ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে কল্পনা দত্তের ভূমিকা আলোচনা করো।

ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে কল্পনা দত্তের ভূমিকা আলোচনা করো।

জন্ম: ভারতে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে আদর্শবোধ ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে যারা নিজেদের জীবনকে অর্থবহ করে তুলেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন কল্পনা দত্ত। 1913 খ্রিস্টাব্দে 27শে জুলাই বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার শ্রীপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

বিপ্লবী আন্দোলনে যোগদান: কল্পনা দত্তের বাবা বিনোদ বিহারী দত্ত সরকারি কর্মচারী হওয়ায় তার পরিবারে স্বাধীনতা আন্দোলনের অনুকূল পরিবেশ ছিল না। কিন্তু দেশের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তাকে স্বাধীনতা সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করে। শহীদ ক্ষুদিরাম ও কানাইলাল দত্তের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি বেথুন কলেজে গড়ে ওঠা ছাত্রীসংঘে যোগ দান করেন।

সূর্য সেনের দলে যোগদান: 1930 খ্রিস্টাব্দে কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে প্রত্যাবর্তন করে পূর্ণেন্দু দস্তিদারের মাধ্যমে মাস্টারদা সূর্য সেনের সাথে তিনি পরিচিত হন এবং মাস্টারদা প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির চট্টগ্রাম শাখায় যোগদান করেন। সেই সময় মহিলাদের বিপ্লবী দলে প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকলেও মাস্টারদা নিয়ম নীতি শিথিল করে কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদাকে তার দলে গ্রহণ করেন।

বৈপ্লবিক কার্যকলাপ: কলকাতা থেকে কলকাতা থেকে ফেরার কল্পনা দত্ত গোপনে কিছু বিস্ফোরক নিয়ে আসেন এবং তা দ্বারা গান কটন তৈরি করেন। এক্ষেত্রে তার উদ্দেশ্য ছিল জেলে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জেলবন্দি বিপ্লবী গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, অনন্ত সিং প্রমুখকে পালাতে সাহায্য করা। কিন্তু তার এই পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায় এবং তার বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের ওপর প্রতিবন্ধকতা নেমে আসে।

ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা: 1932 খ্রী মাস্টারদা সূর্যসেন কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে চট্টগ্রামের ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের দায়িত্ব দেন। এক্ষেত্রে কল্পনাকে মাটির নিচে রাখা ডিনামাইটের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগের দায়িত্ব দেয়া কিন্তু নির্দিষ্ট দিনের এক সপ্তাহ আগে পুরুষের ছদ্মবেশে একটি সমীক্ষা করতে গিয়ে তিনি ধরা পড়েন। জেলে বসে তিনি অপারেশন পাহাড়তলী ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দাদারের আত্মত্যাগের খবর পান।

গ্রেপ্তার ও নির্বাসন: জামিনে মুক্তি পেয়ে মাস্টারদার নির্দেশে তিনি বেশ কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকেন। 1933 খ্রিস্টাব্দের 17 ফেব্রুয়ারি পুলিশ তাদের গোপন ঘিরে ফেললে মাস্টারদা গ্রেফতার হন ও কল্পনা দত্ত পালিয়ে যেত সক্ষম হন। অবশেষে 19 মে তিনিও ধরা পড়েন। বিচারে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

পরবর্তী জীবন:1939 খ্রিস্টাব্দে প্রমাণ অভাবে তিনি জেল থেকে মুক্তি লাভ করেন এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যান। ব্যক্তিগত জীবনে 1943 খ্রিস্টাব্দে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সি.পি.যোশীকে বিবাহ করেন। 1995 খ্রিষ্টাব্দের 8ই ফেব্রুয়ারি তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

Leave a Comment