হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ

হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ: উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে বা মেরু অঞ্চলে ধীরগতি সম্পন্ন চলমান বিশাল, দীর্ঘস্থায়ী  তুষার বা বরফের স্তুপ কে হিমবাহ বলে। বিজ্ঞানী ফ্লিন্ট এর মতে – হিমবাহ হল এক বিশাল আকৃতির বরফের স্তূপ, যা তুষার জমাট বেঁধে তৈরি হয়ে বিস্তীর্ন অঞ্চল ব্যাপী অবস্থান করছে এবং চলন্ত অবস্থায় রয়েছে বা কোনো এক সময় চলন্ত অবস্থায় ছিল। হিমবাহ দুটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষয় কাজ করে বিভিন্ন ধরণের ক্ষয়জাত ভূমিরূপের সৃষ্টি করে। হিমবাহের ক্ষয় প্রক্রিয়া দুটি হল-

১. অবঘর্ষ প্রক্রিয়া – হিমবাহ যে সব শিলাখন্ড বয়ে নিয়ে যায় সেগুলির সঙ্গে ঘর্ষনে উপত্যকা ক্রমশ ক্ষয় প্রাপ্ত হয়, এই প্রক্রিয়াকে অবঘর্ষ বলে।

২. উৎপাটন প্রক্রিয়া – প্রবাহমান হিমবাহের চাপে যখন পর্বত থেকে শিলাখন্ড বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তাকে উৎপাটন প্রক্রিয়া বলে। সাধারনত হিমবাহের বিপরীত ঢালে এই প্রক্রিয়া কাজ করে থাকে। 

হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ সমূহ 

করি বা সার্ক

পার্বত্য হিমবাহ ও তার সাথে বাহিত শিলাখন্ডের ঘর্ষনে হিমবাহ উপত্যকা এক দিকে ক্ষয় পেয়ে খুব খাড়া হয় এবং মধ্যবর্তী অংশ গর্তের মতো গভীর হয়ে অনেকটা হাতল ছাড়া ডেক চেয়ারের মতো দেখতে হয়। এরূপ ভূমিরূপকে স্কটল্যান্ডে করি, ফ্রান্সে সার্ক,ওয়েলসে কুম, জার্মানিতে কার বলে। একটি করির তিনটি অংশ – ক) পেছনের দিকে একটি খাড়া দেওয়াল   খ) মধ্যভাগে একটি অর্ধচন্দ্রাকার গর্ত   গ) নিম্ন দিকে উঠের কুব্জের মতো একটি অংশ।হিমবাহ গলা জল করিতে জমে হ্রদ সৃষ্টি হলে তাকে করি হ্রদ বলে।

উদাহরণ – হিমালয়, আল্পস প্রভৃতি হিমবাহ অধ্যুষিত পার্বত্য অঞ্চলে এই প্রকার ভূমিরূপ দেখা যায়।

এরিটি বা হিমশিরা

হিমবাহের উৎসমুখী ক্ষয়ের ফলে একই পর্বত শৃঙ্গের দুদিকে দুটি করির সৃষ্টি হলে ও তাদের আয়তন ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকলে মধ্যবর্তী সংকীর্ন খাড়া শিরা বা তীক্ষ্ণ ফলকের মতো অংশকে বলা হয় এরিটি। 

পিরামিড শৃঙ্গ বা চূড়া

একটি পর্বতের বিভিন্ন দিকে পাশাপাশি তিন চারটি করির সৃষ্টি হলে মাঝখানের সবচেয়ে উঁচু পর্বত শৃঙ্গ কে পিরামিড চূড়া বলে। 

উদাহরণ – গঙ্গোত্রীর কাছে অবস্থিত নীলকণ্ঠ ও শিবলিঙ্গ পর্বত শৃঙ্গ এবং আল্পসের ম্যাটার হর্ন বিখ্যাত পিরামিড শৃঙ্গ। 

হিমদ্রোনী বা হিমখাত

হিমবাহ কোন নদী উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলে হিমবাহ উপত্যকা দেখতে ইংরেজি  U – অক্ষরের মতো হয়, একে হিমদ্রোনী বা হিমখাত বলে। হিমখাতের তলদেশে অনেক সময় সিঁড়ির মতো ধাপ দেখা যায়। এদের হিমসোপান বলে। 

ঝুলন্ত উপত্যকা

অনেক সময় একটি প্রধান হিমবাহ উপত্যকার সাথে অনেক গুলি উপ হিমবাহ উপত্যকা এসে মিলিত হতে দেখা যায়। কিন্তু প্রধান হিমবাহ উপত্যকা গুলি গভীর ও চওড়া হওয়ায় উপ হিমবাহ উপত্যকা গুলি একই তলে প্রধান হিমবাহ উপত্যকার সাথে মিলিত হতে পারে না। তাই উপ- হিমবাহ উপত্যকা গুলি প্রধান হিমবাহ উপত্যকার উপর ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে বলে মনে হয়, এই ভাবে ঝুলে থাকা উপ-হিমবাহ উপত্যকা গুলিকে ঝুলন্ত উপত্যকা বলে। 

উদাহরন – হিমালয়ের বদ্রীনাথের নিকট কুবের পর্বত শৃঙ্গের কাছে এরূপ ঝুলন্ত উপত্যকা দেখা যায়। 

রসে মোতানে

হিমবাহের প্রবাহ পথে কোন কঠিন শিলাখন্ড উঁচু ঢিবির আকারে অবস্থান করলে হিমবাহের প্রবাহ পথের দিকে শিলাখন্ড অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে মসৃন এবং শিলাখন্ডের বিপরীত দিক টি উৎপাটন প্রক্রিয়ায় ক্ষয় প্রাপ্ত হয়ে অসমতল ও ফাটলযুক্ত অবস্থায় অবস্থান করে। এরূপ ঢিবিকে রসে মোতানে বলে। বিজ্ঞানী সসার ১৮০৪ সালে রসে মোতানে শব্দটি ব্যবহার করেন।

টিলা ও পুচ্ছ

হিমবাহের প্রবাহ পথে কঠিন ও কোমল শিলাখন্ড পরপর অবস্থান করলে, অনেক সময় কঠিন শিলা কোমল শিলাকে হিমবাহের ক্ষয়কার্য থেকে কিছুটা রক্ষা করে। কোমল শিলা ক্ষয় না পেয়ে লেজের আকারে অবস্থান করে। এক্ষেত্রে কঠিন শিলাকে টিলা ও নরম শিলাকে পুচ্ছ বলে। 

ফিয়র্ড

সমুদ্র উপকূল সংলগ্ন অঞ্চলে হিমবাহের ক্ষয়ের ফলে হিমবাহ উপত্যকা ক্রমস গভীর হতে হতে যদি উপকূলে নিমজ্জিত হয়, তাহলে ওই উপত্যকার বিস্তৃর্ন অংশ জলমগ্ন হয়ে যে উপত্যকার সৃষ্টি হয়, তাকে ফিয়র্ড বলে। পৃথিবীর গভীরতম ফিয়র্ড হল নরওয়ের সজনে ফিয়র্ড।

আবর্তরেখা বা গ্রোভস

পার্বত্য অঞ্চলে নরম শিলাস্তরের ওপর দিয়ে হিমবাহ প্রবাহিত হওয়ার সময় অনেক সময় হিমখাতের মধ্যে সুদীর্ঘ ও সুগভীর গর্তের সৃষ্টি করে। এরূপ গর্ত কে আবর্তরেখা বলে। 

Leave a Comment