জাতিসংঘের ব্যর্থতার কারণ – জাতিসংঘের ব্যর্থতার কারন গুলি আলোচনা করো।

জাতিসংঘের ব্যর্থতার কারণ: 1919 খ্রিস্টাব্দে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেশ কয়েক বছর এই সংস্থা অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিল। তুরস্ক ও ইরাকের সীমান্ত সমস্যার সমাধান, এবং গ্রীস ও বুলগেরিয়া, পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যে বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রেও জাতিসংঘ প্রশংসনীয় কাজ করেছিল। কিন্তু বৃহৎ শক্তিগুলির স্বার্থপরতার কারণে জাতিসংঘের মর্যাদা বিনষ্ট হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানটির পতন ঘটে। জাতিসংঘের এই পতনের পিছনে ছিল একাধিক কারণে সমাবেশ। সেগুলি হল-

1)সাংগঠনিক দুর্বলতা: জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই এর সাংগঠনিক দুর্বলতা দেখা গিয়েছিল। মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের 14 দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতেতে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হলেও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এই সংস্থার সদস্যপদ গ্রহণ করেনি।ফলে জাতিসংঘের ক্ষমতা জন্মলগ্ন থেকেই অনেক কম থাকে। শুধু তাই নয় প্রতিষ্ঠালগ্নে জার্মানি ও রাশিয়া-এই দুই বৃহৎ শক্তিকেও এই সংস্থায় যোগ দিতে দেয়া হয়নি।ফলে স্বাভাবিকভাবে প্রথম থেকেই জাতিসংঘের সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল ছিল,যা এই সংস্থার পতনের অন্যতম কারণ।

2)সাংবিধানিক ত্রুটি: জাতিসংঘের সভায় কোন আন্তর্জাতিক বিরোধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে সকল সদস্যকে একমত হতে হতো।কিন্তু নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দীতার কারণে তারা কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে একমত হতে পারত না। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সম্মতির পরিবর্তে সকল সদস্যদের সম্মতি গ্রহণ-এই সাংবিধানিক ত্রুটির জন্য জাতিসংঘের কার্যকারিতা বহুলাংশে হ্রাস পায়। ফলে জাতিসংঘের পতন ঘটে।

3)পরস্পর বিরোধী স্বার্থের সংঘাত: বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে পরস্পর বিরোধী স্বার্থের সংঘাতে জাতিসংঘ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। জাতিসংঘের কোন নির্দেশ কোন সদস্য রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী হলে সেই রাষ্ট্র সদস্য পদ ত্যাগ করে সংঘের নির্দেশ অমান্য করতে শুরু করে।কিন্তু এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করার মতো উপযুক্ত সামরিক শক্তি জাতিসংঘের না থাকায় জাতিসংঘের পক্ষে তার নির্দেশ কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। ফলে জাতিসংঘ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ঐতিহাসিক লিপসনের মতে, “জাতিসংঘ ছিল যেন এক অসহায় বৃদ্ধা বিধবা, যার দংশন করার মতো দাঁত ছিল না”।

4)বৃহৎ রাষ্ট্রের স্বার্থপরতা: বৃহৎ রাষ্ট্র সমূহের স্বার্থপরতা ছিল জাতিসংঘের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক বিরোধের সমাধান জাতিসংঘ অতি সহজে করতে সক্ষম হলেও যেখানে বৃহৎ রাষ্ট্রের স্বার্থ জড়িত থাকত জাতিসংঘ সেখানে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করত। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ রাষ্ট্রসমূহের এই পক্ষপাতমূলক আচরণ জাতিসংঘকে দুর্বল করে দেয়। ফলে জাতিসংঘ ব্যর্থ হয়।

5)ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্ব: জাতিসংঘের প্রধান দুই সদস্য রাষ্ট্র ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স জাতিসংঘের আদর্শকে সমর্থন করা অপেক্ষা নিজ নিজ জাতির স্বার্থ রক্ষা কে অধিক গুরুত্ব দিত। এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে মতবিরোধ হলে জাতিসংঘের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কঠিন ছিল। কারণ এই দুই রাষ্ট্রের সমর্থনের জোরেই জাতিসংঘ চলত। ইঙ্গ-ফরাসি মতানৈক্যের জন্য অধিকাংশ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে জাতিসংঘের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

6)সদস্য রাষ্ট্রগুলির সদিচ্ছার অভাব: জাতিসংঘের পতনের জন্য এর সাংগঠনিক দুর্বলতা ও সাংবিধানিক ত্রুটি অপেক্ষা সদস্য রাষ্ট্রগুলির সদিচ্ছার অভাব বেশি দায়ী ছিল। ঐতিহাসিক লাংসামের মতে, “the league failed in the end to preserve peace because it could be only what the natiins made of if nothing less and nothing more.”

Leave a Comment