মাষ্টারদা সূর্য সেন জীবনী | Surya Sen Biography in Bengali

মাষ্টারদা সূর্য সেন জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Surya Sen Biography in Bengali. আপনারা যারা মাষ্টারদা সূর্য সেন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী সূর্য সেন এর জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

মাষ্টারদা সূর্য সেন কে ছিলেন? Who is Surya Sen?

সূর্য সেন (২২ মার্চ ১৮৯৪ – ১২ জানুয়ারি ১৯৩৪) বা সূর্যকুমার সেন যিনি মাস্টারদা নামে সমধিক পরিচিত, তার ডাকনাম ছিল কালু, ভারতবর্ষের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব। পূর্ববঙ্গে জন্ম নেওয়া এই বাঙালি বিপ্লবী তৎকালীন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং নিজ জীবন বলিদান করেন। সূর্যসেনের বাহিনী কয়েকদিনের জন্যে ব্রিটিশ শাসনকে চট্টগ্রাম এলাকা থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল।

সূর্য সেনের অন্যতম সাথী বিপ্লবী অনন্ত সিংহের ভাষায় “কে জানতো যে আত্মজিজ্ঞাসায় মগ্ন সেই নিরীহ শিক্ষকের স্থির প্রশান্ত চোখ দুটি একদিন জ্বলে উঠে মাতৃভূমির দ্বিশতাব্দীব্যাপি অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে উদ্যত হবে? ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ দমনের জন্য বর্বর অমানুষিক অত্যাচারের প্রতিশোধ, জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ! কে জানতো সেই শীর্ন বাহু ও ততোধিক শীর্ন পদযুগলের অধিকারী একদিন সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ রাজশক্তির বৃহত্তম আয়োজনকে ব্যর্থ করে – তার সমস্ত ক্ষমতাকে উপহাস করে বৎসরের পর বৎসর চট্টগ্রামের গ্রামে গ্রামে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে তুলবে?”

মাষ্টারদা সূর্য সেন জীবনী – Surya Sen Biography in Bengali

নামমাষ্টারদা সূর্য সেন
জন্ম22 মার্চ 1894
পিতারাজমনি সেন
মাতাশশী বালা সেন
জন্মস্থাননোয়াপারা, রাউজান উপজেলা, চট্টগ্রাম, ব্রিটিশ ভারত, (বর্তমান বাংলাদেশ)
জাতীয়তাব্রিটিশ ভারতীয়
পেশাবাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামী
মৃত্যু12 জানুয়ারী 1934 (বয়স 39)

সূর্য সেন এর জন্ম: Surya Sen’s Birthday

সূর্য সেন 22 মার্চ 1894 জন্মগ্রহণ করেন।

চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে ১৯১৪ খ্রিঃ বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। একজন ছাত্র হস্তদন্ত হয়ে হলে ঢুকল। কোন দিকে না তাকিয়ে তাড়াহুড়ো করে পরীক্ষকের কাছ থেকে খাতা ও প্রশ্নপত্র নিয়ে লিখতে বসে গেল ছাত্রটি। বাড়ি থেকে বেরোতে দেরি হয়ে গিয়েছিল, তাই এই বিপত্তি। মাথা গুঁজে একমনে লিখতে শুরু করেছে ছেলেটি। এমন সময় পরীক্ষক এসে দাঁড়ালেন সামনে। উঠে দাঁড়াতে বললেন ছেলেটিকে। জানালেন, তাকে পরীক্ষা দিতে দেওয়া হবে না ! কারণ সে ডেস্কে বই রেখে টুকছে।

উত্তেজিত হয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ছেলেটি লক্ষ করল, সত্যিই ডেস্কের ওপরে বই রয়েছে। তাড়াহুড়ো করে পরীক্ষায় বসতে গিয়ে হাতের বইগুলো বাইরে রেখে আসতে ভুলে গিয়েছিল। ছেলেটি নিজের অসাবধানতার কথা বোঝাবার চেষ্টা করল। কিন্তু পরীক্ষক তার কোন কথাই কানে তুললেন না। এই ব্যাপার শেষ পর্যন্ত অনেকদূর পর্যন্ত গড়াল। ছেলেটি পরীক্ষা দেবার সুযোগ তো পেলই না, উপরন্তু অসাধুতার অভিযোগে তাকে কলেজ থেকে বিতাড়িত হতে হল।

অভিভাবকরা মাথায় হাত দিয়ে বসলেন। হিতৈষীরা পরামর্শ দিলেন, একটা নকল সার্টিফিকেট জোগাড় করে অন্য কলেজে ভর্তি হবার চেষ্টা করার জন্য। ছেলেটি কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য কোন অসাধু উপায় গ্রহণ করতেই রাজি হল না। সে কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে এলো মুর্শিদাবাদে। বহরমপুর কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করে আগাগোড়া সমস্ত ঘটনা তাকে জানাল। উনিশ – কুড়ি বছরের এক তরুণের সৎসাহস ও সরলতা দেখে মুগ্ধ হলেন অধ্যক্ষ। তিনি বিনা দ্বিধায় ছেলেটিকে নিজের কলেজে ভর্তি করে নিলেন।

এই ছেলেটি ১৯১৭ খ্রিঃ বহরমপুর কলেজ থেকেই সসম্মানে বি.এ পরীক্ষা পাস করল। এই সরল, সৎ, ঋজু ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছেলেটিই হলেন উত্তরকালের বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামী তরুণ বিপ্লবীদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সেনাপতি মাষ্টারদা সূর্য সেন। ছাত্রজীবনের ছোট্ট ঘটনাটির মধ্যেই তার যে অসামান্য ব্যক্তিত্ব প্রকাশিত হয়েছিল তার বলেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিপ্লবমন্ত্রে দীক্ষিত তরুণদের অবিসংবাদিত নেতা।

সূর্য সেন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাঁর অন্যতম সহযোদ্ধা কল্পনা যোশি বলেছেন “বিপ্লবী নেতার কথা ভাবতে গেলে সাধারণতঃ যে চেহারাটি ভেসে ওঠে মাষ্টারদার মোটেই তা ছিল না। রোগা, ছোটখাট, স্বল্পভাষী, অমায়িক মানুষটাকে দেখলে বোঝার উপায় ছিল না, মানুষটা কোন জাতের। শুধু যারা তাঁর অতি নিকটে এসেছ তারাই জেনেছে কতটা নৈতিক ও মানসিক শক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি।”

মাষ্টারদা সূর্য সেন সম্পর্কে এমনই মন্তব্য শোনা গেছে বহুজনের কাছ থেকেই। বিপ্লবীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আনন্দ গুপ্ত মাষ্টারদার সম্পর্কে তাঁর The Immortal Surya Sen গ্রন্থে লিখেছেন, “I still remember the day when I had the first privilage of meeting the immortal Surya Sen. One day I was told by late Ananta Singh, ” You are going to meet to morrow the leader of our party on your way back from school . His name is Surya Sen. We all call him Masterda”. I still remember I could not help being worried ….. Next day I arrived at Ananta Singh’s home at the appointed time. I looked around with keen enthusiasm. I found a very ordinary looking man seated in a corner, most of his head bold, I thought perhaps Masterda (Surya Sen) was yet to arrive. I looked at once at Ananta Singh . He immediately introduced me, ” This is Masterda about whom I had told you already, ‘ and he left the room leaving me alone with Surya Sen. A stream of thought crossed my mind. Is this the famous man who leads the party and whose word is law to his followers ? But contrary to my preconceined motion he looked very ordinary. I moved nearer and sat close to him . But no sooner had I looked at his eyes than I felt rather uncomfortable. I immediately had the feel of powerful (but unassuming) personality behind his piercing pair of eyes.”

আপাতদৃষ্টিতে অতি সাধারণ মাষ্টারদা সম্পর্কে তার দলের কর্মীদের কাছ থেকে যেসব কথা জানা যায় কেবল তা থেকেই একটা গোটা মানুষের চরিত্র আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বিপ্লবী বিনোদবিহারী দত্ত লিখেছেন, “আমরা প্রতিটি মুহূর্তে জানতাম যে মাষ্টারদা ভুল করতে পারেন না, তিনি অভ্রান্ত। নেতার প্রতি অমন বিশ্বাস যেমন আমাদের মনে শক্তি দিয়েছে, তেমনই নেতার আদের্শের সক্রিয় শরিক রূপে নিজেদের ভাবতে পারতাম বলেই সকল কর্মে সেই বোধ আমাদের আত্মনির্ভর করেছে।”

বিনোদবিহারী দত্ত আর এক জায়গায় লিখেছেন, “দাদার সঙ্গে আছি। আমার নোংরা কাপড়খানা সাবান জলে ডুবিয়েছি। দূর থেকে দেখতে পেয়েই এগিয়ে এসে ঝট করে দাদা তার ভিজে গেঞ্জিটা তুলে নিলেন, ধুতে দিলেন না। বললেন, আমি মহান্ত নই ! তুই, আমি এবং দলের প্রত্যেকে আমরা এক – আমরা বিপ্লবী। আজকে আমার গেঞ্জি ধুবি, কাল পা টিপবি। – এসব চলবে না। এ করতে চাইলে আমার ধারে কাছে আসতে দেব না।”

আর এক জায়গায় বিনোদবিহারী দত্ত আর একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন ৷ এই ঘটনা মহাবিপ্লবী সূর্য সেনের চরিত্রের পরিচয় আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে আমাদের সামনে। সূর্য সেনের চরিত্রের অলোকেই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সেই যুগের বিপ্লবীদের জীবন ও চরিত্র, দেশের ও দশের কল্যাণে যারা দধীচির মত অকাতরে জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। সেই সময় সূর্য সেন চট্টগ্রাম কংগ্রেসের সভাপতি। একদিন তিনি কংগ্রেস অফিসে বসে আছেন। দেশের বাড়ি থেকে তাঁর দাদা এলেন দেখা করতে। পারিবারিক কোনও প্রয়োজনে তাঁর কিছু টাকার দরকার হয়ে পড়েছে। সূর্য সেন মন দিয়ে সবই শুনলেন তাঁর দাদার কথা, উদ্বেগের ছাপ তার চোখেমুখে ফুটে উঠল। কিন্তু দাদাকে কোন সাহায্য তিনি করতে পারলেন না। নিরাশ হয়ে দাদা ফিরে গেলেন। কিছুক্ষণ পরেই কংগ্রেস অফিসে এল একটি অল্পবয়সী ছেলে। সে সূর্য সেনকে জানাল ফি – এর টাকা জোগাড় করতে পারেনি বলে সে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বসতে পারছে না। সূর্য সেন সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে ছেলেটির হাতে দিলেন।

বিনোদবিহারী দত্ত নিকটেই বসেছিলেন। তিনি সব ঘটনারই সাক্ষী। বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন যে, সঙ্গে এত টাকা থাকা সত্ত্বেও সূর্য সেন কেন তাঁর দাদাকে ফিরিয়ে দিলেন ? সূর্য সেন তাকে উত্তর করলেন, “এ টাকা তো আমার নয়। দেশবাসী কংগ্রেসকে দিয়েছে দেশের কাজের জন্য। ওই ছেলেটি গরীব মেধাবী ছাত্র। অর্থের অভাবে পরীক্ষায় বসতে পারছে না। এ টাকায় তার দাবি আছে। ” বিনোদবিহারী আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার পরিবার কি দেশের অংশ নয় ? ওই টাকাতে তো তাঁরও দাবি থাকবার কথা।”

সূর্য সেন উত্তর দিলেন, “দাদা তো কংগ্রেস সভাপতির কাছে আসেননি। তিনি এসেছিলেন তার ছোট ভাইয়ের কাছে। কিন্তু ওই ছেলেটি সাহায্য চাইতে এসেছিল কংগ্রেস সভাপতির কাছে। তাই ওই টাকাতে তারই দাবি আগে।” এই হলেন বিপ্লবী মাষ্টারদা সূর্য সেন।

সূর্য সেন এর পিতামাতা ও জন্মস্থান: Surya Sen’s Parents And Birth Place

এই অসাধারণ মানুষটির জন্ম চট্টগ্রাম জেলার নোয়াপাড়া গ্রামে। সূর্য সেনের জন্ম সময় নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে। কোন মতে ১৮৯৩ খ্রিঃ ২৫ অক্টোবর। আবার কেউ বলেন ১৮৯৪ খ্রিঃ ২২ শে মার্চ। অবশ্য বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার দ্বিতীয় তারিখটিই সমর্থন করেছেন। সূর্য সেনের বাবার নাম রাজমণি সেন, মাতা শশিবালা দেবী। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সূর্য সেন ছিলেন চতুর্থ। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই তিনি পিতৃহারা হন। কাকা গৌরমণি সেনের আদরে শাসনেই বড় হয়ে ওঠেন তিনি।

সূর্য সেন এর শিক্ষাজীবন: Surya Sen’s Educational Life

বালক সূর্যকে প্রথমে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় গ্রামেরই দয়াময়ী উচ্চবিদ্যালয়ে। তারপর হরিশ দত্তের জাতীয় স্কুল থেকে ১৯১২ খ্রিঃ তিনি এন্ট্রান্স পাস করেন। কলেজ জীবন শুরু হয় চট্টগ্রাম কলেজে। এখানেই ঘটেছিল আগে উল্লেখ করা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি ৷ শেষপর্যন্ত ১৯১৭ খ্রিঃ বহরমপুর কলেজ থেকে বি.এ পাস করে সূর্য সেন ফিরে আসেন চট্টগ্রামে।

সূর্য সেন এর কর্ম জীবন: Surya Sen’s Work Life

সূর্য সেনের জীবনীকারদের অনেকেই উল্লেখ করেছেন যে বহরমপুর কলেজে পড়বার সময়েই তিনি গুপ্ত বিপ্লবী আন্দোলনের কর্মীদের সংস্পর্শে আসেন। তবে নোয়াপাড়া জাতীয় বিদ্যালয়ে পাঠকালেই সূর্য সেন অম্বিকা চক্রবর্তী সহ আরো কিছু তরুণকে বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছিলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হেমেন্দ্রলাল মুখোটি। তিনি ছিলেন বরিশাল ষড়যন্ত্র মামলার পলাতক আসামী। কিছুদিন দুর্গাপুর ; ‘ ইস্কুলে শিক্ষকতা করবার পর তিনি যোগ দিয়েছিলেন নোয়াপাড়া জাতীয় বিদ্যালয়ে ৷

বহরমপুর কলেজের অধ্যাপক ছিলেন বিশিষ্ট বিপ্লবী নেতা সতীশ চক্রবর্তী। তার সংস্পর্শে এসে সূর্য সেন বিপ্লবী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হন। ফলে একটি বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার পরিকল্পনা মাথায় নিয়েই তিনি চট্টগ্রামে ফিরে এসেছিলেন। যোগ দিয়েছিলেন উমাতারা উচ্চ ইংরাজি বিদ্যালয়ে অঙ্কের শিক্ষক হিসাবে। নিছক জীবিকার জন্যই তিনি শিক্ষকতাকে বেছে নেননি। তার এই কর্মগ্রহণের পেছনে ছিল এক বৃহত্তর ও মহত্তর ভাবনা ও উদ্দেশ্য।

স্কুলে তিনি শুধু যে অঙ্ক শেখাতেন তাই নয়। অবসর সময়ে ছাত্রদের শোনাতেন দেশবিদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের কাহিনী। আন্তরিক ব্যবহারের জন্য তিনি অল্পদিনের মধ্যেই হয়ে উঠলেন ছাত্রদের মাষ্টারদা। ক্রমে চট্টগ্রামের ছেলেবুড়ো সবারই মাষ্টারদা। ছাত্র তৈরি করার পাশাপাশি সূর্য সেন নেমে পড়লেন সমাজ সেবার কাজে। এই উদ্দেশ্যে অনুগামী ছাত্রদের নিয়ে গড়ে তুললেন সাম্য আশ্রম। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের সাহায্য করা, দুর্গতদের সেবা করা — এসবই ছিল এই সঙ্ঘের লক্ষ।

সূর্য সেন বিশ্বাস করতেন, ভারতকে স্বাধীন করতে হলে যুবকদের সুপ্ত শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে হবে। তাহলেই তাদের নিয়ে ঘটানো সম্ভব হবে সশস্ত্র বিপ্লব ৷ এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য অস্ত্রশস্ত্রের প্রয়োজন, তবে তার চাইতেও বেশি প্রয়োজন আদর্শবাদী এ অকুতোভয় যুবকের, যাঁরা কোন বাধাকে বাধা বলে মানবে না। যাদের প্রাণের মায়া বলে কোন দুর্বলতা থাকবে না, থাকবে না কোন পিছুটান।

সূর্য সেন বুঝতে পেরেছিলেন যে আসুরিক বলের ওপরে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ শাসনকে উৎখাত করতে হলে বলপ্রয়োগ ছাড়া অন্য পথ নেই। মূল লক্ষ স্বাধীনতা, তা হিংসার পথে আসবে কি অহিংসার পথে আসবে — এই বিষয়কে তিনি মোটেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন না। সাম্য আশ্রম গড়ে তোলার সময়েই সূর্য সেন অনুগামী হিসেবে পেলেন গিরিজাশঙ্কর চৌধুরী, চারুবিকাশ দত্ত, অম্বিকা চক্রবর্তী, নির্মল সেন, অনন্ত সিংহ, রাজেন দাস, গণেশ ঘোষ, যতীন রক্ষিত, সুখেন্দু দত্ত, রাখাল দে প্রমুখ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ একদল তরুণকে।

অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তর প্রভৃতি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনের আদর্শে সূর্য সেন চট্টগ্রামে গড়ে তুললেন একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংস্থা ১৯১৭ খ্রিঃ। অনুরূপ সেন, নগেন সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, চারুবিকাশ দত্ত ও সূর্য সেন — এই পাঁচজনকে নিয়ে গঠিত হল বিপ্লবী কমিটি। পরের বছর এই দলের সঙ্গে যুক্ত হলেন প্রমোদ চৌধুরী, আশরাফউদ্দিন, নির্মল সেন, উপেন ভট্টাচার্য, অনন্তলাল সিং এবং তাঁর বড়ভাই নন্দলাল সিং।

অনন্ত সিং পরে দলের সঙ্গে যুক্ত করেন গণেশ ঘোষকে। সূর্য সেন ছিলেন এই তরুণ বিপ্লবীদলের অবিসংবাদিত নেতা। দলের প্রতিটি অনুগামী তাকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন। তার মুখের কথায় হাসি মুখে প্রাণ দিতে পারতেন ৷ সংগঠনের সকল কাজেই সূর্য সেন কঠোরভাবে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে চলতেন। দলের প্রতিটি কাজে লিপ্ত থেকেও অদ্ভুতভাবে নির্লিপ্ত থাকার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার। সূর্য সেনের অনুমতি ছাড়া যেমন কোন কাজ হত না, তেমনি সকল বিষয়েই উপস্থিত কর্মী ও কর্মীনেতাদের প্রত্যেকেরই মতামত তিনি গুরুত্ব দিয়ে শুনতেন।

মাষ্টারদা সূর্য সেনের ব্যক্তি জীবনেও ছিল আশ্চর্য স্বাতন্ত্র। বস্ত্র বা বাসস্থান বিষয়ে যেমন ছিলেন উদাসীন তেমনি খাদ্যের ব্যাপারেও ছিলেন নির্লিপ্ত। অন্তর ছিল স্নেহ – মমতায় পূর্ণ। কিন্তু পরিবারের ক্ষুদ্র গন্ডি তাকে কখনো বেঁধে রাখতে পারেনি। স্কুলে কাজ নেবার পর পরিজনদের চাপে পড়ে বিয়ে করেছিলেন সূর্য সেন। তাঁর স্ত্রীর নাম পুষ্পকুম্ভলা দেবী। সাধারণ গৃহস্থের মতো অর্থ স্বাচ্ছন্দ্য দিয়ে মাষ্টারদা স্ত্রীকে সুখী করতে পারেননি, সেই অর্থে তার সংসার সুখ বলতে যা বোঝায় তা তিনি কোনদিনই পাননি।

তবে মাষ্টারদার বড় কৃতিত্ব এই যে তিনি স্ত্রীকেও নিজের কর্মযজ্ঞে টেনে নিতে পেরেছিলেন। পুষ্পকুম্ভলা হয়ে উঠেছিলেন বহুমানুষের সুখ – দুঃখের শরিক। মাষ্টারদার অনুগামীদের মনে তিনি শ্রদ্ধার আসন করে নিতে পেরেছিলেন। পুষ্পকুন্তলা দেবী সম্পর্কে অনন্ত সিং তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “যিনি একদিন মাষ্টারদার জীবনে তাঁর স্ত্রীরূপে এসেছিলেন তিনি কেবল তার ধর্মপত্নী ছিলেন, তা নয় — তিনি সূর্য সেনের অতিবিশ্বাসী বিপ্লবী সাথী ও সহযাত্রিনী ছিলেন।”

অনন্ত সিং তার রচিত ‘সূর্য সেনের স্বপ্ন ও সাধনা’ গ্রন্থটি পুষ্পকুন্তলা দেবীকে উৎসর্গ করে অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। খুব অল্প বয়সেই টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান পুষ্পকুন্তলা। সূর্য সেনকে অনুপ্রাণিত করেছিল বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠের জীবনদর্শন। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তাঁর অসাধারণ সংগঠন ক্ষমতা। নিজের হাতে তিনি তাঁর অনুগামীদের ভবিষ্যৎ বিপ্লবের উপযুক্ত করে রীতিমত যোদ্ধাবাহিনী রূপে গড়ে তুলেছিলেন।

কিন্তু শক্তিশালী ব্রিটিশ সরকারকে আঘাত হানতে গেলে অস্ত্রবলেরও প্রয়োজন। অস্ত্র সংগ্রহের জন্য প্রয়োজন টাকার। বিপ্লবের প্রস্তুতিপর্ব সমাপ্ত করবার উদ্দেশ্যে মাষ্টারদা নতুন করে পরিকল্পনা ছকলেন। মাতৃমন্ত্রে দীক্ষিত তরুণ বিপ্লবীরা অর্থ ও অস্ত্র সংগ্রহের জন্য নেমে পড়লেন। অসম – বাংলা রেলওয়ে কোম্পানির অফিসে হানা দিয়ে বিপ্লবীরা সংগ্রহ করলেন সতেরো হাজার টাকা। এই ঘটনার দশদিনের মধ্যেই ১৯২৩ খ্রিঃ ২৪ শে ডিসেম্বর নাগরখানার যুদ্ধে সূর্য সেন ও অম্বিকা চক্রবর্তী ধরা পড়লেন। পরে অবশ্য তারা ছাড়া পেলেন।

কিন্তু অসম – বেঙ্গল রেলওয়ের টাকা চুরির মামলা চলতে লাগল অনন্ত সিং – এর বিরুদ্ধে। সন্ত্রাসবাদ দমনের উদ্দেশ্যে সরকার ১৯২৪ খ্রিঃ জারি করলেন বেঙ্গল অর্ডিন্যান্স।১৯২৬ খ্রিঃ সূর্য সেন চট্টগ্রাম কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। সেই সময়ে স্বাভাবিক ভাবেই তার রাজনৈতিক প্রভাব অনেক গুণ বৃদ্ধি পায় ৷ ১৯২৬ খ্রিঃ বেঙ্গল অর্ডিন্যান্স বাল সূর্য সেনকে গ্রেপ্তার করা হল। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বহু বিপ্লবীকেই এই সময় বন্দি করা হয়।

১৯২৮ খ্রিঃ একে একে সব রাজবন্দিরা মুক্তি লাভ করলেন। কারামুক্তির পর সূর্য সেন মনস্থির করে ফেললেন, বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করতে হবে। তিনি সেভাবে যুবকদের সংগঠিত করার কাজও শুরু করলেন। স্কুলের ছেলেদের গড়ে তোলার জন্য মাষ্টারদার নির্দেশে গড়ে উঠল ব্যায়াম সমিতি। শরীর চর্চার সঙ্গে সেখানে ছেলেদের স্বদেশী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করে তোলার কাজ চলল। এইভাবেই ক্রমে গড়ে উঠল, ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি, চট্টগ্রাম শাখা। সূর্য সেন হলেন এই সংগঠনের প্রেসিডেন্ট।

মাষ্টারদার সহযোদ্ধা কল্পনা যোশী লিখেছেন, ‘ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের ও বাংলার বিপ্লবীদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আয়ারল্যান্ডের সংগ্রাম। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির অনুকরণে চট্টগ্রামের এই বিপ্লবী দল তাদের দলের নামকরণ করল ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি, চট্টগ্রাম শাখা। ‘ চট্টাগ্রাম অস্ত্রাগার লুঠ করার পরিকল্পনা সূর্য সেন দীর্ঘ দিন ধরেই মনে লালন করে আসছিলেন। তারই প্রস্তুতি হিসেবে গড়ে তুলেছেন চট্টগ্রাম রিপাবলিকান আর্মির সুদক্ষ যোদ্ধাবাহিনী। এবারে তিনি সহযোগী সকলকে জানিয়ে দিলেন তার কর্মসূচির কথা।

সেই সঙ্গে দিনও স্থির করে দিলেন — আয়ারল্যান্ডের ইস্টার বিদ্রোহের দিন ১৯৩০ খ্রিঃ ১৮ ই এপ্রিল। মুষ্টিমেয় অস্ত্রশস্ত্র সম্বল করে ব্রিটিশ শাসকের দুর্ভেদ্য অস্ত্রাগার এই দিন আক্রমণ করল একদল তরুণ। সাময়িকভাবে সফলও হল এই বিদ্রোহ। চট্টগ্রাম পুলিশের হেডকোয়ার্টার সমেত অক্সিলিয়ারি ফোর্সের অস্ত্রাগার চলে আসে বিপ্লবীদের দখলে। চট্টাগ্রামের সঙ্গে অন্যান্য জেলাকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার জন্য উপড়ে ফেলা হয়েছিল রেল লাইন, বিচ্ছিন্ন করা হয়, টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন যোগাযোগ।

ব্রিটিশ শাসনের পদস্থ কর্মচারীরা প্রাণ ভয়ে সপরিবারে জাহাজে করে মাঝ সমুদ্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য হল। কয়েকদিনের জন্য চট্টগ্রাম হল স্বাধীন – ব্রিটিশ শাসন মুক্ত। মাষ্টারদার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম শহর ৪৮ ঘন্টার জন্য ইংরাজশাসন মুক্ত ও স্বাধীন ছিল। জালালাবাদ পাহাড়ে বিপ্লবীদের মুখোমুখি সংঘর্ষ শেষ হবার পরেও তারা টানা তিন বছর গেরিলা যুদ্ধ চালিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সৈন্যদের দৃষ্টি থেকে মাষ্টারদাকে আড়ালে রাখার উদ্দেশ্যেই বিপ্লবীরা এই যুদ্ধ চালিয়েছিলেন।

বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তারের হাত থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছেন মাষ্টারদা। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। চট্টগ্রামের কাছেই গইরালা গ্রাম। সেখানে এক বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন মাষ্টারদা। এক জ্ঞাতি ভ্রাতার বিশ্বাসঘাতকতায় ব্রিটিশ সৈন্যরা তার সন্ধান পেয়ে যায়। মাষ্টারদা গ্রেপ্তার হন। ১৯৩৩ খ্রিঃ ১৬ ই ফ্রেব্রুয়ারী। অবশ্য পুলিশের ওই চর নেত্রসেন ও মাষ্টারদার গ্রেপ্তারকারী পুলিস মাখনলালকে পরে বিপ্লবীরা গুলি করে হত্যা করে। ব্রিটিশ সরকারের আদালতে বিচারের নামে হল প্রহসন।

সূর্য সেন এর মৃত্যু: Surya Sen’s Death

বীর বিপ্লবী সূর্যসেনকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হল। ১৯৩৪ খ্রিঃ ১২ জানুয়ারি ঘাতকের হাতে সূর্য সেনের ফাসি হল। ফাসির আগের দিন প্রিয় দেশবাসীর উদ্দেশ্যে সূর্য সেন একটি চিঠিতে লিখেছেন— “ফাসির রজ্জু আমার মাথার ওপর ঝুলছে। মৃত্যু আমার দরজায় করাঘাত করছে। এই তো আমার মৃত্যুকে বন্ধুর মতো আলিঙ্গন করার সময়। আমার ভাইবোন তোমাদের সবার উদ্দেশ্যে বলছি, আমার বৈচিত্র্যহীন (কারাগৃহের) জীবনের একঘেয়েমিকে তোমরা ভেঙে দাও, আমাকে উৎসাহ দাও। এই আনন্দময়, পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আমি তোমাদের জন্য কি রেখে গেলাম, শুধু একটি মাত্র জিনিস, তা হল আমার স্বপ্ন। একটি সোনালী স্বপ্ন। এক শুভ মুহূর্তে আমি প্রথমে স্বপ্ন দেখেছিলাম। উৎসাহভরে সারা জীবন তার পেছনে উন্মত্তের মতো ছুটেছিলাম। জানি না, এই স্বপ্নকে কতটুকু সফল করতে পেরেছি।

আমার আসন্ন মৃত্যুর স্পর্শ যদি তোমাদের মনকে এতটুকু স্পর্শ করে, তবে আমার এই সাধনাকে তোমরা তোমাদের অনুগামীদের মধ্যে ছড়িয়ে দাও যেমন আমি ছড়িয়ে দিয়েছিলাম তোমাদের মধ্যে। বন্ধুগণ, এগিয়ে চলো। কখনো পিছিয়ে যেও না। দাসত্বের দিন চলে যাচ্ছে। স্বাধীনতার লগ্ন আগত। ওঠো। জাগো। জয় আমাদের সুনিশ্চিত।”

Leave a Comment