প্রফুল্ল চাকী জীবনী | Prafulla Chaki Biography in Bengali

প্রফুল্ল চাকী জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Prafulla Chaki Biography in Bengali. আপনারা যারা প্রফুল্ল চাকী সম্পর্কে জানতে আগ্রহী প্রফুল্ল চাকী র জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

প্রফুল্ল চাকী কে ছিলেন? Who is Prafulla Chaki?

প্রফুল্ল চাকী (১০ ডিসেম্বর ১৮৮৮ – ২ মে ১৯০৮) ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা ও অগ্নিযুগের বিপ্লবী ছিলেন। পূর্ববঙ্গে জন্ম নেওয়া এই বাঙালি বিপ্লবী তৎকালীন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং জীবন বিসর্জন করেন।

প্রফুল্ল চাকী জীবনী – Prafulla Chaki Biography in Bengali

নামপ্রফুল্ল চাকী
জন্ম10 ডিসেম্বর 1888
পিতারাজনারায়ণ চাকী
মাতাস্বর্ণময়ী দেবী
জন্মস্থানবগুড়া জেলা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমানে বাংলাদেশে)
জাতীয়তাভারতীয়
পেশাভারতীয় বিপ্লবী
মৃত্যু1 মে 1908 (বয়স 19)

প্রফুল্ল চাকী র জন্ম: Prafulla Chaki’s Birthday

প্রফুল্ল চাকী 10 ডিসেম্বর 1888 জন্মগ্রহণ করেন।

বীর বিনায়ক রাও দামোদর সাভারকর মহারাষ্ট্রে গুপ্ত সমিতি আন্দোলন সংগঠন করেন প্রথম। কিন্তু বাংলাও কিছু পিছিয়ে থাকেনি এ ব্যাপারে। দেখতে দেখতে হু হু করে গুপ্তসমিতি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে শহরে গ্রামে। যুগান্তর দলের কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হল কলকাতার মানিকতলাতে।

বারীন ঘোষ, অবিনাশ ভট্টাচার্য, উল্লাসকর দত্ত, হেমচন্দ্র দাস, উপেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, হৃষীকেশ কাঞ্জিলাল প্রভৃতি এই দলের খুস্ই সক্রিয় কর্মী। দলের শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য তাঁরা চারদিক থেকে বাছাই করে করে কর্মী সংগ্রহ করছেন। অল্পসময়ের মধ্যেই বাংলা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অনেক দেশপ্রাণ স্বাধীনতাকামী বীর যুবক গুপ্ত সমিতিতে প্রবেশ করলেন। দলের আদর্শ ও উদ্দেশ্য প্রচারের জন্য একটি সাপ্তাহিক মুখপত্র প্রকাশিত হল। পত্রিকার নাম যুগান্তর। মুখপত্রের নাম যুগান্তর হওয়ার জন্য এই দলটি যুগান্তর দল নামেই পরিচিতি লাভ করেছিল।

বাংলায় প্রথম গুপ্ত সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯০২ খ্রিঃ। তার নাম হয়েছিল অনুশীলন সমিতি। ব্যারিষ্টার পি.মিত্র ছিলেন অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের অনুশীলনবাদের জীবন – দর্শনের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়েই নৈহাটীর বাসিন্দা পি.মিত্র গুপ্ত সমিতির নামকরণ করেছিলেন অনুশীলন সমিতি। এই গুপ্ত সমিতিগুলিতে কুস্তি, লাঠিখেলা, কসরৎ, অসিখেলা, পিস্তল ছোঁড়া ইত্যাদি গোপনে শিক্ষা দেওয়া হত। ঘোড়া চড়া শিক্ষা দেবার ব্যবস্থাও কোন কোন দলে থাকত। এসব দলের খরচ – পত্র চালাবার জন্য সমদরদীদের কাছ থেকে কিছু কিছু চাঁদা আদায় করা হত।

বারীন ঘোষ রংপুর থেকে প্রফুল্ল চাকীকে কলকাতার সমিতিতে এনে বিশেষ উদ্দেশ্যে তালিম দিতে শুরু করলেন। প্রফুল্ল অবশ্য তার আগেই নিজেকে যথেষ্ট এগিয়ে রেখেছিলেন বিপ্লব আন্দোলনের কাজে।

প্রফুল্ল চাকী র পিতামাতা ও জন্মস্থান: Prafulla Chaki’s Parents And Birth Place

১৮৮৮ খ্রিঃ রংপুরে জন্ম গ্রহণ করেন প্রফুল্ল চাকী। তাঁর পিতার নাম রাজনারায়ণ চাকী। তাঁদের আদি নিবাস ছিল বগুড়ার বিহারগ্রামে। রংপুরে স্কুলে পড়ার সময়েই বাড়িতে কুস্তির আখড়া তৈরি করেছিলেন প্রফুল্ল। সমবয়সীদের সঙ্গে কুস্তি ও নানাবিধ কসরৎ চর্চা করে তিনি শরীর গঠনে মনোযোগী হয়ে উঠেছিলেন। আসলে সেই সময়টা ছিল পরাধীন জাতির জাগরণের যুগ।

দেশের জনগণের স্বাধীন সত্তা ইংরাজের শাসন শোষণ ভেদ করে বেরিয়ে আসার জন্য আকুল হয়ে উঠেছে। শহর ও গ্রামের পরিবেশেও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠছিল। ফলে সেই পরিবেশে দেশ থেকে ইংরাজ বিতাড়নের একটা উন্মাদনা বালক বা কিশোরদের মনেও আপনা আপনি সঞ্চারিত হয়ে পড়ত।

প্রফুল্ল চাকী র শিক্ষাজীবন: Prafulla Chaki’s Educational Life

স্বাধীনতাকামী কিশোর প্রফুল্ল স্কুলের পাঠ শেষ হবার আগেই ১৯০৩ খ্রিঃ বান্ধব সমিতিতে যোগদান করে সমাজ সেবার কাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন। ক্রমে তিনি বিপ্লবী দলের সক্রিয় কর্মী হন। স্বদেশী আন্দোলনের সময় রংপুরে জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রফুল্ল বিদ্যালয়ের ছাত্রদের লাঠিখেলা ও মুষ্টিযুদ্ধ শিক্ষার দায়িত্ব নেন। তাঁর উপযুক্ত শিক্ষায় ছাত্ররা নিয়মনিষ্ঠ ও শৃঙ্খলাপরায়ণ হয়ে সৈনিকের মত গড়ে ওঠে।

১৯০৬ খ্রিঃ শেষ দিকে বিপ্লবী বারীন ঘোষের সঙ্গে প্রফুল্লর সাক্ষাৎ হয়। তাঁর সাহসিকতা, উদ্যম ও স্বদেশচেতনার পরিচয় পেয়ে তিনি তাঁকে কলকাতায় যুগান্তর দলের কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। সেই সময়ে অত্যাচারী রামফিল্ড ফুলার ছিলেন পূর্ববঙ্গের ছোটলাট। কিছুদিনের মধ্যেই প্রফুল্লকে ফুলার হত্যার কাজে নিয়োজিত করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ফুলার রক্ষা পেয়ে যান।

প্রফুল্ল চাকী র কর্ম জীবন: Prafulla Chaki’s Work Life

তারপর থেকে প্রফুল্ল মানিকতলার বোমার আড্ডায় এসে বাস করতে থাকেন। ১৯০৮ খ্রিঃ কলকাতায় প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অন্যায়ভাবে শাস্তি দেওয়া, বিশেষ করে বিপ্লবী বালক সুশীল সেনকে বেত্রদন্ড দেওয়া ইত্যাদি কুকর্মের জন্যই বিপ্লবীরা কুখ্যাত কিংসফোর্ডকে শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিংসফোর্ডকে নিরাপদ করার জন্য ইংরাজ সরকার তাকে মজঃফরপুরে বদলি করে কলকাতা থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়।

দলনেতার নির্দেশে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল উপযুক্ত প্রস্তুতি সহ মজঃফরপুরে আসেন। তারা প্রথমে একটা ধর্মশালায় উঠে কয়েকদিন কাটান কিংসফোর্ডের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। ইউরোপীয় ক্লাবের অদূরেই কিংসফোর্ডের আবাস। এখানে তাস খেলতে আসা ছাড়া তিনি আবাস ছেড়ে বাইরে কোথাও যান না। প্রফুল্ল ও ক্ষুদিরাম ক্লাবের কাছেই আত্মগোপন করে রইলেন।

১৯০৮ খ্রিঃ ৩০ শে এপ্রিল বৃহস্পতিবার। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ দেখা গেল কিংসফোর্ডের ফিটন গাড়িটি গেট দিয়ে বেরিয়ে আসছে। সহসা মজঃফরপুর শহর কাঁপিয়ে বোমা বিস্ফোরণের শব্দ হল। একরাশ ধোঁয়ার কুন্ডলীর মধ্যে বিধ্বস্ত ফিটন উল্টে পড়ল। সেদিন কিংসফোর্ডকে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই বোমা নিক্ষেপ হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে রক্ষা পেয়ে গিয়েছিলেন কিংসফোর্ড। গাড়িতে তিনি ছিলেন না। ছিলেন মিসেস ও মিস কেনেডি।

প্রফুল্ল ও ক্ষুদিরাম ভুল করে তাদেরই বোমা মেরে নিহত করেছিলেন। বোমা নিক্ষেপ করেই দুজন ছুটে চললেন রেল লাইন ধরে। কেউ কারো পরিচয় জানতেন না। বিপ্লবী দলের মন্ত্রগুপ্তি অনুসরণ করে ক্ষুদিরাম জানতেন তার সঙ্গীর নাম দীনেশ রায়। প্রফুল্ল জানতেন তার সঙ্গীটি হরেন সরকার ছাড়া কেউ নন। ক্ষুদিরাম চলে গিয়েছিলেন ওয়াইনী স্টেশনের দিকে। আর প্রফুল্ল দৌড়েছিলেন চল্লিশ মাইল দূরবর্তী সমস্তিপুরের দিকে। রাতটা দুজনেরই দুই পথে টানা হাঁটার ওপরে কেটেছে।

পরদিন সকালে ওয়াইনী স্টেশেনে পৌঁছে ক্ষুদিরাম ধরা পড়েছিলেন দুই কনস্টেবল ফতে সিং আর শিবপ্রসাদ মিশ্রর হাতে। প্রফুল্ল নিরাপদেই পৌঁছেছিলেন সমস্তিপুর স্টেশনের কাছে। রেল কোয়ার্টারের পাশ দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে চললেন স্টেশনের দিকে। এমনি সময়ে বাধা দিলেন একজন সুপুরুষ বাঙ্গালী যুবক। স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই প্রফুল্লকে বারণ করলেন স্টেশনের দিকে যেতে। বললেন, সময় হলে আমিই আপনাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসব। এখন আমার সঙ্গে আসুন।

অচেনা যুবকের আগ্রহ লক্ষ করে পকেটে রাখা পিস্তলে হাত ছোঁয়ালেন প্রফুল্ল। কিন্তু যুবকের সহজ সরল আন্তরিকতাকে তিনি অবিশ্বাস করতে পারলেন না। অচেনা যুবকটি মুখে কোন কৌতূহল প্রকাশ না করলেও তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবলে প্রফুল্লর আসল পরিচয় অনুমান করতে তার দেরি হয়নি। তাই দেশের মুক্তিকামী প্রফুল্লকে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন একজন বাঙালী হিসেবে কর্তব্যজ্ঞানে।

ভদ্রলোক একপ্রস্থ নতুন কাপড় ও জুতো কিনে এনে দিলেন প্রফুল্লকে। একে বিধ্বস্ত রাতজাগা ক্লান্ত অবসন্ন চেহারা, তার ওপর নগ্ন পদ। দুমড়ানো কুঁচকানো ধূলিকাদার ছোপ লাগা জামাকাপড়। প্রথম দর্শনেই পুলিশের সন্দেহ হবার মত চেহারা। তাই সাবধানতা হিসেবেই যে পোশাকপরিচ্ছদ পাল্টে ফেলা দরকার একথা তিনি বুঝিয়ে দিলেন প্রফুল্লকে। নিজের আস্তানাতেই দিনটা রেখে দিলেন তিনি প্রফুল্লকে। সন্ধ্যার পরে সব দিক সতর্কভাবে দেখে নিয়ে তাঁকে পৌঁছে দিলেন স্টেশনে।

একান্ত আপন জনের মত তাঁর শুভ কামনা করলেন। দেশপ্রেমিককে যে ভালবাসে সাহায্য করে সে যে নিজেও একজন দেশপ্রেমিক স্বাধীনতার পূজারী তাতে আর সন্দেহ কি। পরে এই দেশপ্রেমিক যুবকের পরিচয় জানা গিয়েছিল। তার নাম ত্রিগুণাচরণ ঘোষ। প্ল্যাটফর্মে তখন কলকাতার ট্রেনের জন্য অপেক্ষারত যাত্রীদের ভিড় জমে উঠেছে। প্রফুল্ল মোকামাঘাটের একটি টিকিট কিনে প্ল্যাটফর্মের এক কোণে গিয়ে বসে পড়লেন।

সেদিন প্ল্যাটফর্মে উপস্থিত ছিলেন সিংভূমের কুখ্যাত পুলিশ সাব ইনসপেক্টর নন্দলাল ব্যানার্জী। ছুটি উপভোগ করে তিনি কর্মস্থলে ফিরে যাচ্ছিলেন। প্রফুল্লর পায়ে নতুন জুতো দেখেই কেমন সন্দেহ হল নন্দলালের। এগিয়ে এসে অযাচিতভাবে প্রফুল্লর সঙ্গে আলাপ জমাবার চেষ্টা করলেন। কথায় কথায় তিনি বিপ্লবীদের সম্পর্কে গভীর সহানুভূতির কথাও ব্যক্ত করলেন। এই গায়েপড়া ভাব প্রফুল্লর ভাল লাগল না। তিনি দ্বিধায় ও কুণ্ঠায় জড়সড়।

নন্দলাল ধীরে ধীরে কিন্তু সুকৌশলে অগ্রসর হয়। কথায় কথায় ব্যক্ত করল, ভোররাতে শহরের ব্যারিস্টার কেনেডি সাহেবের গাড়িতে বোমা ছুঁড়েছে কে বা কারা, ফলে মিসেস ও মিস কেনেডি মারা গেছেন। খবরটা কানে যেতেই চমকে ওঠেন প্রফুল্ল। কিংসফোর্ড মারা যায়নি ! পরিবর্তে তারা হত্যা করেছেন দুটি অসহায় নিরপরাধ নারী ! প্রফুল্লর ভাবান্তর নন্দলালের চোখ এড়ায় না। তার সন্দেহ ঘনীভূত হয়।

সে জানে একজন আততায়ী ওয়াইনীতে ধরা পড়েছে, অন্যজন পলাতক। এই সে নয় তো ! নন্দলালের লোভী মন সজাগ হয়ে ওঠে। পলাতক আসামীকে ধরিয়ে দিতে পারলে সরকার বাহাদুরের কাছ থেকে নিশ্চয় মোটা ইনাম পাওয়া যাবে। নন্দলালের হাবভাব দেখে ও কথা শুনে বিরক্ত বোধ করেন প্রফুল্ল। তিনি বাধ্য হন কামরা পরিবর্তন করতে। কিন্তু শিকারের সন্ধান পেয়েছে নন্দলাল তাকে কি সহজে ছাড়ে ৷ মোকামা ঘাটে প্রফুল্লকে ঠিক খুঁজে বার করে নেয়।

ইতিমধ্যে এই অল্প সময়ের মধ্যেই প্রফুল্লকে গ্রেপ্তার করার অনুমতি আনিয়ে নিয়েছে। প্রফুল্লকে গ্রেপ্তার করতে গেলে সমস্ত ঘৃণা এবং ধিক্কারে দাঁতে ঠোটে কামড়ে তিনি শুধু বললেন, ‘ ছিঃ ! এই আপনার কাজ। বাঙালী হয়ে একজন বাঙালীকে আপনি এভাবে ধরিয়ে দিচ্ছেন ! ‘ বলেই পালাতে চেষ্টা করলেন তিনি। কিন্তু দৌড়ে যেতে যেতে প্ল্যাটফর্মের শেষে পাহারাওয়ালার হাতে তিনি ধরা পড়লেন। সতেজে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রিভলভার বার করে নিজের কপালে লক্ষ স্থির করলেন। তারপরই গুলির শব্দের সঙ্গে তাঁর প্রাণহীন দেহটা লুটিয়ে পড়ল প্ল্যাটফরমের ওপর।

প্রফুল্ল নিজের প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন বিপ্লবী মরতে কখনো ভয় পায় না। যে স্বাধীনতার পূজারী তাকে পরাধীন করে কার সাধ্য। মৃত্যুর পরে প্রফুল্লর গুলিবিদ্ধ দেহটাকে মজঃফরপুর পাঠিয়ে দেওয়া হল। ক্ষুদিরামকে দিয়ে সনাক্ত করাবার জন্য। ক্ষুদিরাম দেখেই চিনতে পারলেন এবং সেকথা জানিয়ে পুলিশকে জবানবন্দী দিলেন। এরপর প্রফুল্লর দেহ থেকে মুন্ডটা কেটে নিয়ে কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হল।

সেই সময়ের সঞ্জীবনী পত্রিকায় প্রফুল্ল সম্পর্কে যে বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল (১৯০৮, ১৪ ই মেঃ) তা হলঃ ‘ ক্ষুদিরাম যে যুবকের মৃতদেহ দেখিয়া পুলিশের নিকট তাহাকে দীনেশচন্দ্র রায় নামে পরিচিত করিয়া দিল, তাহার প্রকৃত নাম প্রফুল্ল চাকী। মজঃফরপুর হইতে প্রফুল্ল হাঁটিয়া সমস্তিপুর আসিয়া পৌঁছে ও সেখান হইতে একখানা নতুন কাপড় ও একজোড়া নতুন জুতা কিনিয়া বেশ পরিবর্তন করে। সমস্তিপুর হইতে হাওড়ার টিকেট লইয়া রাত্রির গাড়িতে মোকামাঘাটের দিকে রওনা হয়।

সমস্তিপুরে প্রফুল্লর নতুন কাপড়, জুতা, ফুলো পা দেখিয়া একজন পুলিশ সাব ইনসপেক্টরের মনে সন্দেহ জন্মিল। তাহার নাম নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। মজঃফরপুরের গভর্নমেন্ট উকিলের নাতি। নন্দলাল রাঁচিতে কার্যস্থলে যাইতেছিল। প্রফুল্লর প্রতি সন্দেহ হওয়াতে নন্দলাল গাড়িতে তাহার সঙ্গে এক কামরায় উঠিয়া বসিল এবং পুলিশের মতঠিক চতুরতার সহিত খুব ঘনিষ্ঠভাবে কথাবার্তা বলিতে বলিতে দেশের বর্তমান অবস্থা ও রাজনৈতিক সংবাদ প্রভৃতি সন্বন্ধে এরূপ মত প্রকাশ করিতে লাগিল যাহাতে প্রফুল্ল নন্দলালকে তাহারই মতাবলম্বী বলিয়া বিশ্বাস করিল।

ইতিমধ্যে নন্দলাল মজঃফরপুরে গভর্নমেন্ট উকিলকে তারযোগে জিজ্ঞসা করিল যে সন্দেহের উপর প্রফুল্লকে গ্রেপ্তার করা যাইতে পারে কিনা। ম্যাজিস্ট্রেটের মত লইয়া মজঃফরপুর হইতে গ্রেপ্তার হুকুম দেওয়া হইল। নন্দলাল তখন স্বমূর্তি প্রকাশ করিতে প্রস্তুত হইল। ফেরি স্টিমারে নন্দলাল ও প্রফুল্ল ঘাটে পৌঁছিল। প্রফুল্ল তরুণ বয়স্ক বালক। সে তখনও নন্দলালকে চিনিতে পারে নাই। নন্দলাল স্বদেশের জন্য তাহারই মত বেদনা বোধ করে এবং তাহারই মতাবলম্বী দেখিয়া প্রফুল্ল তাহাকে বন্ধু বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিল।

স্টিমার হইতে ট্রেনে উঠিবার সময় প্রফুল্ল নন্দলালের জিনিসপত্র নিজের কাঁধে করিয়া বহিয়া লইল — নন্দলালকে কুলি নিযুক্ত করিতে দিল না। এদিকে নন্দলাল বরাবর স্টেশন মাষ্টারের কাছে যাইয়া তাহাকে সকল কথা জানাইল ; এবং প্রফুল্ল প্ল্যাটফর্মে আসিবামাত্র একজন কনস্টেবলকে হুকুম দিল— গ্রেপ্তার কর। প্রফুল্ল স্তম্ভিত হইল। তাহার তখনকার মনের অবস্থা বর্ণনা করা অনাবশ্যক। সে চিৎকার করিয়া বলিল, ‘ তুমি বাঙালী হইয়া আমাকে গ্রেপ্তার করিতেছ ? ‘ কনেস্টবল পশ্চাৎদিক হইতে প্রফুল্লকে ধরিয়া ফেলিয়াছিল। প্রফুল্ল সবলে কনস্টেবলকে ভূপাতিত করিল।

পর মুহূর্তেই পিস্তল বাহির করিয়া প্ল্যাটফর্মের অপর দিকে কয়েক পা হাঁটিয়া গেল ৷ তৎক্ষণাৎ অপর দিক হইতে আর একজন কনস্টেবল আসিয়া পড়িল। প্রফুল্ল এই কনস্টেবলের দিকে গুলি চালাইল। কিন্তু গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হইল। এদিকে পতিত কনস্টেবল আবার অগ্রসর হইল। প্রফুল্ল দেখিল আর পালাইবার উপায় নাই। তখন দৃঢ়পদে স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া পিস্তল নিজের দিকে বাঁকাইয়া ধরিল। পিস্তলের দুইবার আওয়াজ হইল — প্রথম গুলি বক্ষ ও দ্বিতীয় গুলি চিবুকের নিম্নদেশ বিদ্ধ করিল।

তৎক্ষণাৎ সেই স্থলে প্রফুল্লর মৃতদেহ ভূপাতিত হইল। প্রফুল্লের মৃতদেহ সনাক্ত করিবার জন্য মজঃফরপুরে আনা হইল ! বন্ধুর মৃতদেহ দেখিয়া ক্ষুদিরাম শোকাচ্ছন্ন হইল। সে বলিল ইহা তাহার বন্ধু দীনেশচন্দ্র রায়ের মৃতদেহ। ইহার পর পুলিশের কর্তাদের হুকুমে প্রফুল্লের মৃতদেহ হইতে গলা কাটিয়া ফেলা হইল এবং একটা কেরোসিনের টিনে স্পিরিটে ডুবাইয়া প্রফুল্লর ছিন্নমস্তক কলিকাতায় আনা হইল। ভাল করিয়া সনাক্ত করিবার উদ্দেশ্যেই নাকি এরূপ করা হইয়াছে। ” ৯ ই জুন মঙ্গলবার মজঃফরপুর এডিশনাল সেসন জজ মিঃ কর্নভয় – এর আদালতে শুরু হল আসল বিচার। সঙ্গে রইলেন দুই এসেসর বাবু নাথনিপ্রসাদ ও জনকপ্রসাদ।

সরকার পক্ষের উকিল বাঁকিপুরের বিখ্যাত ব্যারিস্টার মিঃ মানুক এবং সহকারী উকিল বিনোদবিহারী মজুমদার। ক্ষুদিরামের পক্ষে স্বেচ্ছায় এগিয়ে এলেন মজঃফরপুরের একজন দেশপ্রেমিক আইনজীবী — কালিদাস বসু। আর রংপুর থেকে এলেন সতীশচন্দ্র চক্তবর্তী এবং নৃপেন্দ্রনাথ লাহিড়ী।

এই মামলায় প্রধান সাক্ষীদের অন্যতম ছিল সেই সাব ইনসপেক্টর নন্দলাল ব্যানার্জী। তিনি সাক্ষী দিতে এসে বলেন, “ সিংভূম থেকে ছুটি নিয়ে গত ৩০ শে এপ্রিল পর্যন্ত আমি মজঃফরপুরে ছিলাম। ১ লা মে বাঙ্গালীদের দ্বারা অনুষ্ঠিত এই ঘটনার কথা জানতে পারি (কিংসফোর্ড হত্যার চেষ্টা)। ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ছটায় আমি মজঃফরপুর থেকে সিংভূমের দিকে রওনা হই। রাত্রে সমস্তিপুর স্টেশনের প্লাটফরমে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে আমার দেখা হয়। তার পরনে নতুন ধুতি ও পায়ে নতুন পাম্পসু ছিল। মাথায় কিছু ছিল না। সে আমাকে প্রশ্ন করে যে, মোকামা ঘাটের গাড়ি কখন ছাড়বে। আমি তার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে থাকি। তার সঙ্গে মোকামা ঘাটের টিকিট ছিল।

আমরা একই কামরায় উঠেছিলাম। তার কথাবার্তা ও হাবভাব দেখে আমার সন্দেহ হয়। সমস্তিপুর থেকে গাড়ি ছাড়ার আগেই আমি আমার মতামত মজঃফরপুরের সিনিয়র গভর্নমেন্ট প্লীডার শিবচন্দ্র ব্যানার্জীকে এক টেলিগ্রাম করে জানাই যে, তিনি যেন পুলিস সাহেবের সঙ্গে দেখা করে একজন সন্দেহজনক লোককে গ্রেপ্তার করার জন্য একটি অনুমতিপত্র পাঠিয়ে দেন। পরদিন ২ রা মে সকাল সাড়ে দশটায় মোকামা ঘাট স্টেশনে সেই টেলিগ্রামের জবাব পাই।

লোকটি মোকামা ঘাট পর্যন্ত আমার সঙ্গেই ছিল। আমার কথাবার্তায় বিরক্ত হয়ে পরে অন্য কামরায় চলে গিয়েছিল। সকালবেলা মোকামা ঘাটে আমি তাকে আমার জিনিসপত্রের দিকে লক্ষ রাখতে অনুরোধ করি। তার আগে আমি তার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম। গ্রেপ্তারের সময় দুজন সাক্ষীকে উপস্থিত রাখার জন্য আমি স্টেশন মাষ্টারের অফিসে যাই, কারণ তখন আমি দৃঢ় সঙ্কল্প যে লোকটিকে আমি গ্রেপ্তার করব। দুজন লোক দেবার জন্য আমি স্টেশন মাষ্টারকে অনুরোধ করি। সঙ্গে সঙ্গেই তারা এলেন।

ফিরে আসার সময় সাব ইনসপেক্টর শর্মার সঙ্গে আমার দেখা হয়। মজঃফরপুর থেকে প্রাপ্ত পুলিস সুপারের তারের কথা শুনে আমি তখন সেই লোকটিকে বলি যে, তোমাকে আমি সন্দেহ করি। একথা বলে গ্রেপ্তার করার উদ্যোগ করতেই লোকটি ছুটে দৌড় দিল। সঙ্গে সঙ্গেই আমি চিৎকার করে উঠি। বিপরীত দিক থেকে একজন রেলওয়ে কনস্টেবল এগিয়ে এল। ঠিক তখনই আমি একটি গুলির আওয়াজ শুনতে পাই। কনস্টেবলটিকে লক্ষ করেই সেই বাঙ্গালী গুলি চালিয়েছিল।

এবার সাব ইনসপেক্টর শর্মার সঙ্গী পুলিসটি এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। মুহূর্ত বাদেই আমি পরপর দুবার গুলির শব্দ শুনতে পাই এবং লোকটির প্রাণহীন দেহ মাটিতে পড়ে যেতে দেখতে পাই। সেই রাত্রেই মৃতদেহ নিয়ে আমি মজঃফরপুর ফিরে যাই। মহকুমা হাকিম মিঃ বার্টএবং পাটনার পুলিস সাহেবও সঙ্গে গিয়েছিলেন। বারুনী স্টেশনে মৃতদেহের ছবি তোলা এবং সনাক্তকরণের কাজ সম্পন্ন করা হয়। ”

প্রফুল্ল চাকীর সহযোগী এবং মজঃফরপুর কিংসফোর্ড হত্যাচেষ্টার মামলার অপব অভিযুক্ত ক্ষুদিরাম ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ উৎসর্গ করলেন ১৯০৮ খ্রিঃ ১৮ ই আগস্ট। বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীর জীবন – কাহিনী অসমাপ্ত থেকে যাবে বিশ্বাসঘাতক পুলিস ইনসপেক্টর নন্দলালের জীবনের শেষ অধ্যায়টুকুর বিবরণ না দিলে। নির্ভীক বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীকে যেই নরাধমের জন্য মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল, বাংলার বিপ্লবীরা তাকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে বিলম্ব করেননি।

বাঙ্গালী বিপ্লবীকে ধরার প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্য নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের কাছ থেকে হাজার টাকা পুরস্কার লাভ করল। চাকরিতেও পদোন্নতি হয়েছে। সুতরাং এই নগদ ইনাম পেয়ে তার মন খুশিতে ভরপুর। একদিন, রাত তখন প্রায় আটটা। হাতে একতাড়া চিঠি নিয়ে নন্দলাল চলেছে কলকাতার সার্পেন্টাইন লেন ধরে। এমন সময় পেছন থেকে ডাক শোনা যায়, দাঁড়াও। নন্দলাল পেছনে ফিরে তাকায়। —আমরা ডেকেছি। দুই তরুণ পাশে এসে দাঁড়ায়।

নন্দলাল অপরিচিত তরুণদের দেখে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, কি চাই তোমাদের ? –তোমাকে পুরস্কার দিতে চাই। কথার সঙ্গে সঙ্গে — দ্রাম। দ্রাম। দ্রাম। পরপর তিনটি গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে রাতের পল্লীর নিস্তব্ধতা। নন্দলালের মৃতদেহ পড়ে রইল গলির পথের ওপরে। সেদিন নন্দলালের জন্য এই অভিনব পুরস্কারের ব্যবস্থা যিনি করেছিলেন তিনি হলেন সেই সময়ের দুর্ধর্ষ বিপ্লবী নেতা স্বয়ং শ্রীশ পাল। তাঁর সঙ্গের বিপ্লবীর নাম ছিল রণেন গাঙ্গুলী। বিপ্লবী শ্রীশ পাল কেবল নন্দলালকেই নয়, এমনি আরো বিশ্বাসঘাতককেই শায়েস্তা করেছিলেন। অগ্নিযুগের এক উল্লেখযোগ্য যোদ্ধা ছিলেন তিনি।

Leave a Comment