ম্যালথাসের জনসংখ্যা বৃদ্ধি তত্ত্ব

ম্যালথাসের জনসংখ্যা বৃদ্ধি তত্ত্ব: কোনও দেশের জনসংখ্যা কিভাবে বৃদ্ধি পায় সে সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ রবার্ট ম্যালথাস ১৭৯৮ সালে “An Essay on the Principle of Population” নামক গ্রন্থে তার জনসংখ্যা বৃদ্ধি সম্পর্কীত তত্ত্বটি প্রকাশ করেন, যা ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্ব নামে পরিচিত। তিনি পশ্চিম ইউরোপীয় দেশ গুলির অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে ম্যালথাস তার জনসংখ্যা তত্ত্বটি প্রকাশ করেন। 

ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্বের মূল বক্তব্য

ম্যালথাসের তত্ত্বটি দুটি অনুমানের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত –

ক) মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের প্রয়োজন।

খ) নারী ও পুরুষের পারস্পারিক আকর্ষন ও সম্পর্ক অপরিবর্তনশীল।

ম্যালথাসের বক্তব্য হল – স্ত্রী পুরুষের মধ্যে পারস্পারিক আকর্ষনে জনসংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতি ২৫ বছরে জনসংখ্যা দ্বিগুণ হচ্ছে ।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য বদ্ধিত জনসংখ্যাকে বাচিয়ে রাখার জন্য খাদ্যের প্রয়োজন কিন্তু জমির পরিমান সীমিত থাকায় পরবর্তী সময়ে খাদ্যের উৎপাদন হারের তুলনায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি হয়।

ম্যালথাসের হিসাব অনুযায়ী খাদ্যের জোগান বৃদ্ধি পায় সমান্তরাল হারে (arithmetic rate), যেমন – ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯ ……….। অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় গুনোত্তর হারে (Geometric rate), যেমন –১, ২, ৪, ৮, ১৬, ৩২, ৬৪, ১২৮, ২৫৬ ………… । 

যদি জনসংখ্যা প্রতি ২৫ বছরে দ্বিগুণ হয় তাহলে ২০০ বছরে জনসংখ্যা ও খাদ্যের উৎপাদনের অনুপাত দাড়ায় ২৫৬ : ৯ । কয়েকশো বছর পর এই অনুপাত অকল্পনীয় অনুপাতে পৌছাবে।

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনে ম্যালথাসের মতামত

ম্যালথাস জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনের জন্য দুধরেনের প্রতিরোধের কথা বলেন –

১. প্রতিষেধক ব্যবস্থা (Preventive Checks) – মানুষ স্বেচ্ছা প্রণোদিত । মানুষ তার শিক্ষা, রুচি, সৎভাবনা এবং বেশি বয়সে বিবাহ, গর্ভ নিরোধক ব্যবহার, গর্ভপাত, বন্ধ্যাত্বতা  ও সামাজিক সম্পর্কের বাইরে নারী পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে না তোলাই জন্ম শাসনের উপায়।

২. অমোঘ ব্যবস্থা (Positive Checks) – জনসংখ্যা যদি মানুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়, তাহলে প্রকৃতি স্বাভাবিক উপায়ে  জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন করে । অর্থাৎ অমোঘ ব্যবস্থা বলতে ম্যালথাস মূলত প্রাকৃতিক ও আর্থ-সামাজিক প্রতিরোধকে বুঝিয়েছেন । 

প্রাকৃতিক প্রতিরোধ যেমন – বন্যা, খরা, ঘূর্নিঝর, ভূমিকম্প ইত্যাদি এবং আর্থ সামাজিক প্রতিরোধ বলতে -যুদ্ধ, দারিদ্রতা, রোগ, দুর্ভিক্ষ, মহামারি (করোনা অতিমহামারি), দাঙ্গা প্রভৃতি। ম্যালথাস প্রতিষেধক ব্যবস্থার তুলনায় অমোঘ ব্যবস্থাকে অনেক বেশি সক্রিয় মনে করেন।

সিদ্ধান্ত – ম্যালথাস জনসংখ্যা তত্ত্বে ৪ টি মূল সিদ্ধান্তের কথা বলেন।

১) জনসংখ্যার আয়তন নিয়ন্ত্রনের সাথে খাদ্যের জোগানের একটি প্রত্যক্ষ গভীর ও ঋনাত্মক সম্পর্ক রয়েছে।

২) খাদ্যের উৎপাদন বা সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি হলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, যত ক্ষন না এই বৃদ্ধি কোন নিয়ন্ত্রকের দ্বারা প্রতিহত হবে।

৩) শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ নৈতিক সংযম এবং সামাজিক সুঅভ্যাসের মাধ্যমে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে।

৪. জনসংখ্যার অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির হার খরা, বন্যা প্রভৃতি বিপর্যয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়।

সমালোচনা

ম্যালথাসের তত্ত্ব নানাদিক থেকে সমালোচিত হয়েছে। কার্ল মাস্ক ম্যালথাসের তত্ত্বের অন্যতম সমালোচক। এই তত্ত্বের দূর্বলতা গুলি হল –

১. ম্যালথাসের মতে নারী পুরুষের পারস্পারিক আকর্ষন জৈবিক সম্পর্ক নির্ভর। এই আকর্ষনের সাথে সন্তানের জন্মের কোন সম্পর্ক নেই।

২. ম্যালথাস আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে কৃষিজাত দ্রব্যের উৎপাদনের বিষয় টি চিন্তা করেন নি।

৩. ম্যালথাস অমোঘ ব্যবস্থার উপর বেশি গুরুত্ব দেন কিন্তু প্রতিষেধক পদ্ধতি যেমন – গর্ভনিরোধক ও পরিবার পরিকল্পনার উপর তেমন দৃষ্টিপাত করেন নি।

৪. প্রানীজগতের সংখ্যা বৃদ্ধির একটি জৈবিক বা জীবন বিজ্ঞান ভিত্তিক সিমা আছে। মানুষের ক্ষেত্রেও এই শর্ত কাজ করে।

৫. ম্যালথাসের মতে কোন দেশের জনসংখ্যা ২৫ বছরে দ্বিগুণ হয় কিন্তু আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ১০০ বছরে, ব্রিটিশ যুক্তরাষ্ট্রে ২৮০ বছরে জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। রাশিয়া, জার্মানির জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে আগামি কয়েকশো বছরেও জনসংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

Leave a Comment