মৌসুমি বায়ুর উপর জেট বায়ুর প্রভাব

মৌসুমি বায়ুর উপর জেট বায়ুর প্রভাব: ৫ ডিগ্রি থেকে ৩০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত ভারতে মৌসুমি বায়ুর প্রভাব লক্ষ্য করা যায় এবং এই মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ভারতে যে জলবায়ু লক্ষ্য করা যায় তাকে মৌসুমি জলবায়ু বলে। প্রতি বছর ভারতে গ্রীষ্ম ও শীতকালে বিপরীত দিক থেকে ভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন মৌসুমি বায়ুর প্রবাহ হয়ে থাকে যা এই মৌসুমি জলবায়ুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।  ভারতে এই মৌসুমি বায়ুর সৃষ্টি সম্পর্কে বিভিন্ন তত্ত্ব প্রচলিত থাকলেও সবচেয়ে আধুনিক তত্ত্ব গুলির মধ্যে অন্যতম হল জেট স্ট্রিম তত্ত্ব। ভারতে মৌসুমি বায়ুর উপর জেট বায়ু গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। 

জেট বায়ু মৌসুমি বায়ুর উপর কীভাবে প্রভাব বিস্তার করে তা আলোচনার পূর্বে আমাদের জেট বায়ু সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক। তাই আমরা প্রথমে ‘জেট বায়ু কী’ সে সম্পর্কে জানব এবং তারপর জেট বায়ুর ভূমিকা সম্পর্কে ব্যাখ্যা করবো। 

জেট বায়ু বলতে বায়ুমণ্ডলের ট্রপোস্ফিয়ারের ঊর্ধ্বসীমা বরাবর পশ্চিম থেকে পূর্বে সর্পিলাকারে প্রবাহিত দ্রুতগতি সম্পন্ন বায়ুকে বোঝানো হয়ে থাকে। প্রধানত তিন ধরণের জেট বায়ুর প্রবাহ লক্ষ্য করা যায়, যথা – মেরু জেট, উপক্রান্তীয় জেট ও ক্রান্তীয় জেট। এগুলির মধ্যে মেরু জেট ৪৫ থেকে ৬০ ডিগ্রি অক্ষাংশ বরাবর প্রবাহিত হওয়ায় মৌসুমি বায়ু সৃষ্টিতে মেরু জেটের কোন ভূমিকা থাকে না। কিন্তু অপর দুটি জেট অর্থাৎ উপক্রান্তীয় জেট যা ৩০ ডিগ্রি অক্ষাংশ বরাবর সারা বছর ধরে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয় এবং ক্রান্তীয় পূর্বালি জেট যা মূলত গ্রীষ্মকালে ভারতীয় উপদ্বীপে (১৫ ডিগ্রি অক্ষাংশ বরাবর) আবির্ভূত হয়, অন্যান্য সময় এই জেট বায়ুর কোন অস্তিত্ব  থাকে না বলে, একে একটি অস্থায়ী জেট বলা হয়। এই দুটি জেট ভারতে মৌসুমি বায়ুর সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে।  

শীতকালে অর্থাৎ নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে উপক্রান্তীয় জেট ভারতীয় ভূখণ্ডের গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের উপর দিয়ে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়। কিন্তু সূর্যের উত্তরায়ণের সাথে সাথে এই উপক্রান্তীয় পশ্চিমা জেট ক্রমশ উত্তর দিকে সরতে থাকে এবং জুন-জুলাই মাসে এটি হিমালয় পর্বত অতিক্রম করে হিমালয়ের উত্তর প্রান্তে অবস্থান করে। উপক্রান্তীয় জেটের এই উত্তরমুখী সরণ ভারতে মৌসুমি বায়ুর আগমনের পথ কে সুগম করে। উপক্রান্তীয় জেটের উত্তরমুখী সরণ নির্ভর করে গ্রীষ্মকালীন তিব্বত মালভূমির উষ্ণতার উপর। যে বছর তিব্বত মালভূমি পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের থেকে বেশি উষ্ণ হয়ে পরে সেই বছর গুলিতে উপক্রান্তীয় জেট হিমালয়ের উত্তর দিকে সরে গিয়ে দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আগমনকে সুনিশ্চিত করে এবং যেবছর গুলিতে গ্রীষ্মকালে হিমালয়ে সঞ্চিত বরফ গলে না সেই বছর গুলিতে উপক্রান্তীয় জেটের উত্তরে সরন বাঁধা পায় বলে মৌসুমি বায়ু ভারতে প্রবেশ করতে পারে না বলে বৃষ্টিপাতের পরিমান হ্রাস পায়। গ্রীষ্মকালে উপক্রান্তীয় জেট ভারতীয় গাঙ্গেয় সমভূমি থেকে সরে গেলে ক্রান্তীয় জেট ভারতে প্রবেশ করে এবং ভারতীয় দক্ষিণ প্রান্ত বরাবর পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়। এই ক্রান্তীয় জেট ভারত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে অবনমিত হয়ে সেই অঞ্চলে সৃষ্ট উচ্চচাপের মাত্রাকে বৃদ্ধি করে জলভাগ ও স্থলভাগের মধ্যে প্রবল চাপ ঢাল সৃষ্টি করে ভারতে মৌসুমী বায়ুর আগমনে সাহায্য করে। যার ফলে ভারতে দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গ্রীষ্মকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। আবার নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে সূর্যের দক্ষিনায়নের সাথে সাথে ভারতে শীতের সূচনা হলে উপক্রান্তীয় জেট আবার হিমালয় পর্বত পেড়িয়ে দক্ষিণ দিকে সরে আসে ও ভারতীয় ভূখণ্ডের গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে অবস্থান করে এই অঞ্চলে উচ্চচাপ সৃষ্টিতে সাহায্য করে এবং এই উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে শীতল বাতাস উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু রূপে প্রভাবিত হতে থাকে। আর এই সময় ক্রান্তীয় পূর্বালি জেট ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে অবলুপ্ত হয়ে যায়। 

Leave a Comment