মেজর ধ্যানচাঁদ জীবনী | Major Dhyan Chand Biography in Bengali

মেজর ধ্যানচাঁদ জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Major Dhyan Chand Biography in Bengali. আপনারা যারা মেজর ধ্যানচাঁদ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী মেজর ধ্যানচাঁদ এর জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

মেজর ধ্যানচাঁদ কে ছিলেন? Who is Major Dhyan Chand?

মেজর ধ্যানচাঁদ (২৯ আগস্ট ১৯০৫ – ৩ ডিসেম্বর ১৯৭৯) ছিলেন একজন ভারতীয় ফিল্ড হকি খেলোয়াড় যিনি ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ফিল্ড হকি খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত হন। 1928, 1932 এবং 1936 সালে তিনটি অলিম্পিক স্বর্ণপদক অর্জনের পাশাপাশি , একটি যুগে যেখানে ভারত ফিল্ড হকিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তার প্রভাব এই জয়গুলির বাইরেও প্রসারিত হয়েছিল, কারণ ভারত 1928 থেকে 1964 পর্যন্ত আটটি অলিম্পিকের মধ্যে সাতটিতে ফিল্ড হকি ইভেন্ট জিতেছিল।

মেজর ধ্যানচাঁদ জীবনী – Major Dhyan Chand Biography in Bengali

নামমেজর ধ্যানচাঁদ
জন্ম29 আগস্ট 1905
পিতাসামেশ্বর দত্ত সিং
মাতাশরধা সিং
জন্মস্থানএলাহাবাদ, আগ্রা এবং অউধের সংযুক্ত প্রদেশ, ব্রিটিশ ভারত
(বর্তমান প্রয়াগরাজ, উত্তর প্রদেশ, ভারত)
জাতীয়তাভারতীয়
পেশাহকি খেলোয়াড়
মৃত্যু3 ডিসেম্বর 1979 (বয়স 74)

মেজর ধ্যানচাঁদ এর জন্ম: Major Dhyan Chand’s Birthday

মেজর ধ্যানচাঁদ 29 আগস্ট 1905 জন্মগ্রহণ করেন।

পরপর পাঁচটি অলিম্পিকে বিশ্বজয়ীর জয়মাল্য লাভ করে আর্ন্তজাতিক ক্রীড়া ক্ষেত্রে ভারত ক্রীড়া ইতিহাসে নবতম গৌরবের অধিকারী হয়েছিল। ভারতের এই প্রতিভাকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে যিনি সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন, তিনিই হলেন হকির যাদুকর ধ্যানচাঁদ। ভারতীয় হকি দলের অন্যতম জ্যোতিষ্ক ধ্যানচাঁদ বিশ্ববাসীর মনে প্রথম আলোড়ন তোলেন।

নিউজিল্যান্ডে ১৯২৬ খ্রিঃ। এরপর একে একে আমস্টার্ডাম, লস এঞ্জেলস, বার্লিন ও ইংলন্ডের অলিম্পিক ক্রীড়াঙ্গনে সেই আলোড়নের ঢেউ এসে আঘাত করে। ধ্যানচাঁদের হকি খেলা ছিল ছন্দোময়। তার খেলার সৌন্দর্য দেখে ইংলন্ডের জনসাধারণ তাঁকে যাদুকর নামে অভিহিত করেন। কেউ আবার বলেছেন ‘হিউম্যান ঈল’ অর্থাৎ মানুষরূপী বানমাছ। ইংলন্ড, আমেরিকা, জার্মানী, বেলজিয়াম এবং হাঙ্গেরীর জনসাধারণের সঙ্গে বিশ্বের ক্রীড়ামোদী মানুষ স্বপ্নাবিষ্টের মত ধ্যানচাঁদের হকি খেলার সৌন্দর্য উপভোগ করতেন।

১৯৩৬ খ্রিঃ বার্লিন অলিম্পিকে উপস্থিত ছিলেন ফুরার হিটলার। ধ্যানচাঁদের হকি খেলার মাধুর্য সুষমায় মুগ্ধ হয়ে সেদিন নাৎসী জনসাধারণ দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে এসে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। তারপর বিশ্ববাসী ধ্যানচাঁদকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের সম্মান জানিয়ে হকির প্রাঙ্গণে ভারতের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিয়েছিলেন।

মেজর ধ্যানচাঁদ এর পিতামাতা ও জন্মস্থান: Major Dhyan Chand’s Parents And Birth Place

১৯০৫ খ্রিঃ ২৯ শে আগস্ট উত্তর প্রদেশের অন্তর্গত এলাহাবাদে এক রাজপুত ব্রাহ্মণ পরিবারে ধ্যানচাঁদের জন্ম। তাঁর পরিবার রাজপুতনা ত্যাগ করে প্রথমে এলাহাবাদে ও পরে ঝাসিতে বসবাস করেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন মধ্যম ৷ ধ্যানচাঁদের পিতা ও বড় ভাই ছিলেন সৈনিক। ছোট ভাই রূপ সিং ছিলেন ভারতীয় হকি দলের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক।

মেজর ধ্যানচাঁদ এর কর্ম জীবন: Major Dhyan Chand’s Work Life

ধ্যানচাঁদ আর রূপ সিং হলেন ভারতীয় হকির অনন্য ভ্রাতৃযুগল। ছেলেবেলা থেকেই ধ্যানচাঁদ জানতেন, পরিবারের ধারা অনুযায়ী তাকেও সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিতে হবে। তাই লেখা পড়ার বিষয়ে তিনি নিজে এবং পরিবারের লোকেরাও বিশেষ মনোযোগ দিতেন না। ষোল বছর বয়স হতেই ১৯২১ খ্রিঃ ধ্যানচাঁদ দিল্লীতে প্রথম ব্রাহ্মণ রেজিমেন্টে সাধারণ সেপাই হিসেবে যোগদান করেন।

সৈন্যবিভাগে প্রথম যে ব্রাহ্মণ রেজিমেন্ট গঠিত হয়েছিল, তার সুবেদার মেজর ছিলেন বালে তেওয়ারী। ইনি ছিলেন একজন দক্ষ হকি খেলোয়াড় এবং খেলার উগ্র সমর্থক। মুখচোরা স্বভাবের নিরীহ প্রকৃতির ধ্যানচাঁদকে তিনি খুব স্নেহ করতেন। এই বালে তেওয়ারীর কাছেই ধ্যানচাঁদের হকি খেলার প্রথম হাতেখড়ি হয়। বস্তুতঃ তিনিই বিশ্ব হকির সর্বকালের শ্রেষ্ঠ তারকা ধ্যানচাঁদের হকিগুরু।

সেই সময় সৈন্যদলের মধ্যে হকি খেলার খুব প্রচলন ছিল। জনাকয়েক এক সঙ্গে হলেই আরম্ভ হতো খেলা। এর জন্য সকাল বিকাল বা সন্ধ্যা – সময়ের কোন বাছবিচার ছিল না। ধ্যানচাঁদ সুযোগ পেলেই খেলায় মেতে উঠতেন। স্টিকের মাথায় বল নিয়ে এঁকে বেঁকে দৌড়ে বিপক্ষের খেলোয়াড়দের ফাকি দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই যেন তিনি অভূতপূর্ব আনন্দ পেতেন।

এইভাবেই ধীরে ধীরে সৈন্যদলের মধ্যে ধ্যানচাঁদের খেলার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সৈনিকদের আন্তঃবিভাগীয় খেলায় তিনি নিজের দলের জন্য বিজয়ীর জয়মাল্য ছিনিয়ে এনে সৈন্যবিভাগের সকল দলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। ধ্যানচাঁদ সৈন্যবিভাগের মধ্যেই খেলেছেন ১৯২২ খ্রিঃ থেকে ১৯২৬ খ্রিঃ পর্যন্ত।

একসময় একটি ফৌজি দল নিউজিল্যান্ড সফর করবে বলে স্থির হয়। এই সফরের অন্যতম খেলোয়াড় হিসাবে ধ্যানচাঁদকে নির্বাচিত করা হবে কিনা সে বিষয়ে তখনো কোন সিদ্ধান্ত হয়নি ধ্যানচাঁদের মনে অত্যুগ্র আগ্রহ। কিন্তু কারোর অনুগ্রহ নেবার মানসিকতা ছিল না তার। শৈশব থেকে এই শিক্ষাই পেয়েছেন তাই কাউকে কিছু না জানিয়ে তিনি একমনে কঠোর অনুশীলনের মধ্যেই নিজেকে ডুবিয়ে রাখেন। ইতিমধ্যে একদিন কমান্ডিং অফিসার তাকে ডেকে পাঠালেন।

ধ্যানচাঁদ জানতে পারলেন নিউজিল্যান্ড সফরে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। সেদিন আনন্দ সব সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল তার। কিন্তু অসীম ধৈর্যের সঙ্গে উচ্ছ্বাস সংবরণ করে অফিসারকে অভিবাদন জানিয়ে বেরিয়ে এসে ছুটে যান তার ব্যারাকে। সহকর্মীদের ঘরে ঘরে ছুটে গিয়ে সকলকে আনন্দের সংবাদ দিতে থাকেন। বন্ধুরাও আনন্দে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানাতে থাকেন। আশায় আনন্দে বুক ভরে ওঠে ধ্যানচাঁদের। নিউজিল্যান্ড থেকে ভারতের হকি দলের জয়যাত্রা শুরু হয়।

ভারতীয় হকির অবিস্মরণীয় প্রতিভাকে চিনে নিতে বিদেশে ক্রীড়ামোদীদের দেরি হয় না। ধ্যানচাঁদই হয়ে ওঠেন সকলের আলোচনার বিষয়। নিউজিল্যান্ডবাসীদের বিস্ময়ের চমকে চমকিত করে ফিরে আসেন দেশে। ভারতেও দিকে দিকে ধ্যানচাঁদের বিস্ময়কর প্রতিভার কথা ছড়িয়ে পড়তে বিলম্ব হয় না। এই সময়ে সামরিক জীবনেও ঘটল তার পদোন্নতি। সেপাই থেকে হলেন ল্যান্স নায়ক।

ভারতীয় হকিদল প্রথম বিশ্ব অলিম্পিকে যোগদান করে ১৯২৮ খ্রিঃ। স্থির হয় আন্তঃপ্রাদেশিক খেলার মাধ্যমে ভারতীয় খেলোয়াড়দের নির্বাচিত করা হবে। এই আস্তঃপ্রাদেশিক খেলা প্রথম অনুষ্ঠিত হল কলকাতায়। উত্তর প্রদেশ দলের আক্রমণ ভাগে ধ্যানচাঁদের খেলা দেখে দর্শকরা ধ্যানচাঁদের প্রশংসায় কলকাতার ময়দানের আকাশ – বাতাস মুখর করে ফেললেন। নির্বাচক মন্ডলী দ্বিধাহীন ভাবে ভারতীয় দলের আক্রমণভাগের গুরুদায়িত্ব ধ্যানচাঁদের ওপর ন্যস্ত করলেন।

১৯২৮ খ্রিঃ ১০ ই মার্চ কাইজার – ই – হিন্দ জাহাজে চেপে ভারতীয় খেলোয়াড় দল যথাসময়ে বোম্বাই বন্দর ত্যাগ করলেন। সেদিন এই দলকে সম্বর্ধনা জানাতে কোন ভারতীয় জাহাজঘাটে উপস্থিত ছিল না। কিন্তু জাহাজের মধ্যে ভারতীয় জওয়ানদের বুকে দুর্দমনীয় সঙ্কল্প ধ্বনিত হচ্ছিল— আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রে ভারতকে পরিচিত করবার প্রেরণা। অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় যোগদানের আগে লন্ডনে ভারতীয় দল এগারোটি খেলায় জয়ী হয়।

কিন্তু উদ্দেশ্য মূলকভাবে এই সংবাদ গোপন করে লন্ডনের সব কটি দৈনিক সংবাদপত্র। সম্ভবতঃ ধ্যানচাঁদের বিস্ময়কর প্রতিভা তাদের বিচলিত করে তুলেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই দুর্দমনীয় প্রতিভাকে তাঁদেরই অভিনন্দন জানাতে হয়েছিল হকির যাদুকর ও হিউম্যান ঈল আখ্যায় ভূষিত করে। অলিম্পিকের খেলায় পরাজিত হল অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড, ফাইন্যাল পড়ল হল্যান্ডের বিরুদ্ধে। কিন্তু খেলার আগে দেখা দিল আকস্মিক বিপর্যয়।

ভারতীয় দলের দিকপাল খেলোয়াড় ফিরোজ খান, সৌকত আলী ও খের সিং অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অধিনায়ক ছিলেন জয়পাল সিং। তিনিও অনুপস্থিত। প্রবল জ্বরে ধ্যানচাঁদও শয্যাশায়ী। ম্যানেজার মিঃ রসার চোখে অন্ধকার দেখেন। তিনি উম্মাদের মত ছুটে আসেন ধ্যানচাঁদের কাছে। তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘ভারতের এই চরম পরীক্ষার দিনে তুমি শয্যাশায়ী থাকবে, ধ্যানচাঁদ। তুমি তো সৈনিক, ওঠো— ভারতের জন্য নির্দিষ্ট বিজয়ীর জয়মাল্য তোমাকেই এনে দিতে হবে।’

মুহূর্তে যেন সমস্ত জড়তা ঝরে পড়ে ধ্যানচাঁদের শরীর থেকে। অসুস্থ সৈনিক অভুক্ত অবস্থাতেই হাতিয়ার নিয়ে মাঠে ঝাপিয়ে পড়েন। সেদিন যেন আসুরিক শক্তি সামর্থ্য লাভ করেছেন ধ্যানচাঁদ। তার দুর্বার আক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থ হয় হল্যান্ডের রক্ষণভাগ। হল্যান্ডের গোলরক্ষক একবার নয়— বারবার তিনবার পরাজিত হল। সময়টা ১৯২৮ খ্রিঃ ২৬ শে মার্চ। ভারত লাভ করল বিশ্বহকির দুর্লভ বিজয় মুকুট। সহ – খেলোয়াড়দের সঙ্গে ধ্যানচাঁদ অলিম্পিকের স্বর্ণপদক লাভ করলেন ২৯ শে আগষ্ট। অলিম্পিক বিজয়ী দল ভারতে ফিরে আসার পর ধ্যানচাঁদের নাম ছড়িয়ে পড়ল ঘরে ঘরে।

অভিনন্দনে অভিষিক্ত হলেন তিনি। চারবছর পরে ১৯৩২ খ্রিঃ লস এঞ্জেলস অলিম্পিকের জন্য যে দল নির্বাচিত হল তাতে ধ্যানচাঁদ অন্তর্ভুক্ত হলেন কোন ট্রায়াল খেলায় অংশ গ্রহণ না করেই। অলিম্পিক ফাইন্যালে ভারত খেলল আমেরিকার বিরুদ্ধে। পরপর ২৪ গোল করে ভারতীয় খেলোয়াড়রা নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করল। অলিম্পিক বিজয়ের পর ভারতীয় দল হল্যান্ড, জার্মানী, চেকোশ্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরী সফর করে। ভারতীয় হকির উন্নত কৌশল দেখে সকল দেশের জনসাধারণই বিস্ময়মুগ্ধ হয়।

ধ্যানচাঁদের অনুপম খেলার ছন্দোময় সুষমার প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত হন সকলে। সফর শেষ করে অপরাজিত গৌরব নিয়েই ভারতীয় হকি দল দেশে ফিরে আসে। ধ্যানচাঁদ সর্বমোট ১৩৩ টি গোল করে সব চেয়ে বেশি গোলদাতার সম্মান লাভ করেছিলেন। সেই সময় ভারতীয় হকি ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন সিস্টার হোমান। ধ্যানচাঁদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি তার জন্য রেলবিভাগে একটি ভাল চাকুরির ব্যবস্থা করেন। এই সংবাদে ধ্যানচাঁদ পড়লেন অস্বস্তিতে।

সৈন্যবিভাগ ত্যাগ করবেন কিনা এ বিষয় নিয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লেন তিনি। এই সময়ে সৈন্য বিভাগের কর্তাদের আশ্বাস পেয়ে ধ্যানচাঁদ সৈন্য বিভাগেই থেকে যান। তাঁর পদোন্নতি হয় ল্যান্স নায়কের পদ থেকে নায়কের পদে। ১৯৩১ খ্রিঃ ধ্যানচাঁদ লাভ করলেন নবাবী খিলাত। এই সালের ডিসেম্বর মাসে কারোয়াইতে ঝাসী হিরোঞ্জ দলে অধিনায়ক হিসেবে খেলে মানভাদার দলকে পরাজিত করেন। কারোয়াই – এর নবাব পুরস্কার বিতরণের সময় ধ্যানচাঁদকে ‘খিলাত’ দান করেন। দুবছর পরেই, ১৯৩৩ খ্রিঃ ঝাসী হিরোজ দলের হয়ে খেললেন শক্তিশালী ক্যালকাটা কাস্টমসের বিরুদ্ধে। যথারীতি জয়লাভ করে দলের জন্য নিয়ে এলেন বাইটন কাপ।

এই খেলাটি এমনই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে ধ্যানচাঁদ তার জীবনের সব থেকে স্মরণীয় খেলা হিসাবে এটিকে উল্লেখ করেন। সেদিন কাস্টমস দলের হয়ে খেলেছিলেন দিকপাল হকি খেলোয়াড়গণ — সৈকত আলী, আসাদ আলী, ডিফোল্টস, সিম্যান, মেগসিন প্রভৃতি। শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত এই দলকে পরাজিত করে সেদিন ধ্যানচাঁদ যে আনন্দ লাভ করেছিলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অন্য কোন খেলায়, এমনকি অলিম্পিকের বিভিন্ন খেলাতেও তেমন আনন্দ লাভের সুযোগ হয়নি। ওয়েস্টার্ন এশিয়াটিক গেমসে ১৯৩৪ খ্রিঃ ধ্যানচাঁদ ভারতীয় দলের অধিনায়কত্ব করেন।

১৯৩৫ খ্রিঃ ভারতীয় হকিদল নিউজিল্যান্ড সফরে গেল। অধিনায়ক হলেন ধ্যানচাঁদ। অপরাজিত দল নিয়ে সগৌরবে দেশে ফিরে এলেন তিনি। এই সফরে সর্বাপেক্ষা বেশি গোল করার সম্মানও ছিল তাঁরই। গোল করেছিলেন ২০১ টি। এরপর এল ১৯৩৬ খ্রিঃ অলিম্পিক। ভারতীয় হকি দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পড়ল ধ্যানচাঁদের ওপরে। এবারেও বিজয়ীর সম্মান লাভ করে পর পর তিনবার হকি খেলায় ভারতীয় দলকে বিশ্বক্রীড়াঙ্গনের সভায় শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করলেন ধ্যানচাঁদ।

এবারের সফরেও তিনি সর্বাপেক্ষা বেশি ৫৯ টি গোল করার কৃতিত্ব অর্জন করেন। ১৯৩৬ খ্রিঃ থেকে তিন বছর, ১৯৩৯ খ্রিঃ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর মধ্যেই ধ্যানচাঁদ তার হকি খেলা সীমাবদ্ধ রাখেন। ১৯৩৮ খ্রিঃ তিনি ভাইসরয়েস কমিশন লাভ করে জমাদার পদে উন্নত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল স্তিমিত হয়ে এলে ধ্যানচাঁদ সৈন্যবিভাগের হকি দল নিয়ে মণিপুর, বর্মা, দূরপ্রাচ্য এবং সিংহল সফর করেন। পূর্ব আফ্রিকা এশিয়ান স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের আমন্ত্রণ আসে ১৯৪৭ খ্রিঃ।

ধ্যানচাঁদের নেতৃত্বে ভারতীয় দলকে পূর্ব আফ্রিকা সফরে পাঠানো হয়। এই দল ২৮ টি খেলাতে অংশ গ্রহণ করে সবকটিতেই বিজয়ী হয়। ধ্যানচাঁদের অস্তায়মান প্রতিভার শেষ রশ্মিচ্ছটা বিচ্ছুরিত হয় নিউজিল্যান্ডের মাঠে। এই সফরে তিনি ৬১ টি গোল করে তার প্রতিভাদীপ্ত জীবনের শেষ স্বাক্ষর রেখে যান। প্রথম শ্রেণীর খেলা থেকে ধ্যানচাঁদ অবসর নেন ১৯৪৮ খ্রিঃ। ১৯৪৯ খ্রিঃ মে মাসে কলকাতায় লন্ডন অলিম্পিক বিজয়ী দলের সঙ্গে অবশিষ্ট দলের প্রদর্শনী খেলা হয়।

এই খেলায় অবশিষ্ট দলের অধিনায়ক হিসেবে ধ্যানচাঁদ অংশগ্রহণ করেন। এটিই তার জীবনের সর্বশেষ প্রদর্শনী খেলা এবং এরপরই তিনি প্রথম শ্রেণীর হকি খেলা থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। খেলার বিরতির সময় হকি অ্যাসোসিয়েশন ভারতীয় হকি ইতিহাসে ধ্যানচাঁদের অকৃপণ অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেন।

মেজর ধ্যানচাঁদ এর পুরস্কার ও সম্মান: Major Dhyan Chand’s Awards And Honors

কলকাতার মাঠে শেষ প্রদর্শনী খেলা থেকেই বলা যায় ধ্যানচাঁদ একরকম তার প্রিয় খেলা ত্যাগ করেন। উত্তরকালের খেলোয়াড়দের জন্য ধ্যানচাঁদ যে আহ্বান রেখে গেছেন তা হল “Keep the flag of India flying”। ধ্যানচাঁদ ১৯৪৬ খ্রি: সামরিক জীবনে কিংস কমিশন লাভ করে লেফটেন্যান্ট হন। ১৯৪৮ খ্রিঃ ক্যাপ্টেন ও পরে মেজর পদে উন্নীত হন। স্বাধীনতা লাভের পর ভারত তার এই অনন্য প্রতিভাধর খেলোয়াড়কে উপযুক্ত মর্যাদা দিয়ে খেলার জগতের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। ১৯৫৬ খ্রিঃ ভারত সরকার ভারতীয় হকির অবিস্মরণীয় প্রতিভা ধ্যানচাঁদকে পদ্মভূষণ উপাধিতে সম্মানিত করেন।

মেজর ধ্যানচাঁদ এর মৃত্যু: Major Dhyan Chand’s Death

৩ ডিসেম্বর ১৯৭৯ মেজর ধ্যানচাঁদ এর জীবনাবসান হয়।

Leave a Comment