয়ার বইতে থাকে। নবদ্বীপ হয়ে ওঠে নববৃন্দাবন ৷ সেই সময়ে বাংলার সুলতান ছিলেন হোসেন শাহ। তার অধীনে চাঁদ কাজী শাসন করতেন নবদ্বীপ। তিনি ছিলেন প্রবল হিন্দু বিদ্বেষী।

বৈষ্ণবদের দলবদ্ধ হয়ে নগরসংকীর্তন করা বন্ধ করবার জন্য তিনি হুকুম জারি করলেন। ভক্তমন্ডলী বিচলিত হলেও নিমাই সকলকে নিয়ে সেদিন সন্ধ্যায়ই নগর কীর্তন নিয়ে পথে বার হলেন। সেদিন কেবল বৈষ্ণবরাই নয়, দলে দলে সাধারণ মানুষও কীর্তনের দলে যোগ দিল। জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকলের সঙ্গেই একাত্ম হয়ে উঠেছিলেন নিমাই। তাই তার আহ্বান সাড়া জাগিয়েছিল সর্বশ্রেণীর জনসাধারণের অন্তরে। ফলে সেদিন সন্ধ্যায় তার কীর্তনের দল পরিণত হল এক বিপুল জনস্রোতে।

মেঘের গর্জনের মত কীর্তনের ধ্বনি শুনে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন চাঁদ কাজী ৷ তার প্রাসাদরক্ষীরাও প্রাণভয়ে পালিয়ে গেল। প্রাসাদের বাইরে এসে আত্মসম্পূর্ণ করলেন কাজী সাহেব। নিমাইয়ের মধুর সম্বোধন ও তার আন্তরিক ব্যবহার পেয়ে মুগ্ধ হলেন চাদ কাজী। স্বেচ্ছায় সংকীর্তনের ওপর থেকে বাধানিষেধ তুলে নিলেন তিনি। এখানেও প্রেমের অমোঘ শক্তির বলেই নিমাই সেদিন অবাধ ধর্মাচরণের স্বাধীনতা অর্জন করেছিলেন। গয়াধাম থেকে ফিরে আসার এক বছরের মধ্যেই ঘটল এসব ঘটনা।

সকল মানুষের দুঃখ বেদনা ভেদাভেদ ও লাঞ্ছনা দূর করবার জন্যই আবির্ভাব হয়েছিল নিমাইয়ের। তাই কেবল নবদ্বীপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল না তার কর্মপ্রবাহ। তিনি এবারে বৃহৎ জগতের কল্যাণের লক্ষে নিজেকে উৎসর্গ করবার জন্য প্রস্তুত হলেন। তিনি সন্ন্যাস নেবার সংকল্প গ্রহণ করলেন। নিমাইয়ের সংকল্পের কথা কেবল জানতে পারলেন নিত্যানন্দ প্রমুখ কয়েকজন অন্তরঙ্গ পার্ষদ।

১৫১০ খ্রিঃ ২৬ শে মাঘ গভীর রাতে জননী ও স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়ার গভীর নিদ্রার মধ্যে গৃহত্যাগ করলেন নিমাই। গঙ্গা পার হয়ে গিয়ে কাটোয়ায় কেশব ভারতীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন। তার নতুন নাম হল শ্রীচৈতন্য। এরপর অন্তরঙ্গ ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে নীলাচলে রওনা হবার সঙ্কল্প নিলেন তিনি। তার বিরহে ভক্তরা কাতর হয়ে পড়েছিলেন। শ্রীচৈতন্য শান্তিপুরে অদ্বৈতপ্রভুর গৃহে কয়েকদিন অবস্থান করে সকলকে দর্শন দিলেন।

জননী শচীদেবীও এসে পুত্রের সঙ্গে দেখা করে গেলেন। নীলাচলে প্রভু জগন্নাথের দর্শন লাভের জন্য উড়িষ্যায় রওনা হলেন শ্রীচৈতন্য। তার সঙ্গী হলেন কয়েকজন অন্তরঙ্গ শিষ্য। সমস্ত পথ ভাবে বিভোর অবস্থায় কাটল। জগন্নাথ দর্শনের জন্য তার মনপ্রাণ ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। উড়িষ্যায় পৌঁছে জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশ করেই ভাব বিহ্বল চৈতন্যদেব চেতনা হারিয়ে মেঝেয় লুটিয়ে পড়লেন।

সেই সময়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন উৎকলরাজ প্রতাপরুদ্রের গুরুদেব মহাপন্ডিত বাসুদেব সার্বভৌম। দিব্য ভাবে উদ্ভাসিত শ্রীচৈতন্যের প্রেমবিহ্বল অবস্থা দেখে মুগ্ধ হলেন তিনি। তাকে নিয়ে গেলেন নিজের গৃহে। বাসুদেব সার্বভৌম ছিলেন বেদান্তবাদী পন্ডিত। কেবল উৎকল নয়, ভারতের শ্রেষ্ঠ বৈদান্তিকদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

শ্রীচৈতন্যের ভক্তিভাব তাঁর ভাল লাগে না। জ্ঞানের পথে ভাবিত করবার জন্য তিনি শ্রীচৈতন্যের কাছে প্রতিদিন বেদান্তের ব্যাখ্যা করতে থাকেন। সাতদিন কোন কথা না বলে শ্রীচৈতন্য সার্বভৌমের ব্যাখ্যা শুনে গেলেন। পরে তার ভুল – ত্রুটিগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বুঝিয়ে দিলেন। পান্ডিত্যের অহমিকা চূর্ণবিচূর্ণ হল সার্বভৌমের। তিনি বুঝতে পারলেন শ্রীচৈতন্যের অসাধারণত্ব। তাঁরই পাদপদ্মে নিজেকে সমর্পণ করলেন তিনি।

চৈতন্য মহাপ্রভু র কর্ম জীবন: Chaitanya Mahaprabhu’s Work Life

সেই সময়ে শ্রীচৈতন্য মাত্র ২৪ বছরের এক তরুণ। তাঁর কাছে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈদান্তিক পন্ডিতের আত্মসর্ম্পনের সংবাদে পন্ডিত সমাজে বিস্ময়ের সঞ্চার হল। শ্রীচৈতন্যের ঐশীশক্তি সম্বন্ধে কারোরই আর দ্বিধা রইল না। শ্রীচৈতন্যের প্রেম ধর্মের আকর্ষণে মাতোয়ারা হল নীলাচলের মানুষ। কিছুকাল উড়িষ্যা বাসের পর শ্রীচৈতন্য দক্ষিণ ভারতের তীর্থ পর্যটনে বেরিয়ে পড়লেন। এবারে তিনি নিঃসঙ্গ — নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে হরিনাম হল একামাত্র সঙ্গী।

পথে যেতে যেতে নগরে গ্রামে সর্বত্র ভাববিহ্বল শ্রীচৈতন্য কৃষ্ণনাম বিতরণ করলেন। তাঁর প্রচারিত প্রেমধর্মের স্পর্শে পরিবর্তন ঘটে কত পাপীতাপীর জীবনে, দস্যু তস্কর প্রভৃতির জীবনে আসে নতুন জীবনের স্পর্শ। দক্ষিণ ভারতে রামেশ্বর, ত্রিবাঙ্কুর, শ্রীরঙ্গক্ষেত্র প্রভৃতি একের পর এক তীর্থ দর্শন করেন শ্রীচৈতন্য। তাঁর আবির্ভাবে প্রেমধর্মের জোয়ারে ভেসে যায় দক্ষিণ ভারত। দুবছর পরে আবার নীলাচলে ফিরে আসেন শ্রীচৈতন্য।

ব্যাকুল শিষ্যরা তাঁদের ধ্যানের দেবতাকে ফিরে পেয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। কৃষ্ণনাম গানে মুখর হয়ে ওঠে নীলাচলের পথঘাট। বাংলার সঙ্গে উড়িষ্যার আত্মিক যোগ থাকলেও শ্রীচৈতন্য উপলব্ধি করলেন, তাঁর অবর্তমানে বাংলায় বৈষ্ণবধর্ম প্রচারের জন্য একজন উপযুক্ত মানুষের দরকার। তার সঙ্গে যে ভক্তশিষ্যরা পরবাসে এসেছিলেন তাঁদের মনও নবদ্বীপে ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল।

শ্রীচৈতন্য নিত্যানন্দকে আদেশ করলেন, তিনি যেন সংসারী হয়ে বাংলার গৃহী মানুষদের মধ্যে গিয়ে বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার করেন। বয়সে নিত্যানন্দ ছিলেন শ্রীচৈতন্যের চেয়ে আট বছরের বড়। এতদিন ছিলেন ব্রহ্মচারী ও অবধূত। শ্রীচৈতন্যের আদেশ পেয়ে তিনি বাংলায় ফিরে এসে বিবাহ করলেন। তার স্ত্রীর নাম জাহ্নবীদেবী। তিনিও ছিলেন শাস্ত্রজ্ঞ ও ধার্মিক। পরবর্তীকালে বহু ভক্ত তার কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করে ধন্য হন।

নীলাচলে চলে আসার পর থেকে প্রতিবছর শ্রীচৈতন্যকে দর্শন করবার জন্য নবদ্বীপ থেকে ভক্তরা আসতেন। তাদের কাছেই শচীদেবী পুত্রের সংবাদ পেয়ে অশান্তমনকে শান্ত করবার চেষ্টা করতেন। শ্রীচৈতন্যকে দেখার জন্য তার মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। মায়ের অন্তরের টানেই শ্রীচৈতন্য নীলাচল ত্যাগ করে নবদ্বীপের পথে রওনা হলেন। সেই দিনটা ছিল বিজয়া দশমী, ১৫১৪ খ্রিঃ। শিষ্যদের সঙ্গে নামগান করতে করতে কাটোয়ায় এসে পৌঁছালেন শ্রীচৈতন্য।

সেখান থেকে এলেন কুমারহট্ট গ্রামে শ্রীবাসের গৃহে। তারপর শান্তিপুর হয়ে পৗঁছলেন নবদ্বীপে। শ্রীচৈতন্যের আগমনে যেন উৎসব শুরু হয়ে গেল চারদিকে। সেই সময়ে স্থানীয় মুসলমান শাসকরাও যোগদান করেছিলেন সেই আনন্দ উৎসবে। শচীমাতা এলেন পুত্রকে দেখতে। বিষ্ণুপ্রিয়ার আসায় বাধা ছিল। সন্ন্যাসীর পক্ষে স্ত্রীমুখ দর্শন নিষিদ্ধ। কিন্তু স্বামীকে দর্শনের ব্যাকুলতায় কোন বাধানিষেধ মানলেন না বিষ্ণুপ্রিয়া। শ্রীচৈতন্যের কাছে এসে প্রণাম করলেন তিনি।

তুমি কৃষ্ণপ্রিয়া হও –এই বলে তাকে আশীর্বাদ করলেন শ্রীচৈতন্য। বিষ্ণুপ্রিয়াকে নিজের পাদুকা দান করলেন শ্রীচৈতন্য। আজীবন এই পাদুকার সোপূজাতেই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বিষ্ণুপ্রিয়া। তার মধ্যেই তিনি তার অন্তরের আরাধ্য দেবতার উপস্থিতি অনুভব করতেন। বাংলার সমাজ জীবনে শ্রীচৈতন্যের প্রেমধর্ম এক নব জাগরণের সৃষ্টি করেছিল।

সমাজের অগণিত মানুষ যখন উচ্চবর্ণের অত্যাচারে অপমানে অতিষ্ঠ হয়ে ইসলাম ধর্মগ্রহণ করছিল, ভাঙ্গন ধরেছিল হিন্দু সমাজে। বিপন্ন হয়ে পড়েছিল, ধর্মের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতি ভাষা ও সাহিত্য। এই জাতীয় অবক্ষয় রোধ করেছিলেন শ্রীচৈতন্য। সেই কারণেই তার আবির্ভাব বাঙ্গালী জাতির তথা বাংলার ইতিহাসের এক বিশিষ্ট ঘটনা। আট মাসকাল নবদ্বীপে ছিলেন শ্রীচৈতন্য। তারপর ফিরে এলেন পুরীতে। দুমাস পরেই রওনা হলেন বৃন্দাবনে। বৃন্দাবন, প্রয়াগ ও কাশীতে রইলেন আট মাস।

সেখান থেকে ফিরে বাংলায় রইলেন দুই মাস। এভাবে পরিব্রাজন ও তীর্থদর্শন সম্পূর্ণ করে ১৫১৬ খ্রিঃ মে মাসে ফিরে এলেন পুরীতে। অবশিষ্ট জীবন তিনি পুরী থেকে আর কোথাও যাননি। ১৫১০ খ্রিঃ ২০ শে ফেব্রুয়ারী প্রথমবার জগন্নাথ দর্শনের পর থেকে জীবনের বাকি চব্বিশ বছর পুরীধামই ছিল শ্রীচৈতন্যের স্থায়ী ঠিকানা। শ্রীচৈতন্যের উপস্থিতির ফলে সেদিনের ওড়িশা হয়ে উঠেছিল মানুষের এক মিলনতীর্থ। সমগ্র উত্তর ও দক্ষিণ ভারত থেকে ভক্তরা আসতেন তাঁকে দর্শন করতে। জগন্নাথ মূর্তি দর্শনের জন্যও যুগ যুগ ধরে তীর্থযাত্রীর সমাগম হয় ওড়িশায় ৷

সকল তীর্থযাত্রী পুরীর মন্দিরের অচল জগন্নাথের সঙ্গে সচল জগন্নাথ শ্রীচৈতন্যকেও দর্শন করে ধন্য হতেন। ঈশ্বরের মহিমান্বিত রূপ তার মধ্যেই সকলে প্রত্যক্ষ করতেন। শ্রীচৈতন্য প্রতিদিন একবার করে যেতেন জগন্নাথ দর্শনে। নিত্য দর্শনের সময় তিনি দাঁড়াতেন জগন্নাথ মন্দিরের সামনে গরুড় স্তম্ভের পাশে। তিনি গরুড় স্তম্ভে হাত রেখে দাঁড়াতেন। তাঁর আঙুলের ছাপ এখনও এই স্তম্ভের গায়ে লেগে রয়েছে বলা হয়। এখানে দাঁড়িয়ে বিভোর হয়ে তিনি জগন্নাথদেবকে দেখতেন।

রথযাত্রার সময় রথের আগে শ্রীচৈতন্য তার ভক্ত পরিকরদের নিয়ে নাচতেন ও গাইতেন। প্রথম যেদিন তিনি পুরীতে আসেন, সেদিন ছিলেন ঈশ্বর প্রেমে অর্ধোন্মাদ ৷ এখানে বাস করতে করতে তিনি প্রায় পাগলই হয়ে গেলেন। দাক্ষিণাত্ম বাংলা বৃন্দাবন ইত্যাদি জায়গা ঘুরে আসার পর তিনি একটানা আঠারো বছর পুরীতে কাটিয়েছিলেন। সেই আঠারো বছরের শেষ বারো বছর ছিল তাঁর উন্মাদের জীবন। ভগবানের জন্য ভক্তের ভালবাসা ও অনুরাগ কত গভীর হওয়া সম্ভব শ্রীচৈতন্যের জীবন ছিল তার দৃষ্টান্ত।

চৈতন্য মহাপ্রভু র মৃত্যু: Chaitanya Mahaprabhu’s Death

ঈশ্বর ছাড়া অন্য কোন চিন্তা তাঁর মধ্যে ছিল না। ঈশ্বরের নামে তিনি জগৎ ভুলে গিয়েছিলেন, নিজের দেহবোধও লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। কখনো চেতনাহীন অবস্থায় ছুটে যেতেন সমুদ্রের দিকে। সমুদ্রের নীল জল দেখে মনে করতেন, ওই তো কৃষ্ণ। তিনি পড়ে থাকতেন সমুদ্রের তীরে। সমুদ্রে ঝাপও দিয়েছিলেন তিনি। শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধানের তারিখ ১৫৩৩ খ্রিঃ ২৯ শে জুন। সেদিন রাত্রির তৃতীয় প্রহরে তিনি ভাববিহ্বল অবস্থায় গরুড়ধ্বজের কাছ থেকে সরে গিয়ে মন্দিরের মূল গর্ভগৃহে প্রবেশ করেন। সঙ্গে সঙ্গেই মন্দিরের দরজা বন্ধ হয়ে যায়।

তারপর যখন রাত্রির নবম প্রহরে মন্দিরের দরজা খোলা হয়, দেখা যায় শ্রীচৈতন্য মন্দিরে নেই। প্রচার করা হল শ্রীচৈতন্য জগন্নাথের সাথে লীন হয়ে গেছেন ৷ শ্রীচৈতন্যের এই অন্তর্ধান কিছু সংখ্যক ভক্ত মেনে নিলেও সকলে মেনে নেননি। পরবর্তীকালে বহু ঐতিহাসিক ও শ্রীচৈতন্যভক্ত তথ্যানুসন্ধানীর চেষ্টায় প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরে যেসব পূজারীর হাতে আজ পূজার ডালি সাজিয়ে জীবন সার্থক মনে করেন পুণ্যার্থী তীর্থযাত্রীরা, সেদিন এই পূজারীর দলই শ্রীচৈতন্যকে মন্দিরের মধ্যে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। তার দেহটি পর্যন্ত গোপন পথে অজ্ঞাত স্থানে স্থানান্তরিত করে দেয় তারা।

জাতিবর্ণ ধর্ম নির্বিশেষ সকল মানুষের মধ্যে প্রেমের বাণী প্রচার করেছিলেন শ্রীচৈতন্য। এর বাইরে তিনি অন্য কোন ধর্মতত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেননি। কোন ধর্মগ্রন্থও রচনা করেন নি। মানবীয় চেতনার পূর্ণবিকশিত রূপবিগ্রহ ছিলেন তিনি। মানুষে মানুষে বিভেদ মুছে দেবার ব্রতই ছিল তাঁর জীবন সাধনা। সন্ন্যাসী হলেও তিনি আত্মমুক্তিকামী বা মানবতা বিমুখী ছিলেন না। সেই আকর্ষণেই হাজার হাজার মানুষ তার কাছে ছুটে আসত, লাভ করত জীবনের আলো।

Leave a Comment