রাণী রাসমণি জীবনী | Rani Rashmoni Biography in Bengali

রাণী রাসমণি জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Rani Rashmoni Biography in Bengali. আপনারা যারা রাণী রাসমণি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী রাণী রাসমণি র জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

রাণী রাসমণি কে ছিলেন? Who is Rani Rashmoni?

রাণী রাসমণি (২৮ সেপ্টেম্বর, ১৭৯৩ – ১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৮৬১)। রানী রাসমণির আবির্ভাব কাল ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২৮ সেপ্টেম্বর। তবে অনেকে রানীমার জন্মদিবস হিসেবে ২৮ শে সেপ্টেম্বরের পরিবর্তে ২৬ শে সেপ্টেম্বরের কথা বলে থাকেন ছিলেন কলকাতার জানবাজারের বাসিন্দা প্রসিদ্ধ মানবদরদি জমিদার। তিনি দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ির প্রতিষ্ঠাত্রী এবং রামকৃষ্ণ পরমহংসের অন্যতমা পৃষ্ঠপোষক।

রাণী রাসমণি তার বিবিধ জনহিতৈষী কাজের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি তীর্থযাত্রীদের সুবিধার্থে সুবর্ণরেখা নদী থেকে পুরী পর্যন্ত একটি সড়ক পথ নির্মাণ করেন। কলকাতার অধিবাসীদের গঙ্গাস্নানের সুবিধার জন্য তিনি কলকাতার বিখ্যাত বাবুঘাট, আহিরীটোলা ঘাট ও নিমতলা ঘাট নির্মাণ করেন। ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি (অধুনা ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার) ও হিন্দু কলেজ (অধুনা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠাকালে তিনি প্রভূত অর্থসাহায্য করেছিলেন।

রাণী রাসমণি জীবনী – Rani Rashmoni Biography in Bengali

নামরাণী রাসমণি
জন্ম28 সেপ্টেম্বর 1793
পিতাহরেকৃষ্ণ বিশ্বাস
মাতারাম প্রিয়া
জন্মস্থানকোনা গ্রাম, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, কোম্পানি রাজ (বর্তমান হালিশহর, উত্তর 24 পরগণা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)
জাতীয়তাভারতীয়
পেশাসমাজকর্মী, ব্যবসায়ী, জমিদার
মৃত্যু19 ফেব্রুয়ারি 1861 (বয়স 67)

রাণী রাসমণি র জন্ম: Rani Rashmoni’s Birthday

রাণী রাসমণি 28 সেপ্টেম্বর 1793 জন্মগ্রহণ করেন।

রাণী রাসমণি র পিতামাতা ও জন্মস্থান: Rani Rashmoni’s Parents And Birth Place

দানে, দয়ায় ব্যাক্তিত্বে, সাহসে, বুদ্ধিমত্তায় ও ভক্তিসাধনায় অনন্যা মহীয়সী নারী রানী রাসমণি। তীক্ষ্ণ বিষয় – বুদ্ধি, জনহিতকর কর্ম এবং ধর্মচর্চার প্রতি আকর্ষণে তিনি ইতিহাসের এক বিরল চরিত্র।

শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ গ্রন্থে স্বামী সারদানন্দ রানী রাসমণি সম্পর্কে বলেছেন, ”তাহার ঈশ্বর বিশ্বাস, তেজস্বিতা, দরিদ্রদের প্রতি নিরন্তর সহানুভূতি, অজস্র দান, অকাতর অর্থব্যয় প্রভৃতি অনুষ্ঠানসমূহ তাহাকে সকলের বিশেষ প্রিয় করিয়া তুলিয়াছিল। বাস্তবিক নিজ গুণে ও কর্মে এই রমণী তখন আপন রানী নাম সার্থক করিতে এবং ব্রাহ্মণেতর নির্বিশেষে সকল জাতির হৃদয়ের শ্রদ্ধা ও ভক্তি সর্বপ্রকারে আকর্ষণে সক্ষম হইয়াছিলেন।”

রানী রাসমণি, বস্তুত সর্ব অর্থেই ছিলেন রানী। ১৭৯৩ খ্রিঃ হালিশহরের নিকটবর্তী এক গ্রামের কৃষিজীবী মাহিষ্য পরিবারে রাসমণি জন্ম গ্রহণ করেন। নিতান্ত এক দরিদ্র পরিবারে জন্মলাভ করেও তিনি একদিন যথার্থই রানী হয়ে উঠেছিলেন। সেই যুগে এই দেশে মেয়েদের লেখাপড়া শেখাবার বা শিখবার সুযোগ তেমন ছিল না। ঘরেই সামান্য লেখাপড়া শিক্ষা হয়েছিল রাসমণির।

এর বেশি আর এগুনো সেই সময়ে স্বাভাবিক ব্যাপার বলে গণ্য হত না। সামান্য লেখাপড়া হলেও রাসমণির রূপ ছিল অসাধারণ। সেই সূত্রেই তাঁর বিয়ে হয়েছিল কলকাতার বিরাট ধনী পরিবারে। জানবাজারের প্রীতিরাম দাস ছিলেন ব্যবসায়ী। ফোর্ট উইলিয়ামে খাবার – দাবার সরবরাহ করে তিনি প্রভূত অর্থের মালিক হয়েছিলেন। একটি বাঁশের আড়তের মালিকানাও তাঁর ছিল। ফলে সমৃদ্ধি ছিল ক্রমবর্ধমান।

রাণী রাসমণি র বিবাহ জীবন ও পরিবার: Rani Rashmoni’s Marriage Life And Family

প্রীতিরাম দাসের বড় ছেলে রাজচন্দ্রের সঙ্গে রাসমণির বিয়ে হয়েছিল ১৮০৪ খ্রিঃ, বাংলা সন ১২১১, ৪ ই বৈশাখ। রাজচন্দ্র ছিলেন এক রাজকীয় পুরুষ। তার ঐশ্বর্য ও দানধ্যান ছিল বিস্ময়কর। এরকম এক ধনী পরিবারে সুদূর পল্লী অঞ্চলের এক দরিদ্র কন্যার বধূ হয়ে আসার ব্যাপারটা রীতিমত অবিশ্বাস্য। অথচ সেই ঘটনাই ঘটেছিল।

বিয়ের পর রাজচন্দ্রের আর্থিক সমৃদ্ধি আরও বৃদ্ধি পায়। ফলে রাসমণি পরিবারে লক্ষ্মী রূপেই আদৃতা হয়েছিলেন। কিন্তু এত সব সত্ত্বেও রানী রাসমণির জীবন ছিল নিরন্তর সংগ্রামের জীবন। সারাজীবন ধরে তাকে নানা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়েছে। তার এই সংগ্রামের মূলে কখনও ছিল আত্মমর্যাদা রক্ষার প্রতিজ্ঞা, কখনও লোকহিতৈষণার প্রেরণা। এই সংগ্রামের মধ্যেই কঠোরে কোমলে রাসমণি ছিলেন অনন্যা।

মাত্র চুয়াল্লিশ বছর বয়সে রাসমণি বিধবা হয়েছিলেন। তার কোন ছেলে ছিল না। একপাশে বিশাল সম্পত্তি, আর অন্য দিকে চার কন্যা পদ্মমণি, কুমারী, করুণা ও জগদম্বা। এই সুকঠিন অবস্থায় পড়েও ব্যক্তিত্বময়ী রাসমণি যোগ্যতার সঙ্গেই তার কর্তব্য সাধন করেছেন। তৃতীয়া কন্যা করুণার সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল মথুরনাথ বিশ্বাসের।

রাণী রাসমণি র কর্ম জীবন: Rani Rashmoni’s Work Life

করুণার অকাল মৃত্যুর পর রাসমণি মথুরবাবুর সঙ্গেই চতুর্থ কন্যা জগদম্বার বিয়ে দেন এবং জামাতাকে বিষয় – সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব দেন। এই কাজের মধ্যে রাসমণি অসামান্য বিচক্ষণতা ও বাস্তব বুদ্ধির পরিচয় দেন। মথুরবাবুকে কাছে রেখে দেওয়ায় সুরক্ষিত হয়েছিল বিষয় – সম্পত্তি এবং বৈষয়িক জীবন থেকে ধর্মীয় জীবনের দিকে যাওয়া রানীর পক্ষে সহজ হয়েছিল।

রাসমণির দানধ্যান ও পুণ্যকর্মের তুলনা পাওয়া বিরল। তাঁর পিতার মৃত্যুর পর কন্যার করণীয় পারলৌকিক করতে গঙ্গায় গিয়ে তিনি দেখেন ঘাট ভাঙ্গা, কর্দমাক্ত। তার মধ্যেই মানুষকে গঙ্গার ঘাটে প্রয়োজনীয় কৃত্য ও স্নানাদি করতে হয়। রাসমণির অনুরোধে রাজচন্দ্র প্রচুর অর্থব্যয় করে গঙ্গার ঘাট ও ঘাটে যাবার রাস্তা তৈরি করে দেন। সেই ঘাটেরই নাম হয় বাবুঘাট, যা আজও বর্তমান। বাবুঘাট ছত্রিশ থাম ও চাঁদনীযুক্ত।

তার গায়ে খোদিত আছে – “ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্কের অনুমতিক্রমে এবং বাবু রাজচন্দ্র দাসের অর্থব্যয়ে ১৮৩০ খ্রিঃ এই ঘাট নির্মিত এবং ইহার নাম বাবু রাজচন্দ্র ঘাট ”। রাজচন্দ্রের নির্মিত রাস্তাটির নামকরণ হয়েছিল বাবুরোড। দানধ্যানের ব্যাপারে রাজচন্দ্র ছিলেন মুক্তহৃদয় ও উদারহস্ত। স্বামীর মতো রাসমণিও সারাজীবন অজস্র দানধ্যান করেছেন।

রাজচন্দ্রের শ্রাদ্ধকার্যের সময় তিনি ছয় হাজার রুপোর মুদ্রা ব্রাহ্মণদের দান করেছিলেন। তিনি লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করতেন বিভিন্ন পুজো ও ব্রত উপলক্ষে। রাসমণি বাংলা ১২৪৫ সনে সওয়া লক্ষ টাকা ব্যয় করে রুপোর রথ তৈরি করে পথে বের করেছিলেন। সেই শোভাযাত্রার সামনে পেছনে ছিল শত শত গায়ক ও বাদক। একই জাঁকজমকে তিনি পর পর কয়েক বছর রথোৎসব পালন করেছিলেন।

তিনি প্রতিবছর যে দুর্গাপুজো করতেন তাতে খরচ হত ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। একই রকম ধূমধামের সঙ্গে তিনি জন্মাষ্টমী, বাসন্তী পুজো, লক্ষীপুজো, সরস্বতী পুজো প্রভৃতি সম্পন্ন করতেন। সেইকালে তীর্থাদিতে যেতে হত পায়ে হেঁটে ও নৌকা যোগে। পুরী যাবার রাস্তা ভাল ছিল না বলে রাসমণি সেই রাস্তা তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন। কেবল তাই নয়, তিনি জগন্নাথ বলরাম ও সুভদ্রার জন্য তিনটি হীরক – খচিত মুকুট তৈরি করিয়ে মন্দির কর্তৃপক্ষের হাতে দিয়েছিলেন। এই জন্য তার খরচ হয়েছিল ৬০ হাজার টাকা।

রাসমণি তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে দানধ্যান, ঘাট ও মন্দির তৈরি প্রভৃতি কাজে চার বছরে ব্যয় করেছিলেন প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা। কালীঘাটে বাগানবাড়ি, পুকুর ও আদি গঙ্গার পাকা ঘাট তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন রাসমনি। তাছাড়া তিনি আধমাইল দীর্ঘ টোনার খাল খনন করিয়ে মধুমতী নদীর সঙ্গে যুক্ত করার ব্যবস্থা করেন। এর ফলে কৃষকদের চাষের কাজের বিশেষ উপকার সাধিত হয়। কৃষকরা তাঁকে মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা জানাত।

রানী তার প্রজাদের কাছে ছিলেন মায়ের মত। শিশু যেমন তার মায়ের কাছে নির্ভয়ে আবদার ও দাবি জানায়, তেমনি প্রজারাও রাসমণির কাছে তাঁদের অভাব অভিযোগের কথা নির্ভয়ে ও নিঃসঙ্কোচে জানাতে পারত। রাসমণির প্রজাদের মধ্যে অনেকেরই জীবিকা ছিল গঙ্গায় মাছ ধরা। এই দরিদ্র জেলেদের ওপরে হঠাৎ ইংরাজ সরকার মৎস্যকর চাপিয়ে দেওয়ায় তারা খুবই বিভ্রাটে পড়ে গেলেন। সরকারী কর না দিয়ে গঙ্গায় মাছ ধরা চলবে না — জেলেদের সংসার অচল হবার মত অবস্থা।

ইংরাজ সরকারের কাছে অনেক আবেদন নিবেদন জানিয়েও কোনই প্রতিকার হল না। শেষ উপায় এক রানীমা – রানী রাসমণি। সকলে এসে কেঁদে পড়ল তার কাছে। রাসমণি সব শুনে প্রজাদের আশ্বস্ত করলেন। তারপর নায়েব মশাইকে পাঠিয়ে ঘুসুড়ী থেকে মেটিয়াবুরুজ পর্যন্ত গঙ্গা দশ হাজার টাকায় লিজ নিয়ে নিলেন। এরপর যা করলেন তা এক অকল্পনীয় কাজ। দড়ি, বাঁশ শিকল দিয়ে গঙ্গা ঘিরে ফেললেন। ফলে গঙ্গায় নৌকা ও জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেল।

বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত ইংরাজ সরকারকে নতি স্বীকার করতে হল। জেলেদের ওপর থেকে কর তুলে নেওয়া হল। রাসমণিও নদীর ওপর থেকে বন্ধন তুলে নিলেন। রানীর জীবনে এমনি জনহিতৈষণা ও তেজস্বিতার ঘটনা অনেকবারই ঘটেছে। তার তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও কৌশলের কাছে প্রতিবারেই প্রতিপক্ষকে হার মানতে হয়েছে।

আর একবার, রাসমণির দুর্গাপুজোর সময় হাজার হাজার মানুষ স্নানের জন্য নবপত্রিকা গঙ্গায় নিয়ে চলেছেন বাবুরোড দিয়ে। এমন সময় ঘটল বিপত্তি। সরকার এক নিষেধাজ্ঞা জারি করল, বাবু রোড দিয়ে পুজোর শোভাযাত্রা নেওয়া চলবে না। রাসমণি যথারীতি প্রতিবাদ করলেন, বাবুরোড তার, সুতরাং তার পুজোর শোভাযাত্রা সেখান দিয়ে যাবার কোন বাধা নেই।

এই নিয়ে আদালতে মামলা পর্যন্ত গড়াল। সেই মামলায় রাসমণির পঞ্চাশ টাকা জরিমানা হল। জরিমানার টাকা রাসমণি জমা দিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে জানবাজার থেকে বাবুঘাট পর্যন্ত দুই পাশে গরানকাঠের বেড়া দিয়ে ঘিরে দিলেন। কর্তৃপক্ষের আর কিছু করার রইল না। লোকজনের চলাচল, যানবাহন ইত্যাদির যাতায়াতের পথের বাধা সরাবার জন্য নতি স্বীকার করতে হল। রাসমণির জয় হল।

লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল— অষ্ট ঘোড়ার গাড়ি দৌড়ায় রানী রাসমণি। রাস্তা বন্ধ করতে পারলে না ইংরাজ কোম্পানি।। একবার, সিপাহী যুদ্ধের কিছু পরের ঘটনা এটা, একদিন একদল গোরা সৈন্য হঠাৎ হৈ হৈ করে জানবাজারের বাড়িতে ঢুকে পড়ল। রাসমণির কর্মচারীদের সঙ্গে কি নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছিল, তাইতে গোরাগুলো তাদের উন্মত্তের মত তাড়া করে এলো।

এরকম অত্যাচার গোরারা নিরীহ দেশবাসীর ওপর প্রায়ই করে। কিন্তু কখনো বাধা পেত না বলে দিনে দিনে তাদের সাহসও বেড়ে গিয়েছিল। এদিন বাড়িতে মথুরবাবু ছিলেন না, বৈষয়িক কাজে অন্যত্র ছিলেন। রাসমণির লোকেরা যথাসাধ্য বাধা দেবার চেষ্টা করে যেতে লাগল। রাসমণি সব শুনে ক্রোধে জ্বলে উঠলেন। ভৈরবী মূর্তিতে খাঁড়া হাতে করে বেরিয়ে এলেন। তাঁর সেই মূর্তি দেখে গোরা সৈন্যরা হতভম্ব হয়ে থমকে গেল।

এক পা – ও তারা সামনে এগোবার সাহস পেল না। তারা দল বেঁধে পালিয়ে যেতে বাধ্য হল। পরে এই সৈন্যদের শাস্তি হয়েছিল। রাসমণির তেজস্বিতা ও সাহসিকতা এমনি করে বারবার দেখা গেছে। প্রজা বৎসল রাসমণি তাঁর প্রজাদের ওপর ইংরাজের অবিচার কখনো সহ্য করতেন না। কেবল প্রজাদের ক্ষেত্রেই নয়, জনহিতৈষণার প্রেরণায় তিনি সাহসিকতার সঙ্গে বীরাঙ্গনা মূর্তিতে বিপদ – আপদ রুখে দাঁড়াতেন। করুণায় মাখা হৃদয়ের স্নিগ্ধ মমতাই তাঁকে করে তুলত ভীমাভৈরবী।

রাসমণি যথার্থই ছিলেন লোকমাতা, পালিকা, অপর দিকে সন্তান রক্ষার তাগিদে তিনিই হয়ে উঠতেন ভয়ঙরী রণরঙ্গিনী। একদিকে বরাভয় প্রদায়িনী অপরদিকে ভয়ঙ্করী রণরঙ্গিনী — এই দুই সত্তাই তার মধ্যে সমানভাবে কাজ করেছে বারবার। রাসমণির জীবনের শ্রেষ্ঠকীর্তি দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণীর মন্দির নির্মাণ।

সেখানেই নিজেকে প্রকটিত করেছিলেন যুগপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ। পরম ভক্তিমতী রানী রাসমণি সম্পর্কে স্বামী সারদানন্দ লিখেছেন, “অশেষ গুণশালিনী রানী রাসমণির শ্রীশ্রীকালিকার শ্রীপাদপদ্মে চিরকাল বিশেষ ভক্তি ছিল। জমিদারি সেরেস্তার কাগজপত্রে নামাঙ্কিত করিবার জন্য যে শীলমোহর নির্মাণ করাইয়াছিলেন, তাহাতে ক্ষোদিত ছিল ‘ কালীপদ – অভিলাষী শ্রীমতী রাসমণি দাসী’। ঠাকুরের মুখে শুনিয়াছি, তেজস্বিনী রানীর দেবী ভক্তি ঐরূপে সকল বিষয়ে প্রকাশ পাইত।”

রাসমণি একবার ঠিক করলেন কাশীক্ষেত্রে বিশ্বনাথ দর্শনে যাবেন ৷ সময়টা ১৮৪৭ খ্রিঃ। রানী রাসমণি তীর্থে যাবেন। কাজেই আয়োজন হল রাজকীয়। লোকজন, দাসদাসী নিয়ে বেশ বড়সড় এক দল আর বিপুল আয়োজন হল। শ’খানেক বজরা তৈরী হল। সমস্ত লোকজনের জন্য ছমাসের উপযুক্ত খাদ্য সামগ্রী নেওয়া হল সঙ্গে। আত্মীয় – স্বজন, এমন কি চেনা – জানা অনেক মানুষও রাসমণির তীর্থযাত্রার সঙ্গী হল। যাত্রার সব আয়োজন সম্পূর্ণ। এ

খন দুর্গা বলে গঙ্গায় ভেসে পড়লেই হয়। কিন্তু যাত্রা শুরুর আগের রাতে রাসমণি স্বপ্ন দেখলেন, স্বয়ং মাকালী দর্শন দিয়ে বলছেন, কাশীতে যাবার দরকার নেই, গঙ্গার ধারে একটা মন্দির প্রতিষ্ঠা করে পুজোর ব্যবস্থা করলেই হবে। রানীর এই তীর্থযাত্রা বন্ধ হওয়া সম্পর্কে অন্য একটা কাহিনীও প্রচলিত আছে। রানী তার দলবল বোঝাই করে বজরা ভাসিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। কিন্তু দক্ষিণেশ্বরের কাছে এসে খারাপ আবহাওয়ার জন্য আটকে পড়লেন।

সেই সময়েই ওই স্বপ্ন দেখেন। যাইহোক, মোটকথা রাসমণির আর কাশী যাওয়া হয়নি। তিনি গঙ্গার তীরে কোথায় মন্দির তৈরি করবেন সেই বিষয়য়েই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মন্দিরের উপযুক্ত জমি কেনার জন্য অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। রাসমণির জন্মস্থান হালিশহর। প্রথমে তিনি স্থির করলেন, তার কাছাকাছিই মন্দিরের জন্য জমি কিনবেন। কিন্তু রাসমণি তো শূদ্রের মেয়ে, শূদ্রের গৃহিণী।

তখনকার দিনের জাতপাতের গোঁড়ামী রযুগে একজন শূদ্রের পক্ষে দেবকার্যে এগিয়ে আসার পথে হাজারো বাধা। গোঁড়া ব্রাহ্মণ পন্ডিতরা রাসমণির ইচ্ছার কথা জানতে পেরে প্রবল বিরোধিতা করলেন। আজীবন সংগ্রামী রানী আবার এক সংগ্রামের মুখোমুখি হলেন। এ হল তৎকালীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন গোঁড়া সমাজপতিদের বিরুদ্ধে সামাজিক সংগ্রাম। রানী তাঁর সঙ্কল্প বদল করতে বাধ্য হলেন। হালিশহরে আর মন্দির নির্মাণ সম্ভব হল না।

রাসমণি জানতেন সেই কথাটা, গঙ্গার পশ্চিম কূল, বারাণসী সমতুল। এবারে তাই এই পুণ্যভূমির দিকেই মনোযোগ দিলেন রাসমণি। মথুরবাবু ওই দিকেই জমি খুঁজে বেড়াতে লাগলেন। সেই সময়ে বালি – উত্তরপাড়া অঞ্চলের ক্ষুদ্র জমিদাররা কেউ অন্যের জমির ওপর দিয়ে গঙ্গায় যেতেন না। কাজেই কেউই জমি বিক্রি করতে চাইলেন না। কিন্তু রাসমণি নিরস্ত হলেন না।

দীর্ঘদিন ধরে খোঁজাখুঁজির পর শেষ পর্যন্ত কেনা হল গঙ্গার পূর্বকূলের দক্ষিণেশ্বর অঞ্চলের জমি। জমির মালিক ছিলেন হেস্টিং সাহেব। তার কাছ থেকেই ১৮৪৭ খ্রিঃ ৬ ই সেপ্টেম্বর ষাট বিঘে জমি কেনা হল পঞ্চাশ হাজার টাকায়। এই জমিটা ছিল খুবই তাৎপর্যমন্ডিত। তার একদিকে ছিল জমির মালিক সুপ্রিম কোর্টের অ্যাটর্নি জেমস হেস্টিং – এর কুঠি। অন্য প্রান্তে ছিল মুসলমানদের কবরস্থল ও গাজি সাহেবের দরগা।

এই দুই প্রান্তের মাঝখানে হল হিন্দু মন্দির। জমির এমন অবস্থানের মধ্যেই যেন ছিল ভবিষ্যতের এক অলৌকিক ইঙ্গিত। পরবর্তীকালে এখানেই রাসমণির মন্দিরের পুরোহিত যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণের কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাণী — যত মত তত পথ। সর্বধর্মের মধ্যে যিনি এই ঈশ্বরকে দর্শন করেছেন, তাঁর সেই সত্য উপলব্ধির ভূমি ছিল রাসমণির মন্দির প্রাঙ্গণ।

রানীর ঐকান্তিক আগ্রহে ও চেষ্টায় একদিন গড়ে উঠল ভবতারিণীর মন্দির, রাধাকান্তের মন্দির, দ্বাদশ শিবমন্দির, অতিথিশালা, কর্মীগৃহ, মন্দির সংলগ্ন দুটো ঘাট, কুঠিবাড়ি, চাঁদনী ইত্যাদি। মন্দির সম্পূর্ণ হতে লেগেছিল দীর্ঘ দশ বছর। খরচ ? মন্দির উদ্বোধনের খরচ নিয়ে মোট ব্যয় হয়েছিল তখনকার দিনের নয় লক্ষ টাকা। বাংলা ১২৫৪ থেকে ১২৬৩ সন পর্যন্ত দক্ষিণেশ্বর মন্দির নির্মাণের সময় সুদীর্ঘ দশ বছর রাসমণি ছিলেন ব্রতচারী, শয়ন করেছেন মাটিতে, আহার তো ছিল হবিষ্যান্ন মাত্র ৷

জমি কেনা, মন্দির নির্মাণ ও মন্দিরের খরচপত্র চালানোর জন্য দিনাজপুরে জমি কেনা হয়েছিল ত্রৈলোক্যনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে। তার জন্য খরচ হয়েছিল দুই লক্ষ ছাব্বিশ হাজার টাকা। এই সম্পত্তি দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের জন্যই দানপত্র করে দিয়েছিলেন তিনি। মন্দিরে কর্মচারী নিযুক্ত হয়েছিলেন পঞ্চাশজন। তাদের বেতন বাবদ বছরে খরচ হত তিন হাজার টাকা।

সেই সময়ে রাসমণির বয়স হয়েছিল বাষট্টি বছর। বয়সের কথা ভেবেই তিনি মন্দিরে দেববিগ্রহ প্রতিষ্ঠা এবং বিধিমতে নিত্যপূজা উপসনার জন্য অধীর হয়ে উঠেছিলেন। মন্দির নির্মাণের কাজ শেষ হবার আগেই বাংলা ১২৬২ সনে ১৮ ই জ্যৈষ্ঠ জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার দিনে তিনি মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন। ইংরাজি মতে সময়টা ছিল ১৮৫৫ খ্রিঃ ৩১ শে মে। মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছে, এবারে কোন সৎ নিষ্ঠাবান শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণকে দিতে হবে মন্দিরে দেবসেবার দায়িত্ব।

কিন্তু ব্রাহ্মণদের কেউই রানীর আমন্ত্রণ রক্ষা করতে এগিয়ে এলেন না। রানী ছিলেন মাহিষ্য পরিবারের মেয়ে। বিয়ে হয়েছিল মাড় – পরিবারে। সেইকালে মাহিষ্যদের শূদ্র বলেই গণ্য করা হত। সেইজন্য রানীর গোঁড়া ব্রাহ্মণরা মন্দিরে পৌরোহিত্য বা দান গ্রহণ করার ব্যাপারে রাজি হলেন না। রাসমণি এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তার মাথায় যেন এবারে আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে মন্দির নির্মাণ করিয়েছেন, নিষ্ঠা, আকুলতা, অর্থব্যয়, শ্রম কোন কিছুরই ত্রুটি ছিল না।

কিন্তু ব্রাহ্মণরা পুজো করতে না এলে যে কেউ ঢুকবে না মন্দিরে, তবে কি সব আয়োজনই পন্ড হবে ? কিন্তু রাসমণি তো প্রতিকূলতার কাছে কোন দিন মাথা নত করেন নি। তিনি বিভিন্ন দিকে লোক পাঠিয়ে পন্ডিতদের পরামর্শ নিতে লাগলেন। রানীর সব চেষ্টাই যখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবার মুখে, সেই সময় একজন শাস্ত্রবিৎ, সদাচারনিষ্ঠ, ভক্ত ব্রাহ্মণ রামকুমার চট্টোপাধ্যায় রানীর কাতরতায় বিচলিত হয়েছিলেন।

তিনি সম্মত হলেন রানীর মন্দিরে পুজো করতে। সেই সময় রামকুমার কলকাতার ঝামাপুকুরে সংস্কৃত টোলে অধ্যাপনা করতেন। টোল বাড়িতে তাঁর সঙ্গে থাকতেন ছোটভাই রামকৃষ্ণ। তখন তিনি রামকৃষ্ণ নন, গদাধর। বয়স উনিশ। উপনয়নের সময় তাদের কামারপুকুর গ্রামে গুরুজনদের নিষেধবাক্য উপেক্ষা করে শূদ্রা রমনী ধনী কামারনীর কাছ থেকে প্রথম ভিক্ষা গ্রহণ করে তাঁকে মা বলে ডেকেছিলেন গদাধর।

নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হয়েও শূদ্রানীকে তিনি করেছিলেন ভিক্ষামাতা। এবারে রানী রাসমণির আর্তি শোনার পর তিনি দাদাকেও তার মত আচরণ করতেই প্রেরণা দিলেন। রাসমণির পত্র নিয়ে এসেছিলেন মহেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ব্রাহ্মণ পূজকের অভাবে ভক্তের মাতৃপূজা হবে না, দেবীর আদিষ্ট মন্দির প্রতিষ্ঠা ব্যর্থ হয়ে যাবে— এসব কথা ভেবে রামকুমার ও গদাধর দুজনেই ব্যথিত হলেন। তাদের পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় কোনদিন শূদ্রের দান গ্রহণ করেন নি, শূদ্রযাজী হননি।

এই ঐতিহ্যের ধারক হয়েও বংশের রীতিকে ভঙ্গ করতে বাধ্য হলেন রামকুমার — ভক্তিমতী রাসমণির অসহয়তার কথা ভেবে। তিনি রানীকে বিধান দিয়েছিলেন রানী যদি ওই মন্দির ও মন্দির পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট সব সম্পত্তি কোনও ব্রাহ্মণকে দান করেন, তাহলে সমস্যার সমাধান হতে পারে। রাসমণি প্রতিষ্ঠার আগেই মন্দির উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন তাঁর গুরুদেবের নামে। কাজেই মন্দিরে পূজার দায়িত্ব নিতে আর ইতস্ততঃ করেন নি রামকুমার।

পরবর্তীকালে একই দায়িত্ব নিয়েছিলেন রামকৃষ্ণ। রামকৃষ্ণ যখন তার দাদার সঙ্গে দক্ষিনেশ্বরে থাকতে আসেন, সেই সময়েও তার মধ্যে পারিবারিক নিষ্ঠা বেশ সক্রিয় ছিল। প্রচলিত রীতিনীতিকে অতিক্রম করবার মতো মানসিক প্রস্তুতি তখনো তাঁর গড়ে ওঠেনি। দাদার সঙ্গে থেকেছেন কিন্তু মন্দিরের অন্নভোগ বা প্রসাদ গ্রহণ করতেন না। মন্দিরের ভাঁড়ার থেকে নেওয়া চাল ডাল ইত্যাদি তিনি গঙ্গাতীরে স্বহস্তে রান্না করে খেতেন।

ক্রমে রাসমণির মধুর ব্যবহারে ও সহৃদয়তাগুণে রামকৃষ্ণের মধ্যে পরিবর্তন ঘটে। ক্রমে তিনি সহজ হয়েছেন। পরে রাসমণির অনুরোধে তিনি পূজারীর পদও নিয়েছেন। তার সস্নেহ প্রশ্রয়েই উত্তরকালে গদাধর থেকে শ্রীরামকৃষ্ণে উন্নীত হয়েছেন। রামকৃষ্ণ প্রচলিত পূজার পদ্ধতির ধার ধারতেন না। ভাবের আবেশে তিনি নিজস্ব প্রক্রিয়ায় পুজো করতেন, কালীর সঙ্গে অলৌকিক লীলায় মেতে থাকতেন।

মন্দিরের অন্যান্য পুরোহিতরা রামকৃষ্ণের ব্যবহারে রুষ্ট হয়ে রানীর কাছে গিয়ে নালিশ জানিয়েছিলেন এই বলে যে রামকৃষ্ণ দেবীর অবমাননা করে মন্দিরের পবিত্রতা নষ্ট করছেন। অভিযোগ শুনে রাসমণি নিজে অনুসন্ধানে এসে দেখলেন, রামকৃষ্ণের দেবীপূজা মন্ত্রহীন, প্রচলিত পদ্ধতির একেবারে বাইরে। কিন্তু সেই পূজায় রয়েছে ভক্ত প্রাণের আকুতি আর আত্মনিবেদন। রাসমণি তার ভক্তি ও বিচক্ষণতা দিয়ে সেদিন বুঝতে পেরেছিলেন, রামকৃষ্ণের পূজাতেই পাষাণী দেবী একদিন চিন্ময়ী হবেন।

তার মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছে যে এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই। রাসমণি তার লোকজনদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, গদাধরের কাজে কেউ যেন কোন বাধা না দেয়। তিনি তার মতো করেই মায়ের পূজা করবেন।

রাসমণির বাস্তববোধও লোকচরিত্র জ্ঞানের ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। রামকৃষ্ণের স্বরূপ তার অন্তর্দৃষ্টিতেই প্রথম ধরা পড়েছিল। ফলে মানসিক দিক থেকে ক্রমেই রাসমণির এই চরিত্ররহস্যটি শ্রীরামকৃষ্ণের জ্ঞানদৃষ্টিতে উম্মোচিত হয়েছিল। জগন্মাতার শক্তির অংশ রূপেই রাসমণিকে জ্ঞান করতেন তিনি।

রাণী রাসমণি র মৃত্যু: Rani Rashmoni’s Death

বিপুল কর্তব্য সম্পূর্ণ করে, ১৮৬১ খ্রিঃ ১৯ শে ফেব্রুয়ারি রানী রাসমণি ফিরে গেছেন জগন্মাতার কোলে।

Leave a Comment