পরিবেশের উপর জনসংখ্যার প্রভাব আলােচনা করাে?

পরিবেশের উপর জনসংখ্যার প্রভাব আলােচনা করাে?: জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত সমস্যা গুলির মধ্যে অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ন সমস্যা হল পরিবেশের অবনমন তথা পরিবেশ দূষণ। বর্তমানে সারা পৃথিবী ব্যাপী যে সব পরিবেশ দূষণ গত সমস্যা দেখা যায় তা প্রধানত এই জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথেই সম্পর্কীত। বদ্ধিত জনসংখ্যা ও তার সাথে বিভিন্ন মনুষ্য কার্যকলাপ পরিবেশের ধারন ক্ষমতাকে অতিক্রম করে এমন এক পর্যায়ে পৌছেছে সেই ক্ষত পূরন করে কোটি কোটি মানুষের চাহিদাকে পূরন করা পরিবেশের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠছে।

জনসংখ্যার অত্যাধিক বৃদ্ধি আমাদের পরিবেশের জীবমণ্ডলের অন্তর্গত ভূমণ্ডল, বায়ুমণ্ডল ও বারিমন্ডলের উপর তথা পরিবেশের উপর কিরূপ বিরুপ প্রভাব ফেলে তা নিম্নে আলোচনা করা হল – 

পরিবেশের উপর জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাব গুলি হল 

স্থলভাগের উপর জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাব

পৃথিবীর মাত্র ২৯ % স্থলভাগ এবং এই স্থলভাগের প্রাপ্ত সম্পদের পরিমানও সীমিত। কিন্তু মানুষের অবিবেচনা প্রসূত কাজ কর্মের ফলের এই স্থলজ পরিবেশ প্রতিনিয়ত দূষিত হয়ে পড়ছে। মানুষের কার্যকলাপ স্থলভাগের উপর যে সব প্রভাব ফেলে সেগুলি হল –

ক) অরণ্য বিনাশ – মানব সভ্যতা শুরুর প্রথম দিকে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক অরণ্য দ্বারা আবৃত ছিল কিন্তু বর্তমানে খুব সামান্য অংশ অবশিষ্ট রয়ে গেছে। কেবল মাত্র বিংশ শতকেই ৯ মিলিয়ন হেক্টর অরন্য কৃষি জমি সম্প্রসারনের জন্য লোপ পেয়েছে। অনুমান করা হয় যে প্রতি বছর প্রায় ১৬ মিলিয়ন হেক্টর অরন্য মানুষের নানা রকম কার্য কলাপের ফলে ধ্বংস হছে।

খ) মৃত্তিকা ক্ষয় – জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বসত বাড়ি, কৃষি জমি সম্প্রসারণ, রাস্তা নির্মান প্রভৃতি কারনের মৃত্তিকার উপর চাপ বৃদ্ধি পাছে, যা মৃত্তিকা ক্ষয় কে ত্বরান্বিত করছে। মৃত্তিকা ক্ষয়ের ফলে মানুষের গুনগত মানের অবনমন হচ্ছে, যা মৃত্তিকা কে পতিত ভূমিতে পরিনত করছে।

গ) মৃত্তিকা দূষণ – বর্দ্ধিত জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মেটাতে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়োজন হয়। আর এই ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষি জমিতে প্রচুর পরিমানে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে মৃত্তিকা দূষণের পরিমান বাড়ছে।

ঘ) জীববৈচিত্র্যের হ্রাস – জনসংখ্যা বৃদ্ধি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে  কিছু কিছু উদ্ভিদ ও প্রানীকে বিপন্নতার মুখে ঠেলে দিছে। ফলস্বরূপ জীববৈচিত্র্যের হ্রাস পাচ্ছে।

ঙ) বিষাক্ত কঠিন বর্জ্যের পরিমান বৃদ্ধি – মানুষের ব্যবহারের ফলে উৎপন্ন কঠিন বর্জ্য পরিবেশগত নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। শিল্পাঞ্চল থেকে নির্গত কঠিন ও বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থ গুলি ব্যবস্থাপনা আজ বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চ) মরুকরণ – জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও তার ফলে অরণ্য বিনাশ, ভূমিক্ষয় ও তার সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তন মরুভূমির প্রসারে সাহায্য করছে।

বায়ুমণ্ডলের উপর জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাব

মানুষ বিভিন্ন ভাবে পরিবেশ দূষণ ঘটায়। মানুষের কাজের ফলে নির্গত বিভিন্ন উপাদান পরিবেশের সঙ্গে মিশে পরিবেশকে দূষিত করে। পরিবেশে উপস্থিত উপাদান গুলি ভারসাম্য অবস্থায় থাকে কিন্তু মানুষের দ্বারা নির্গত উপাদান গুলি বায়ুর সাথে মিশে ভারসাম্য নষ্ট করে দেয় আবার এমন কিছু উপাদান আছে যেগুলি পরিবেশে নেই কিন্তু মানুষের দ্বারা সেগুলি পরিবেশে উপস্থিতি হয়েছে।

মনুষ্যসৃষ্ট কার্যকলাপ গুলির মধ্যে শিল্পকারখানা বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন প্রকারের বায়ুদূষক নির্গমনে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

ক) গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমান বৃদ্ধি ও বিশ্ব উষ্ণায়ন – জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে শিল্পাঞ্চল, তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন , যানবাহন থেকে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিন হাউস গ্যাস বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটাচ্ছে।

খ) ওজোন স্তরের বিনাশ – পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তরের উপস্থিতি দেখা যায় যা আমাদের সূর্য থেকে নির্গত ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি থেকে আমাদের রক্ষা করে। কিন্তু বর্তমানে মনুস্য সৃষ্ট ক্লোরোফ্লুরোকার্বন এই ওজোন স্তরকে ক্ষয় করেছে ফলে অতিবেগুনি রশ্মি সহজেই পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে।

গ) অম্ল বৃষ্টির পরিমান বৃদ্ধি – শিল্পাঞ্চল গুলি থেকে নির্গত সালফার ডাই অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড বৃষ্টির জলের সাথে মিশ্রিত হয়ে অ্যাসিড বৃষ্টি রূপে ঝরে পরে, যা ভূপৃষ্টীয় জল, ভৌম জলের দূষণ ঘটায় ও অরন্যের ব্যাপক ক্ষতি করে।   

বারিমণ্ডলের উপর জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাব

মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এক অতি প্রয়োজনীয় উপাদান হল বারিমন্ডল। কিন্তু বিভিন্ন রকম দূষিত পদার্থ জলে মিশে জলকে দূষিত করে দিচ্ছে। যেমন – ড্রেনের জল, খনিজ তেল, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য প্রভৃতি সমুদ্র, নদী এমনকি ভৌম জলকেও দূষিত করে দিচ্ছে। ফলে মানুষের পানযোগ্য জলের অভাব দেখা দিচ্ছে।

Leave a Comment