সমুদ্র তলদেশের ভূমিরূপ – সমুদ্র তলদেশের ভূমিরূপ কত প্রকার?

সমুদ্র তলদেশের ভূমিরূপ – সমুদ্র তলদেশের ভূমিরূপ কত প্রকার?: স্থলভাগের উপর যেমন পাহাড়, পর্বত, মালভূমি, গিরিখাত ইত্যাদি নানা রকম ভূ প্রাকৃতিক বৈচিত্র লক্ষ্য করা যায় সমুদ্র বিজ্ঞানীদের সমীক্ষায় জানা গেছে রে মহাসাগরের তলদেশের ভূপ্রকৃতি তেমনি বৈচিত্র্যময়। সমুদ্র তলদেশের ভূমিরূপ এর বৈচিত্র অনুসারে সমগ্র সমুদ্রসমতল কে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়। 

A) মহীসোপান, B) মহীঢাল, C) গভীর সমুদ্রে র সমভূমি D) গভীর সমুদ্র খাত, E) সামুদ্রিক শৈলশিরা।

A) মহীসোপান: মহাদেশ গুলি র শেষ ভাগ ধীরে ধীরে ভালো হয় কোন সমুদ্রে নেমে গেছে। তটরেখা থেকে সমুদ্রে 200 মিটার গভীরতা পর্যন্ত অঞ্চল টির নাম মহীসোপান। 

সৃষ্টির কারণ: মহীসোপান সৃষ্টি একাধিক কারণ আছে সেগুলির মধ্যেে উল্লেখযোগ্য – 

i. ভূগর্ভস্থ পরিচলন স্রোত

ii. সমুদ্র তরঙ্গের ক্ষয় কার্য

iii. মহাদেশীয় প্রান্তভাগে সমান্তরাল চ্যুতির সৃষ্টি

iv. মহাদেশীয় প্রান্তভাগ এর উত্থান

v. তরঙ্গ কর্তিত মঞ্চের সমুদ্র জলে নিমজ্জিত

vi. হিমবাহের ক্ষয়কার্যের প্রভাব

মহীসোপানের বৈশিষ্ট্য

প্রকৃতি – উপকূল বরাবর মহাদেশীয় প্রান্তভাগ সমুদ্রের জলে অবনমনের ফলে মহীসোপান সৃষ্টি হয়।

গভীরতা– মহীসোপানের গভীরতা 200 মিটার পর্যন্ত হয়।

ভূমি ঢাল – মহীসোপান ও অঞ্চলগুলি মৃদু ঢাল যুক্ত হয় । ঢালের পরিমাণ 1 ডিগ্রির কম।

গড় প্রশস্থ – মহীসোপান কোথাও প্রশস্ত কোথাও সংকীর্ণ হয়। মহীসোপানের গড় প্রশস্থ হল 50 মিটার এবং গভীরতা 78 মিটার।

মোট পরিমাণ – পৃথিবীর মোট সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় 7.6% হল মহীসোপান।

প্লাংটন এর প্রাচুর্যতা – মহীসোপানের অগভীর অংশে প্লাংটন এর প্রাচুর্য থাকায় বিভিন্ন ধরনের মাছের সমাগত ঘটে। এর ফলে এখানে বাণিজ্যিক মৎস্য চারণক্ষেত্র গড়ে ওঠে।

সমুদ্র সম্পদের আঁতুড়ঘর – মহীসোপান অঞ্চলগুলিতে গ্যাস, খনিজ তেল, প্রবাল প্রাচীর, মনিমুক্তা প্রভৃতি পাওয়া যায় বলে একে সমুদ্র সম্পদের আঁতুড়ঘর বলে।

B) মহী ঢাল: মহীসোপানের সীমানা থেকে ভূভাগ হঠাৎ খাড়া ভাবে নিচে নেমে গভীর সমুদ্র গর্ভ পযর্ন্ত বিস্তৃত এই ঢালু অংশ কে মহী সোপান বলে।

মহী ঢাল সৃষ্টির কারণ 

তরঙ্গ কর্তিত ও তরঙ্গ গঠিত মতবাদ – এই মতবাদ অনুসারে সোপান এর একাংশ তরঙ্গ শক্তির ক্ষয় কার্যে ও অন্যান্য অংশে সঞ্চয়ের ফলে মহী ঢালের উৎপত্তি হয়ে থাকে।

মহাদেশীয় ভূভাগের অবনমন মতবাদ – এই মতবাদ অনুসারে প্রাচীন ভূভাগ ক্ষয়কার্যের ফলে সমপ্রায় ভূমিতে পরিণত হয়। পরে ভূ আলোড়ন এর ফলে  ওই সমতল ভূভাগের সমুদ্র তলদেশে অবনমন ঘটলে মহী ঢালের সৃষ্টি হয়।

চ্যুতি মতবাদ – মহী ঢাল সৃষ্টির কারণ হিসাবে এই মতবাদটি বেশি গ্রহণযোগ্য। চ্যুতি বরাবর ভূভাগের অবনমনের ফলে মহী ঢালের সৃষ্টি হয়। 

মহী ঢালের বৈশিষ্ট্য 

প্রকৃতি: মহী ঢাল কে মহাদেশের শেষ সীমানা ধরা হয়। 

গভীরতা – মহী ঢাল সমুদ্র তলদেশে প্রায় 2000- 3000 মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। 

ভূমি ঢাল – মহী ঢালের ঢালের পরিমাণ 2 ডিগ্রি থেকে 5 ডিগ্রি । 

মোট পরিমাণ – মহী ঢাল মোট সমুদ্র পৃষ্ঠের প্রায় 15 % অঞ্চল জুড়ে বিরাজ করে। 

সামুদ্রিক অবক্ষেপণের অপ্রতুলতা – খাড়া ঢাল বিশিষ্ট মহী ঢালে সামুদ্রিক সঞ্চয় কার্যের পরিমাণ খুবই কম।

সামুদ্রিক গিরিখাতের বিদ্যমানতা – মহী ঢালে সৃষ্ট গিরিখাত গুলি সচরাচর উপকূল ভাগের সাথে সমকোণে থাকে।

C) গভীর সমুদ্রের সমভূমি – মহী ঢাল শেষ হওয়ার পর থেকেই গভীর সমুদ্রের সমভূমি অঞ্চল থেকে শুরু হয়। মহী ঢাল ক্রমে ক্রমে গভীর সমুদ্রের যে অংশে মেশে সেই অঞ্চলকে গভীর সমুদ্রের সমভূমি বলে।

গভীর সমুদ্রের সমভূমির বৈশিষ্ট্য 

প্রকৃতি – গভীর সমুদ্রে সমভূমি হল স্থলভাগের সমপ্রায় ভূমির ন্যায় তরঙ্গায়িত ভূমিভাগ। 

গভীরতা – গভীর সমুদ্রের সমভূমির গভীরতা 2000 মিটার থেকে 6000 মিটার পর্যন্ত হয়।

বিস্তৃতি – গভীর সমুদ্রের সমভূমি মোট সাগর তলের 76% জায়গা দখল করে আছে। 

গঠন – ব্যাসল্ট শিলা ছাড়া কাদা, বালি, জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ সঞ্চয়ের ফলে গভীর সমুদ্রের সমভূমি গঠিত হয়েছ।

ভূমিরূপের বিকাশ – গভীর সমুদ্রের সমভূমি অঞ্চলে শৈল শিরা, সামুদ্রিক খাত, মালভূমি, সামুদ্রিক পাহাড়, গায়ট ও আগ্নেয়গিরি ইত্যাদি ভূমিরূপ গড়ে উঠতে দেখা যায়। 

D) গভীর সমুদ্র খাত – গভীর সমুদ্রের মাঝে মাঝে অত্যন্ত গভীর ও দীর্ঘায়িত খাত দেখা যায়। এগুলি গভীর সমুদ্র খাত নামে পরিচিত। এই সমুদ্র খাত গুলিকে সাধারণ ভাবে সমুদ্রের তলদেশের প্রান্ত ভাগে উপকূলের সমান্তরালে সৃষ্টি হতে দেখা যায়। সমুদ্র খাত গুলির মধ্যে যে গুলি অত্যন্ত দীর্ঘায়িত ও সংকীর্ণ সেগুলিকে পরিখা খাত বলে। 

গভীর সমুদ্র খাত এর বৈশিষ্ট্য 

বিস্তার – পৃথিবীর সমগ্র সমুদ্র পৃষ্ঠের মোট আয়তনের প্রায় 1.2% জুড়ে অবস্থান করছে গভীর সমুদ্রের সমভূমি।

প্রকৃতি – এই খাত গুলি অত্যন্ত গভীর, সুদীর্ঘ এবং সংকীর্ণ হয়ে থাকে। অত্যন্ত গভীর সমুদ্র খাত গুলির গভীরতা 10000 মিটারের বেশি, দৈর্ঘ্য 1000 কিলোমিটার এর বেশি এবং প্রস্থ 100 মিটারের বেশি।

E) সামুদ্রিক শৈলশিরা – সমুদ্রের তলদেশেও স্থলভাগের মতো উচু শৈল শিরা রয়েছে। তবে এগুলি অধিকাংশ সমুদ্র গর্ভে নিমজ্জিত। কোন কোন শৈল শিরার শীর্ষ দেশ জলের ওপর জেগে থাকলে দ্বীপ সৃষ্টি হয়।

সৃষ্টির কারণ – সমুদ্রের তলদেশে বেশিরভাগ শৈলশিরা প্রতিসারী পাত সীমানা বরাবর গড়ে উঠেছে। প্রতিসারী পাত সীমান্তের যে ফাটল সৃষ্টি হয়, তার মধ্যে দিয়ে ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা উত্থিত হয়ে সমুদ্রের শীতল জলের সংস্পর্শে জমাটবদ্ধ হয়ে শৈলশিরা রূপে অবস্থান করে। প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের বেশিরভাগ শৈলশিরা উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত। আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝ বরাবর বিস্তৃত মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত।

Leave a Comment