ক্ষুদিরাম বসু জীবনী | Khudiram Bose Biography in Bengali

ক্ষুদিরাম বসু জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Khudiram Bose Biography in Bengali. আপনারা যারা ক্ষুদিরাম বসু সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ক্ষুদিরাম বসু র জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

ক্ষুদিরাম বসু কে ছিলেন? Who is Khudiram Bose?

ক্ষুদিরাম বসু (3 ডিসেম্বর 1889 – 11 আগস্ট 1908) ছিলেন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির একজন ভারতীয় বিপ্লবী যিনি ভারতের ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করেছিলেন। প্রফুল্ল চাকির সাথে মুজাফফরপুর ষড়যন্ত্র মামলায় তার ভূমিকার জন্য, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যা তাকে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বকনিষ্ঠ শহীদদের একজন করে তোলে।

ক্ষুদিরাম বসু জীবনী – Khudiram Bose Biography in Bengali

নামক্ষুদিরাম বসু
জন্ম3 ডিসেম্বর 1889
পিতাত্রৈলোক্যনাথ বসু
মাতালক্ষ্মীপ্রিয় দেবী
জন্মস্থানমোহবনী (হবিবপুর), পশ্চিম মেদিনীপুর
জাতীয়তাভারতীয়
পেশাভারতীয় বিপ্লবী
মৃত্যু11 আগস্ট 1908 (বয়স 18)

ক্ষুদিরাম বসু র জন্ম: Khudiram Bose’s Birthday

ক্ষুদিরাম বসু 3 ডিসেম্বর 1889 জন্মগ্রহণ করেন।

ছোট্ট একটা নাম ক্ষুদিরাম — কিন্তু কী বিস্ফোরক ! নামটার পেছনে লুকিয়ে আছে অনেক রহস্যও। অনেকে বলেন বাঙলার বিপ্লবী আন্দোলনের প্রথম শহীদ ক্ষুদিরাম। আসলে তিনি হলেন তৃতীয়। তবে ফাসীর মঞ্চে যাঁরা প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রথম বিপ্লবী। অগ্নিযুগের প্রথম শহীদ হলেন প্রফুল্ল চক্রবর্তী।

১৯০৭ খ্রিঃ দেওঘর সংলগ্ন রোহিনী পাহাড়ে তিনি বোমার আঘাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন। বোমা তৈরি করেছিলেন উল্লাসকর দত্ত। তার কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে গিয়েই প্রচন্ড বিস্ফোরণে ঘটেছিল এই বিপর্যয়। সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বারীন ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, বিভূতি সরকার প্রমুখ বিপ্লবীবৃন্দ। মন্ত্রগুপ্তির জন্যই এই খবর কেউ জানতেন না। পরবর্তীকালে উপরিউক্ত বিপ্লবীরা প্রকাশ্যে এ খবর স্বীকার করেছেন। দ্বিতীয় শহীদ হলেন প্রফুল্লচাকী। ক্ষুদিরামের ফাসীর আগেই বাংলার এক অজ্ঞাত পরিচয় চারণের লেখা গান ছড়িয়ে পড়েছিল মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে — “একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি …….. ”সেই গান অমর হয়ে রয়েছে।

ক্ষুদিরাম বসু র পিতামাতা ও জন্মস্থান: Khudiram Bose’s Parents And Birth Place

বিপ্লবী ক্ষুদিরামের জন্ম হয়েছিল ৩ রা ডিসেম্বর ১৮৮৯ খ্রিঃ মেদিনীপুর জেলার মৈবনীতে। অনেকের মতে হাবিবপুরে। তাঁর বাবার নাম ছিল ত্রৈলোক্যনাথ বসু। অল্প বয়সেই মা – বাবাকে হারিয়ে বড় দিদি অপরূপা দেবীর কাছে মানুষ হয়েছিলেন তিনি। ভাই – এর সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি পরে বলেছেন— “এর আগে পরপর দুটো ভাই মারা গেছে, আর আমরা বাঙালী ঘরের অভিসম্পাত নিতে নিতে তিনটে বোন অজয় অমর হয়ে বেঁচে রইলাম — এ লজ্জা রাখবার যেন ঠাই পাচ্ছিলাম না। তাই ছোট ভাইটি যখন হল, কি আনন্দ আমাদের। নবজাতক ভাইটিকে আমি কিনে নিলাম তিন মুঠো ক্ষুদ দিয়ে। আমাদের এদিকে একটা সংস্কার আছে, পরপর কয়েকটি পুত্রসন্তান মারা গেলে মা তার কোলের ছেলের সমস্ত লৌকিক অধিকার ত্যাগ করে বিক্রি করার ভান করেন। যে কেউ কিনে নেন কড়ি দিয়ে, নয়ত ক্ষুদ দিয়ে ! তিন কড়ি দিয়ে কিনলে নাম হয় তিনকড়ি, পাঁচকড়ি দিয়ে কিনলে নাম হয় পাঁচকড়ি। তিন মুঠো ক্ষুদ দিয়ে কিনলাম বলে ভাইটির নাম হল ক্ষুদিরাম ”।

ক্ষুদিরাম বসু র শিক্ষাজীবন: Khudiram Bose’s Educational Life

ক্ষুদিরাম প্রথমে তমলুক হ্যামিলটন স্কুলে ও পরে মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষালাভ করেন। ছাত্রাবস্থাতেই তার সঙ্গে যোগাযোগ হয় বিপ্লবী নায়ক সত্যেন বসুর। সত্যেন্দ্রনাথ তখন ছাত্রমহলে সুপরিচিত নাম। ক্ষুদিরামের অসম সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে তিনি ক্ষুদিরামকে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বলেন। সত্যেন্দ্রনাথ বিপ্লবমন্ত্রে দীক্ষা দেবার আগে তাঁর শিষ্যদের জিজ্ঞাসা করতেন, দেশের জন্য মরতে পারিস ? ক্ষুদিরামকেও তিনি একই প্রশ্ন করেছিলেন। ক্ষুদিরাম দ্বিধাশূন্য সহজ ভাবে জবাব দিয়েছিলেন — পারব বই কি !

এই ছোট্ট কথা কয়টির মধ্যেই ক্ষুদিরামের দেশের জন্য মমতা ও তেজস্বীতার প্রমাণ মেলে। এরপর থেকেই তিনি সাধারণ বাঙালীর নিরীহ জীবনযাপন ত্যাগ করে বিদ্রোহী জীবন বরণ করে নেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষুদিরাম মেদিনীপুর কেন্দ্রের মধ্যে লাঠিখেলা, অসি প্রভৃতি খেলায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। পরোপকার প্রিয়তা ও অলৌকিক সাহসিকতার জন্য তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই সত্যেন্দ্রনাথের অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।

ক্ষুদিরাম বসু র কর্ম জীবন: Khudiram Bose’s Work Life

১৯০৫ খ্রিঃ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী স্বদেশী আন্দোলনের ঝড়ওঠে। সেই সময় ক্ষুদিরাম দিদির আশ্রয় ত্যাগ করে চিরদিনের মত স্বদেশীদলের আশ্রয়ে চলে আসেন। এই সময় থেকে তার কাজ হল, লাঠিখেলায় উৎসাহ দান করা, আর বিলিতি দ্রব্য বয়কটের ছলে বিলিতি কাপড় পোড়ানো। বিলিতি কাপড়ের গাঁট লুঠ করা, আর বিলিতি লবনের নৌকা ডুবিয়ে দেওয়া। এর সঙ্গে পিস্তল ছোঁড়া অভ্যাস করা, প্রাচীর ডিঙ্গানো ইত্যাদি কাজও ছিল।

ক্ষুদিরাম তাঁর মন্ত্রগুরু সত্যেন্দ্রনাথের মতই পরের দুঃখে কাতর হয়ে পড়তেন। কেউ কোন বিপদে পড়লে ক্ষুদিরাম ও সত্যেন্দ্রনাথ উভয়েই জীবনপণ করে লেগে যেতেন সমাধানের জন্য। আবার দেশের মঙ্গলের কাজে যদি কারো পেছনে লাগতেন, তার লাঞ্ছনার একশেষ করে ছাড়তেন। এক বছর কঁাসাই নদীর বন্যায় গ্রাম ভেসে গেলে। রণপায়ে গিয়ে ক্ষুদিরাম সেখানে ত্রাণকার্য করেছিলেন। গ্রামে আগুন লাগা, ওলাওঠা, বসন্ত প্রভৃতি সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব হলে তাঁরাই দলবল নিয়ে জীবন বিপন্ন করে হলেও সেবার কাজে ঝাপিয়ে পড়তেন।

১৯০৬ খ্রিঃ মেদিনীপুরে মারাঠা কেল্লায় কৃষি – শিল্প প্রদর্শনী মেলা বসে। এই মেলা প্রাঙ্গণে সোনার বাংলা নামে বিপ্লবী পুস্তিকা বিলি করতে গিয়ে ক্ষুদিরাম প্রথম রাজনৈতিক অভিযোগে অভিযুক্ত হন। ক্ষুদিরাম পুলিশের হাতে ধরা পড়লে সত্যেন্দ্রনাথই পুলিশকে ধমকে তাকে ছাড়িয়ে দেন। সেই সময়ে সত্যেন্দ্রনাথ কালেকটরীতে কেরানীর কাজ করতেন। সত্যেন্দ্রনাথের পরামর্শমত পলাতক ক্ষুদিরাম পরে ধরা দিয়েছিলেন। কিন্তু অল্প বয়স বলে সরকারের পক্ষ থেকে মামলা তুলে নেওয়া হয়েছিল।

এই ঘটনার কিছুদিন পরেই ঘটে কিংসফোর্ড হত্যার চেষ্টা। সেইসময় কলকাতার অত্যাচারী চীফ প্রেসিডেন্সী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড হত্যার জন্য বিপ্লবী দলের সিদ্ধান্ত হয়। তাঁর নিরাপত্তার জন্য সরকার মজঃফরপুরে তাকে বদলি করেন। দলের আদেশে সঙ্গে সঙ্গে মেদিনীপুরের ক্ষুদিরাম বসু এবং রংপুরের প্রফুল্ল চাকী রওনা হয়ে যান মজঃফরপুর। দুজনের কেউ কাউকে চিনতেন না। রেল স্টেশনেই দুই বিপ্লবীর প্রথম সাক্ষাৎকার হয়।

আলাপ পরিচয়ের পর দুজনে আশ্রয় নেন একটি ধর্মশালায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দুজনে নিঃশব্দে শুধু কিংসফোর্ডের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করলেন। কিংসফোর্ডের কোয়ার্টারের কাছেই ছিল ইউরোপীয় ক্লাব। এখানে ছাড়া কিংসফোর্ড বাইরে কোথাও যান না। ১৯০৮ খ্রিঃ ৩০ শে এপ্রিল। সেদিন কিংসফোর্ডের খেলার সাথী হলেন একজন বড় উকিল মিঃ কেনেডির পত্নী ও কন্যা। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ খেলা শেষ হল।

মিস ও মিসেস কেনেডি কিংসফোর্ডের গাড়ির অনুরূপ একটি ঘোড়ার গাড়িতে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। বাইরে দুই বিপ্লবী প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। গাড়িটি গেট পার হয়ে আসতে না আসতেই প্রচন্ড শব্দে সমস্ত শহর কাপিয়ে একটা বোমা ফাটল ৷ কেনেডি – পত্নী ও কন্যা সঙ্গে সঙ্গেই মারা গেলেন। বিধ্বস্ত গাড়ি একপাশে উল্টে পড়ল। যাকে বধ করার জন্য ক্ষুদিরাম প্রফুল্লর এই বোমা নিক্ষেপ, সেই কিংসফোর্ডের অক্ষত গাড়িটি তখন মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে।

বোমা নিক্ষেপ করেই জুতো ফেলে রেখে দুই বিপ্লবী ছুটলেন দুই দিকে। ততক্ষণে বোমা বিস্ফোরণের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ বেষ্টনী ভেদ করে না যাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হওয়া যাচ্ছে না। দুই বিপ্লবীর কেউ কারো পরিচয় জানেন না। জানানো হয়নি ইচ্ছে করেই। এটাই হল মন্ত্রগুপ্তি। ক্ষুদিরামকে বলা হয়েছিল তার সঙ্গীর নাম দীনেশ রায়। আর প্রফুল্ল জানতেন তার সঙ্গীর নাম হরেন সরকার।

সারারাত লাইন ধরে হেঁটে পরদিন ভোরে চব্বিশ মাইল দূরবর্তী ওয়াইনী স্টেশনে পৌঁছলেন ক্ষুদিরাম। ক্ষুধা তৃষ্ণা পথশ্রমে কাতর হয়ে পড়েছেন। অবসাদে ভেঙ্গে আসছে শরীর। একটা মুদি দোকানে এসে কিছু খাবার কিনে খেলেন। অদূরেই দাঁড়িয়ে খৈনি টিপছিল দুই কনস্টেবল — ফতে সিং আর শিবপ্রসাদ মিশ্র। ক্ষুদিরামকে দেখেই তাদের সন্দেহ হল। পায়ে পায়ে এগিয়ে এল ক্ষুদিরামের কাছে।

পুলিশ দেখেই ক্ষুদিরাম বিদ্যুৎগতিতে হাত দিলেন কোমরে। কিন্তু তার আগেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ফেলল দুই কনস্টেবল। পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন ক্ষুদিরাম। ওয়াইনি স্টেশনে ক্ষুদিরাম ধরা পড়লেন ১ লা মে। চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ল মিসেস ও মিস কেনেডির ওপর বোমা নিক্ষেপকারী আসামী রিভলবারসহ ধরা পড়েছে।

মজঃফরপুরের পুলিশ সুপার মিঃ আর্মস্ট্রং ছুটে এলেন ওয়াইনিতে। সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনী। ক্ষুদিরামের সারা মুখে সলজ্জ স্মিত হাসি। যেন খেলা দেখছেন মজা করে। আর্মস্ট্রং দেখে অবাক হলেন। এই হল কিনা খুনের আসামী ! সারা মুখে শিশুর সারল্য মাখানো। বন্দি ক্ষুদিরামকে নিয়ে বিকেল পাঁচটা নাগাদ আর্মস্ট্রং ফিরে গেলেন মজঃফরপুরে। গোটা শহর ভেঙ্গে পড়েছে রেল স্টেশনে। পুলিশ সুপার আর্মস্ট্রং বন্দিবীরকে নিয়ে স্পেশাল ট্রেনে করে ফিরে এসেছেন। এই খবর ততক্ষণে জানতে পেরে গেছে সকলে।

তাই জনতা ভিড় করে এসেছে বাংলার এই বন্দিবীরকে একবার দেখে তাদের শ্রদ্ধা জানাতে। পুলিশ পরিবেষ্টিত অবস্থায় প্রথম শ্রেণীর কামরা থেকে ধীরে ধীরে মাটিতে পা দিলেন ক্ষুদিরাম। সারা মুখে ছড়িয়ে আছে মিষ্টি হাসি। সেই অবস্থাতেই তিনি একবার ঘুরে তাকালেন উৎসুক জনতার দিকে। ধ্বনি তুললেন — বন্দে মাতরম ! বন্দে মাতরম ! বন্দে মাতরম ! তারপর নির্দিষ্ট ফিটন গাড়িতে উঠে পড়লেন। স্টেশন থেকে সোজা ইউরোপীয়ান ক্লাব। তারপর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ এইচ.সি.উডম্যানের কাছে জবানবন্দী।

ক্ষুদিরাম তাঁর জবানবন্দীতে বললেন, ‘আমার নাম ক্ষুদিরাম বসু, বাড়ি মেদিনীপুরে। এন্ট্রান্স ক্লাশ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। আমি এখানে এসেছিলাম কিংসফোর্ডকে হত্যা করার জন্য। তার মত উৎপীড়ক ম্যাজিস্ট্রেট ভারতে দ্বিতীয় নেই। তাকে বধ না করে দুই জন নিরপরাধিনী স্ত্রীলোককে যে আমি হত্যা করেছি, এজন্য আমার মর্মান্তিক যাতনা হচ্ছে। মেদিনীপুর থেকে আমি এখানে এসেছি। হাওড়ায় আমার সহচর দীনেশের সঙ্গে দেখা হয়। দীনেশের সঙ্গে একটা বোমা ছিল। দীনেশ বোমা তৈরি করতে পারত। আমার সঙ্গে দুটো রিভলবার ও কতগুলো গুলি ছিল। ওটা আমি কলকাতা থেকে কিনেছিলাম। আমরা ৭-৮ দিন আগেই মজঃফরপুরে পৌঁছে ধর্মশালায় থেকেছি। আমরা সর্বদা কিংসফোর্ডের খবর নিতাম। আমরা দেখলাম, কিংসফোর্ড কুঠি থেকে কয়েক গজ দুরের ক্লাব ছাড়া আর কোথাও যান না। একদিন কাছারিতে গিয়ে দেখলাম তিনি সেসনের বিচার করছেন। সেখানে বোমা ছুঁড়লে অনেক নির্দোষ মানুষের মৃত্যু হবে বিবেচনা করে বিরত হই। ৩০ শে এপ্রিল কিংসফোর্ডের গাড়ি কখন ক্লাব থেকে ফিরে আসবে সেই প্রতীক্ষায় ছিলাম। একখানা গাড়ি আসছে দেখেই আমি বোমা নিক্ষেপ করেছিলাম। আমাদের উভয়ের পা – ই খালি ছিল। বোমা নিক্ষেপের পর দীনেশ বাঁকিপুরের দিকে পালিয়ে যায়। আমি সমস্তিপুরের দিকে। ওয়াইনি স্টেশনে এক মুদির দোকানে যখন জল খাচ্ছিলাম তখন দুজন নস্টেবল আমাকে গ্রেপ্তার করে। কলকাতায় এক গুপ্ত সমিতি আছে। সেই সমিতি কর্তৃক নিযুক্ত হয়েই আমি কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে এসেছিলাম। যদি ধরা পড়ি, তাহলে তৎক্ষণাৎ আত্মহত্যা কববার জন্য পিস্তল সঙ্গে রেখেছিলাম।’

প্রফুল্ল যে আত্মহত্যা করেছে, একথা ক্ষুদিরাম জানতে পারেন ৩ রা মে। মৃতদেহ নিয়ে আসা হল সনাক্ত করার জন্য। ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ডাক পড়ে ক্ষুদিরামের। মৃত যে তাঁর সঙ্গী দীনেশ রায় সেকথা স্বীকার করলেন তিনি। এরপর শুরু হল মামলা। দায়রা আদালতে বিচারযোগ্য মামলা বলে ২১ মে তারিখে প্রাথমিক বিচারের জন্য ক্ষুদিরামকে হাজির করা হল প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ ই.বি. বার্থাউডের আদালতে।

২৩ শে মে তারিখে আবার একটি বিবৃতি দিলেন ক্ষুদিরাম। আগের বিবৃতির সঙ্গে এবারের বিবৃতির অনেক অমিল দেখা গেল। ধরা পড়বার পর প্রথম স্বীকারোক্তির কালে ক্ষুদিরামের একমাত্র লক্ষ্য ছিল, সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে টেনে নিয়ে সঙ্গী প্রফুল্ল চাকীকে সব রকম বিপদ থেকে আড়াল করে রাখা। প্রফুল্লর মৃত্যু হয়েছে জেনে স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় বিবৃতিতে তিনি আর সে চেষ্টা করেননি। ক্ষুদিরামের দ্বিতীয় বিবৃতিটির মধ্যে নতুন কথা যা ছিল তা হল, মজঃফরপুরে আসার পাঁচ – সাতদিন আগে যুগান্তর অফিসে প্রথম দীনেশের সঙ্গে তার আলাপ হয় ৷ পত্রিকা বিক্রির সূত্রেই তিনি যুগান্তর পত্রিকা অফিসে যাতায়াত করতেন।

তিনি বললেন, একদিন আমি যখন খেতে বসেছি, সেই সময় দীনেশ আমার কাছে আসে ৷ সে আমার পরিচয় জানতে চায়। আমার নাম শুনে সে আমাকে চিনতে পারে। কারণ আমার বিরুদ্ধে কিছুদিন আগে পুলিশ একটা মামলা করেছিল। কথাবার্তার পরে সে আমাকে জানায় যে, একটা কাজ করতে পারলে অনেক পুরস্কার পাওয়া যাবে। আমি রাজি হই। তখন সে আমাকে শুক্রবার তিনটের সময় হাওড়া স্টেশনে দেখা করতে বলে। সেখানে সে আমাকে কিংসফোর্ডকে হত্যার কথা বলেছিল। নানাভাবে বোঝাবার পরে আমিও রাজি হয়েছিলাম। দীনেশ আমাকে রিভলবার দিয়ে বলেছিল এগুলো কোথায় পেয়েছি সেকথা যেন কাউকে না বলি। প্রয়োজন হলে যেন অমূল্য দাসের নাম বলি একথাও বলেছিল।

ক্ষুদিরাম বসু র মৃত্যু: Khudiram Bose’s Death

৯ ই জুন মঙ্গলবার মজঃফরপুরের এডিশনাল সেসন জজ মিঃ কনডফ – এর আদালতে বিচার শুরু হল। সরকার পক্ষে মামলা পরিচালনা করার দায়িত্ব নিলেন বাঁকিপুরের বিখ্যাত ব্যারিস্টার মিঃ মানুক এবং সরকারী উকিল বিনোদবিহারী মজুমদার। ক্ষুদিরামের পক্ষে স্বেচ্ছায় এগিয়ে এলেন মজঃফরপুরের একজন দেশপ্রেমিক আইনজীবী কালিদাস বসু। আর রংপুর থেকে এলেন সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী এবং নৃপেন্দ্রনাথ লাহিড়ী। সাক্ষীদের জবানবন্দি ও জেরা দু পক্ষের উকিলের সওয়াল জবাব ইত্যাদির মধ্য দিয়ে মামলা শেষ পর্যন্ত যেখানে এসে নিষ্পত্তি হল, তাতে ভারতীয় দন্ডবিধি আইনের ৩০২ ধারা অনুসারে বিচারক ক্ষুদিরামের মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করলেন।

বিচারকের রায় ক্ষুদিরাম শুনলেন মুখে মৃদু হাসি নিয়ে। যে হাসি বরাবর তার মুখে দেখা গেছে। দর্শকদের আসনে বসেছিলেন একজন শ্বেতাঙ্গ সাহেব। অবাক বিস্ময়ে তিনি তাকিয়ে রইলেন ক্ষুদিরামের মুখের দিকে। এই অসম্ভব দৃশ্য যেন তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। নিজের মৃত্যুদন্ডাজ্ঞা শুনে এমন করে কেউ হাসতে পারে ! সাহেবের পাশেই বসেছিলেন এক বাঙ্গালী যুবক।

তাকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন, Are you a Bengali Yough? যুবক সম্মতি জানিয়ে বললেন, Yes। Try to follow in the foot steps of your brother— একথা বলেই শ্বেতাঙ্গ সাহেবটি আদালত কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। পরদিনের খবরের কাগজে যে বিবরণ প্রকাশিত হল তা এরকম: একেবারে নির্বিকারভাবে ক্ষুদিরাম দন্ডাজ্ঞা শুনিলেন। কি নিম্ন আদালতের কমিটির নিকট, কি উচ্চ আদালতে সেসন জজের নিকট, মামলা শুনানী কালে ক্ষুদিরাম অধিকাংশ সময়ই নির্লিপ্তভাবে কাটাইতেন। কখনো কখনো তাহাকে আসামীর কাঠগড়ায় নিদ্রিত অবস্থায় দেখা যাইত।

আদালতে কি হইতেছে না হইতেছে, সে সম্বন্ধে ক্ষুদিরাম প্রায়ই উদাসীন থাকিতেন। প্রাণদন্ডযোগ্য অপরাধের অভিযোগে বিচারাধীন আসামীর এই নির্লিপ্তভাব এবং ঔদাসীন্য আদালতে উপস্থিত ব্যক্তিগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করিত। মৃত্যু দন্ডাজ্ঞার পর ক্ষুদিরামকে সম্পূর্ণ অবিচলিত দেখিয়া এবং তাঁহার নির্বিকার ভাব লক্ষ্য করিয়া বিদেশী রাজার স্বজাতীয় বিচারকের মনে সম্ভবতঃ এইরূপ ধারণ জন্মিয়াছিল যে আসামীর প্রতি যে চরমদন্ড প্রদত্ত হইয়াছে তাহা সে বুঝিতে পারে নাই।

এই ধারণার বশবর্তী হইয়া ফাঁসির হুকুমের পর জজ ক্ষুদিরামকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার প্রতি যে দন্ডের আদেশ হইল তাহা বুঝিতে পারিয়াছ ? ক্ষুদিরাম হাস্যমুখে মাথা নাড়িয়া জানাইল- বুঝিয়াছি। সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকেও বিনা পরিশ্রমে ক্ষুদিরামের মামলা চালিয়ে ছিলেন মজঃফরপুরের দেশপ্রেমিক আইনজীবী কালিদাস বসু এবং রংপুর থেকে আগত সতীশ চক্রবর্তী ও নৃপেন লাহিড়ী।

সাক্ষীদের জবানবন্দি ও দুপক্ষের উকিলের সওয়াল জবাবের পূর্বে সতীশবাবু বিচারপতি কর্নডফের অনুমতি নিয়ে বন্দি ক্ষুদিরামের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। ক্ষুদিরামের সঙ্গে সতীশবাবুর যে কথাবার্তা হয়েছিল সেই কোর্ট বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৮ খ্রিঃ ৮ ই জুনের সঞ্জীবনী পত্রিকায়। সেই অংশ এখানে তুলে দিচ্ছি, এ থেকেই পরিস্ফুট হবে নির্ভীক বিপ্লবী তরুণ ক্ষুদিরামের মানসিক পরিচয়।

রংপুরের উকীলবাবু সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী ক্ষুদিরামের সঙ্গে কিঞ্চিৎ কথাবার্তা বলিবার অভিপ্রায়ে অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। জজ অনুমতি দিলেন। ক্ষুদিরাম কাঠগড়ায় ছিলেন। অস্ত্রধারী পুলিস ও উকীলগণ কাঠগড়া ঘিরিয়া দাঁড়াইলেন। ক্ষুদিরামের মুখে অন্তর্নিহিত তেজোগর্ব পরিস্ফুট, তাহার কথাবার্তায় কোনরূপ কুন্ঠা বা উদ্বেগের লেশমাত্র নাই।

সতীশবাবুর প্রশ্নের উত্তরে ক্ষুদিরাম অবিচলিত ভাবে বলিতে লাগিল: মেদিনীপুর শহরে আমার বাড়ি। আমার বাপ, মা, ভাই, কাকা বা মামা কেহ নাই। কেবল আমার এক বোন আছেন। তার অনেকগুলি ছেলেমেয়ে আছে। বড়টির বয়স আমার মতই হইবে। বাবু অমৃতলাল রায়ের সহিত দিদির বিবাহ হইয়াছে। তিনি মেদিনীপুরের জজের হেডক্লার্ক। ইহারাই আমার একমাত্র স্বজন। বাবু অবিনাশচন্দ্র বসু নামে আমার এক পিসতুত ভাই আছেন। তিনি আমার তত্ত্ববার্তা লন না। আমি এন্ট্রান্স স্কুলের ২ য় শ্রেণী পর্যন্ত পড়িয়াছি। ২/৩ বৎসর হইল পড় ৷ ছাড়িয়াছি। পড়া ছাড়িয়াই স্বদেশী আন্দোলনে কাজ করিতে আরম্ভ করি। সেই সময় হইতে আমার ভগিনীপতি অমৃতবাবু আমাকে পরিত্যাগ করিয়াছেন।

আমার মা নাই। বাবা ১০/১১ বছর হইল মারা গিয়াছেন। আমার বিমাতা জীবিত আছেন। তিনি তার ভাই সুরেন্দ্রনাথ ভঞ্জের নিকট থাকেন। সুরেন্দ্রনাথ ভঞ্জ কি করেন, কোথায় থাকেন, তাহা আমি জানি না। —তুমি কাউকেও দেখিতে চাও কি ? –হ্যা, একবার মেদিনীপুর দেখিতে চাই, আমার দিদিও তার ছেলেমেয়ে কটিকে দেখিতে চাই। —তোমার মনে কোন দুঃখ আছে কি ? –না, কিছু না। তোমার কোন আত্মীয়ের নিকট কোন খবর দিতে বা তাহাদের কাহাকেও তোমার পক্ষের সাহায্যের জন্য এখানে আসতে বলিতে চাও ? না, তাঁদের কাছে কোন খবর পাঠাইতে আমার ইচ্ছা নাই। যদি তারা ইচ্ছা করেন আসিতে পারেন।

জেলে তোমার প্রতি কিরূপ ব্যবহার করা হয় ? —একরূপ ভালই। জেলের খাবারটা খারাপ। আমার সহ্য হয় না, তাতেই আমার শরীর খারাপ হইয়াছে। ইহা ছাড়া আর কোন খারাপ ব্যবহার করে না। একটা নির্জন ঘরে আমাকে দিন রাত বন্ধ করিয়া রাখে। কেবল একবার স্নানের সময় আমাকে বাহিরে আসিতে দেয়। একা থাকিতে থাকিতে আমি ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছি। আমাকে কোন খবরের কাগজ বা বই পড়িতে দেয় না, পাইলে বড় ভাল হয় ৷ –তোমার মনে কোনরূপ ভয় হয় কি ? ভয়ের কথা শুনিয়া ক্ষুদিরাম হাসিয়া ফেলিল। হাসিয়া উত্তর করিল – কেন ভয় করিব ? —তুমি গীতা পড়িয়াছ ? –হ্যা, পড়িয়াছি। –তুমি কি জান যে, তোমাকে বাঁচাইবার জন্য রংপুর হইতে আমরা কয়েকজন উকিল আসিয়াছি ? তুমি ত পূর্বেই তোমাকে অপরাধী বলিয়া স্বীকার করিয়াছ। নির্ভীক ক্ষুদিরাম মস্তক উন্নত করিয়া জিজ্ঞাসা করিল – কেন স্বীকার করিব না ? সকলে স্তম্ভিত হইলেন।

সতীশবাবু বলিলেন— “ ক্ষুদিরাম, ভগবানকে স্মরণ 39 কর। ‘ বিচারের রায় সকলকে হতাশ করলেও কালিদাসবাবু আশা ছাড়লেন না। তিনি হাইকোর্টে আপীল করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কোর্টের অনুমতি নিয়ে কালিদাসবাবু ক্ষুদিরামের সঙ্গে জেলখানায় গিয়ে দেখা করলেন। ক্ষুদিরাম কিন্তু প্রথমে আপীলের দরখাস্তে সই করতে রাজি হলেন না। পরে পিতৃতুল্য মানুষটির পীড়াপীড়িতে বাধ্য হয়ে সই করলেন। যথারীতি কলকাতা হাইকোর্টে আপীলের শুনানী হল। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের রায় অপরিবর্তিতই রইল। কালিদাসবাবু পরে বড়লাট বাহাদুরের কাছেও ক্ষুদিরামের প্রাণরক্ষার আবেদন জানালেন। কিন্তু তা – ও অগ্রাহ্য হল। ক্ষুদিরামের ফাসির দিন ধার্য হল ১১ ই আগস্ট। ততদিনে দুঃখিনী বাংলার পল্লীকবির অমর সঙ্গীত দেশের পথে প্রান্তরে বাউল ভিখারী, ছোট বড় সকলের কন্ঠে ধ্বনিত হতে শুরু করেছে—

“একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি হাসি হাসি পড়ব ফাসি দেখবে ভারতবাসী।”

হিন্দুমতে শবদেহ সৎকার করবার জন্য ফাসির সময় উপস্থিত থাকবার জন্য বেঙ্গলী কাগজের সংবাদদাতা উপেন্দ্রনাথ সেন সহ কয়েকজন আইনজীবী। পরের ঘটনার বিবরণ উপেন্দ্রনাথ সেন তাঁর ‘ ক্ষুদিরাম ’ গ্রন্থে এ ভাবে লিখেছেনঃ “১১ ই আগস্ট ফাসির দিন ধার্য হইল। আমরা দরখাস্ত দিলাম যে ক্ষুদিরামের ফাসির সময় উপস্থিত থাকিব এবং তাহার মৃতদেহ হিন্দুমতে সৎকার করিব ! ………. আমি তখন বেঙ্গলী কাগজের স্থানীয় সংবাদদাতা। বোমা পড়া হইতে আরম্ভ করিয়া যাবতীয় সংবাদ সে কাগজে পাঠাইতাম …………… আমি অতি গোপনভাবে বাড়িতে বসিয়া একটি বাঁশের খাটিয়া প্রস্তুত করাইলাম। যেখানে মাথা থাকিবে, সেখানে ছুরি দিয়া কাটিয়া বন্দেমাতরম লিখিয়া দিলাম। ভোর পাঁচটায়ফাসি হইবে। পাঁচটার সময় আমি গাড়ির মাথায় খাটিয়াখানি ও আবশ্যকীয় সৎকারের বস্ত্রাদি লইয়া জেলের ফটকে উপস্থিত হইলাম। দেখিলাম, নিকটবর্তী রাস্তা লোকে লোকারণ্য। ফুল লইয়া বহুলোক দাঁড়াইয়া আছে। ……….

দ্বিতীয় লৌহদ্বার উন্মুক্ত হইলে আমরা জেলের আঙিনায় প্রবেশ করিলাম ! দেখিলাম, ডান দিকে একটু দূরে প্রায় ১৫ ফুট উঁচুতে ফাঁসির মঞ্চ। দুইদিকে দুইটি খুঁটি আর একটি মোটা লোহার বড় বা আড় দ্বারা যুক্ত, তারই মধ্যস্থানে বাঁধা মোটা একগাছি দড়ি ঝুলিয়া আছে, তাহার শেষ প্রান্তে একটি ফাস। একটু অগ্রসর হইতেই দেখিলাম, ক্ষুদিরামকে লইয়া আসিতেছে চারজন পুলিস। কথাটা ঠিক বলা হইল না। ক্ষুদিরামই আগে আগে দ্রুতপদে অগ্রসর হইয়া যেন সিপাহীদের টানিয়া আনিতেছে ৷ আমাদের দেখিয়া একটু হাসিল। স্নান সমাপন করিয়া আসিয়াছিল।

শেষে শুনিয়াছি, খুব প্রত্যূষে উঠিয়া স্নান করিয়া কারাবাসকালীন বর্ধিত চুলগুলি আঙ্গুল দিয়া বিন্যস্ত করিয়া নিকটবর্তী দেবমন্দির হইতে প্রহরী কর্তৃক সংগৃহীত চরণামৃত পান করিয়া আসিয়াছিল। আমাদের দিকে আর একবার চাহিল। তারপর দৃঢ় পদক্ষেপে মঞ্চের দিকে অগ্রসর হইয়া গেল। মঞ্চে উপস্থিত হইলে তাহার হাত দুইখানি পিছনে আনিয়া রজ্জুবদ্ধ করা হইল। একটি সবুজ রঙের পাতলা টুপি দিয়া তাহার গ্রীবামূল অবধি ঢাকিয়া দিয়া গলায় ফাঁসি লাগাইয়া দেওয়া হইল। ক্ষুদিরাম সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল।

এদিকে ওদিকে একটুও নড়িল না। উডম্যান সাহেব ঘড়ি দেখিয়া একটি রুমাল উড়াইয়া দিলেন। একটি প্রহরী মঞ্চের একপ্রান্তে অবস্থিত একটি হ্যান্ডেল টানিয়া দিল। ক্ষুদিরাম নিচের দিকে অদৃশ্য হইয়া গেল। কেবল কয়েক সেকেন্ড ধরিয়া উপরের দড়িটি একটু নড়িতে লাগিল। তারপর সব স্থির।আমরা জেলের বাহিরে আসিলাম। আধঘন্টা পরে, জেলের দুইজন বাঙ্গালী যুবক ডাক্তার আসিয়া খাটিয়া ও নূতন বস্ত্র লইয়া গেলেন। নিয়ম অনুসারে ফাঁসির পর গ্রীবার পশ্চাৎ দিকে অস্ত্র করিয়ে দেখা হয় যে, পড়ামাত্র মৃত্যু হইয়াছিল কিনা।

ডাক্তার দুইটি সেই অস্ত্রকরা স্থান সেলাই করিয়া ঠেলিয়া বাহির হওয়া জিহ্বা ও চক্ষু যথাস্থানে বসাইয়া, নূতন কাপড় পরাইয়া, দুইজনে খাটিয়া ধরিয়া মৃতদেহটি জেলের বাইরে আমাদের দিয়া গেলেন। কর্তৃপক্ষের আদেশে আমরা নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়া শ্মশানে চলিতে লাগিলাম। রাস্তার দুই পাশে কিছুদূর অস্তর পুলিস প্রহরী দাঁড়াইয়া আছে। তাহাদের পশ্চাতে শহরের অগণিত লোক ভিড় করিয়া আছে। অনেকে শবের উপর ফুল দিয়া গেল। শ্মশানেও অনেক ফুল আসিতে লাগিল ৷

একটি সাব ইনসপেক্টরের নেতৃত্বে বারোজন পুলিস শ্মশানের একপ্রান্তে বসিয়া রইল। চিতারোহণের আগে স্নান করাইতে গিয়া ক্ষুদিরামের মৃতদেহ বসাইতে গেলাম। দেখিলাম মস্তকটি মেরুদন্ডচ্যুত হইয়া বুকের উপর ঝুলিয়া পড়িয়াছে। দুঃখ বেদনা – ক্রোধে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মাথাটি ধরিয়া রাখিলাম। বন্ধুগণ স্নান করাইলেন। তারপর চিতায় শোয়ানো হইলে রাশিকৃত ফুল দিয়া মৃতদেহ সম্পূর্ণ ঢাকিয়া দেওয়া হইল। কেবল উহার হাস্যোজ্জ্বল মুখখানি অনাবৃত রহিল। দেহটি ভষ্মীভূত হইতে সময় লাগিল না।

চিতার আগুন নিভাইতে গিয়া প্রথম কলসী জল ঢালিতেই তপ্ত ভষ্মরাশির খানিকটা আমার বক্ষে আসিয়া পড়িল। তাহার জন্য জ্বালা যন্ত্রণা বোধ করিবার মত মনের অবস্থা তখন ছিল না। আমরা শ্মশানবন্ধুগণ স্নান করিতে নদীতে নামিয়া গেলে পুলিস প্রহরীগণ চলিয়া গেল ৷ তখন আমরা সমস্বরে বন্দেমাতরম বলিয়া মনেরভাব খানিকটা লাঘব করিয়া যে যাহার বাড়ি ফিরিয়া আসিলাম।

সঙ্গে লইয়া আসিলাম একটা টিনের কৌটায় কিছু চিতাভষ্ম কালিদাসবাবুর জন্য। …… ” শহিদ ক্ষুদিরামের মৃত্যু ছিল জীবনাদর্শে উজ্জীবিত চরম অত্মোৎসর্গ। মানুষের ও দেশের কল্যাণ যাঁদের জীবনের একমাত্র লক্ষ, এভাবেই যুগে যুগে তাঁদের জীবন উৎসর্গীকৃত হয়। তাই মৃত্যু তাঁদের ছিনিয়ে নিতে পারে না। মৃত্যুর পরেও তারা মানুষের স্মৃতিতে চিরঅমর হয়ে বেঁচে থাকেন। বাংলার কাব্যে, সাহিত্যে সঙ্গীতে ও ইতিহাসের পাতায় এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই বিপ্লবীবীর ক্ষুদিরাম মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে আছেন, থাকবেন চিরদিন।

Leave a Comment