সামুদ্রিক অবক্ষেপণ কাকে বলে? সামুদ্রিক অবক্ষেপন বা তলানির শ্রেণীবিভাগ আলোচনা করো?

সামুদ্রিক অবক্ষেপণ কাকে বলে? সামুদ্রিক অবক্ষেপন বা তলানির শ্রেণীবিভাগ আলোচনা করো?

সামুদ্রিক অবক্ষেপণ বা তলানি কাকে বলে?

বিখ্যাত ভূবিজ্ঞানী Monkhouse এর মতে “সাগর বা মহাসাগরের তলদেশে সঞ্চিত হওয়া সকল প্রকার পদার্থকে সামুদ্রিক অবক্ষেপন বা সামুদ্রিক তলানি বলে।

R.C. Sharma এবং M. Vatal নামে দুই বিখ্যাত সমুদ্র বিজ্ঞানীর মতে – স্থলভাগের শিলা সমূহের ক্ষয়জাত পলি সহ নানা প্রকার পদার্থ যেমন বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণী ইত্যাদি মহাসাগরের তলদেশে সঞ্চয়ের ফলে সৃষ্ট  অসঙ্গ বদ্ধ পলি স্তর কে সাধারণ ভাবে সামুদ্রিক অবক্ষেপন বলে। সুতরাং উপরোক্ত সংজ্ঞা দুটি থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে সাগর বা মহাসাগরের তলদেশে সঞ্চিত হওয়া যাবতীয় পদার্থ কে একত্রে সামুদ্রিক অবক্ষেপ বা সামুদ্রিক তলানি বলে।

ক্যাপ্টেন ফিপস 1973 সালে সর্ব প্রথম সামুদ্রিক অবক্ষেপে র ধারণা টি প্রধান করেন।

সামুদ্রিক তলানির শ্রেণীবিভাগ

সামুদ্রিক অবক্ষেপন কে প্রধানত দুভাগে ভাগ করা যায় – A) উৎপত্তি অনুসারে সামুদ্রিক অবক্ষেপের শ্রেণীবিভাগ, B) অবস্থান অনুসারে সামুদ্রিক অবক্ষেপের শ্রেণীবিভাগ।

A) উৎপত্তি অনুসারে সামুদ্রিক অবক্ষেপের শ্রেণীবিভাগ: উৎপত্তি অনুসারে সামুদ্রিক অবক্ষেপকে 6 ভাগে ভাগ করা যায়।

1) উপকূলবর্তী স্থলবিধৌত পদার্থের সঞ্চয়: উপকূলের ও স্থলভাগের শিলা সমূহ প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক শক্তির দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে নদী, বায়ুপ্রবাহ, জলস্রোত, সমুদ্র তরঙ্গ প্রভৃতির সাহায্যে বাহিত হয়ে সমুদ্র উপকূলের অগভীর মহীসোপান অঞ্চলের সঞ্চিত হয়। এছাড়া এই অঞ্চলে শামুক, ঝিনুক, প্রবাল ইত্যাদি সামুদ্রিক প্রাণীর দেহাবশেষও সঞ্চিত হয়। তবে এ অঞ্চলে অজৈব পদার্থের তুলনায় জৈব পদার্থের সঞ্চয় এর পরিমাণ যথেষ্ট কম। 

2) অগ্নুৎপাত জনিত অপক্ষেপ: স্থলভাগ ও সমুদ্র গর্ভের আগ্নেয়গিরির উৎক্ষিপ্ত পদার্থ  সমূহ সমুদ্রের তলদেশে সঞ্চিত হয়। অনেক সময় সমুদ্রের তলদেশে অগ্ন্যুদগম এর দরুন নির্গত পদার্থসমূহ জমা হয়ে দ্বীপের সৃষ্টি করে। যেমন – বঙ্গোপসাগরের ব্যারেন ও নারকোন্ডাম দ্বীপ। এই আগ্নেয় পদার্থের সঞ্চয় থেকে লোহিত কর্দম বা লাল রঙের কাদার উৎপত্তি হয়।

3) জীবাশ্মের সঞ্চয়: সমুদ্রের তলদেশে বিভিন্ন প্রকার জলজ প্রাণী উদ্ভিদ ইত্যাদি কোটি কোটি বছর ধরে শিলাস্তরের সঞ্চিত অবস্থায় থাকলে তাকে জীবাশ্মের সঞ্চয় বলে। সামুদ্রিক প্রাণীর দেহ থেকে এই জীবাশ্মের উৎপত্তি হয় বলে এগুলি চুন ও সিলিকা জাতীয় পদার্থ দ্বারা গঠিত, তাই জীবাশ্ম গুলি অত্যন্ত কঠিন হয়ে থাকে। 

4) সমুদ্র জলে অধঃক্ষিপ্ত পদার্থসমূহের সঞ্চয়: যেসকল দ্রব্য সমুদ্র জলে দ্রবীভূত হতে পারে না, সেইসব পদার্থ অধঃক্ষিপ্ত হয়। যেমন লোহা ও ম্যাঙ্গানিজের অক্সাইড, ফসফেট, পাইরাইট, ক্যালসিয়াম কার্বনেট, ডলোমাইট, লৌহ বর্গীয় সালফাইট প্রভৃতি অধঃক্ষিপ্ত পদার্থসমূহ গঠনকারী প্রধান উপাদান।

5) রাসায়নিক বিক্রিয়ায় গঠিত পদার্থ সঞ্চয়: সমুদ্র জলে অবস্থানকারী ফেল্ডসপার, গ্লুকোনাইট, ক্লে মিনারেল, ফসফো জাইট ইত্যাদি বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের সঙ্গে সমুদ্রের জল ও কঠিন পদার্থসমূহের পারস্পারিক রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে যেসব পদার্থের সৃষ্টি হয়, সেগুলি সমুদ্র তলদেশে সঞ্চিত হলে তাকে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় গঠিত পদার্থের সঞ্চয় বলে।

6) অপার্থিব পদার্থের সঞ্চয়: পৃথিবীর বাইরে মহাকাশ থেকে যেসব ধূলিকণা ও উল্কাপিণ্ড আসে সেগুলি সমুদ্র নিক্ষিপ্ত হয় এবং কালক্রমে কর্দম এ পরিণত হয়।

B) অবস্থান অনুসারে সামুদ্রিক অবক্ষেপের শ্রেণীবিভাগ

অবস্থান অনুসারে অবক্ষেপ কে আবার দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা – 1) মহীসোপান ও মহীঢাল এর সঞ্চয়, 2) সমুদ্রের গভীরতম অংশ ও গভীর সমুদ্র খাতের  সঞ্চয়।

1) মহীসোপান ও মহীঢাল এর সঞ্চয়: মহাসমুদ্রের এই অংশে নুড়ি, বালি, কাদা প্রভৃতি অজৈব পদার্থের সঞ্চয় বেশি হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক শক্তির দ্বারা স্থলভাগের শিলা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে নদীর বাতাস জলপ্রবাহ দ্বারা বাহিত হয়ে সমুদ্রের এই অংশে সঞ্চিত হয়। অবস্থান অনুসারে এই সঞ্চয় জাতীয় পদার্থ গুলিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন – 

I) তটদেশীয় সঞ্চয় বা উপকূলের নিকটতম অংশের সঞ্চয়: উপকূলের কাছে মহীসোপান অঞ্চলে বড়ো বড়ো নুড়ি, মোটা দানা যুক্ত বালি সঞ্চিত হয়। এগুলির মধ্যে জৈব পদার্থ বিশেষ থাকে না, অজৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকে। সেই কারণে অজৈব পদার্থের অবক্ষেপ নামেও পরিচিত।

II) অগভীর সমুদ্রের সঞ্চয়: উপকূল থেকে দূরের মহীসোপান অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম বালি, কাদা ও পলির সঞ্চয় হতে দেখা যায়। এখানেও জৈব পদার্থের তুলনায় অজৈব পদার্থের সঞ্চয়ের পরিমাণ বেশি।

III) গভীর সমুদ্রের সঞ্চয়: মহী ঢালের গভীরতা বেশি, কাজেই মহী ঢালে সঞ্চিত পদার্থ গুলিকে গভীর সমুদ্রের সঞ্চয় বলে। সমুদ্রের এই অংশে সূক্ষ্ম বালি, নুড়ি, কাদা সঞ্চিত হয়। এছাড়া লাল, নীল, সবুজ কর্দম বা সিন্ধুমল এই অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায়। কর্দমের সঙ্গে বিভিন্ন ধাতব পদার্থের মিশ্রণের ফলে এদের রং নানা প্রকারের হলে থাকে। কর্দম বা সিন্ধু মল ছাড়াও এই অংশে প্রবাল ও আগ্নেয় গিরি নিঃসৃত লাভা সঞ্চিত হয়।

2) সমুদ্রের গভীরতম অংশ ও গভীর সমুদ্র খাতের সঞ্চয় – মহীঢাল এর পরবর্তী অংশ হলো সমুদ্রের গভীরতম অংশ। এখানে জৈব পদার্থ বেশি কারণ উপকূল থেকে বহু দূরে অবস্থিত বলে এখানে অজৈব পদার্থ এর সঞ্চয় খুব একটা দেখা যায় না। ব্যতিক্রম হলো আগ্নেয়গিরির উৎক্ষিপ্ত ছাই, সূক্ষ্ম ধূলিকণা র মত অজৈব পদার্থের সঞ্চয়। 

এই অঞ্চলে প্রধানত সামুদ্রিক প্রাণী ও জীবজন্তু র দেহাবশেষ কঙ্কাল, দাঁত, হাড় প্রভৃতি থেকে উদ্ভূত জৈব পদার্থের সঞ্চয় বেশি। এই সকল জৈব পদার্থকে সমুদ্রের তলদেশ থেকে উপরে আনলে তরল ও পিচ্ছিল কর্দম এর ন্যায় দেখায় তাকে সিন্ধুকর্দ বা উজ বলে। এই পিচ্ছিল কর্দমে প্রধানত চুন ও সিলিকা জাতীয় পদার্থ দেখতে পাওয়া যায়। এই জাতীয় পদার্থের প্রাধান্য অনুসারে সিন্ধু কর্দের নামকরণ করা হয়। তাই সমুদ্রের গভীরতম অংশ ও গভীর সমুদ্র খাতের সঞ্চিত কতগুলি কে গঠন অনুসারে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা – 

I) চুন জাতীয় জৈব পদার্থের সঞ্চয়

a) টেরোপড সিন্ধুকর্দ : এতে চুন জাতীয় পদার্থের ভাগ বেশি থাকে, শতকরা 80 ভাগ ক্যালসিয়াম কার্বনেট। এটি মূলত মোচা কৃ্তি প্রাণী অর্থাৎ শামুক, ঝিনুক ইত্যাদির দেহাবশেষ। এই জাতীয় সিন্ধু কর্দ উষ্ণ সমুদ্র জলে বেশি সঞ্চিত হয়। সাধারণত ক্রান্তীয় অঞ্চলে উষ্ণ সমুদ্রে যেখানে বার্ষিক উষ্ণতার প্রসার খুব কম, সেই অঞ্চলে 1500 থেকে 2000 মিটার গভীরতায় টেরোপড জাতীয় সিন্ধুকর্দ বেশি পাওয়া যায়।

b) গ্লোবিজারিনা সিন্ধুকর্দ: এই চুন জাতীয় সিন্ধু কর্দে যদি সূক্ষ্ম বালিকা ও কর্দম জাতীয় পদার্থ বা গ্লোবিজারিনার পরিমাণ বেশি থাকে, তা হলে তাকে গ্লোবিজারিনা সিন্ধু কর্দ বলে। এই জাতীয় সিন্ধু কর্দে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ 65% । উষ্ণ সমুদ্র অংশে এই জাতীয় সিন্ধু কর্দ বেশি দেখতে পাওয়া যায়। গ্লোবিজারিনা সিন্ধুকর্দ ক্রান্তীয় ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের সমুদ্রে 4000 মিটারের অধিক গভীরতায় দেখা যায়।

II) সিলিকা জাতীয় জৈব পদার্থের সঞ্চয়

a) রেডিওল্যারিয়ান জাতীয় সিন্ধুকর্দ : রেডিও ল্যারিয়ন নামক একপ্রকার সামুদ্রিক প্রাণীর কোষ বা খোলক থেকে এই জাতীয় সিন্ধু কর্দ সৃষ্টি হয়। এই জাতীয় সিন্ধু  কর্দে সিলিকার পরিমাণ থাকে সবচেয়ে বেশি এবং ক্যালসিয়াম থাকে যোৎসামান্য। ক্রান্তীয় সমুদ্রে 4000 মিটারের অধিক গভীরতায় এই ধরনের সিন্ধু কর্দ দেখতে পাওয়া যায়।

b) ডায়াটম সিন্ধুকর্দ: গভীর ও শীতল সমুদ্রের এক প্রকার ক্ষুদ্র উদ্ভিদের দেহাবশেষ দ্বারা ডায়াটম সিন্ধুকর্দ গঠিত হয়। সমুদ্র বিজ্ঞানী মারে সর্ব প্রথম এই ধরনের সিন্ধুকর্দের নাম করণ করেন। উভয় গোলার্ধে উচ্চ অক্ষাংশ এর সমুদ্রে 1000-4000 মিটার গভীরতায় এই সমুদ্র দেখতে পাওয়া যায়। 

c) লোহিত কর্দম – সমুদ্রের 200 মিটার থেকে 2500 মিটার গভীরতা পর্যন্ত মহী ঢাল অংশে লোহিত কর্দম সৃষ্টি হয়। স্থল বিধৌত পলি ও অতি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কর্দম কণার সঙ্গে সামুদ্রিক জৈব ও অজৈব পদার্থ ও মহী ঢাল অঞ্চলে সঞ্চিত হয়। পলিতে লৌহ অক্সাইডের পরিমাণ বেশি থাকে বলে এইরূপ কর্দম এর রং লাল হয়। 

Leave a Comment