কর্মধারার ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের পৌর বসতির পরিচয় দাও।

কর্মধারার ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের পৌর বসতির পরিচয় দাও। অথবা, পৌর বসতির কর্মধারা আলোচনা করো। অথবা, শহরের কর্মভিত্তিক শ্রেণীবিভাগ করো।

কোন পৌর বসতির কার্যাবলী তার আপেক্ষিক সুবিধা ও অসুবিধার ওপর নির্ভরশীল। প্রধানত, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, খনিজ দ্রব্য আহরণ এবং পরিষেবা ভিত্তিক কাজকর্মের আধার হলো এই পৌর বসতি। পৌরবসতির এই কাজকর্মের দ্বারা পার্শ্ববর্তী, শহরতলী গ্রামাঞ্চল প্রভাবিত ও উপকৃত হয়। পৌর বসতির কাজকর্মের প্রভাব পার্শ্ববর্তী এলাকায় যতদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে সেই বিস্তীর্ণ ও পুর প্রভাবিত এলাকাকে Omland বা Umland বা Hinterland বা Urban Field বলে। ব্যবসা বাণিজ্যই পৌরবসতির প্রধান কাজ হলেও ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়াও প্রতিটি পৌর বসতি বা শহরের কতগুলি সুনির্দিষ্ট কার্যাবলী থাকে, যা তাদের প্রত্যেককে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রদান করে। এই বিভিন্ন প্রকার মুখ্য কার্যাবলীর উপর নির্ভর করে পৌর বসতিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-

১)প্রশাসনিক শহর-প্রশাসনিক কাজকর্মকে কেন্দ্র করে যেসব শহর গড়ে ওঠে, তাদের প্রশাসনিক শহর বলা হয়। এই ধরনের শহর শুধু দেশের রাজধানী নয়, রাজ্য, জেলা প্রশাসনিক বিভাগের কেন্দ্রস্থলও হতে পারে। এই ধরনের শহরে প্রশাসনিক ভবন, সরকারি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, প্রধান আদালত, মুখ্য ডাকঘর ইত্যাদি থাকে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ, জল সরবরাহ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়।

উদাহরণ-ভারতের নতুন দিল্লি, ফ্রান্সের প্যারিস, অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা ইত্যাদি।

২)শিল্প শহর-ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহদাকৃতির বিভিন্ন শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শহরকে শিল্প শহর বলে। যেসব শহরের কার্যাবলীর মধ্যে যন্ত্রের সাহায্যে শিল্পজাত পণ্য উৎপাদন করা হয় প্রধান কাজ, সেই সমস্ত শহরগুলি এই পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। শিল্প বিপ্লবের সময় এই শহরগুলির সংখ্যা দ্রুত হারে বৃদ্ধি পায়।

উদাহরণ-ভারতের ইস্পাত নগরী জামশেদপুর, ভারতের রূঢ় দুর্গাপুর, ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ার ইত্যাদি।

৩)বন্দর শহর-বন্দর ও বন্দর ভিত্তিক শিল্পকর্ম এবং অন্যান্য কাজকর্মকে কেন্দ্র করে যে শহর বা নগরের সৃষ্টি হয়, তাকে বন্দর শহর বলে। এই ধরনের শহরের মুখ্য কার্যাবলী হলো পণ্য পরিবহন এবং আমদানি ও রপ্তানি কৃত পণ্য সমুহের বন্টন।

উদাহরণ-ভারতের বিশাখাপত্তনম, জাপানের টোকিও ইত্যাদি।

৪)বাণিজ্য শহর-পাইকারি ও খুচরা বেচাকেনা, গুদাম ঘর এবং বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কাজকর্মকে কেন্দ্র করে যে শহর গড়ে উঠে, তাকে বাণিজ্য শহর বলে। এই ধরনের শহরে কৃষি বিপনন কেন্দ্র, ব্যাংক ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কেন্দ্র, অন্তর্দেশীয় বাণিজ্যকেন্দ্র ইত্যাদি থাকে।

উদাহরণ-ভারতের মুম্বাই, ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার, নেদারল্যান্ডের আমস্টারডাম ইত্যাদি

৫)প্রতিরক্ষা শহর-প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কাজকর্মের উপর ভিত্তি করে যে শহর গড়ে ওঠে, তাকে প্রতিরক্ষা শহর বলে। এই ধরনের শহরে সেনাবাহিনী থাকার ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, বিমান অবতরণ ক্ষেত্র, যুদ্ধজাহাজের জন্য পোতাশ্রয় ইত্যাদি থাকতে পারে। এই ধরনের শহর দুর্গ শহর, গ্যারিসন শহর ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে।

উদাহরণ-ভারতের পাঁচমারি, কলাইকুন্ডা, ব্যারাকপুর; ফ্রান্সের তুঁলো ইত্যাদি।

৬)সাংস্কৃতিক শহর-শিক্ষা, সংগীত কলা, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা, সম্মেলন ইত্যাদি মানব সংস্কৃতির অসংখ্য কাজকর্মকে কেন্দ্র করে যে শহরের উদ্ভব ঘটে, তাকে সাংস্কৃতিক শহর বলে। এই ধরনের শহরগুলিতে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রন্থাগার, খেলার মাঠ, প্রেক্ষাগৃহ ইত্যাদি দেখতে পাওয়া যায়।

উদাহরণ-ভারতের শান্তিনিকেতন, ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড ও ক্রেমব্রিজ, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের হলিউড, শিকাগো ইত্যাদি।

৭)সংগ্রহ ভিত্তিক শহর-খনিজ সম্পদ উত্তোলন, মৎস্য সংগ্রহ, বনজ সম্পদ সংগ্রহ ইত্যাদি কাজকর্মকে কেন্দ্র করে যেসব শহর গড়ে ওঠে, তাদের সংগ্রহ ভিত্তিক শহর বলে। এই ধরনের শহর আবার বিভিন্ন প্রকারের হয়।যেমন-

অ)খনি শহর-খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও এ সংক্রান্ত কাজকর্মকে কেন্দ্র করে খনি শহর গড়ে ওঠে।যেমন-ধানবাদ (কয়লা), ঘাটশিলা (তামা), কালগুর্লি (সোনা) ইত্যাদি।

আ)মৎস্য সংগ্রহ শহর-এই ধরনের শহরে মৎস্য শিকার এবং নৌকা তৈরি, মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ ইত্যাদি কাজকর্ম হয়ে থাকে। যেমন-কোচিন, হ্যালিফস্ক ইত্যাদি।

ই)কাষ্ঠ সংগ্রহ শহর-এই ধরনের শহর বিভিন্ন স্থান থেকে কাষ্ঠ সংগ্রহকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।যেমন-পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের সাভালকারা, মায়ানমারের আর্কিন ইত্যাদি।

৮)ধর্মীয় শহর-ধর্মীয় কাজকর্মকে ভিত্তি করে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের তীর্থস্থান হিসেবে যে শহর গড়ে, তাকে ধর্মীয় শহর বলা হয়।

উদাহরণ-ভারতের তিরুপতি, বারাণসী; ইজরায়েলের জেরুজালেম এবং ভাটিকান সিটি ইত্যাদি।

৯)বসত শহর-কেবলমাত্র বাসস্থানের জন্য গড়ে ওঠা শহরকে বসত শহর বলা হয়।

উদাহরণ-ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সল্টলেক সিটি, কল্যাণী, বরাহনগর ইত্যাদি।

১০)বিনোদন ও পর্যটন শহর-বিনোদন, আমোদ-প্রমোদ ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত শহরগুলি এই শ্রেণীর অন্তর্গত। প্রধানত সমুদ্রতীর, উষ্ণ ও শীতল প্রস্রবণ, ক্রীড়াকেন্দ্র, আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কে কেন্দ্র করে এই ধরনের শহরগুলি গড়ে ওঠে।

উদাহরণ-ভারতের হিমাচল প্রদেশের সিমলা, পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং ও দীঘা ইত্যাদি।

Leave a Comment