জর্জ ওয়াশিংটন জীবনী | George Washington Biography in Bengali

জর্জ ওয়াশিংটন জীবনী: Gksolve.inআপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে George Washington Biography in Bengali. আপনারা যারা জর্জ ওয়াশিংটন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী জর্জ ওয়াশিংটন এর জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

জর্জ ওয়াশিংটন কে ছিলেন? Who is George Washington?

জর্জ ওয়াশিংটন (ফেব্রুয়ারি ২২, ১৭৩২ – ডিসেম্বর ১৪, ১৭৯৯) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি। তিনি আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ-এ কন্টিনেন্টাল আর্মির সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গঠনের প্রধান বলে উল্লেখ করা হয় এবং তিনি তার জীবদ্দশায় এবং এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতির জনক হিসেবে পরিচিত।

জর্জ ওয়াশিংটন জীবনী – George Washington Biography in Bengali

নামজর্জ ওয়াশিংটন
জন্ম22 ফেব্রুয়ারি 1732
পিতাঅগাস্টিন ওয়াশিংটন
মাতামেরি বল ওয়াশিংটন
জন্মস্থানপোপস ক্রিক, ভার্জিনিয়া, ব্রিটিশ আমেরিকা
জাতীয়তামার্কিন
পেশাসেনা কর্মকর্তা,রাজনীতিবিদ
মৃত্যু14 ডিসেম্বর 1799 (বয়স 67)

জর্জ ওয়াশিংটন এর জন্ম: George Washington’s Birthday

জর্জ ওয়াশিংটন 22 ফেব্রুয়ারি 1732 জন্মগ্রহণ করেন।

ভারতবর্ষ আবিষ্কার করতে বেরিয়ে ইতালীয় নাবিক কলম্বাস ১৪৯২ খ্রিঃ আবিষ্কার করেছিলেন আমেরিকা। সেই সময় আমেরিকা ভূখন্ডে বাস করত যারা তারা ছিল অর্ধসভ্য লাল মানুষ। কলম্বাস ইন্ডিয়া আবিষ্কার করেছেন এই ভ্রমে স্থানীয় অধিবাসীদের নাম দিয়েছিলেন রেড ইন্ডিয়ান। এই মানুষেরা নিজেরাই জানত না কী পরিমাণ সম্পদ লুকিয়ে আছে তাদের দেশে। কলম্বাসের সুবাদে সেই সম্পদের সন্ধান জেনে গেল ইউরোপের মানুষ।

তারা দলে দলে সেখানে গিয়ে বসতি স্থাপন করতে লাগল। স্পেনের লোকদের পরে আমেরিকায় এল ফরাসীরা। তারা বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে উপনিবেশ গড়ে তুলল। ইংরাজ ঔপনিবেশিকরা এলো সবার পরে। কিন্তু গায়ের জোরে তারা অধিকাংশ অঞ্চল দখল করে নিল। ক্রমে একসময় স্পেন ও ফরাসীরাও নিজেদের দখল হারাল ৷ সোনার লোভে ভাগ্যান্বেষী ইংরাজ যারা আমেরিকায় এসে উপনিবেশ গড়েছিল তাদের অধিকাংশ ছিল গরীব কারিগর, কৃষক আর ধর্মনিপীড়িত মানুষ।

ইংলন্ডের রানীর সনদ নিয়ে বিভিন্ন কোম্পানি এই উপনিবেশগুলি শাসন করত। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার মাটিতে কালেকালে একটা নতুন ইউরোপ গড়ে তোলা। ইংলন্ড ছেড়ে আসা মানুষেরা কঠোর পরিশ্রম করে আমেরিকার মাটিতে যা উৎপাদন করত তার বেশির ভাগই চলে যেত ইংলন্ডে। ফলে ক্রমশই তাদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠতে লাগল। ইংলন্ডের শোষণ ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে একদিন তারা বিদ্রোহী হয়ে উঠল। ইংলন্ডের শাসনের অধীনতা মুক্ত হয়ে নিজেদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তোলার সঙ্কল্প গ্রহণ করল।

জর্জ ওয়াশিংটন এর পিতামাতা ও জন্মস্থান: George Washington’s Parents And Birth Place

স্বাধীন আমেরিকার দাবী প্রথম যিনি উত্থাপন করেছিলেন, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যিনি, তারই নাম জর্জ ওয়াশিংটন। তিনি ছিলেন স্বাধীন আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট। জর্জ ওয়াশিংটনের পূর্বপুরুষরা ছিলেন ইংলন্ডের নর্দাম্পটনসায়ার অঞ্চলের অধিবাসী। ভাগ্যান্বেষণে তারা আমেরিকায় এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। আমেরিকার ভার্জিনিয়াতে ১৭৩২ খ্রিঃ ২২ শে ফেব্রুয়ারী জর্জ ওয়াশিংটনের জন্ম ।

তাঁর পিতা ছিলেন বিশাল কৃষি খামারের মালিক। সেই খামারে গরু মোষ ইত্যাদি পশু প্রতিপালন করা হত। তামাকের চাষ হত। জর্জ ছিলেন তার পিতার দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রথম সম্ভান। সৎমা মারা গিয়েছিলেন আগেই, লরেন্স নামে বৈমাত্রেয় এক দাদা ছিলেন কেবল। লরেন্স থাকতেন তার শ্বশুরবাড়িতে। ভার্জিনিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি লর্ড ফেয়ারফ্যাক্স ছিলেন তার শ্বশুর।

জর্জ ওয়াশিংটন এর কর্ম জীবন: George Washington’s Work Life

এগারো বছর বয়সে পিতৃহারা হলে জর্জকে লরেন্স নিজের কাছে নিয়ে এলেন। এখানেই তার লেখা পড়া শেখার ব্যবস্থা হল। ফেয়ারফ্যাক্স পরিবারে সবশুদ্ধ বছর পাঁচেক ছিলেন জর্জ। সেই সময় এক উপত্যকায় ষাট লক্ষ একর জমি জরিপ করবার জন্য যে সার্ভেয়ার দল পাঠানো হয়েছিল ফেয়ারফ্যাক্স জর্জকে সেই দলে সহকারী সার্ভেয়ার রূপে নিযুক্ত করেছিলেন। তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে পরে তিনি জর্জকে প্রধান সার্ভেয়ার পদে নিয়োগ করেছিলেন। দুবছর এই পদে কাজ করেছিলেন জর্জ। ব্যবসায়ের কাজে জর্জের দাদা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বার্বাডোজে গিয়েছিলেন।

সেখান থেকে ফিরে এসেছিলেন দুরারোগ্য বসন্ত রোগ নিয়ে এবং শেষ পর্যন্ত এই রোগেই তিনি মারা যান। সেই সময় জর্জের বয়স মাত্র সতের বছর। দাদার মৃত্যুর পর তার বিধবা পত্নী হলেন সমস্ত সম্পত্তির মালিক। বিশাল সম্পত্তি দেখা শোনার ভার পড়ল জর্জের ওপর। নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। লরেন্সের কোন সন্তান ছিল না। কয়েক বছর পরে তার স্ত্রীর মৃত্যু হলে সমস্ত সম্পত্তির মালিক হলেন জর্জ। জর্জ ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও পরিশ্রমী। বিষয়সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়েও ইতিমধ্যে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা লাভ হয়েছিল।

এবারে তিনি লব্ধ সম্পত্তির উন্নতি সাধনে মন দিলেন। জমিতে উৎপাদন বাড়াবার জন্য তিনি কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিলেন, কৃষির ওপরে লেখা বিভিন্ন বই পড়াশুনা করলেন। সেচের উন্নতির জন্য আধুনিক ব্যবস্থার সাহায্য নিলেন। এছাড়া পতিত জমি উদ্ধার করে কৃষিযোগ্য করে নিলেন। এই সঙ্গে পশুপালন ব্যবস্থারও উন্নতি সাধন করলেন। খামারের কাজে প্রায় দুশো লোক নিযুক্ত ছিল। তাদের কাজেরও তদারকি ও বিলিবন্টন নিজে তত্ত্বাবধান করতে লাগলেন। জর্জ যেন একাই একশো জন হয়ে গোটা ব্যবস্থাটাকে অপচয় আর ত্রুটি থেকে আগলে রাখতে লাগলেন ৷ এই কঠোর পরিশ্রমের ফলও ফলল যথারীতি।

সব ক্ষেত্রেই আশাতীত সাফল্য লাভ করলেন। লোকের মুখে মুখে উদ্যমীপুরুষ জর্জের প্রশংসা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেও বিলম্ব হল না। এই সময়ে ভার্জিনিয়ার ওহিও নদীর তীরে বিরাট অঞ্চল ছিল ফরাসীদের অধীন। তাদের সেই অঞ্চল থেকে সরাবার জন্য ভার্জিনিয়ার গভর্নর চিন্তাভাবনা করছিলেন। এমনি সময়ে জর্জ ওয়াশিংটন সেনাবাহিনীতে কাজ করবাব ইচ্ছা জানিয়ে তাঁর কাছে আবেদন পত্র পাঠালেন। গভর্নর জর্জকে বিশেষ দূত করে ফরাসীদের কাছে পাঠালেন।

আদেশ দিলেন, অবিলম্বে ফরাসীদের এই অঞ্চল ছেড়ে যেতে হবে। জর্জের দৌত্য ব্যর্থ হল। গভর্নরের আদেশে তখন জর্জকে সেনাবিভাগের লেফটেনান্ট কর্নেল পদে নিযুক্ত করা হল। ছশো সৈন্যের এক বাহিনী দিয়ে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হল বিতর্কিত এলাকায় ফরাসীদের হটিয়ে দেবার জন্য। জর্জ কৌশলে ফরাসীদের দুর্গ অধিকার করে তাদের বিধ্বস্ত ও বিতাড়িত করল। যুদ্ধে ফরাসী সেনাপতি মারা গেলেন। কিছুদিন পরেই স্থানীয় রেড ইন্ডিয়ান ও ফরাসী বাহিনী মিলিত ভাব ইংরাজদের আক্রমণ করলেন। এই আক্রমণ প্রতিহত করবার জন্য ইংরাজ সেনাপতি ব্রাডক এর অধীনে ওয়াশিংটনকে পাঠানো হল।

যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে শত্রুপক্ষকে আক্রমণের যে কৌশল জেনারেল ব্রাডক অবলম্বন করলেন তাতে ওয়াশিংটন খুশি হতে পারলেন না। কিন্তু তার পরামর্শে কান না দিয়ে ব্রাডক সরাসরি ফরাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরম্ভ করলেন। এই যুদ্ধে সাহসিকতার পরিচয় দিলেও ব্রাডককে প্রাণ হারাতে হল। তার যুদ্ধকৌশলের ত্রুটির জন্য বহু সংখ্যক ইংরাজ সৈন্যও মারা গেল। ওয়াশিংটন নেহাৎ ভাগ্যবলেই প্রাণে রক্ষা পেলেন। কিন্তু তার তিনটি ঘোড়াই গুলিবিদ্ধ হল, গুলির আঘাতে পোশাক হল ছিন্নভিন্ন।

কিন্তু এর মধ্যেই ওয়াশিংটন স্বপক্ষীয় বিপর্যস্ত সৈন্যদের পেছনে হটিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। সেদিন সাহসিকতার সঙ্গে এই কাজটি করতে না পারলে গোটা বাহিনীই প্রাণ হারাতো। যুদ্ধক্লান্ত ফরাসীরা ইংরাজ সৈন্যদের অনুসরণ করেনি, ফলে রক্ষা পেয়ে গিয়েছিলেন ওয়াশিংটন ও তার বাহিনীর অবশিষ্ট সৈনারা। ভার্জিনিয়ার গভর্নর ব্রাডকের শূন্য পদে ওয়াশিংটনকে নিযুক্ত করলেন ১৭৫৫ খ্রিঃ। ওয়াশিংটন হলেন ভার্জিনিয়ার সৈন্যবাহিনীর প্রধান।

ভার্জিনিয়ার সৈন্যবাহিনীর সেনাপতি পদে মাত্র তিন বছর কাজ করেছিলেন ওয়াশিংটন। এই সময়ের মধ্যেই নিজ বুদ্ধিমত্তা ও রণকুশলতার গুণে যথেষ্ট সুখ্যাতি অর্জন করেন। শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করবার জন্য ওয়াশিংটন নিত্য নতুন এমন সব কৌশল অবলম্বন করতেন যে শত্রুপক্ষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ত। মঝে মাঝেই তিনি সুকৌশলে ভুল তথ্য প্রচার করে শত্রুদের বিপথে চালিত করতেন। এই সকল কারণে তিনি আখ্যা পেয়েছিলেন ধূর্ত শেয়াল। স্বাস্থ্যের কারণে তিন বছর পরে পদত্যাগ করে ওয়াশিংটন নিজের জমিদারি মাউন্ট ভার্ননে চলে আসেন।

এই সময়েই তিনি বিবাহ করেন মার্থা ড্রানড্রিজ নামে এক ধনাঢ্যা বিধবাকে। তাদের বিবাহিত জীবন সুখের হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সতেরো বছর নিজের জমিদারির কাজে ব্যস্ত থেকেছেন ওয়াশিংটন। কিন্তু দেশের ঘটনাপ্রবাহ ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ছিলেন সজাগ। এই সতেরো বছরের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, ইংরাজদের শাসনাধীনে আমেরিকার অধিবাসীরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ছাড়া আর কিছু নয়।

যতদিন ইংরাজদের হাতে এদেশের শাসনক্ষমতা থাকবে ততদিন এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে না। সতেরো বছর পরে ১৭৭৪ খ্রিঃ আবার পাদপ্রদীপের আলোয় এলেন ওয়াশিংটন সেই বছর তেরোটি মার্কিন উপনিবেশের প্রতিনিধিদের এক সম্মেলন আয়োজিত হল ফিলাডেলফিয়ায়। ভার্জিনিয়ার প্রতিনিধি হিসাবে এই সম্মেলনে যোগ দেন ওয়াশিংটন। ইংলন্ডের পার্লামেন্টে যে সকল আইন পাশ হত তার ফলে বরাবরই আমেরিকার স্বার্থ ক্ষুন্ন হত। এছাড়া আমেরিকায় উৎপাদিত ফসলের সিংহভাগ চালান হয়ে যেত ইংলন্ডে সেখানকার লোকদের সুখভোগের জন্য।

এই সকল নানা কারণে সম্মেলনে প্রত্যেক প্রতিনিধিই ইংলন্ডের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করলেন। পরের বছরে দ্বিতীয় অধিবেশনে সর্বসম্মতি ক্রমে ওয়াশিংটন সমগ্র উপনিবেশের সেনাপ্রধান নিযুক্ত হলেন। প্রতিনিধিদের মধ্যে একমাত্র ওয়াশিংটনেরই সামরিক অভিজ্ঞতা ছিল। কাজেই গুরুত্বপূর্ণপদের দায়িত্ব যে উপযুক্ত হস্তেই অর্পিত হয়েছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। প্রথমে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে ইংলন্ডকে নিজেদের দাবি – দাওয়া জানানোর ও আপসরফার চেষ্টা করা হল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছল যে আমেরিকার মাতৃভূমি ইংলন্ডের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা ছাড়া আর পথ রইল না। যুদ্ধই হয়ে দাঁড়াল একমাত্র সমাধানের পথ। আমেরিকার তেরোটি প্রদেশের প্রতিনিধিরা সম্নিলিত সিদ্ধান্তের শেষে ১৭৭৬ খ্রিঃ ৭ ই জুন আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। পাঁচজন সদস্যকে নিয়ে গঠন করা হল পরিচালন পরিষদ। এর প্রধান হলেন টমাস জেফারসন। ১৭৭৬ খ্রিঃ ৪ ঠা জুলাই স্বাধীনতার যে ঘোষণাপত্র প্রচার করা হল তাতে প্রদেশগুলির ঐক্যের কথা বিশেষ জোর দিয়ে বলা হল।

এরপরেই বিভিন্ন প্রদেশে আমেরিকানদের সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনীর যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। সামরিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও শক্তিশালী ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর তুলনায় ওয়াশিংটনের আমেরিকান বাহিনী ছিল যথেষ্ট দুর্বল। এদের অধিকাংশেরই সামরিক শিক্ষা বা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল না। উন্নতমানের অস্ত্রশস্ত্রও ছিল না। কিন্তু সমস্ত অসুবিধা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন সুশৃঙ্খল একটি বাহিনী সংগঠিত করতে পেরেছিলেন এবং এই বাহিনীর সাহায্যেই যুদ্ধ জয় করেছিলেন।

ব্রিটিশ সৈন্যের তিনটি বাহিনী তিনদিক থেকে এসে একজায়গায় মিলিত হয়ে আমেরিকানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করবে এরকমই নির্দেশ ছিল ইংলন্ডের সামরিক দপ্তরের। আমেরিকার ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্বন্ধে অজ্ঞ সামরিক দপ্তরের নির্দেশ অনুসরণ করতে গিয়ে ব্রিটিশদের একটি বাহিনী বিস্তীর্ণ জলাভূমির মধ্যে পথ হারিয়ে ফেলল। ওয়াশিংটন সেই সুযোগে আক্রমণ করে তাদের পর্যুদস্ত করলেন। প্রাণ বাঁচাবার জন্য ইংরাজ সৈন্যরা তড়িঘড়ি জাহাজে চেপে ইংলন্ডে পাড়ি দিল।

ইংরাজদের অপর দুটি বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘ পাঁচ বছর মরণপণ লড়াই করতে হয়েছে ওয়াশিংটনকে। নিজের বাহিনীর দুর্বলতার কথা ওয়াশিংটন জানতেন। তাই সৈন্যদের মনোবল ও উৎসাহ সজাগ রাখার বিষয়ে তিনি বিশেষ মনোযোগী ছিলেন। নিজের পদমর্যাদার কথা ভুলে গিয়ে তিনি তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মিশে গিয়েছিলেন। শত্রুসৈন্যের বন্দুকের মুখে ওয়াশিংটন নিজে অকুতোভয়ে এগিয়ে যেতেন। সৈনিকদের বিপদকে তিনি নিজের বিপদ বলেই গণ্য করতেন। সমস্ত বিপদ আপদ দুঃখ যন্ত্রণা তিনি সৈন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন।

সুযোগ সুবিধার বিষয়ে কোন সৈনিকের যাতে কোন প্রকার অভিযোগ না থাকে সেই বিষয়ে তিনি সর্বদা তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। এই সকল কারণে সমগ্র বাহিনীর শ্রদ্ধা ও আনুগত্য লাভ করেছিলেন ওয়াশিংটন। তার আদেশ নির্দেশ শৃঙ্খলার সঙ্গে অক্ষরে অক্ষরে পালন করার জন্য সকলে প্রাণপণ চেষ্টা করত। কেবলমাত্র সৈনিকদের শৃঙ্খলা ও অটুট মনোবলের জোরেই শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ইংরাজ বাহিনীকে পরাস্ত করতে সক্ষম হলেন। ১৭৮১ খ্রিঃ ইংরাজ সেনাপতি কর্নওয়ালিশ আমেরিকান বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলেন।

ওয়াশিংটন লাভ করলেন আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয়ী নায়কের গৌরব। সেনাপতি হিসেবে নিজের কর্তব্য সম্পূর্ণ করে ওয়াশিংটন আবার নিজের জমিদারিতে ফিরে গেলেন। কিন্তু আমেরিকার মানুষ তার অসামান্য কর্মকুশল তাকে দেশ গঠনের কাজে নিয়োজিত করতে চাইছিল। তাই এবারে তাকে হতে হল স্বাধীন আমেরিকার কর্ণধার। ১৭৮৭ খ্রিঃ সমস্ত প্রদেশের প্রতিনিধিরা মিলিত হয়ে দেশে সংবিধান রচনা করেছিলেন, এবং ঐক্যবদ্ধভাবে জর্জ ওয়াশিংটনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। তিনি হন স্বাধীন আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্রপতি।

ওয়াশিংটন যে কেবল একজন দক্ষ সেনাপতি ছিলেন তাই নয়। দক্ষ রাজনীতিবিদ ও প্রশাসক হিসেবেও তিনি তার শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপন করেছেন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করবার পর। শিশুরাষ্ট্রের সংগঠনের কাজে তিনি কখনো রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিভেদ বা কোন প্রকার সংকীর্ণতার প্রশ্রয় দেননি। দলমত নির্বিশেষে যোগ্যতম ব্যক্তিকে তিনি রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের ভার অর্পণ করেছেন। তার সুদক্ষ পরিচালনায় অতি অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের অভ্যন্তরীন উন্নতির সাথে সাথে বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এবং দেশকে দ্রুত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

১৭৯৩ খ্রিঃ ফরাসী বিপ্লব শুরু হলে তিনি বিপ্লবীদের সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু গ্রহণ করেছিলেন নিরপেক্ষনীতি। ফলে বিবদমান প্রতিটি দেশের সঙ্গেই আমেরিকার ব্যবসায়ের যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ ছিল। রাষ্ট্রপতি হিসেবে অসাধারণ যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছিলেন জর্জ ওয়াশিংটন। ১৭৯২ খ্রিঃ তাকে দ্বিতীয়বারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়। তৃতীয় বারের জন্যও তিনিই নির্বাচিত হন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির পদ তিনি আঁকড়ে থাকতে চান নি।

অধিকতর যোগ্য ও সম্ভাবনাময় নেতৃত্বের জন্য প্রেসিডেন্ট পদ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ইংলন্ডে ক্রমওয়েল যেমন নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ওয়াশিংটন তেমনি ‘ এক নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু ক্রমওয়েলের মত উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন না তিনি, দেশের প্রতি কর্তব্যবোধে নিজের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ পালন করে গেছেন।

জর্জ ওয়াশিংটন এর মৃত্যু: George Washington’s Death

১৭৯৯ খ্রিঃ জর্জ ওয়াশিংটনের দেহাবসান হয়।

Leave a Comment