মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক জীবনী | Mustafa Kemal Atatürk Biography in Bengali

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Mustafa Kemal Atatürk Biography in Bengali. আপনারা যারা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক সম্পর্কে জানতে আগ্রহী মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক এর জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক কে ছিলেন? Who is Mustafa Kemal Atatürk?

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক (১৯ মে ১৮৮১ (ধারণা) – ১০ নভেম্বর ১৯৩৮) ছিলেন উসমানীয় সামরিক কর্মকর্তা, বিপ্লবী রাজনীতিক, লেখক এবং তুরষ্কের প্রথম রাষ্ট্রপতি। তিনি আধুনিক তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা।তাকে আধুনিক তুরষ্কের জনক বলা হয়।

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক জীবনী – Mustafa Kemal Atatürk Biography in Bengali

নামমোস্তফা কামাল আতাতুর্ক
জন্ম19 মে 1881
পিতাআলি রিজা এফেন্দি
মাতাজুবায়দা হানিম
জন্মস্থানসেলোনিকা, উসমানীয় সাম্রাজ্য (বর্তমান থেসালোনিকি, গ্রীস)
জাতীয়তাতুর্কি
পেশাতুরস্কের সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, বিপ্লবী, এবং তুরস্কের প্রথম রাষ্ট্রপতি
মৃত্যু10 নভেম্বর 1938 (বয়স 57)

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক এর জন্ম: Mustafa Kemal Atatürk’s Birthday

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক 19 মে 1881 জন্মগ্রহণ করেন।

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক এর পিতামাতা ও জন্মস্থান: Mustafa Kemal Atatürk’s Parents And Birth Place

১৮৮১ খ্রিঃ তুরস্কের সালোকিনায় এক চাষী পরিবারে কামাল আতাতুর্কের জন্ম। ম্যাসিডোনিয়া অঞ্চলের যে অংশে তাঁদের বংশানুক্রমিক বসতি, তা ছিল পূর্ব ইউরোপের কট্টরপন্থী বিপ্লবীদের স্বভূমি। শিশুকালের বেপরোয়া স্বভাবের মধ্যে তাঁর জন্মভূমির ভাবটি যেন গ্রথিত ছিল। জেদের সঙ্গে কামালের স্বভাবে যুক্ত হয়েছিল রাগী ও দুর্বিনীত ভাব।

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক এর শিক্ষাজীবন: Mustafa Kemal Atatürk’s Educational Life

এই স্বভাবের জন্য অল্পদিনের মধ্যেই তিনি স্কুলে সহপাঠী শিক্ষক সকলেরই বিরাগভাজন হয়ে উঠেছিলেন। স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তাঁকে সতের বছর বয়সে পাঠান হয়েছিল সামরিক শিক্ষার বিদ্যালয়ে। সেখানেও বেপরোয়া স্বভাবের জন্য সকলের ঘৃণ ভয় এবং একই সঙ্গে শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠেন। দুবছর সামরিক বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করে কামাল রীতিমত সৈনিক হয়ে উঠলেন।

তিনি সাব লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হন। এরপর ভর্তি হন ইমপিরিয়াল স্টাফ কলেজে। একদল তরুণ তুর্কী অফিসার সেই সময়ে এই কলেজে ‘পিতৃভূমি’ নামে একটি বৈপ্লবিক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। এ সংগঠনের লক্ষ্য ছিল, সুলতান আবদুলের স্বৈরাচার ও বিদেশী ষড়যন্ত্রের কবল থেকে তুরস্ককে মুক্ত করা। কামাল অল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠনের নেতা হয়ে উঠলেন।

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক এর প্রথম জীবন: Mustafa Kemal Atatürk’s Early Life

সুলতানের এক গোয়েন্দা এই গোপন সংগঠনটির হদিশ পেয়ে গিয়েছিল। ফলে একদিন গোপন ঘাঁটিতে সভা চলার সময়ে কামাল সহ অফিসারদের গোটা দলই ধরা পড়ে গেলেন। তবে কিছুদিনের মধ্যেই খালাস পেয়ে গেলেন। সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ এই তরুণ অফিসারদের আনুগত্য পাওয়ার আশায় কাউকেই শাস্তি দিতে চাইলেন না। তবে পিতৃভূমি নিষিদ্ধ ঘোষিত হল। এরপর কামালকে পাঠিয়ে দেওয়া হল দামাস্কাসে এক অশ্বারোহী বাহিনীতে।

সেখানে পৌঁছেই কামাল বে – আইনী ঘোষিত পিতৃভূমির নতুন একটি শাখা খুলে ফেললেন। সেই সময়ে ম্যাসিডোনিয়া অঞ্চলে সুলতানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই বিদ্রোহের ঘটনা ঘটছিল। কামাল ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে কিছুদিনের মধ্যেই সালোনিকায় ফিরে এলেন। এই সময়ে আহমেদ বে নামে একজন পিতৃভূমির সদস্য গোপনে জাহাজে চাপিয়ে কামালকে গাজা অঞ্চলে পাঠিয়ে দিলেন। কেননা ধরা পড়লে এবারে কামালের মৃত্যুদণ্ড ছিল অবধারিত।

কামাল এইভাবে ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছিলেন সুলতানের বিরুদ্ধে যে অভ্যুত্থান আসন্ন হয়ে উঠেছে তা শুরু হবে সালোনিকা অঞ্চল থেকে। তাই তিনি অনেক চেষ্টা করে ১৯০৮ খ্রিঃ সালোনিকায় বদলি হয়ে এলেন। সালোনিকায় এনভার নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে কমিটি অব ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রোগ্রেস নামে একটি বৈপ্লবিক সংস্থা গড়ে উঠেছিল। এনভার বিপ্লবপন্থী হলেও ছিলেন স্বপ্নচারী — বাস্তবের সঙ্গে তাঁর ভাবনা চিন্তার সংযোগ ছিল কমই।

অপর দিকে কামাল ছিলেন কঠোর বাস্তববাদী। ফলে উভয়ের যোগাযোগের কিছুদিনের মধ্যেই মতভেদ দেখা দিল। সংস্থার অন্যান্য সদস্যরাও ছিলেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী। অথচ কামালের ধ্যানজ্ঞান ছিল কেবল তুর্কীদের জন্যই এক শক্তিশালী তুর্কীসাম্রাজ্য গড়ে তোলা। এদের কারো সঙ্গেই কামালের বনিবনা হবার কথা ছিল না।

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক এর কর্ম জীবন: Mustafa Kemal Atatürk’s Work Life

১৯০৮ খ্রিঃ নিয়াজি নামে কামালের এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী সহযোগী কাউকে কিছু না জানিয়ে সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়ে ম্যাসিডোনিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে তুর্কী সুলতানের বিরুদ্ধে এক সামরিক অভিযান করে বসল। রাজনীতির বিচিত্র খেলায় নিয়াজিকে দমনের জন্য তুরস্ক সরকার যে সৈন্যবাহিনী পাঠিয়েছিল তারা নিয়াজির পক্ষেই যোগ দিল। দেশের সর্বশ্রেণীর জনগণ দীর্ঘদিন থেকেই দাসত্ব আর অত্যাচারে জর্জরিত হচ্ছিল।

সুযোগ পেয়ে সরকারী সৈন্যদল ও সাধারণ মানুষ দলে দলে বিপ্লবীদের দলে যোগ দিতে লাগল। এনভার হয়ে উঠলেন সর্ববাদী নেতা। বিপদের আভাস পেয়ে সুলতান একটি নতুন সংবিধানের কথা ঘোষণা করলেন এবং বিপ্লবীদের কিছু সংস্কার প্রস্তাব মেনে নিলেন। সালোনিকার হোটেল অলিম্পাস চত্বর থেকে বিশাল জনসমাবেশের সামনে এনভার তাঁর জয়লাভের বিস্তারিত বিবরণ বিবৃত করলেন। অখ্যাত কামাল নিরুপায় হয়ে সবই শুনলেন।

নতুন শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই বহিষ্কৃত রাজনীতিকরা কনস্তানতি নোপলে ফিরে আসতে লাগলেন। তারা অনভিজ্ঞ ও অদূরদর্শী বিপ্লবী নেতাদের হাত থেকে সমস্ত ক্ষমতা সহজেই নিজেদের হাতে তুলে নিলেন। নিয়াজি খুন হলেন। এনভার ও কামালকে সামরিক কাজের ভার দিয়ে বার্লিন ও ত্রিপোলীতে পাঠিয়ে দেওয়া হল। স্বৈরাচারী সুলতান আবদুল হামিদকে দেশের লোক অভিহিত করত লাল শেয়াল বলে। তাঁর তৎপরতায় উৎকোচ দিয়ে সৈন্যদলকে শীঘ্রই বশীভূত করা সম্ভব হল।

আর সারা দেশে এই মর্মে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হল যে নতুন উদারপন্থী শাসকরা বিদেশী চিন্তাধারার মাধ্যমে তুর্কী সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করতে চাইছে। একই সঙ্গে দালাল শ্রেণীর যাজক সম্প্রদায়কে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া হল। তারা দেশবাসীকে জানাতে লাগল ইহুদী ও খ্রিস্টান বিদ্রোহীরা মিলে পবিত্র ইসলাম ও খলিফাতন্ত্রকে ধ্বংস করবার পরিকল্পনা করেছে। ফল ফলতেও বিলম্ব হল না। একদল সেনাবাহিনী তাদের বিপ্লবী অফিসারদের হত্যা করল। পরে বিশাল এক জনসমাবেশে ইসলাম এবং সুলতানের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করল।

এই সংবাদ পেয়ে এনভার বার্লিন থেকে কনস্তানতিনোপল – এ ফিরে এসে দৃঢ় হস্তে প্রতিবিপ্লব ধ্বংস করলেন। তারপর সুলতানকে সিংহাসনচ্যুত করে তার এক অকর্মন্য জ্ঞাতিভাইকে সেখানে বসালেন। তবে আসল ক্ষমতা রইল বিপ্লবী সংস্থারই হাতে। কামাল এনভারের দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করতেন না। তাই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করবার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগলেন। ১৯১২ খ্রিঃ সার্বিয়া, বুলগেরিয়া, মনটিনিগ্রো ও গ্রীস সম্মিলিতভাবে তুরস্কের ওপর আক্রমণ চালাল।

ইউরোপের ঘাঁটিগুলো থেকে তুরস্ককে বিতাড়িত করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। যদি যথাসময়ে সরকারি বাহিনী তৎপর হয়ে এই আক্রমণ প্রতিরোধ না করত তাহলে তুরস্কের অস্তিত্বই বিপন্ন হত। পরের বছরই তাদের তৎপরতায় ইউরোপে তুরস্কের ঘাঁটি অ্যাড্রিয়ানোপল তুরস্কের দখলে এসে গেল। পরপর সাফল্য লাভের ফলে তুরস্কবাসীর কাছে এনভার – এর ভাবমূর্তি হয়ে উঠল ঈশ্বরের মত। তিনি রাজকীয় শোভাযাত্রায় সজ্জিত হয়ে অ্যাড্রিয়ানোপল – এ প্রবেশ করলেন।

অখ্যাত এক অফিসার কামাল এলেন শোভাযাত্রার বহু পেছনে। এনভার বিশাল তুরস্ক সাম্রাজ্য গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে সৈন্য বাহিনীকে পুনর্গঠিত করার কাজ শুরু করলেন। লিমান ভন স্যান্ডারস নামে এক জার্মান জেনারেলকে আমন্ত্রণ করে আনলেন। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ কামাল প্রকাশ্যেই প্রতিবাদ জানালেন। তিনি নানা স্থানে জনসভা সংগঠিত করে জনসাধারণকে জানালেন, জার্মানির সঙ্গে কোন মৈত্রী চুক্তি সম্পাদিত হলে তা তুরস্কের ঘোরতর বিপদ ডেকে আনবে।

এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ এনভাব কামালকে সোফিয়ায় সামরিক অ্যাটাশে করে নির্বাসনে পাঠালেন। এরপরেই ইউরোপে শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। রাশিয়া তুরস্ক আক্রমণ করলে এনভার যে একলক্ষ তুর্কী সৈন্য তাদের দমন করবার জন্য পাঠালেন, প্রবল শীতে তাদের মধ্যে ৮৮ হাজার সৈন্য নিদারুণভাবে প্রাণ হারাল। এদিকে ইংরাজদের পরিকল্পনা ছিল দার্দানিলেসের মধ্য দিয়ে ঢুকে কনস্তান্তিনোপল দখল করা। এই উদ্দেশ্যে তারা গ্যালিপলিতে ৮০ হাজার সৈন্য সমাবেশের সিদ্ধান্ত নিল। গ্যালিপলিতে তুর্কী বাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব ছিল কামালের ওপর।

তাঁর যুদ্ধকৌশলে ইংরাজদের গ্যালিপলি অভিযানের সমস্ত আয়োজনই চরমভাবে ব্যর্থ হয়ে গেল। কামাল বীরবিক্রমে কনস্তান্তিনোপলে ফিরে এলেন। তাঁকে তুরস্কের শ্রেষ্ঠ বীর বলে সম্মান জানানো হল। কামালের এই সাফল্য কিন্তু ভালভাবে মেনে নিতে পারলেন না এনভার। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে কামালকে ককেশাস – এর রণক্ষেত্রে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে রাশিয়ার গ্র্যান্ড ডিউক নিকোলাস সৈন্য সমাবেশ করেছিলেন। এনভার ধারণা করেছিলেন, তুর্কী সৈন্য সেখানে অবশ্যই পরাজয় স্বীকার করবে।

কিন্তু কামালের ভাগ্য এবারেও ছিল সুপ্রসন্ন। বিপ্লবের ফলে রাশিয়ার সৈন্যদল খুবই দিশেহারা অবস্থার মধ্যে ছিল। ফলে সহজেই কামাল তাদের পর্যুদস্ত করলেন। এনভার বুঝতে পারছিলেন, কামালের জনপ্রিয়তা যেভাবে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনাও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এবারে কামালকে সরকারি কাজে বার্লিনে পাঠিয়ে দেওয়া হল। সেখান থেকে পাঠানো হল লিমানের অধীনে সিরিয়ার রণক্ষেত্রে। ১৯১৮ খ্রিঃ তুরস্ক বাহিনীর পরাজয় ঘটল ইংরাজ সৈন্যের কাছে। কামাল অমানুষিক চেষ্টা করেও পরাজয় এড়াতে পারলেন না।

যুদ্ধ শেষ হবার আগেই এনভার দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। বিপ্লবীদের কমিটি অব ইউনিয়ান অ্যান্ড প্রোগ্রেস ভেঙ্গে গেল। মিত্রবাহিনী কনস্তান্তিনোপল দখল করল। সেখানে সুলতানের গদিতে বসলেন বাহেদ্দীন। কামাল তখনো হাল ছাড়েননি। তিনি মিত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধ আন্দোলন সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর উদ্যোগে আঙ্কারায় এক জাতীয় সরকার গঠিত হল এবং কনস্তান্তিনোপলের সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা হল।

১৯২০ খ্রিঃ মিত্রশক্তি তুরস্কের জন্য সেভরের শান্তিচুক্তি ঘোষণা করল। কিন্তু চুক্তির অস্বাভাবিক শর্তগুলির বিরুদ্ধে সমগ্র তুরস্ক জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠল। এই সুযোগে কামাল এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে কনস্তান্তিনোপলের দিকে অগ্রসর হলেন। দীর্ঘ যুদ্ধের পর মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, অনেককেই ছুটি দেওয়া হয়েছিল। এই অবস্থায় গ্রীসের প্রধানমন্ত্রী ভেনিজেলেসে মিত্রবাহিনীর কাছ থেকে প্রচুর সাজসরঞ্জাম কিনে নিয়ে তার বাহিনীকে শক্তিশালী করে তুললেন।

তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তুরস্কে গ্রীক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা। এক বছরের মধ্যেই দেখা গেল তুরস্কের ইউরোপীয় অংশ প্রায় সবটাই গ্রীসের কবলে চলে গেছে। কেরল তাই নয় আঙ্কারায় গঠিত কামালদের নতুন সরকারকে নিশ্চিহ্ন করবার উদ্দেশ্যে গ্রীকরা অগ্রসর হতে লাগল৷ কামালের জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সময় উপস্থিত হল। ১৯২১ খ্রিঃ জুলাই মাসে গ্রীক সৈন্য আঙ্কারা অভিযান করল। বহু সংখ্যক শক্তিমান সৈন্য ও সাজসরঞ্জামে সজ্জিত শত্রুবাহিনীর সঙ্গে এঁটে ওঠার মত উপযুক্ত আয়োজন কামালের ছিল না।

তিনি বিপুল ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করেও সৈন্য নিয়ে ২০০ মাইল পিছিয়ে গিয়ে সাকারিয়া নদীর তীরে প্রতিরোধ ব্যুহ গড়ে তুললেন ! মানব ইতিহাসের সম্ভবত হিংস্রতম লড়াইটি এখানেই হল গ্রীক ও তুর্কী সৈন্যের মধ্যে ২৪ শে আগস্ট। খ্রিঃস্টান এবং মুসলমানের বহু শতাব্দী ব্যাপী ঘৃণা বিবাদমান দুই বাহিনীর মধ্যেই মজুদ ছিল। তারা মরণপণ লড়াইয়ে মেতে উঠল। চোদ্দ দিন ধরে চলল এক অবর্ণনীয় হত্যাকান্ড। রক্তে লাল হয়ে গেল সাকারিয়া নদীর জল। শেষ পর্যন্ত গ্রীকরা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পিছু হটে যেতে বাধ্য হল।

তুর্কী সৈন্যের অবস্থাও চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। কামাল আর গ্রীক সৈন্যের পিছু ধাওয়া করবার ঝুঁকি নিলেন না। এরপর রাশিয়ার সাহায্যে কামাল তার সৈন্যবাহিনী পুনর্গঠন করলেন। ফ্রান্সের সঙ্গে এক গোপন চুক্তি করে সিরিয়ার সীমান্ত অরক্ষিত রেখেই ৮০ হাজার সৈন্য নিয়ে সরে এলেন। ওই বছরেই ২৬ শে আগস্ট কামাল গ্রীক ছাউনি অ্যাফিয়ান আক্রমণ করলেন। দু পক্ষেই প্রচন্ড গোলাবর্ষণ হল। কামালের যুদ্ধকৌশল এমনই ছিল যে অল্প সময়ের মধ্যেই গ্রীক বাহিনী দুভাগে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে গ্রীকরা দিশাহারা হয়ে পালাতে লাগল। তাদের গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জামাদি পেছনেই পড়ে রইল। গ্রীকরা সরাসরি সমুদ্রতীরে থ্রেসে গিয়ে পৌঁছল। তাদের ধাওয়া করতে হলে ইংরাজদের সৈন্য সমাবেশের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কামালের সন্দেহ হল, তারা তাকে দার্দানেলেস অতিক্রম করে হয়তো যেতে দেবে না। সেই সময়ে ইংরাজরা ছিল যুদ্ধক্লান্ত। কামাল তাঁর তীব্র বাস্তববোধ প্রয়োগ করে বুঝতে পারলেন, এই সময়ে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারলে সাফল্য অনিবার্য। তিনি সৈন্য বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন হাতিয়ার নিচু রেখে ইংরাজ শিবিরের পাশ দিয়ে এগিয়ে যেতে।

তারা যেন বন্ধুত্বপূর্ণ ভাব দেখিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। দার্দানালেস প্রণালী পর্যন্ত গিয়ে তারা থামবে। ইংরাজরা কামালের সৈন্যদের নির্ভীকভাবে এগিয়ে যেতে দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। তাদের ওপর তুর্কীদের আটকে দেবার হুকুম ছিল। কিন্তু গুলি ছোঁড়ার হুকুম ছিল না। ফলে খুবই সংকটজনক অবস্থার সৃষ্টি হল। কোন পক্ষে একটা গুলির শব্দ হলেই ইংলন্ড ও তুরস্ক এক ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। শেষ পর্যন্ত দু তরফেই একটা রফা হল। যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নিয়ে যে বৈঠক হল তাতে স্থির হল, মিত্রবাহিনী থ্রেস থেকে গ্রীকদের এবং কনস্তান্তিনোপল থেকে নিজেদের বাহিনী সরিয়ে নেবে।

বিনা রক্তপাতে প্রখর বাস্তববুদ্ধি বলে কামাল বিরাট জয়লাভ করলেন। তাঁরই আপ্রাণ পরিশ্রমে তুরস্ক আবার বিদেশীদের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করল। এরপর এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি এক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে কনস্তান্তিনোপলের সরকারের দখল নিয়ে নিলেন। বৃদ্ধ সুলতান বাহেদ্দীন পালিয়ে গিয়ে ব্রিটিশ রণতরীতে আশ্রয় নিলেন। কামাল সুলতানের ভাইপো আবদুল মজিদকে খলিফা – এর পদ দিলেন কিন্তু তাকে কোন ক্ষমতা দেওয়া হল না।

পরের বছরে কামাল পিপলস পার্টি নামে একটি দল গঠন করলেন। সেই সঙ্গে কূটচাল চেলে সংসদীয় সঙ্কটের পরিবেশ তৈরি করে রাখলেন। পুরনো সরকার ভেঙ্গে দেওয়া হল। কিন্তু নতুন সরকার গঠনের পথও সুগম হল না। এই সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় পিপলস পার্টির সদস্য কামালুদ্দীন সংসদে প্রস্তাব করলেন নতুন সরকার গঠন করার দায়িত্ব কামালকে দেওয়া উচিত ৷ কামাল সংসদে এসে ঘোষণা করলেন, তুরস্ক হবে এক সাধারণতন্ত্রী রাষ্ট্র এবং তিনি হবেন তার প্রথম প্রেসিডেন্ট, এই শর্তেই কেবল তিনি শাসন ক্ষমতা হাতে নিতে পারেন।

সংসদীয় অচলাবস্থা মোচনের অন্য কোন পথ ছিল না, কাজেই বাধ্য হয়েই সদস্যদের এই শর্তে রাজি হতে হল। কামাল তুরস্কে তার একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। খুবই দ্রুত পিপল পার্টি দেশের প্রতিটি গ্রামে তাদের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত করল ! আগেই কামাল সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন, এবারে দেশের প্রতিটি স্তরের শাসনব্যবস্থা নিজের হাতে তুলে নিলেন। এর পরেও কামালের নিরঙ্কু স ক্ষমতা লাভের বাধা যা ছিল তা হল ইসলাম ধর্ম। তাঁর ইচ্ছা তুরস্ককে এক আধুনিক উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা।

কিন্তু ইসলামের সারয়তপন্থী পুরনো নিয়মকানুনের পরিবর্তন না ঘটাতে পারলে তার স্বপ্ন কখনোই সফল হবে না। কামাল সিদ্ধান্ত নিলেন ইসলামের সাবেকী নিয়মকানুন সব বাতিল করে দেবেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি সরকারী খবরের কাগজগুলিতে ইসলামের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত প্রচার শুরু করলেন। সেই সঙ্গে বিরোধী খবরের কাগজগুলিতে সংবাদ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতে লাগল। এই ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া যা হবার তাই হল। দেশ জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠল। ইসলামের মৌলবাদী ধর্মীয় নেতারা মসজিদে হাটে বাজারে মুস্তাফা কামালের নিন্দায় মুখর হয়ে উঠলেন্।

তারা বলতে লাগলেন, মেয়েদের বোরখাপ্রথা তুলে দিয়ে দেশে নাচ – গান করতে দিয়ে কামাল ইসলামের সব নিয়মকানুনই ভেঙ্গে দিচ্ছেন। এইসব অভিযোগের বিরুদ্ধে কামালও পাল্টা চাল চাললেন। তিনি অভিযোগ তুললেন যে দেশের প্রধান ধর্মগুরু খলিফা ইংলন্ডের সঙ্গে চক্রান্ত করে তুরস্ককে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন। এখানেই থেমে থাকলেন না কামাল। কঠোর হাতে তাঁর বিরোধীদের দমন করতে লাগলেন। অনেক সংসদ সদস্যকেই হতে হল।

১৯২০ খ্রিঃ কামাল এক আইন বলে দেশের খলিফাতন্ত্র রদ করে দিয়ে তুরস্ককে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করলেন। এই সঙ্গে তিনি তার বিরোধীদের জন্য প্রচ্ছন্ন হুমকিরও আভাস দিয়ে রাখলেন। ফলে সদস্যরা এই আইনের প্রতি সমর্থন জানাতে বাধ্য হলেন। এদিকে কামালের প্রাক্তন সহকর্মীরা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল। তাঁরা দেশ জুড়ে গুপ্ত ঘাঁটি গড়ে তুলল। কামাল যথাসময়েই তাঁর গোয়েন্দা বাহিনীর মাধ্যমে সব খবর ও প্রমাণ পেয়ে গেলেন।

অবিলম্বে এক অভিযান চালিয়ে তিনি তাঁর প্রাক্তন সহকর্মীদের গ্রেপ্তার করলেন। দেশের বৃহত্তম স্বার্থের খাতিরে তিনি বিরোধীদের ফাঁসিকাঠে ঝোলাতেও ইতস্ততঃ করলেন না। এরপর কামালের চেষ্টায় অচিরেই তুরস্ক আধুনিক পাশ্চাত্য রাষ্ট্রে পরিণত হল। প্রাচীন ধর্মীয় ও সামাজিক অভ্যাস, ব্যবহার, আচার প্রথা, পোশাক – আশাক এমন কি পারিবারিক জীবনের সনাতন বিধি নিষেধের ঘেরাটোপ ভেঙ্গে সম্পূর্ণ এক নতুন তুরস্কের জন্ম হল। কামালের তুরস্কে প্রাচীন ঐতিহ্যমন্ডিত ফেজ টুপি পরা নিষিদ্ধ হল, বহু বিবাহ নিষিদ্ধ হল, স্ত্রীলোকেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে গণ্যকরা বন্ধ হল, প্রাপ্তবয়স্করা ভোটাধিকার পেল।

দেশের প্রচলিত আরবি বর্ণমালা পাল্টে পাশ্চাত্য দেশগুলির ব্যবহৃত ল্যাটিন বর্ণমালার প্রচলন হল। কামাল ইসলামী সমস্ত আইন বদলে সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও ইটালির প্রচলিত আইন দেশে চালু করলেন। কামালের চেষ্টায় তুর্কী সৈন্যদল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও দক্ষ সেনাবাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। তিনি শক্তিশালী বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীও গড়ে তুলে ছিলেন। আপাত দৃষ্টিতে মুস্তাফা কামালকে নির্মম স্বৈরাচারী শাসক মনে হলেও তাঁর মহান দেশপ্রেমের ফলেই প্রাচীনপন্থী খোলসমুক্ত হয়ে আধুনিক সুসভ্য তুরস্কের জন্ম সম্ভব হয়েছে।

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক এর মৃত্যু: Mustafa Kemal Atatürk’s Death

১৯৩৮ খ্রিঃ কামাল আতাতুর্কের মৃত্যু হয়।

Leave a Comment