রাজা রামমোহন রায় জীবনী | Raja Ram Mohan Roy Biography in Bengali

রাজা রামমোহন রায় জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Raja Ram Mohan Roy Biography in Bengali. আপনারা যারা রাজা রামমোহন রায় সম্পর্কে জানতে আগ্রহী রাজা রামমোহন রায় এর জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

রাজা রামমোহন রায় কে ছিলেন? Who is Raja Ram Mohan Roy?

রামমোহন রায়, যিনি সচরাচর রাজা রামমোহন রায় বলে অভিহিত, (২২ মে, ১৭৭২ – সেপ্টেম্বর ২৭, ১৮৩৩) বাংলার নবজাগরণের আদি পুরুষ। তিনি প্রথম ভারতীয় যিনি ধর্মীয়-সামাজিক পুনর্গঠন আন্দোলন ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি একজন বাঙালি দার্শনিক। তৎকালীন রাজনীতি, জনপ্রশাসন, ধর্ম এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখতে পেরেছিলেন। তিনি সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত হয়েছেন সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত করার প্রচেষ্টার জন্য।

ভারতে দীর্ঘ কাল যাবৎ বৈষ্ণব বিধবা নারীদের স্বামীর চিতায় সহমরণ যেতে বা আত্মাহুতি দিতে বাধ্য করা হত। রামমোহন রায় কলকাতায় ২০ আগস্ট, ১৮২৮ সালে ইংল্যান্ড যাত্রার আগে দ্বারকানাথ ঠাকুরের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে এই ব্রাহ্মসমাজ এক সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলন এবং বাংলার পুনর্জাগরণের পুরোধা হিসাবে কাজ করে।

রাজা রামমোহন রায় জীবনী – Raja Ram Mohan Roy Biography in Bengali

নামরাজা রামমোহন রায়
জন্ম22 মে 1772
পিতারামকান্ত রায়
মাতাতারিণীদেবী
জন্মস্থানরাধানগর, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত
জাতীয়তাভারতীয়
পেশাভারতীয় ধর্মীয়, সামাজিক, এবং শিক্ষা সংস্কারক
মৃত্যু27 সেপ্টেম্বর 1833 (বয়স 61)

রাজা রামমোহন রায় এর জন্ম: Raja Ram Mohan Roy’s Birthday

রাজা রামমোহন রায় 22 মে 1772 জন্মগ্রহণ করেন।

রাজা রামমোহন রায় এর পিতামাতা ও জন্মস্থান: Raja Ram Mohan Roy’s Parents And Birth Place

আধুনিক ভারতের জনক – রূপে অভিহিত রামমোহন রায় সম্ভবত ১৭৭২ খ্রিঃ বর্তমান হুগলী জেলার রাধানগর গ্রামে এক কুলীন ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। বামমোহনের প্রপিতামহ কৃষ্ণকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় বাদশাহ ফররুখশিয়রের আমলে বাংলার সুবেদারের অধীনে আমিনের কাজ করতেন। সেই সূত্রেই তাঁদের পরিবারে রায় উপাধির ব্যবহার প্রচলিত হয়। রামমোহনের পিতার নাম রামকান্ত রায় এবং মাতার নাম তারিণীদেবী।

রাজা রামমোহন রায় এর শিক্ষাজীবন: Raja Ram Mohan Roy’s Educational Life

সেকালের প্রথা মত রামমোহন পাটনায় মৌলভীর নিকট আরবী ও ফারসী ভাষা শিক্ষা করেন। সংস্কৃত শিক্ষা করেন কাশীতে। এরপরে নিজ গ্রামের কাছে সুপন্ডিত নন্দকুমার বিদ্যালঙ্কার বা হরিহরানন্দ তীর্থস্বামীর কাছে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য এবং বেদাস্তশাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন। এই সময়েই তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিক চিন্তার বীজ রোপিত হয়।

রাজা রামমোহন রায় এর প্রথম জীবন: Raja Ram Mohan Roy’s Early Life

পনের বছর বয়সে আকস্মিকভাবে গৃহত্যাগ করে রামমোহন পর্যটনে বেড়িয়ে পড়েন। ১৭৯০ খ্রিঃ পুনরায় ঘরে ফিরে আসেন। ১৭৯১ খ্রিঃ রামকান্ত পৈতৃক ভিটা পরিত্যাগ করে পার্শ্ববর্তী লাঙ্গুলপাড়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। ঘরে ফিরে এসে রামমোহন তাঁর অন্যান্য ভাইদের সঙ্গে পৈতৃক জমিদারী দেখাশোনা করতে থাকেন। বৈষয়িক কাজে রামমোহন বিভিন্ন সময়ে কলকাতা, বর্ধমান ও লাঙ্গুল পাড়ায় অবস্থান করতেন।

রাজা রামমোহন রায় এর কর্ম জীবন: Raja Ram Mohan Roy’s Work Life

সেই সময় তাঁকে ইংরাজ সিভিলিয়ানদের সাহচর্যে আসতে হয়। অসাধারণ মেধাবী রামমোহন এই সুযোগে ইংরাজী ভাষা আয়ত্ত করেন। ১৮০৩ খ্রিঃ রামমোহন মুর্শিদাবাদের কালেক্টর উডফোর্ডের কাছে কাজ নেন এবং যশোরে যান। অবশ্য এই চাকরি মাস দুই – এর বেশি করা সম্ভব হয়নি। ইতিমধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর এক সিভিলিয়ান কর্মচারী জন ডিগবির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা জন্মে।

রামমোহন ডিগবির অধীনে দেওয়ান বা খাসকর্মচারীরূপে ১৮০৫ খ্রিঃ থেকে ১৮১৪ খ্রিঃ পর্যন্ত কাজ করেন। তার কর্মস্থল ছিল রংপুর। এই সময়ে রামমোহন বিষয়কর্মে যথেষ্ট উন্নতি করেন। ইংরাজের অধীনে চাকরি হলেও রামমোহন সর্বদা আত্মমর্যাদা বজায় রেখে চলতেন। একসময় চাকুরি ক্ষেত্রে এই প্রশ্নেই স্যার ফ্রেডরিক হ্যামিলটনের সঙ্গে তার বিবাদ উপস্থিত হয়।

১৮০৯ খ্রিঃ ১২ ই এপ্রিল রামমোহন তাঁর বিরুদ্ধে লর্ড মিন্টোর কাছে অভিযোগ করেন। এই অভিযোগ পত্রটিকেই রামমোহনের প্রথম ইংরাজি রচনা বলে জানা যায়। ১৮১৫ খ্রিঃ রামমোহন স্থায়িভাবে কলকাতায় বসবাস করতে শুরু করেন। কলকাতায় বসবাসকালেই রামমোহন বিবিধ সমাজ – সংস্কারমূলক কাজে জড়িত হয়ে পড়েন। প্রথমজীবনে মুর্শিদাবাদে বাসকালে (১৮০৩-১৮০৪ খ্রিঃ) তার একেশ্বরবাদ মূলক রচনা ফারসী ও আরবী ভাষায় তুফাৎ – উল – সুবাহহিদ্দীন প্রকাশিত হয়।

এবারে তিনি একেশ্বরবাদের সমর্থনে বেদান্তসূত্র এবং বিবিধ উপনিষদ বাংলাভাষায় অনুবাদের কাজ শুরু করেন। এভাবেই বাংলাদেশে প্রথম উপনিষদ চর্চার ভিত্তি স্থাপিত হয়। কলকাতাবাসের চারবছরের মধ্যেই রামমোহন একে একে রচনা করেন বেদান্তগ্রন্থ, বেদান্তসার, কেনোপনিষদ, ঈশোপনিষদ, কঠোপনিষদ, মান্ডুক্যোপনিষদ এবং মুন্ডকোপনিষদ

এই সময়েই তাঁকে ধর্ম বিষয়ে নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে হয়। কিন্তু একেশ্বরবাদ বিরোধী গোঁড়া হিন্দুদের সঙ্গে বাদানুবাদের সূত্রেই রামমোহনের চিন্তা ও লেখনীর স্পর্শে ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতির পথ সুগম হয়ে ওঠে। রামমোহন একেশ্বর উপাসনার পথ দেখাবার উদ্দেশ্যে ১৮১৫ খ্রিঃ আত্মীয়সভা প্রতিষ্ঠা করেন। এই সভাই ১৮২৮ খ্রিঃ দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রভৃতি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সহায়তায় ব্রাহ্মসমাজে রূপান্তরিত হয়।

আত্মীয়সভায় শাস্ত্র আলোচনা, বেদপাঠ, ব্রাহ্মসংগীত ইত্যাদি হত। রামমোহন নিজেও সুগায়ক ছিলেন। কলকাতার গুণীজ্ঞানী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সহায়তায় সভা ক্রমশ বড় হতে লাগল। সেই সঙ্গে রামমোহন সমাজের অন্ধকুসংস্কার দূর করবার জন্য যে সকল যুক্তি ও শাস্ত্রের কথা বলতেন তা – ও প্রচার লাভ করল। সমাজে নারীজাতির দুঃখ ও দুর্দশা লক্ষ করে রামমোহন বেদনা বোধ করতেন। তাই দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত কুপ্রথা সহমরণ রোধ করবার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। সারাদেশে আলোড়ন উঠল।

শেষ পর্যন্ত লর্ড বেন্টিঙ্কের সহযোগিতায় ভারতবর্ষে সহমরণ নিষিদ্ধ হল। এই বিষয়ে রামমোহনের প্রথম বই সহমরণ বিষয়ক প্রবর্তক ও নিবর্তকের সম্বাদ প্রকাশিত হয় ১৮১৮ খ্রিঃ। ১৮২০ খ্রিঃ লিখলেন দ্বিতীয় বই প্রবর্তক ও নিবর্তকের দ্বিতীয় সম্বাদ এবং সহমরণ বিষয়। ১৮২০ খ্রিঃ তিনি খ্রিস্টের উপদেশ নামে ইংরাজিতে একটি বই লেখেন। এই বইতে রামমোহন খ্রিস্টীয় ত্রিত্ববাদ অস্বীকার করেন। ফলে মিশনারীদের সঙ্গেও তাঁর সংঘর্ষ ও বাদপ্রতিবাদ অনিবার্য হয়ে উঠল।

১৮২৩ খ্রিঃ তিনি প্রচলিত সংস্কৃত শিক্ষার বিরোধিতা করে আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি চালু করার প্রস্তাব দিয়ে লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি লেখেন। সনাতন শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে কেবল কাব্য আর ব্যাকরণ নিয়ে পড়ে থাকলে দেশ অন্ধকারেই পড়ে থাকবে। আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে ভারতবাসীকে যে ইংরাজি শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে তা মনে প্রাণে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন রামমোহন।

ইংরাজিতে লেখাপড়া চালু করবার জন্য ১৮২২ খিঃ অ্যাংলো – হিন্দু স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি। মাতৃভাষা শিক্ষা প্রসারের জন্য ইতিপূর্বে তিনি বাংলা ভাষায় সংস্কৃত ব্যাকরণ গৌড়ীয় ব্যাকরণ প্রণয়ন করেছিলেন। সেই বই স্কুলবুক সোসাইটি প্রকাশ করেছিল ১৮০৩ খ্রিঃ। বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের নিগড় মুক্ত করে এই গ্রন্থেই তিনি তার একটি নিজস্ব রূপ দান করেছিলেন।

তিনিই প্রথম বাংলা গদ্যে তদ্ভব শব্দের ব্যবহার এবং অসমাপিকা ক্রিয়া ও জটিল বাক্যাংশের ব্যবহার বন্ধ করেন। বাপ, মাসী, মেসো, গাই, কাপড়চোপড়, ভাই, পাগল, পাগলী ইত্যাকার যেসব শব্দ আমরা মুখের ভাষায় ব্যবহার করি, এসব রামমোহনই প্রথম ব্যবহার করেন। রামমোহনের চেষ্টায় সতীদাহ বা সহমরণ নামক কুপ্রথা যেমন সমাজে আইনত নিষিদ্ধ হয়েছিল, তেমনি তিনি বহুবিবাহ সম্পর্কেও সোচ্চার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

রামমোহনের জীবনীকার নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এই সম্পর্কে লিখেছেন, রাজা রামমোহন রায় বলেন যে গভর্নমেন্ট এইরূপ ব্যবস্থা করিলে অত্যন্ত উপক হয় যে, কোন ব্যক্তি এক স্ত্রীর জীবদ্দশায় পুনর্বার বিবাহ করিতে ইচ্ছা করিলে ম্যাজিস্ট্রেট বা অন্য কোন রাজকর্মচারীর নিকট প্রমাণ করিতে হইবে যে, তাহার স্ত্রীর শাস্ত্র নির্দিষ্ট কোন দোষ আছে। প্রমাণ করিতে সক্ষম না হইলে, সে পুনর্বার বিবাহ করিতে অনুজ্ঞা প্রাপ্ত হইবে না। রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার সূত্রে রামমোহন ছিলেন ভারতে আন্তর্জাতিক মনন ও আদর্শের প্রবক্তা।

তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি ভারতের বাইরের নানা ঘটনার প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে মানুষের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে মতামত ব্যক্ত করেছেন। জানা যায় যে, দক্ষিণ আমেরিকা স্পেনের অধিকারমুক্ত হলে সেই আনন্দে তিনি বাড়িতে জোরদার ভোজসভার আয়োজন করেছিলেন। ১৮২২ খ্রিঃ তার সম্পাদিত সাপ্তাহিক পত্রিকা মিরাত – উল – আখবার এ আয়ারল্যান্ডের ওপর ইংরাজ সরকারের অত্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

রাজা রামমোহন রায় এর পুরস্কার ও সম্মান: Raja Ram Mohan Roy’s Awards And Honors

১৮৩০ খ্রিঃ ১৯ শে নভেম্বর দিল্লীর বাদশাহ দ্বিতীয় আকবর রামমোহনকে ‘রাজা’উপাধি দিয়ে তাঁর জন্য পার্লামেন্টে কিছু বিষয়ে তদ্বির করবার জন্য বিলেতে পাঠান। সেই সময়ে এইকাজের জন্য ভারতবর্ষে রামমোহনই ছিলেন একমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তি। বিলেতে রামমোহন ইউনিটেরিয়ান সমিতির সম্বর্ধনা লাভ করেন।

রাজা রামমোহন রায় এর মৃত্যু: Raja Ram Mohan Roy’s Death

১৮৩৩ খ্রিঃ ২৭ শে সেপ্টেম্বর এই ক্ষণজন্মা মনীষী ব্রিস্টলে দেহত্যাগ করেন।

Leave a Comment