ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদের শ্রেনীবিভাগ – ভারতের বনভূমি

ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদের শ্রেনীবিভাগ – ভারতের বনভূমি: প্রকৃতির বুকে স্বাভাবিক ভাবে যে সমস্ত উদ্ভিদ জন্মায় তাদের স্বাভাবিক উদ্ভিদ বলে। ভারতের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার তারতম্য অনুসারে বিভিন্ন প্রজাতির স্বাভাবিক উদ্ভিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তাই ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদের শ্রেনীবিভাগ করা খুবই কঠিন কাজ।

বিভিন্ন উদ্ভিদবিদ ও বাস্তুবিদ বিভিন্ন সময়ে ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদের শ্রেনীবিভাগের চেষ্টা করেন। H.G. Champion 1936  সালে ভারতে ১১৬ রকমের স্বাভাবিক উদ্ভিদ শনাক্ত করেন এবং সেগুলি বেশ কয়েকটি উপবিভাগে বিভক্ত করেন। G.S. Puri (1960), Legris (1963), Champion & S.K. Seth (1968), এবং S.S. Negi (1990) এই সমস্ত বিশেষজ্ঞ দের শ্রেনীবিভাগের ওপর নির্ভর করে ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদ কে ৫ টি প্রধান ভাগে এবং ১৬ টি উপবিভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রধান ৫ টি শ্রেনী সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হল।

১. ক্রান্তীয় আর্দ্র চিরহরিৎ অরণ্য 

অবস্থানঃ পশ্চিমঘাট পর্বতের পশ্চিম অংশ, আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, ঊর্ধ্ব আসাম, পূর্ব হিমালয়ের নিম্নাংশে ও হিমালয়ের পাদদেশ অঞ্চলে এই ধরণের অরন্য দেখা যায়। 

জলবায়ুঃ অধিক বৃষ্টিপাত (২০০-৩০০ সেমির বেশি), অধিক উষ্ণতা (২৫-২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ও অধিক আর্দ্রতা যুক্ত জলবায়ু অঞ্চলে চিরহরিৎ অরণ্য সৃষ্টি হয়। 

প্রধান উদ্ভিদঃ শিশু, গর্জন, রোডউড, মেহগিনি, রাবার, আবলুস, বাঁশ, আয়রন উড প্রভৃতি এই অরন্যের প্রধান উদ্ভিদ গোষ্ঠী। অরন্যের বৈশিষ্ট্যঃ এই অরণ্যের গাছ গুলি পরস্পরের সন্নিকটে অবস্থান করায় বনভূমি খুবই ঘন হয়, এই বনভূমির গাছের পাতা গুলি বৃহৎ আকৃতির হওয়ায় ও সারা বছর পাতা থাকে বলে একে চিরহরিৎ অরণ্য বলে, এই অরন্যের গাছ গুলির কাঠ খুব শক্ত, ভারী ও মজবুত হয় বলে এর বানিজ্যিক মূল্য খুব বেশি। 

২. ক্রান্তীয় আর্দ্র পর্নমোচী অরণ্য

অবস্থানঃ হিমালয়ের পাদদেশে তরাই ও ডুয়ার্স অঞ্চল, ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চল, অসম সমভূমি, মধ্য ও নিম্নগঙ্গা সমভূমি, ওড়িশা মালভূমি ও উপকূল অঞ্চল, দাক্ষিনাত্য মালভূমির বিভিন্ন অংশে এই বনভূমি দেখা যায়। 

জলবায়ুঃ মাঝারি বৃষ্টিপাত (১০০-১৫০ সেমি), অধিক উষ্ণতা ( ২৬-২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ও মাঝারি আর্দ্রতার জন্য শীতকালে গাছের পাতাগুলি ঝরে পড়ে। এই জন্য এই বনভূমিকে পর্নমোচী মৌসুমি বনভূমি বলা হয়। 

প্রধান উদ্ভিদঃ শাল, সেগুন, শিরীষ, পলাশ, মহুয়া, চন্দন, অর্জুন, তুঁত, শিমুল প্রভৃতি এই বনভূমির প্রধান বৃক্ষ। ভারতের ক্রান্তীয় আর্দ্র পর্নমোচী অরন্যের পরিমান সবচেয়ে বেশি প্রায় ৩৭%। 

৩. ক্রান্তীয় শুষ্ক পর্নমোচী অরণ্য

অবস্থানঃ পশ্চিমঘাট পর্বতের বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চল, মধ্য ভারতের উচ্চভূমি, আরাবল্লী পর্বতের পূর্বাংশ, উচ্চ গঙ্গা ও শতদ্রু সমভূমি অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন ভাবে এই বনভূমি দেখা যায়।

জলবায়ুঃ এই অঞ্চলে স্বল্প বৃষ্টিপাত (৫০-১০০ সেমি), অধিক উষ্ণতা (২৮-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ও স্বল্প আর্দ্রতা (৪০-৫০%) জলবায়ু দেখা যায়। 

প্রধান উদ্ভিদঃ এই বনভূমি অঞ্চলে সাবাই ঘাস, পলাশ, কুল, শিরীষ, আম, জাম প্রভৃতি গাছের উপস্থিতি দেখা যায়। মূলত এই অঞ্চলকে সাভানা তৃনভূমি অঞ্চল বলা হয়। 

৪. ক্রান্তীয় কাঁটা ঝোপের অরণ্য

অবস্থানঃ রাজস্থান, কচ্ছ ও কাথিয়াবাড় উপদ্বীপে, দাক্ষিনাত্য মালভূমির বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চলে শুষ্ক কাঁটাযুক্ত ঝোপ ও গুল্ম জন্মাতে দেখা যায়। 

জলবায়ুঃ এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমান ৫০ সেমির কম, অধিক উষ্ণতা (৩৫-৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ও অতি স্বল্প আর্দ্রতার জন্য উদ্ভিদের কাণ্ড ও কাঁটা মোমযুক্ত পদার্থ দ্বারা আবৃত থাকে। 

প্রধান উদ্ভিদঃ বাবলা, খেজুর, মনিমনসা, তাল, বেরি প্রভৃতি কাঁটাযুক্ত বৃক্ষ, গুল্ম ও ঘাস এই অঞ্চলের প্রধান বৃক্ষ। মরু ও মরুপ্রায় অঞ্চলে এরূপ উদ্ভিদ কে জেরোফাইট বলে। এই অরণ্য ভারতের প্রায় ২.৬% অঞ্চল জুড়ে অবস্থান করছে। 

৫. পার্বত্য অঞ্চলের অরণ্য

পার্বত্য অঞ্চলের বনভূমি প্রধানত উচ্চতা ও বৃষ্টিপাতের তারতম্যে গড়ে ওঠে। ভারতের পার্বত্য বনভূমিকে দুভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। 

I] দক্ষিণ ও মধ্য ভারতের পার্বত্য বনভূমি – দক্ষিণ ও মধ্য ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বত, নীলগিরি ও পালনি পাহাড়, বিন্ধ্য, সাতপুরা, মহাদেব, মহাকাল প্রভৃতি পর্বতের ১০০০ থেকে ১৫০০ মিটার উচ্চতায় চিরহরিৎ বনভূমি, ১৫০০ মিটারের অধিক উচ্চতায় আর্দ্র নাতিশীতোষ্ণ বনভূমি দেখা যায়। এই বনভূমিকে শোলা বনভূমি বলা হয়। লরেন্স, রডোডেনড্রন, এলম প্রভৃতি এই বনভূমির প্রধান বৃক্ষ। 

II] হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের বনভূমি – হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন অংশে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও উচ্চতার তারতম্যে নানা ধরনের উদ্ভিদ জন্মায়। পূর্ব হিমালয় ও পশ্চিম হিমালয়ে এই কারণে বনভূমির বেশ পার্থক্য দেখা যায়। যেমন – 

  • পাদদেশ থেকে ১০০০ মিটার পর্যন্ত উচ্চতায় পূর্ব হিমালয়ে শাল, সেগুন, গর্জন, বাঁশ প্রভৃতি পর্নমোচী ও চিরহরিৎ বৃক্ষের মিশ্র অরণ্য এবং পশ্চিম হিমালয়ে ঘাস ও পর্নমোচী বৃক্ষের গুল্ম ও শুষ্ক অরণ্য দেখা যায়। 
  • পূর্ব হিমালয়ে ১০০০ থেকে ৩০০০ মিটার উচ্চতায় ওক, চেষ্টনাট, অ্যাশ, বীচ প্রভৃতি চিরহরিৎ বনভূমি এবং পশ্চিম হিমালয়ের ১০০০ থেকে ২০০০ মিটার উচ্চতায় চির ও পাইনএর পর্নমোচী বনভূমি দেখা যায়। 
  • পূর্ব হিমালয়ের ৩০০০ থেকে ৪০০০ মিটার উচ্চতায় এবং পশ্চিম হিমালয়ের ২০০০ থেকে ৩০০০ মিটার উচ্চতায় স্প্রূস, ফার, সিডার, পাইন প্রভৃতি বৃক্ষের বনভূমি দেখা যায়।  
  • পূর্ব হিমালয়ের ৪০০০ থেকে ৫০০০ মিটার উচ্চতায় এবং পশ্চিম হিমালয়ের ৩০০০ থেকে ৫০০০ মিটার উচ্চতায় বার্চ, পাইন, রডোড্রেনড্রন প্রভৃতি আল্পীয় বনভূমি জন্মায়। 

এছাড়া ভারতে আরো এক প্রকারের বনভূমি দেখা যায়, যাকে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ অরণ্য বলে। 

৬. উপকূলীয় বনভূমি বা ম্যানগ্রোভ অরণ্য 

অবস্থানঃ গঙ্গা, গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী নদীর বদ্বীপ অঞ্চলে, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের উপকূলভাগে জোয়ার-ভাটা অধ্যুষিত লবনাক্ত মাটিতে এই ধরণের উদ্ভিদ জন্মায়। 

জলবায়ুঃ অধিক উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাতের প্রভাবে এই বনভূমির বিকাশ ঘটে। 

প্রধান উদ্ভিদঃ সুন্দরী, গরান, গেওয়া, কেওড়া, গোলপাতা, পশুর, আগর, হোগলা প্রভৃতি এই বনভূমির প্রধান উদ্ভিদ। সমুদ্র ও নদী তীরবর্তী অঞ্চলে জোয়ারের জলের ওঠা নামা এবং কর্দমাক্ত লবনাক্ত মাটিতে উদ্ভিদ্গুলি টিকে থাকার জন্য অনেক উদ্ভিদের শ্বাসমূল ও ঠেসমূল দেখা যায়। ভারতের প্রায় ০.৬% বনভূমি এই প্রকৃতির। 

  • বর্তমানে ভারতের মোট অরন্যের পরিমান ২১.৬৭% (২০১৯)। 
  • আয়তনের দিক থেকে মধ্যপ্রদেশে অরন্যের পরিমান সব থেকে বেশি, তারপর অরুনাচল প্রদেশ, ছত্তিসগড়, ওড়িশা ও মহারাষ্ট্র।
  • শতকরা হিসাবে অরণ্য আচ্ছাদনে মিজোরাম রাজ্য প্রথম । মিজোরামে প্রায় ৮৫.৪১% ভূমি অরণ্য দ্বারা আবৃত। এরপর অরুনাচল প্রদেশ (৭৯.৬৩%), মেঘালয় (৭৬.৩৩%), মনিপুর (৭৫.৪৬ %) এবং নাগাল্যান্ড (৭৫.৩১%)।
  • ভারতে মোট ম্যানগ্রোভের পরিমান – ৪৯৭৫ বর্গকিমি
  • ভারতের অরণ্য গবেষনা কেন্দ্র অবস্থিত দেরাদুনে। 
  • ভারতের প্রথম জাতীয় অরণ্য হল উত্তরাখণ্ডের জিম করবেট ন্যাশনাল পার্ক। 
  • জাতীয় অরন্যের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি মধ্যপ্রদেশে। 

Leave a Comment