মরু বা শুষ্কতার ক্ষয়চক্রের বিবরণ

মরু বা শুষ্কতার ক্ষয়চক্রের বিবরণ: মরু ক্ষয়চক্র সংঘটিত হয় মরু অঞ্চলে। মরুপ্রায় অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের অভাবে জলধারা কম বলে বায়ুর কার্য প্রাধান্য বিস্তার করে। তাই মরুপ্রায় জলবায়ু অঞ্চলে বায়ু, জলপ্রবাহ প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তির সম্মিলিত প্রভাবে ভূমিরূপ যৌবন অবস্থা থেকে বার্ধক্য অবস্থা পর্যন্ত যে বিবর্তন ঘটে, তাকে মরু ক্ষয়চক্র বলে। উইলিয়াম মরিস ডেভিস ও এল সি কিং প্রদত্ত মরুক্ষয় চক্র ধারণা গুলি খুব জনপ্রিয়।

নিম্নে উইলিয়াম মরিস ডেভিস প্রণীত মরু ক্ষয় চক্র ধারণা টি বিস্তারিত আলোচনা করা হল। ডেভিস ১৯০৫ সালে ‘শুষ্ক অঞ্চলের ক্ষয়চক্র’ সম্পর্কে সর্বপ্রথম সুস্পষ্ট ধারণা প্রদান করেন। তার তত্ত্বটি কেবলমাত্র পর্বতবেষ্টিত মরু অঞ্চলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। স্বল্প বৃষ্টিপাত ও উদ্ভিদহীনতা  মরু অঞ্চলের প্রধান বৈশিষ্ট্য। বায়ুপ্রবাহ ছাড়াও জলপ্রবাহ মরু অঞ্চলের ক্ষয়চক্রে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। 

মরু বা শুষ্কতার ক্ষয়চক্র অত্যন্ত সরল প্রকৃতির। নদীর ক্ষয়চক্রের মতো মরু ক্ষয়চক্রের তিনটি পর্যায় লক্ষ্য করা যায় – (ক) যৌবন, (খ) পরিনত, (গ) বার্ধক্য।

(যৌবন পর্যায় – মরু অঞ্চলে জলপ্রবাহ জনিত ক্ষয় কার্যের মধ্যে দিয়ে যৌবন অবস্থার সূচনা হয়। মরু অঞ্চলের ক্ষয়চক্রের প্রারম্ভিক পর্যায়ে ভূমিরুপের যে বৈশিষ্ট্য গুলি লক্ষ্য করা যায় সেগুলি হল –

১. যৌবন অবস্থার প্রাথমিক পর্যায়ে ভূ-আলোড়নের ফলে পর্বতবেষ্টিত ভূমিরূপ ও কেন্দ্রমুখী জলনির্গমন প্রণালীর সৃষ্টি হয়।

২. যৌবন অবস্থায় প্রাকৃতিক শক্তি সমূহের ক্ষয়কার্য ও সঞ্চয়কার্য উভয়েই এক সঙ্গে সংঘটিত হয়।

৩. আবহবিকার ও জলধারার সম্মিলিত ক্ষয়কার্যের প্রভাবে ভূমিভাগের উচ্চতা ক্রমশ হ্রাস পায়।

৪. ক্ষয়প্রাপ্ত পদার্থসমূহ নদী অববাহিকায় সঞ্চিত হয়।

৫. জলবিভাজিকা সমূহের আয়তন স্থানীয় নিম্নক্ষয় ও পশ্চাৎক্ষয়ের মাধ্যমে হ্রাস পায়।

৬. পার্বত্য ঢালের নিচে অর্থাৎ বর্ষনের ফলে নালিক্ষয় ও প্রনালী ক্ষয় প্রাধান্য পায়।

৭. নদীবাহিত পদার্থ পর্বতের পাদদেশীয় অঞ্চলে সঞ্চিত হয়ে পললব্যজনী ও বাজাদা গঠন করে।

৮. পর্বতের পাদদেশীয় অঞ্চলের অবনমিত স্থানে প্লায়া হ্রদ গঠিত হয়।

৯. প্লায়া হ্রদের চারপাশে বালুকনা সঞ্চিত হয়ে বালিয়ারি গঠন করে।

(খ) পরিনত পর্যায় – বৃষ্টিপাতের অভাবে বায়ুর কার্য খুব বেশি সক্রিয় হলে পরিনত পর্যায়ের শুরু হয়। ভূমির উচ্চতা ও বৃষ্টিপাতের পরিমান ভীষন ভাবে কমে যায় বলে এই পর্যায়ের প্রথম ভাগেই জলপ্রবাহের দ্বারা নগ্নীভবন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষয়চক্রের প্রারম্ভিক পর্যায় থেকে বায়ু সক্রিয় থাকলেও পরিনত পর্যায়ে এটি প্রাধান্য বিস্তার করে।

এই পর্যায়ে সৃষ্ট ভূমিরূপ গুলি হল –

১. ভূমিভাগের বন্ধুরতা ক্রমশ হ্রাস পায়।

২. জলবিভাজিকা গুলির আয়তন ক্রমশ হ্রাস পায় এবং নদী অববাহিকার আয়তন বৃদ্ধি পায়।

৩. পর্বতের পাদদেশীয় অঞ্চলে পেডিমেন্ট গঠিত হয়।

(গ) বার্ধক্য পর্যায় – ভূমিরুপের পরিবর্তনে জলের কাজ যখন সম্পূর্ন রূপে বন্ধ হয়ে যায় এবং বায়ুর

কাজ চলতে থাকে তখন থেকে বার্ধক্য পর্যায়ের শুরু। এই পর্যায়ে ভূমিরুপের বৈশিষ্ট্য গুলি হল:

১. বার্ধক্য অবস্থায় ক্ষয় ও সঞ্চয় কার্য প্রাধান্য পায়।

২. বায়ু তাড়িত গর্ত ও বালিয়ারির সংখ্যা এই পর্যায়ে সবথেকে বেশি হয়।

৩. প্লায়ার সমস্ত পলি বায়ু দ্বারা অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়ে লোয়েস ভূমি গঠন করে।

৪. বার্ধক্য অবস্থায় পেডিমেন্ট গুলি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রায়সমতল ভূমি বা পেডিপ্লেন গঠন করে।

৫.মরু অঞ্চলের উচ্চ ভূমিভাগের কঠিন শিলা ক্ষয়কাজ প্রতিহত করে অনুচ্চ টিলা বা ইনসেলবার্জ 

রূপে অবস্থান করে।

Leave a Comment