জাতীয় কংগ্রেসের ত্রিপুরী অধিবেশন কি? জাতীয় কংগ্রেসের ত্রিপুরা অধিবেশনের গুরুত্ব আলোচনা করো।

জাতীয় কংগ্রেসের ত্রিপুরী অধিবেশন কি? জাতীয় কংগ্রেসের ত্রিপুরা অধিবেশনের গুরুত্ব আলোচনা করো: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের একটি জাতীয় রাজনৈতিক দল। এই দল সাধারণভাবে কংগ্রেস নামে পরিচিত। কংগ্রেস দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলদুটির একটি (অপর দলটি হল ভারতীয় জনতা পার্টি)। এটি একটি ভারতের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক সংগঠন। ১৮৮৫ সালে থিওজোফিক্যাল সোসাইটির কিছু “অকাল্ট” সদস্য কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। এঁরা হলেন অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম, দাদাভাই নওরোজি, দিনশ এদুলজি ওয়াচা, উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মনমোহন ঘোষ, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে ও উইলিয়াম ওয়েডারবার্ন প্রমুখ। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব দান করেছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করলে, কংগ্রেস দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। সেই থেকে মূলত নেহেরু-গান্ধী পরিবারই কংগ্রেসকে নেতৃত্ব দান করতে থাকেন।

জাতীয় কংগ্রেসের ত্রিপুরা অধিবেশনের পটভূমি

ভারতের জাতীয় আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে মহাত্মা গান্ধীর সাথে সুভাষচন্দ্র বসুর কিছু নীতিগত মতবিরোধ ছিল। বামপন্থী চিন্তা ধারার জন্য সুভাষচন্দ্র বসু যুব সমাজের কাছে বিশেষ জনপ্রিয় ছিলেন।তাই 1938 খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেসের হরিপুরা অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র বসুকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সভাপতির পদে আসীন সুভাষচন্দ্র বসু ব্রিটিশদের প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্র গঠনের তীব্র প্রতিবাদ করে তাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামের আহ্বান জানান এবং কৃষক ও শ্রমিক সংগঠনগুলিকে জাতীয় কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে এনে একটি প্রগতিশীল ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মঞ্চ গঠনের প্রস্তাব দেন। এর ফলে কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গে বাম মনোভাবাপন্ন সুভাষচন্দ্র বসুর মতপার্থক্য বৃদ্ধি পেতে থাকে।

জাতীয় কংগ্রেসের ত্রিপুরী অধিবেশন

উপরিউক্ত পরিস্থিতিতে 1939 খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেসের ত্রিপুরী অধিবেশনে বামপন্থীদের সমর্থনে সুভাষচন্দ্র বসু পুনরায় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি পদে প্রার্থী হন। কিন্তু ব্যক্তিত্বের সংঘাত ও মতাদর্শগত বিরোধের কারণে গান্ধিজি সুভাষচন্দ্র বসুকে দ্বিতীয়বারের জন্য সভাপতি হিসেবে মেনে না নিয়ে তার বিরুদ্ধে পট্টভি সীতারামাইয়াকে প্রার্থী করেন। এর ফলে সভাপতি পদে নির্বাচন অবসম্ভাবি হয়ে ওঠে। এই নির্বাচনে সুভাষচন্দ্র বসু 203 ভোটে গান্ধীজি মনোনীত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে পরাজিত করে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন।

জাতীয় কংগ্রেসের ত্রিপুরা অধিবেশনের গুরুত্ব

জাতীয় কংগ্রেসের ত্রিপুরী অধিবেশন বিভিন্ন দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন-

1)ত্রিপুরী অধিবেশনে সভাপতি পদে সুভাষচন্দ্র বসুর জয়লাভ প্রমাণ করেন মহাত্মা গান্ধীই জাতীয় কংগ্রেসের একমাত্র নিয়ন্ত্রক নয়।

2)এই অধিবেশনে গান্ধী সুভাষ দ্বন্দ্ব সর্বসমক্ষে প্রকাশ পায়।পট্টভি সীতারামাইয়ার পরাজয়ে গান্ধীজি মন্তব্য করেছিলেন, “সীতারামাইয়ার পরাজয়, আমার পরাজয়।”

3)ত্রিপুরী অধিবেশনের সুভাষ ও গান্ধীজীর এই বিরোধ একদিকে যেমন জাতীয় আন্দোলনকে দুর্বল করেছিল, অন্যদিকে তেমনি জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে বামপন্থী শক্তির জয় সূচিত হয়েছিল।

4)এই অধিবেশনে জয়লাভ করার পর গান্ধীজীর অসহযোগিতা ও কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি থেকে গান্ধীবাদী সদস্যরা পদত্যাগ করলে সুভাষচন্দ্র বসু জাতীয় কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি গঠনে ব্যর্থ হন। ফলে তিনি বাধ্য হয়ে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দেন।

5)জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সুভাষচন্দ্র বসু 1939 খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে ফরওয়ার্ড ব্লক নামক একটি দল গঠন করেন।

6)জাতীয় কংগ্রেসের তৃতীয় অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচনে সুভাষচন্দ্র বসুর জয়লাভ ও পরবর্তীকালে পদত্যাগ জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছিল এবং এখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল।

Leave a Comment