মৃত্তিকা সংরক্ষণের উপায়

মৃত্তিকা সংরক্ষণের উপায়: মৃত্তিকা বা ভূমিক্ষয়ের ফলে মৃত্তিকার উপরিস্থিত উর্বরস্তর অপসারিত হয়, ফলে মৃত্তিকার উৎপাদিকা শক্তি হ্রাস পায় এবং লক্ষ লক্ষ হেক্টর জমি পতিত জমিতে পরিনত হয়। মৃত্তিকার ক্ষয় ও গুনগত মানের অবনমনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মৃত্তিকা সংরক্ষণের প্রয়োজন।বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম উপায় গ্রহনের মাধ্যমে মৃত্তিকা ক্ষয় রোধ করার পদ্ধতিকেই মৃত্তিকা সংরক্ষন বলে।বিভিন্ন উপায়ে ভূমিক্ষয় রোধ করা সম্ভব। মৃত্তিকা সংরক্ষণের উপায় গুলি হল – 

বনভূমি সৃষ্টি – উদ্ভিদের শিকড় এক দিকে যেমন মৃত্তিকাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে থাকে, অন্যদিকে পৃষ্টপ্রবাহ রোধ ও বৃষ্টির ফোঁটার আঘাত থেকে মৃত্তিকাকে প্রতিহত করে মৃত্তিকা ক্ষয় নিবারন করে। তাই জলপ্রবাহ ও বায়ু প্রবাহ জনিত মৃত্তিকা ক্ষয়ের পরিমান হ্রাস পায়। এসব কারণে বনভূমি নষ্ট না করে প্রয়োজন মতো নতুন বনভূমি সৃষ্টি করে মৃত্তিকা ক্ষয় প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। 

ধাপ চাষ – পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ের ঢাল বরাবর সিঁড়ির মতো ধাপ কেটে চাষ করার অন্যতম পদ্ধতি হল ধাপ চাষ। এই ধাপ চাষের ফলে পাহাড়ের ঢাল বরাবর বৃষ্টির জল অতি দ্রুত নিচে গড়িয়ে যেতে পারে না বলে মৃত্তিকা ক্ষয় কম হয়। 

ফালি চাষ – মাঝারি ঢালু পাহাড়ি অঞ্চল গুলিতে পাহাড়ের ঢাল বরাবর সমান্তরাল সারিবদ্ধ ভাবে পরপর  শস্যের চাষ কে ফালি চাষ বলে। সাধারণত যে সমস্ত অঞ্চলে জমি গুলি সমভাবে একই দিকে বিস্তৃত , সেই সমস্ত স্থানে মৃত্তিকা ক্ষয় রোধের অন্যতম পদ্ধতি হল ফালি চাষ। 

সমোন্নতি চাষ – এটিও পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিক্ষয় রোধে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে অনেক দূর অবধি বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চলের সমান উচ্চতা যুক্ত অঞ্চল গুলি চিহ্নিত করে সেই ঢাল বরাবর বাঁধ নির্মান করা হয়। এভাবে সমোন্নতি রেখা বরাবর সৃষ্ট দুটি বাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে জলসঞ্চয় করে চাষ করার পদ্ধতিকে সমোন্নতি চাষ বলে। এই বাঁধ দিয়ে মৃত্তিকা ক্ষয় কে ব্যাপক আকারে রোধ করা সম্ভব হয়। 

মালচিং পদ্ধতির ব্যবহার – শুষ্ক অঞ্চল গুলিতে মৃত্তিকা ক্ষয় রোধ ও মৃত্তিকার আর্দ্রতা রক্ষা করার অন্যতম পন্থা হল মালচিং পদ্ধতির ব্যবহার। এক্ষেত্রে জমির ফসল উত্তোলনের পর ফসলের অবশিষ্টাংশ বা গাছের ডালপালা ও আগাছা জমির উপর বিছিয়ে রাখা হয়, যেন সূর্য তাপে মৃত্তিকা মধ্যস্থিত জল বাষ্পীভূত না হতে পারে। 

খাত ও নালি ক্ষয় নিবারন – ভঙ্গুর গঠন যুক্ত ভূমিভাগ গুলি বৃষ্টিপাত জনিত খাত ও নালি ক্ষয়ের দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষয় প্রাপ্ত হয়। সেই সমস্ত স্থানে খাত ও নালি ক্ষয়কে নিবারনের জন্য খাত বরাবর বাঁধ নির্মান, খাতের ঊর্ধ্বাংশে মৃত্তিকার দেওয়াল নির্মান ও খাতের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ঝোপঝাড় সৃষ্টি করলে খাত জনিত মৃত্তিকা ক্ষয় কম হয়। 

নদীর পাড় ভাঙন রোধ – নদীর পাড় ভাঙন প্রতিরোধ করার জন্য নদীর পাড় বরাবর কংক্রিটের বাঁধ নির্মান, বোল্ডার দ্বারা পাড় বাঁধন এবং অনেক সময় বালির বস্তা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। 

পাটজাত পদার্থের ব্যবহার – পাট একটি জৈব পদার্থ হওয়ায় পরিবেশের তেমন একটা ক্ষতি করে না বলে পাটের তৈরি বস্তা মাটির ঢালু অংশে বিছিয়ে দিয়ে মৃত্তিকা ক্ষয় রোধ করা যায়। 

পশুচারন নিয়ন্ত্রন – পশুচারন নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে মৃত্তিকা ক্ষয় কমানো সম্ভব। কারণ পশুচারন কম হলে মৃত্তিকায় তৃণ ও অন্যান্য উদ্ভিদের আবরন বেড়ে যায়, পশুর পায়ের আঘাতে মৃত্তিকা আলগা হওয়ার পরিমান হ্রাস পায়। এভাবে নিয়ন্ত্রিত পশুচারন মৃত্তিকা ক্ষয় কে নিয়ন্ত্রন করতে সাহায্য করে। 

ঝুমচাষ নিষিদ্ধ করন – পাহাড়ি অঞ্চলে বন জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে প্রাচীন পদ্ধতিতে চাষবাস কে ঝুমচাষ বলে। এই ক্ষেত্রে বনভূমি কেটে চাষ করা হয় বলে ভূমি উন্মুক্ত হয়ে বায়ু ও জলপ্রবাহ দ্বারা ক্ষয় হয়ে যায়। তাই যে সব অঞ্চলে এই ঝুমচাষ করা হয় তা বন্ধ করতে পারলে ভূমিক্ষয়ের পরিমান হ্রাস পায়।

শস্যাবর্তন – একই জমিতে পর্যায় ক্রমে বিভিন্ন ফসলের চাষ করলে একদিকে যেমন মৃত্তিকার উর্বরতা বজায় থাকে, ঠিক তেমনি সারা বছর ধরে ফসল উৎপাদন করা হয় বলে জমি কখনো খালি পড়ে থাকে না, তাই বৃষ্টি ও বায়ুর দ্বারা মৃত্তিকা ক্ষয়ের পরিমান কমে যায়। 

Leave a Comment