আয়তন ও কার্যাবলির ভিত্তিতে পৌরবসতির শ্রেনীবিভাগ

আয়তন ও কার্যাবলির ভিত্তিতে পৌরবসতির শ্রেনীবিভাগ: অল্প বিস্তৃত অঞ্চলে ইট, বালি, পাথর দ্বারা ঘনসন্নিবিষ্ট ভাবে বসত বাড়ি নির্মানের মাধ্যমে যে মনুষ্য বসতি গড়ে ওঠে, যেখানে বেশির ভাগ মানুষ দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ স্তরের কার্যাবলির সাথে যুক্ত থেকে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে, সেই সব বসতি কে পৌর বসতি বলা হয়। পৌরবসতি গুলিকে আয়তন ও কার্যাবলির উপর ভিত্তি করে বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। 

আয়তনের উপর ভিত্তি করে পৌরবসতির শ্রেনীবিভাগ 

মানুষের জন্মের পর থেকে সময়ের সাথে সাথে যেমন ক্রমশ শারীরিক বিকাশ ঘটতে থাকে এবং এক সময় এসে মানুষ মৃত্যুবরন করে অর্থাৎ মানুষের বিলোপ ঘটে ঠিক তেমনি ভাবে একটি পৌরবসতি গড়ে ওঠার প্রথম স্তর থেকে ক্রমশ আয়তনে বৃদ্ধি পেতে পেতে একসময় সেই পৌরবসতি ধ্বংসের সম্মুখিন হয়।

তাই পৌর বসতি গড়ে ওঠার প্রাথমিক পর্যায়ে জনসংখ্যার যে ক্ষুদ্র আয়তন থাকে এবং সেটাই ক্রমশ বিকশিত হতে হতে অন্তিম পর্যায়ে যে বিশাল আকৃতির পৌর বসতির বিকাশ ঘটায় তাকেই বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে জনসংখ্যার আয়তনের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন নামে ভূষিত করা হয়ে থাকে। যেমন –

ইয়োপলিস (Eopolis)  – লুই মামগোর্ডের মতে কৃষিভিত্তিক নানা প্রকার কাজকর্ম বা খনিভিত্তিক কাজকর্ম কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ছোটো আকারের শহরকে ইয়োপলিস বলে। ইয়োপলিসের জনসংখ্যা ৫০০০ জনের কম হয়। 

পলিস (Polis) – খুচরো বাজারকেন্দ্রিক পৌরবস্তিকে পলিস বলে। এদের জনসংখ্যা ও আয়তন ইয়োপলিস অপেক্ষা বেশি হয়। এক্ষেত্রে জনসংখ্যা ৫০০০ জনের অধিক হয়ে থাকে। 

শহর (Town)  – পৌর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা নোটিফায়েড এরিয়া কমিটির প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে থাকা ইয়োপলিস অপেক্ষা বড়ো পৌরবসতি কে শহর বলে। শহরের জনসংখ্যা সাধারণত ১ লক্ষের কম হয়ে থাকে। উদাহরণ – বোলপুর, মালদা টাউন, রায়গঞ্জ প্রভৃতি শহর।

নগর (City) – পৌরসভা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা  নোটিফায়েড অথরিটির প্রশাসনিক অধীনে থাকা শহরের থেকে বড়ো পৌরবসতি কে নগর বলে। নগরের জনসংখ্যা ১ লক্ষের বেশি কিন্তু ১০ লক্ষের কম হয়ে থাকে। যেমন – শিলিগুড়ি, কলকাতা নগর ।

মহানগর বা মেট্রোপলিস (Metropolis) – ১০ লক্ষ বা তার থেকে বেশি জনসংখ্যা বিশিষ্ট পৌরবসতিকে মহানগর বলে। মহানগরে নানা প্রকারের জীবিকা সুবিধা, ব্যবসা বানিজ্য কেন্দ্র, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন প্রকার নাগরিক পরিসেবার সুবন্দোবস্ত থাকে। যেমন – কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী শহর গুলিকে নিয়ে কলকাতা মহানগর গড়ে উঠেছে। এছাড়া মুম্বাই, লন্ডন, নিউইর্য়ক মহানগর। মহানগর কে Mother City বলা হয়ে থাকে। 

মেগাসিটি (Mega City) – যে সব নগরের জনসংখ্যা ৫০ লক্ষ থেকে ১ কোটির বেশি সেগুলিকে মেগাসিটি বলে। যেমন  – জাপানের টোকিও, চিনের সাংহাই প্রভৃতি মেগাসিটির প্রকৃষ্ট উদাহরণ । 

মেগালোপলিস (Megalopolis) – পাশাপাশি অবস্থিত বেশ কয়েকটি বড়ো বড়ো নগর ক্রমশ বিস্তৃত হতে হতে পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে যে বিশাল আকৃতির পৌর বসতির সৃষ্টি করে তাকে, মেগালোপলিস বলে। যেমন – আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর – পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত নিউইর্য়ক, বোস্টন, ফিলাডেলফিয়া, ওয়াশিংটন, মরিসভীল প্রভৃতি একত্রে একটি  বিশাল আকৃতির মেগালোপলিস গঠন করেছে। 

মেগালোপলিস শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন বিজ্ঞানী গটম্যান।   

পৌরপুঞ্জ বা কনারবেশন (Conurbation) – পৌরপুঞ্জ বা কনারবেশন শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন প্যাট্রিক গেডেস ১৯১৫ সালে। তার মতে একটি বড়ো শহর ও তার পার্শ্ববর্তী ছোট ছোট শহর গুলি পরস্পর যুক্ত হয়ে যে পৌর বসতির বিকাশ ঘটায় তাকেই পৌরপুঞ্জ বলা হয়ে থাকে। যেমন – বৃহত্তর লন্ডন, বৃহত্তর কলকাতা প্রভৃতি। পৌরপুঞ্জ কে বোঝানোর জন্য পৌরপিন্ড বা Urban Agglomeration শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। 

টির‍্যানোপলিস – নগর উন্নয়নের শেষ পর্যায়ে যখন কোন দেশের প্রতিটি বসতি পৌর বসতিতে পরিনত হয়, তখন তাকে যে অতিকায় পৌর বসতি গড়ে ওঠে, সেই পৌর বসতিকে টির‍্যানোপলিস বলে।

সমগ্র ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের প্রায় ৯০%বর্তমানে পৌরবসতির অন্তর্গত, অবশিষ্ট ১০% পৌরবসতির অন্তর্ভুক্ত হলেই দেশটি টির‍্যানোপলিসে পরিনত হবে। 

এক্যুমনোপলিস – পৃথিবী জুড়ে যখন প্রতিটি বসতি পৌরবসতিতে পরিনত হবে, ভৌগোলিক বিদগন সেই চরমতম নগরায়নকে বোঝাতে এক্যুমনোপলিস শব্দটি ব্যবহার করেন। এই ধরণের অবস্থা মানুষের কাছে কখনোই  কাম্য নয়।

নেক্রোপলিস – চরম নগরায়নের ফলে যখন বিপুল পরিমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে নাগরিক পরিসেবা বিপর্যস্ত হয়, তখন সমগ্র দেশে দুর্ভিক্ষ, মহামারি, গৃহ যুদ্ধ প্রভৃতির প্রভাবে যে মৃত প্রায় পৌর বসতির উদ্ভব ঘটে সেই পৌরবসতিকে নেক্রোপলিস বলে। যেমন – ব্যাবিলন, মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা সভ্যতা এই ধরণের নেক্রোপলিসের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এগুলোকে মৃতের শহর বা ভূতের শহর হিসাবে গন্য করা হয়ে থাকে।

কার্যাবলির উপর ভিত্তি করে পৌরবসতির শ্রেনীবিভাগ 

এই ক্ষেত্রে পৌরবসতিকে কোন একটি বিশেষ কার্যাবলির ভিত্তিতে শ্রেনীবিভাগ করা হয়ে থাকে। সাধারন অবস্থায় একটি শহর বা পৌর বসতিতে বহুমুখী কার্যাবলির উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও সে পৌরবসতিতে এমন একটি বা দুটি কার্যাবলির প্রাধান্য থাকে যা শহরটিকে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য প্রদান করে থাকে। তাই কার্যাবলির উপর ভিত্তি করে পৌরবসতি গুলো নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে।

প্রশাসনিক শহর – প্রশাসনিক শহর বলতে সেই সমস্ত শহর কে বোঝায় যেখান থেকে সমগ্র দেশের বা রাজ্যের বা জেলার বা নির্দিষ্ট কোন অঞ্চলের শাসন কার্য পরিচালনা করা হয়ে থাকে। রাজধানী শহর গুলি এই ধরণের প্রশাসনিক শহর হয়ে থাকে। যেমন – ভারতের রাজধানী নিউ দিল্লি, ইংল্যান্ডের লন্ডন, বাংলাদেশের ঢাকা, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি, চিনের বেজিং আবার ভারতের প্রতিটি রাজ্যের রাজধানী প্রশাসনিক শহরের উদাহরণ। 

শিল্প শহর – শিল্প শহর হল সেই সমস্ত শহর যে গুলির প্রধান অর্থনৈতিক কার্যাবলি হল বিভিন্ন প্রকার দ্রব্যের উৎপাদন অর্থাৎ যেখানে শিল্প মূলক কার্যাবলির প্রাধান্য দেখা যায়। শিল্পকেন্দ্র ও নগরায়নের মধ্যে ধনাত্মক সম্পর্কের বিদ্যমানতা দেখা যায় কারণ যেখানে শিল্পকেন্দ্রের বিকাশ ঘটে সেখানে নগরায়নের সূচনা হয়। ভারত তথা পৃথিবীর প্রধান প্রধান শিল্প শহর গুলির মধ্যে অন্যতম হল – কিভয়রগ, ম্যানচেস্টার, টোকিও – ইয়াকোহামা, পিটসবার্গ, গ্লাসগো, ভারতের জামসেদপুর, দূর্গাপুর, আমেদাবাদ প্রভৃতি। 

বানিজ্যিক শহর – বানিজ্যিক শহরের প্রধান কার্যাবলি হল ব্যবসা ও বানিজ্য। এই সমস্ত বানিজ্যিক শহর গুলি শিল্প শহরে উৎপাদিত বিভিন্ন দ্রব্য গুলি সংগ্রহ করে সেগুলির বন্টন মূলক কার্যাবলির সাথে যুক্ত থাকে। তাই এই প্রকারের শহর গুলি বিভিন্ন সড়ক পথের সংযোগ স্থলে বা কেন্দ্রে অবস্থান করে। বাজার শহর, সামুদ্রিক বন্দর কেন্দ্রিক শহর গুলি এই বানিজ্যিক শহরের অন্তর্ভুক্ত। উদাহরন – ভারতের মুম্বাই, কানপুর, লুধিয়ানা এবং বিশ্বের উল্লেখযোগ্য বানিজ্যিক শহরের মধ্যে অন্যতম হল নিউইর্য়ক, লন্ডন, সিঙ্গাপুর, হংকং, কেপটাউন প্রভৃতি। 

ধর্মীয় শহর – কোন পবিত্র ধর্মীয় স্থানকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় শহর গুলির বিকাশ ঘটে থাকে। বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে বর্তমানে সারা পৃথিবী ব্যাপী বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ন ধর্মীয় শহরের অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। যেমন – মক্কা ও মদিনা (সৌদি আরব), ভ্যাটিকান সিটি (রোম), জেরুজালেম (ইস্রায়েল), বারানসি, কাশী, গয়া, বৃন্দাবন, মথুরা, দ্বারকা, পুরী, অমৃতসর, অযোধ্যা, মাদুরাই প্রভৃতি ধর্মীয় শহরের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। 

প্রতিরক্ষা বা সামরিক শহর – প্রতিরক্ষা ও সামরিক ক্রিয়াকলাপ যে ধরণের শহরের প্রধান কার্যাবলি সে সমস্ত শহর কে প্রতিরক্ষা বা সামরিক শহর বলা হয়ে থাকে। সাধারণত এই সমস্ত শহরে সৈন্য ঘাঁটির অবস্থান থাকে যেখানে সৈন্য ও পুলিশকর্মীদের প্রতিরক্ষামূলক নানা রকম প্রশিক্ষন দেওয়া হয়ে থাকে।

ভারতের এই ধরণের বেশ কয়েকটি শহর গড়ে উঠেছে, যেমন – পোর্ট ব্লেয়ার (আন্দামান), বিশাখাপত্তনম, কোচি, আম্বালা, জব্বলপুর, মেরুট, যোধপুর ও পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুর। 

পর্যটন শহর –  মানুষ তার অবসর সময় আনন্দের মাধ্যমে উপভোগ করার জন্য উদ্দেশ্যে কোন প্রাকৃতিক বা  ঐতিহ্যবাহী স্থানে গমন করে অর্থাৎ মানুষ ভ্রমনের উদ্দেশ্যে যে সমস্ত জায়গায় ভিড় করে সেখানে পর্যটন কে কেন্দ্র করে যে শহর গুলির বিকাশ ঘটে তাকে পর্যটন শহর বলে। সাধারনত এই শহর গুলি কোন ঐতিহাসিক স্থান, সমুদ্র তীর, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা কোন স্থাপত্য শিল্প কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে দেখা যায়। যেমন – ভারতের দার্জিলিং, সিমলা,মানালি, শ্রীনগর, নৈনিতাল প্রভৃতি শহর। 

সাংস্কৃতিক শহর – যে সমস্ত শহরে সাংস্কৃতিক কার্যাবলির প্রাধান্য দেখা যায়। যেমন শিক্ষা, সংস্কৃতি, চিত্রকলা, স্থাপত্য, চলচ্চিত্রের পীঠস্থান গুলি এই ধরণের শহর বিকাশে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভাড, ভারতের শান্তিনিকেতন। আবার  চলচ্চিত্র উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া। 

Leave a Comment