বাংলার নমঃশূদ্র আন্দোলন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।

বাংলার নমঃশূদ্র আন্দোলন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।

বাংলার নমঃশূদ্র আন্দোলন ভূমিকা

নমঃশূদ্র হলো হিন্দু সমাজের একটি বড় জনগোষ্ঠী। 1911 খ্রিষ্টাব্দের জনগণনায় বাংলার প্রাচীনতম অধিবাসী চন্ডালদের নমঃশূদ্র নামে অভিহিত করা হয়। এদের আদি বাসস্থান ছিল পূর্ববঙ্গের যশোর, খুলনা, বরিশাল, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও ফরিদপুর জেলায়। জনসংখ্যার বিচারে হিন্দু সমাজের কৃষিজীবী নমঃশূদ্ররা দ্বিতীয় স্থানাধিকারী হলেও শিক্ষা, সম্পত্তি, মন্দিরে প্রবেশ, সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদান প্রভৃতি অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত ছিল। এরা ছিল উচ্চবর্ণের অত্যাচার ও শোষণের শিকার। শতশত বছর ধরে এই শোষণ ও মর্যাদা হানির বিরুদ্ধে নমঃশূদ্ররা যে আন্দোলন সংঘটিত করেছিল, তা নমঃশূদ্র আন্দোলন নামে পরিচিত।

নমঃশূদ্র আন্দোলনের সূচনা

উচ্চবর্ণের হিন্দুদের ঘৃণা, শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাংলায় 1872-1947 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নমঃশূদ্র আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। 1872 খ্রিস্টাব্দে এক বিশিষ্ট নমঃশূদ্রের মায়ের শ্রদ্ধানুষ্ঠানে উঁচু জাতের হিন্দুরা যোগদান করতে অস্বীকার করলে নমঃশূদ্ররা উঁচু জাতের মানুষদের সঙ্গে সমস্ত রকম সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং উঁচু জাতের ঘরে কোনরকম কাজ করতে অস্বীকার করে। এভাবে নমঃশূদ্র আন্দোলনের সূচনা হয়। যদিও প্রথম দিককার এই আন্দোলন স্থায়ী হয়নি।

সভা সমিতি গঠন

1902 খ্রিস্টাব্দে নমঃশূদ্ররা আন্দোলন পরিচালনার জন্য উন্নয়নী সভা প্রতিষ্ঠা করে। আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য যাত্রা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এবং প্রতি পরিবার থেকে ‘মুষ্ঠি সংগ্রহের’ ব্যবস্থা করা হয়। এরপর পূর্ববঙ্গের নিপীড়িত নমঃশূদ্র সম্প্রদায়কে নতুন জীবন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করে তাদের মধ্যে আত্মশক্তি ও আত্মমর্যাদা বোধের বিকাশ ঘটান হরিচাঁদ ঠাকুর নামক এক ব্যক্তি। তিনি মতুয়া ধর্ম প্রবর্তন করেন এবং মতুয়া মহা সংঘ গড়ে তোলেন। তার পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর মতুয়া আন্দোলনকে আরো জোরদার করে তোলেন। গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে নমঃশূদ্র আন্দোলন ক্রমশ রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ ধারণ করে। 1912 খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বেঙ্গল নমঃশূদ্র অ্যাসোসিয়েশন। এছাড়া নমঃশূদ্র আন্দোলনের অঙ্গ হিসাবে নিখিল বঙ্গ নমঃশূদ্র সমিতি, বেঙ্গল ডিপ্রেসড ক্লাস অ্যাসোসিয়েশন, ইন্ডিপেন্ডেন্ট কাস্ট পার্টি ইত্যাদি সংগঠন স্থাপিত হয়। হরিচাঁদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুর ছাড়াও প্রমথরঞ্জন ঠাকুর, যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল, বিরাট চন্দ্র মন্ডল, মুকুন্দ বিহারী মল্লিক প্রমুখ ব্যক্তি এই সমস্ত সংগঠন ও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

সামাজিক আন্দোলন

নমঃশূদ্ররা সামাজিক আন্দোলনের অঙ্গ হিসাবে তাদের অসম্মানজনক চন্ডাল নামের পরিবর্তে সরকারের কাছে নমঃশূদ্র নামের অনুমোদন চায়।1911 খ্রিস্টাব্দের আদমশুমারিতে তাদের চন্ডাল নাম মুছে যায়। তাদের এই দাবির সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এবং উচ্চ বর্ণের ক্ষমতার প্রতীকগুলিকে অর্থহীন করে দিতে তারা বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক রীতিনীতি চালু করে। তারা নিজেদের ব্রাহ্মণ বলে দাবি করে ও তার সাপেক্ষে প্রমাণ দাখিল করে, ব্রাহ্মণদের মতো উপবীৎ ধারণ করা শুরু করে, পরিবারের মহিলাদের বাজারে যাওয়া বন্ধ করে এবং 11 দিন অশৌচ পালন করে। আসলে তারা সমাজের উঁচু-নিচুর বিভেদ দূর করতে চেয়েছিলো।

অর্থনৈতিক আন্দোলন

নমঃশূদ্ররা সামাজিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতিতেও সচেষ্ট হয়।তারা বুঝতে পারে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির জন্য শিক্ষা ও চাকরির প্রয়োজন। এই আন্দোলনের অন্যতম নেতা গুরুচাঁদ ঠাকুর বলেন, “বাঁচি কিংবা মরি তাতে ক্ষতি নেই, গ্রামে গ্রামে পাঠশালা চাই।” তার উদ্যোগে বাংলার বিভিন্ন স্থানে 3952টি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষা ছাড়াও চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের জন্য নমঃশূদ্র নেতারা সরকারের কাছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দাবি করেন।

রাজনৈতিক আন্দোলন

সামাজিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি নমঃশূদ্ররা রাজনৈতিক আন্দোলনেও অংশগ্রহণ করে। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন মূলক প্রতিষ্ঠানগুলিতে তারা নিজেদের প্রতিনিধিত্ব দাবি করে।1919 খ্রিষ্টাব্দের মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার আইনে বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় অনুন্নত সম্প্রদায়ের একজন প্রতিনিধি নির্বাচনের নীতি স্বীকৃত হয়।1935 খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইনে আইনসভায় বাংলার দলিত সম্প্রদায়ের জন্য 20% আসন সংরক্ষিত হয়।

মূল্যায়ন

সামাজিক মর্যাদা লাভের উদ্দেশ্যে নমঃশূদ্র আন্দোলন শুরু হলেও বিভিন্ন সময় তা বিভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। ব্রিটিশ শাসনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে নমঃশূদ্র নেতারা স্বদেশী আন্দোলন, হোমরুল আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন, ভারত ছাড়ো আন্দোলন প্রভৃতি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডোনাল্ডের সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। অবশ্যই নিজেদের অধিকার আদায়ের উদ্দেশ্যে নমঃশূদ্র নেতারা তাদের আন্দোলনকে কখনো জাতিভিত্তিক, কখনো সাম্প্রদায়িক, আবার কখনো বা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পথে পরিচালিত করেছিল।1947 খ্রিস্টাব্দে দেশভাগের পর নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষেরা উদ্বাস্তু হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।

Leave a Comment