জনসংখ্যা বিবর্তন তত্ত্ব – Demographic Transition Theory

জনসংখ্যা বিবর্তন তত্ত্ব – Demographic Transition Theory: জনসংখ্যার বিবর্তন বা পরিবর্তন বলতে সাধারণত কোন দেশের জনসংখ্যা পরিবর্তনের ক্রমপর্যায়কে বোঝায়, যা ওই দেশের মানুষের জন্ম, মৃত্যু ও পরিব্রাজনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় এবং ওই দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা প্রতিফলনে সক্ষম হয়।

জনসংখ্যা বিবর্তন তত্ত্ব 

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে অর্থনৈতিক উন্নতির সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ন। এই সম্পর্কে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ওয়ার্নার থম্পসন ১৯২৯ সালে জনসংখ্যা বিবর্তন তত্ত্বটি পেশ করেন। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যুগ পরিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে, এর কারণ হিসাবে ট্রেওয়ার্থা মানুষের দুটি প্রকৃতির কথা উল্লেখ করেন।

১. জৈবিক ভাবে মানুষ সব জায়গায় একই রকম

২. সাংস্কৃতিক ভাবে পৃথিবীর একজায়গার মানুষ অন্য জায়গার থেকে আলাদা

মানুষের এই সাংস্কৃতিক পার্থক্যের জন্য বিভিন্ন জায়গায় জন্মহারের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় এবং এর ফলই হল জনসংখ্যা বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়। 

থম্পসন (১৯২৯) ও নটেস্টেন  (১৯৪৫) জনসংখ্যা বিবর্তন তত্ত্বকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করেন। 

কার্ল সাক্স জনসংখ্যা বিবর্তনের পর্যায় গুলিকে চারটি পর্যায়ে বিভক্ত করেন। তবে বর্তমানে অতিরিক্ত আর একটি পর্যায়ের উপস্থিতি দেখা যায়। 

জনসংখ্যা বিবর্তন তত্ত্বের বিভিন্ন পর্যায় গুলি হল:

প্রথম পর্যায় – প্রথম পর্যায়ে জন্ম ও মৃত্যুহার ছিল প্রতি হাজারে ৩৫ জনেরও বেশি। মূলত কৃষি নির্ভর, অশিক্ষিত, অনুন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যুক্ত সমাজ ব্যবস্থায় এরুপ উচ্চ জন্ম ও মৃত্যু হার দেখা যেত। 

প্রথম পর্যায়ের বৈশিষ্ট্য গুলি হল 

১. জন্ম ও মৃত্যহার খুব বেশি (৩৫ জন/১০০০)

২. অশিক্ষা, গর্ভনিরোধক ব্যবস্থার অভাব, শিশু মৃত্যুর হার বেশি হওয়ায় বেশি সংখ্যাক সন্তান ধারনের প্রবনতা, কৃষি কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিকের জোগানের জন্য বেশি সন্তান গ্রহন প্রভৃতি কারণে জন্মহার ছিল খুব বেশি।

৩. অপুষ্টি, অনাহার, দূর্ভিক্ষ, মহামারি প্রভৃতি কারণে মৃত্যুহারও ছিল অনেক বেশি। 

৪. কৃষিনির্ভর দূর্বল অর্থনৈতিক সমাজ ব্যবস্থা।

৫. জন্মহার ও মৃতুহার উভয়ই অধিক হওয়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল খুবই কম, মোট জনসংখ্যার স্থিতাবস্থা দেখা যায়। 

প্রথম পর্যায়ের জনসংখ্যা পিরামিডের বৈশিষ্ট্য 

এই পর্যায়ে জন্মহার বেশি হওয়ায় জনসংখ্যা পিরামিডের ভীত বা তলদেশ হয় চওড়া বা বিস্তৃত এবং অনুন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য মানুষের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ছিল খুবই কম, তাই ৬০ বছর বয়সে পৌছানোর আগেই অনেক মানুষ মারা যেত, তাই জনসংখ্যা পিরামিডের উপরিভাগ ছিল সংকীর্ন। এই পর্যায়ে জনসংখ্যা পিরামিড গুলি দেখতে অনেকটা অবতল আকৃতির মতো। 

উদাহরণ – পৃথিবীর প্রায় সব দেশ এক সময় এই পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে, বর্তমানে আফ্রিকার কয়েকটা দেশ ব্যতিত আর অন্য কোন দেশ এই পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। আফ্রিকা মহাদেশের নাইজার, গ্যাবন, জাম্বিয়া ও সোয়াজিল্যান্ড এই পর্যায়ের অন্তর্গত। ভারত ১৯২১ সাল পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে ছিল। 

দ্বিতীয় পর্যায় –  দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রথম দিকে কৃষি নির্ভর অর্থনীতি থাকলেও শেষের দিকে ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হওয়ায় কৃষি নির্ভর সমাজ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে শিল্পভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় পরিনত হয়। ফল স্বরূপ চিকিৎসা ব্যবস্থা ও মানুষের জীবন ধারনের মান উন্নত হতে থাকে। 

দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রথম দিকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির ফলে মৃত্যুহার কমতে থাকে এবং জন্মহার একই ভাবে বাড়তে থাকে। এই সময় জন্মহার ছিল ৩৫ জন /১০০০ এবং মৃত্যুহার ছিল ১৫ জন/১০০০ ।

বৈশিষ্ট্য 

১. উচ্চ জন্মহার ও নিম্নমুখী মৃত্যুহার 

২. শিল্পনির্ভর সমাজ ব্যবস্থার বিকাশ ঘটায় জনগনের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটায় জীবনমাত্রার মানের বিকাশ ঘটে  ও সঙ্গে সঙ্গে কৃষি ব্যবস্থারও উন্নতি হওয়ায় অনাহার ও অপুষ্ঠি জনিত কারণে মানুষের মৃত্যুহার কমতে থাকে। আবার চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি মহামারি জনিত মৃত্যুহার হার কেও অনেক টা কমিয়ে দেয়। 

৩. অন্যদিকে শিক্ষার প্রসার তেমন ভাবে না হওয়ায় মানুষের মধ্যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন মূলক সচেতনার অভাব পরিলক্ষিত হয়, যেমন – গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা ব্যবহার, ক্ষুদ্র পরিবারের সুবিধা প্রভৃতি কারণে মৃতুহার ছিল আগের মতোই অনেক বেশি। 

৪. জন্মহার ও মৃতুহারের মধ্যে পার্থক্য বৃদ্ধি পাওয়ায় জনসংখ্যা বিবর্তনের এই পর্যায়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল সবচেয়ে বেশি। তাই জনসংখ্যা অতি দ্রুত বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায় এই পর্যায়ে। 

দ্বিতীয় পর্যায়ের জনসংখ্যা পিরামিডের বৈশিষ্ট্য 

এই পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় মানুষের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল প্রথম পর্যায়ের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় জনসংখ্যা পিরামিডের উচ্চতা সামান্য বৃদ্ধি পেলেও উপরিভাগ থাকে সংকীর্ন এবং জন্মহার পূর্বের মতো বেশি হওয়ায় তলদেশ হয় চওড়া। তাই এই স্তরের জনসংখ্যা পিরামিড গুলি ত্রিভুজাকৃতি হয়।

উদাহরণ – ভারত, বাংলাদেশ, ইরান, মিশর, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ বর্তমানে জনসংখ্যা বিবর্তনের এই পর্যায়ে অবস্থিত। ভারতবর্ষ বর্তমানে জনসংখ্যা বিবর্তন তত্ত্বের দ্বিতীয় পর্যায়ের শেষের দিকে অবস্থিত। 

তৃতীয় পর্যায় – আর্থিক সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি, শিক্ষিত সচেতন সমাজ, চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি, জীবনধারনের মান উন্নয়ন, মহিলাদের চিন্তাভাবনা পরিবর্তন প্রভৃতি কারণে জন্মহার হ্রাস পায় এবং মৃত্যুহারও একই ভাবে হ্রাস পেতে থাকে।

বৈশিষ্ট্য 

১. এই পর্যায়ে জন্মহার ছিল নিম্নমুখী এবং মৃত্যুহার ছিল সর্বনিম্ন।

২. চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি ঘটায় মৃত্যুহার হ্রাস পেয়ে প্রতি হাজারে ১০ জনে নেমে আসে। 

৩. শিক্ষা, সচেতনতা, গর্ভ নিরোধক ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ব্যবহার ও নারী স্বাধীনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পর্যায়ে এসে জন্মহার অতি দ্রুত হারে কমতে থাকে এবং এই সময় জন্মহার হয় প্রতি হাজারে ২০ জন। 

৪. জন্মহার ও মৃত্যুহারের মধ্যে পার্থক্য হ্রাস পাওয়ায় এই পর্যায়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও কমতে থাকে।  

৫. শহরকেন্দ্রিক শিক্ষিত সমাজ ব্যবস্থার প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। 

৬. শিল্প ও বানিজ্যিক ভিত্তিক অর্থনীতির প্রাধান্য দেখা যায় এই পর্যায়ে।

তৃতীয় পর্যায়ের জনসংখ্যা পিরামিডের বৈশিষ্ট্য 

এই পর্যায়ের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি এবং কৃষি ও শিল্পেরও যথেষ্ট বিকাশ ঘটায় মানুষের মৃত্যুহার কমে যায় ও প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পায়, তাই পিরামিডের গুলির মধ্য ও উপরিভাগ প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের তুলনায় বেশি চওড়া ও উঁচু হয় এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে জন্মহারও নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় পিরামিডের তলদেশও ক্রমশ সংকীর্ন হতে থাকে, তাই এই স্তরের পিরামিড গুলি উত্তল আকৃতির দেখতে হয়। 

উদাহরণ – বর্তমানে দক্ষিণ আমেরিকা ব্রাজিল, উত্তর আমেরিকার মেক্সিকো, আফ্রিকার মিশর, এশিয়ার চীন এই পর্যায়ের অন্তর্গত। 

চতুর্থ পর্যায় –অতি উন্নত আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা যুক্ত দেশ যেখানে জন্মহার ও মৃত্যুহার উভয়ই অনেক কম সেই সমস্ত দেশ জনসংখ্যা বিবর্তনের এই পর্যায়ে অবস্থিত। 

বৈশিষ্ট্য 

১. এই পর্যায়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল অতি নিম্ন জন্মহার ও অতি নিম্ন মৃত্যুহার

২. অতি আধুনিক জীবনযাপন, মেয়েদের কর্মসংস্থানের সুযোগ, স্বাধীন চেতা মনোভাব ও দেশের প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রভৃতি কারনের জন্য জন্মহার হ্রাস পেতে পেতে সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। 

৩. অতি নিম্ন মৃত্যুহার অতি উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সূচিত করে। 

৪. মৃত্যুহার ও জন্মহার প্রায় সমান হয় বলে জনসংখ্যার বৃদ্ধি প্রায় হয় না বললেই চলে। 

৫. জীবনযাত্রার উচ্চ মান লক্ষ্য করা যায়। 

৬. এই পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত দেশ গুলিতে জনসংখ্যার শূন্য বৃদ্ধি দেখা যায়।

চতুর্থ পর্যায়ের জনসংখ্যা পিরামিডের বৈশিষ্ট্য 

জন্ম ও মৃত্যু দুটোই কম হওয়ায় জনসংখ্যা পিরামিডের তলদেশ, মধ্যভাগ ও উপরিভাগের বিস্তৃতি প্রায় সমান হয় এবং এই পিরামিড টি দেখতে বেল বা ঘন্টা আকৃতির হয়। 

উদাহরন – আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য প্রভৃতি 

পঞ্চম পর্যায় – যে সমস্ত দেশে জন্মহার মৃতুহারের থেকে কম হয়, সেই সমস্ত দেশ গুলি এই পর্যায়ে অন্তর্গত। এই পর্যায়ের অন্তর্গত দেশ গুলির বৈশিষ্ট্য 

১. মৃত্যুহার অনেক কম কিন্তু মৃতুহারের থেকে জন্মহার আরো কম।

২. জন্মহার মৃত্যুহারের থেকে কম হওয়ায় জনসংখ্যার ঋনাত্মক বৃদ্ধি দেখা যায়। 

৩. গর্ভ নিরোধকের ব্যবহার, গর্ভপাত কে আইনত স্বীকৃতি প্রদান, সমাজে নারীদের পুরুষ দের সমান মর্যাদা প্রদান, অধিক সন্তানের জন্মদান অর্থাৎ অধিক ব্যয়, সমকামী বিবাহ প্রভৃতি কারণ জনিত কারণে এই সমস্ত দেশ গুলিতে জন্মহার অনেক সময় মৃত্যুহারের থেকে কমে যায়। 

৪. সব সময় জন্মহার মৃত্যুহারের হারের থেকে কম থাকে না বলে এটি একটি অস্থায়ী পর্যায়। 

পঞ্চম পর্যায়ের জনসংখ্যা পিরামিডের বৈশিষ্ট্য

এই পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত দেশ গুলিতে মানুষের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল অনেক বেশি হওয়ায় জনসংখ্যা পিরামিডের উপরিভাগ ও মধ্যভাগ বেশ চওড়া হয় কিন্তু জন্মহার মৃত্যুহারের থেকে কম তলদেশের বিস্তৃতি পিরামিডের মধ্যভাগ ও উপরিভাগ থেকে কম হয় অর্থাৎ পিরামিড গুলি দেখতে ন্যাসপাতি আকৃতির হয়ে থাকে। 

উদাহরন – জার্মানি, জাপান প্রভৃতি দেশ জনসংখ্যা বিবর্তনের এই পর্যায়ে অবস্থিত।  

Leave a Comment