মৌসুমী বায়ুর উপর এল নিনোর প্রভাব

মৌসুমী বায়ুর উপর এল নিনোর প্রভাব: মৌসুমী বায়ুর উৎপত্তি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন – মৌসুমী বায়ুর উপর এল নিনোর প্রভাব সম্পর্কে এখানে সহজ সরল ভাষায় বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো, আশা করি ছাত্রছাত্রীদের সহযোগিতায় আসবে। সমুদ্র ও স্থলভাগের বায়ু চাপের পার্থক্য জনিত কারণে আরব সাগর থেকে ভারতীয় ভূ খন্ডের দিকে প্রতি বছর জুন জুলাই মাসে দক্ষিণ পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবাহিত বায়ু কে মৌসুমী বায়ু বলে। ভারতবর্ষের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে এই মৌসুমী বায়ুর গুরুত্ব অপরিসীম। এই মৌসুমী বায়ুর উৎপত্তি কিভাবে হয়েছে, সেই নিয়ে বিভিন্ন আবহবিদ বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেছেন। তার মধ্যে একটি হল মৌসুমী বায়ু ও এল নিনোর সম্পর্ক। মৌসুমী বায়ুর ওপর এল নিনো কিরূপ প্রভাব ফেলে সেই সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হলো। তার আগে এল নিনো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ পূর্ব উপকূলে অবস্থিত পেরু ইকুয়েডর উপকূল বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত এক প্রকার উষ্ণ সমুদ্র স্রোত। যা প্রতি 3-7 বছর অন্তর ডিসেম্বর মাসে পেরু ইকুয়েডর উপকূল বরাবর প্রবাহিত হয়ে থাকে। এল নিনো বছর গুলি বাদে সাধারন বছর গুলিতে এই উপকূলে দক্ষিণ থেকে উত্তরে একটি শীতল স্রোতের নিয়মিত প্রবাহ দেখা যায়, যা লা নিনা নামে পরিচিত। 

তাই দেখা যাচ্ছে যে যে বছর গুলিতে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব উপকূল (দক্ষিণ আমেরিকা উপকূল) বরাবর শীতল স্রোত বা লা নিনা প্রবাহিত হয় সেই বছর গুলোতে দক্ষিণ আমেরিকার এই অংশে শীতল স্রোত প্রবাহ জনিত কারনে বায়ুর উচ্চচাপ বিরাজ করায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনেক হ্রাস পায় ও খরা পরিস্থিতির বিকাশ ঘটে। কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরের বিপরীত পাশে অর্থাৎ পশ্চিম উপকূলে এই সময় নিম্ন চাপ অবস্থান করায় ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া উপকূলে প্রচুর বৃষ্টিপাত সংঘটিত হয়ে থাকে। আবার যে বছর গুলোতে পেরু উপকূল বরাবর উষ্ণ সমুদ্র স্রোত এল নিনোর আবির্ভাব ঘটে সেই বছর গুলিতে দক্ষিণ পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে উষ্ণ পরিবেশের জন্য নিম্ন চাপের সৃষ্টি হয় ও প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় কিন্তু ঠিক একই সময় পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল অঞ্চলে উচ্চ চাপের বিকাশ ঘটে ও বৃষ্টিপাত হ্রাস পায়, ফলে খরা পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে (বৃষ্টিপাত সাধারণত নিম্নচাপের সাথে সম্পর্কিত)। 

প্রশান্ত মহাসাগরের উভয় উপকূলবর্তী অঞ্চলে এল নিনোর প্রবাহ জনিত যে বায়ু চাপের অবস্থান জনিত যে বিন্যাস লক্ষ্য করা যায় তাকে সার্দান অসিলিয়েশন ইনডেক্স বা দক্ষিণী দোলন সূচক বলা হয়। এই সার্দান অসিলিয়েশন ইনডেক্স বা সূচক যে বছর গুলিতে পজেটিভ বা ধনাত্মক হয় অর্থাৎ যে বছরগুলিতে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে উচ্চ বায়ুর চাপ এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল তথা ভারত মহাসাগরে নিম্নচাপের অবস্থান দেখা যায়। ভারত মহাসাগরে পূর্বস্থিত এই শীতকালীন নিম্নচাপ গ্রীষ্মকালীন মৌসুমী বায়ুর আগমন কে অধিক সক্রিয় করতে সাহায্য করে। কিন্তু যে বছর গুলিতে ডিসেম্বর মাসে (শীতকাল) পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো জনিত নিম্নচাপ (নেগেটিভ বা ঋণাত্মক সার্দান অসিলিয়েশন ইনডেক্স বা সূচক) অবস্থান করে সেই বছর গুলিতে প্রশান্ত মহাসাগরের বিপরীত পাশে অবস্থিত ভারত মহাসাগরে শীতকালে উচ্চচাপ অবস্থান করে, যা গ্রীষ্মকালে আগত দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ুকে অনেকটা দুর্বল করে দেয় বলে ভারতে মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক টা হ্রাস পায় ও সারা দেশে খরা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে বছর গুলোতে এল নিনোর আবির্ভাব ঘটেছে সেই বছর গুলিতে ভারতে মৌসুমী বায়ুর দ্বারা বৃষ্টিপাত অনেক টা হ্রাস পেয়েছে এবং বিগত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রমাণিত হয়েছে যে এল নিনো ও মৌসুমী বায়ুর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

Leave a Comment