নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন – নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের নেতা কে?

নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন – নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের নেতা কে?: নর্মদা বাঁধ বিরোধী আন্দোলনকে বর্তমান সময়ের সর্বাধিক উদযাপিত বাঁধ বিরোধী আন্দোলন হিসাবে ভূষিত করা হয়। ২০০৬ সালের ৮ ই মার্চ Narmada Control Authority কে নর্মদা বাঁধের সর্দার সরোবর জলাধারের বর্তমান উচ্চতা ১১০.২৬ মিটার থেকে বাড়িয়ে ১২১.৯২ মিটার করার নির্দেশ দেওয়া হয়। যা নর্মদা প্রকল্পের পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে আবার বিতর্কের সূচনা করে।

যে সমস্ত গ্রুপ গুলি নর্মদা বাঁধের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হল Narmada Bachao Andolan (NBA)। এই সংগঠনটি Right Livelihood Award জিতেছিল, যা নোবেল পুরস্কারের পরিপূরক বা বিকল্প নামে পরিচিত। NBA নর্মদার উপর প্রকল্পিত  ৯০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বহুমুখী নদী পরিকল্পনার বিরোধিতা করার সর্বাত্মক প্রচেষ্ঠা করেছিল। 

পটভূমি 

নর্মদা ভারতের বৃহত্তম পশ্চিমবাহী নদী। ১৩০০ কিলোমিটার ব্যাপী বিস্তৃত নর্মদা নদী মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাটের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সবশেষে আরব সাগরে পতিত হয়েছে। নর্মদা নদী উপত্যকার উন্নয়নের জন্য ১৯৪০ এর দশক থেকেই প্রাথমিক ভাবে পর্যালোচনা শুরু হয় এবং ১৯৫০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ১৫ টি জায়গা চিহ্নিত করা হয় বাঁধ নির্মানের জন্য। ১৯৬২ সালে জওহরলাল নেহেরু সর্দার সরোবর প্রকল্পের শিলান্যাস করেন। এই প্রকল্পের অধীনে ৩০ টি বৃহৎ বাঁধ, ১৩৩ টি মাঝারি বাঁধ ও ৩০০০ টি ছোট বাঁধ এবং এর সাথে ৭৫০০০ কিলোমিটার ব্যাপী বিস্তৃত ক্যানেল নেটওয়ার্ক নির্মানের পরিকল্পনা করা হয়। প্রকল্পটির বিশালতা বিবেচনা করে লেখক Claude Alvares এটিকে “পৃথিবীর সর্বাধিক পরিকল্পিত পরিবেশ বিপর্যয়” হিসাবে গন্য করেন। 

বর্তমান সময়ে দুটি বৃহৎ বাঁধ যা বিতর্কের মূল কেন্দ্র বিন্দু হিসাবে বিবেচ্য, যার মধ্যে একটি হল মধ্যপ্রদেশের  Narmada Sagar Project (NSP) এবং অপরটি হল গুজরাটের Sardar Sarovar Project (SSP)। এগুলির মধ্যে সর্দার সরোবর প্রকল্প ভারতের অন্যতম বৃহত্তম জলাধার নির্মান মূলক প্রকল্প। গুজরাটের রাজ্য সরকার সর্দার সরোবর প্রকল্প নির্মানের পক্ষপাতি ছিলেন কারণ এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট ও রাজস্থানের প্রায় ২.২৭ মিলিয়ন হেক্টর জমি জলসেচ করা সম্ভব হবে। এছাড়া এই দুটি প্রধান বাঁধের দ্বারা বন্যা নিয়ন্ত্রন করাও সম্ভব। 

এই সব উপকারিতা সত্ত্বেও নর্মদা প্রকল্পের পরিবেশগত বিরুপ বা ক্ষতিকারক প্রভাব গুলি অগ্রাহ্য করা যায় না।কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড়ো বড়ো বাঁধের পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উপর প্রভাব বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা গেছে যে, বৃহৎ আকৃতির বাঁধ পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের উপর গভীর প্রভাব ফেলে থাকে। ঠিক একই ভাবে নর্মদা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উদ্ভিদ ও প্রানী কুল ধ্বংস হবে, জলাবদ্ধতার মাধ্যমে বিস্তৃর্ন অঞ্চলের মাটির লবনতা বৃদ্ধি পাবে ও জলবাহিত রোগের প্রবনতা বৃদ্ধি পাবে ও আরো অন্যান্য সমস্যার সৃষ্টি হবে। 

পরিবেশগত প্রভাব ছাড়া এই প্রকল্পের ফলে প্রচুর পরিমান মানুষ তাদের বাসস্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হবে। এই প্রকল্পের বিরোধীরা দাবি করেন যে সর্দার সরোবর বাঁধ তৈরি হলে ২৯৭ টি গ্রাম প্লাবিত হবে, যার ফলে এই সব গ্রামে বসবাসকারী মানুষরা তাদের বাস্তুস্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হবে। অনেকে আবার দামি করেন যে নর্মদার সব প্রকল্প গুলি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২০ লক্ষ মতো মানুষ উৎখাত হবে এবং তাদের বেশির ভাগটাই আদিবাসী শ্রেনীর মানুষ। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই সব বাস্তুচ্যুত মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য তেমন কোন নীতি বা পরিকল্পনা ছিল না। যার ফলস্বরূপ শক্তিশালী আন্দোলনের সূচনা হয়। 

নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের বিবর্তন

প্রাথমিক পর্যায়ে এই প্রকল্পের তাৎক্ষনিক কোন বিরোধীতা হয়নি। ১৯৭৭ সালে মধ্যপ্রদেশের নিমাদ নামক অঞ্চলের গ্রামবাসীরা সর্বপ্রথম সর্দার সরোবর বাঁধের নির্মান জনিত কারণে উচ্ছেদের সম্ভাবনাকে পরিলক্ষিত করে প্রতিবাদ শুরু করেন। ১৯৮০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিভিন্ন মধ্যম বর্গীয় পরিবেশকর্মী ও NGO এই নর্মদা প্রকল্পটি নিয়ে কাজ করতে শুরু করে। নিম্নস্তর থেকে পর্যালোচনা করার পর তারা অনুমান করতে সক্ষম হয় যে এই প্রকল্পের ফলে প্রচুর মানুষের স্থানচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাই তারা আগে থেকেই সমস্ত মানুষদের স্থানচ্যুতি সম্পর্কে সচেতন করতে শুরু করেন এবং তাদের পুনর্বাসনের নীতি গুলি সংশোধনের একত্রিত আন্দোলন শুরু করেন।  

১৯৮৫ সাল থেকে বাঁধ বিরোধী আলোড়ন ঘনীভূত হতে শুরু করে যখন থেকে মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশে সর্দার সরোবর বাঁধ ও নর্মদা সাগর বাঁধ নির্মানের প্রতিবাদে ‘do or die’ আন্দোলনের সূচনা হয়। 

নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের উৎপত্তি

১৯৮৯ সাল নাগাদ Narmada Dharangrast Samiti, Maharashtra Ghati, Navnirman Samiti, Narmada Asargrasta Sangharsha Samiti ও আরো কিছু সংগঠন একত্রিত হয়ে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন (NBA) সংগঠন স্থাপন করেন। অন্যদিকে অপর এক সংগঠন Arch-Vahini রাজ্য সরকার কে এই প্রকল্পে প্রভাবিত মানুষদের পুনর্বাসনে সাহায্য করতে থাকে। কিন্তু নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন সংগঠন সঠিক ভাবে পুনর্বাসনের দাবিতে অনড় থেকে বাঁধ বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। 

নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন মেধা পাটেকর। যার নেতৃত্বে এই আন্দোলন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সমর্থন অর্জন করেন। এই নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনে মেধা পাটেকরের ভূমিকা বর্ননা করার মতো। মেধা পাটেকর প্রথমবার নর্মদা উপত্যকায় এসেছিলেন একজন সামাজিক কর্মী ও গবেষক হিসাবে। তাকে মুম্বাই এর Tata Institute of Social Science থেকে নর্মদা উপত্যকায় নির্মিত সর্দার সরোবর বাঁধের সমস্যা গুলি তুলে ধরার জন্য নিয়োগ করা হয়। কিন্তু মেধা পাটেকার যত তার গবেষণার কাজ করতে থাকে তত তিনি গরীব আদিবাসী শ্রেনীর মানুষদের জীবন ও সমস্যা নিয়ে আগ্রহী হয়ে পরেন। পরবর্তী কালে তিনি তার গবেষণা ছেড়ে দিয়ে এই নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনে অংশ গ্রহন  করেন। তার অসাধারন নেতৃত্ব দানের ক্ষমতার জন্য অনেক স্থানীয় মানুষ তার সাথে এই আন্দোলনে যুক্ত হন। 

১৯৮৯ সালে NBA এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করেন। এই সমাবেশে বাবা আমটে, সুন্দরলাল বহুগুনার মতো প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ অংশ গ্রহন করেন। 

১৯৯০ সালে NBA এই প্রকল্পটি স্থগিতের দামি জানায়। আন্দোলন ও বিক্ষোপের দ্বারা NBA, সর্দার সরোবর বাঁধে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্র টারবাইন কেনার জন্য জাপবারা,বিনিয়োগ করা ২০০ মিলিয়ন ডলার বাতিল করতে সক্ষম হয়। এরপর NBA  এর সদস্যরা ১৯৯০ সালের মে মাসে দিল্লির গোল মিথি চকে ধর্নায় বসেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী V.P. Singh এর প্রতিশ্রুতিতে তারা এই ধর্না তুলে দেন। 

তারপর ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসে NBA মধ্যপ্রদেশের রাজঘাট থেকে একটি বাঁধ নির্মান কেন্দ্র মোর্চা বের করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল  সত্যাগ্রহ পদ্ধতিতে শারীরিক উপস্থিতির মাধ্যমে বাঁধ নির্মানের কাজ বন্ধ করা কিন্তু সেই মোর্চাটি গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় থামিয়ে দেওয়া হয়।

বিশ্ব ব্যাঙ্কের আর্থিক সহায়তা প্রত্যাহার

যারা নর্মদা প্রকল্পের জন্য তাদের বাসস্থান থেকে উৎখাত হয়েছিল, তাদের জন্য পূনর্বাসনের কোন রকম পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়নি, তা জেনেও বিশ্ব ব্যাঙ্ক ১৯৮৫ সালে সর্দার সরোবর বাঁধ প্রকল্পের জন্য অর্থনৈতিক সাহায্য প্রদান করেছিল। যা ছিল বিশ্ব ব্যাঙ্কের নীতির বিপরীত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বাঁধটির ক্রমবর্ধমান বিরোধীতাকে লক্ষ্য করে বিশ্ব ব্যাঙ্ক ১৯৯১ সালে Bradford Morse এর নেতৃত্বে একটি উচ্চ পদস্থ দল গঠন করেন ব্যাপারটি তদন্তের জন্য। ১৯৯২ সালে তদন্ত কমিটি তাদের রিপোর্ট পেশ করেন, যেখানে প্রকল্পটির সমালোচনা করা হয়। তারপর NBA এবং আরো কিছু আন্তর্জাতিক NGO, যেমন – Green Peace International, Friends of the Earth and the US-based Environmental Defence Fund বিশ্ব ব্যাঙ্কের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। যার ফলসব্রুপ বিশ্ব ব্যাঙ্ক ১৯৯৪ সালে তাদের দ্বারা বরাদ্দকৃত  তহবিল প্রত্যাহার করে নেন। 

যদিও আন্দোলনটি তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য বাঁধ নির্মান বন্ধ করা, তাতে ব্যর্থ হয়েছে, তা সত্ত্বেও এটি অসাধারণ সফলতা অর্জন করেছে। এই আন্দোলন দেখিয়েছে যে, সাধারন মানুষ যদি সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে কাজ করে তাহলে যে কোন প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করতে সক্ষম। এই ভাবেই নর্মদা আন্দোলন বিশ্বের অন্যান্য পরিবেশ আন্দোলনের অনুপ্রেরনার উৎস হিসাবে কাজ করেছে। 

Leave a Comment