কাশ্মীর কিভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়? অথবা, ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর কাশ্মীর সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করো।

কাশ্মীর কিভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়? অথবা, ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর কাশ্মীর সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করো: ইংরেজরা ভারত ত্যাগের সময় ভারতীয় ভূখণ্ডে অন্তত 562 টি দেশীয় রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল। ভারতের স্বাধীনতা আইন দ্বারা এই দেশীয় রাজ্যগুলি নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখার অথবা ভারত ও পাকিস্তান-যেকোনো একটি রাষ্ট্রে যোগদানের অধিকার পায়। ফলস্বরূপ স্বাধীনতা লাভের পর দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তির ক্ষেত্রে তিনটি দেশীয় রাজ্যকে নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি হয়, যার মধ্যে অন্যতম হলো কাশ্মীর।

কাশ্মীর সমস্যার প্রেক্ষাপট

ভারতের উত্তর এ অবস্থিত প্রায় 84 হাজার 400 বর্গমাইল এলাকা বেষ্টিত কাশ্মীর দেশীয় রাজ্যের সীমানা ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশী বিস্তৃত ছিল। এই রাজ্যের রাজা হরি সিং হিন্দু হলেও তার সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রজা ছিলেন মুসলমান। ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই কাশ্মীরকে নিজ নিজ রাষ্ট্রে যোগদানের আহ্বান জানালেও ভারতীয় স্বাধীনতা আইনকে ব্যবহার করে হরি সিং কোন রাষ্ট্রে যোগ না দিয়ে কাশ্মীরের স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষায় সচেষ্ট হন। অপরদিকে কাশ্মীরের প্রধান রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের সভাপতি শেখ আব্দুল্লাহ কাশ্মীরের ভারত ভুক্তির ক্ষেত্রে জনমত গঠন করতে থাকেন।

ভারতীয় নেতৃবৃন্দের মনোভাব

ভারতের অখন্ডতা ও ঐক্য রক্ষার জন্য কাশ্মীরকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা আবশ্যিক হলেও ভারতের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কাশ্মীরের ভারত ভুক্তি বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চাননি। তারা চেয়েছিলেন কাশ্মীরের জনগনই ঠিক করুক তারা ভারত বা পাকিস্তান কোন দেশে যোগ দেবে। এ প্রসঙ্গে 1947 খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে মহাত্মা গান্ধী ঘোষণা করেছিলেন, “জনগণের ইচ্ছা অনুসারে কাশ্মীর ভারত বা পাকিস্তানের যোগ দিতে পারবে।”

পাক হানাদার বাহিনীর আক্রমণ

পাকিস্তানের জনক মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ কাশ্মীরকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রধান কেন্দ্র বলে মনে করতেন। পাকিস্তান সরকারের আশঙ্কা ছিল হরি সিং ভারতের সাথে যোগ দিতে পারেন। তাই তারা কাশ্মীর অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে বল প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করে এবং পাকিস্তানি মদতপুষ্ঠ পাঠান উপজাতির হানাদাররা কাশ্মীরে প্রবেশ করে 1947 খ্রিস্টাব্দের 22শে অক্টোবর ব্যাপক লুণ্ঠন, নির্যাতন ও হত্যা লীলা চালাতে থাকে। পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও কাশ্মীরে প্রবেশ করে।

হরি সিং এর সাহায্য প্রার্থনা

পাক সেনা ও হানাদার বাহিনীর যৌথ আক্রমণ প্রতিহত করতে না পেরে কাশ্মীরের রাজা হরি সিং 1947 খ্রিস্টাব্দের 24শে অক্টোবর ভারত সরকারের কাছে সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করেন। এক্ষেত্রে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয় যে কাশ্মীর ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করলে তবেই ভারত সরকার কাশ্মীরে সেনা প্রেরণ করবে।

ভারত ভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর

পাক বাহিনীর দ্রুত কাশ্মীরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে রাজধানীর শ্রীনগরের 40 মাইলের মধ্যে এসে পৌঁছালে নিরুপায় হরি সিং 1947 খ্রিস্টাব্দের 26শে অক্টোবর ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করেন।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাফল্য

হরি সিং এর ভারত ভক্তির দলিলে স্বাক্ষর করার পর 1947 খ্রিস্টাব্দের 27শে অক্টোবর প্রায় 100টি বিমানে ভারতীয় সেনাবাহিনী শ্রীনগরে অবতরণ করে এবং পাক হানাদারদের বিতাড়িত করে কাশ্মীরের দুই-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ডের উপর নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপন করে। 31শে অক্টোবর ভারতীয় সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় শেখ আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে কাশ্মীরে একটি অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

আজাদ কাশ্মীর

1947 খ্রিস্টাব্দের 31শে অক্টোবর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহতায় কাশ্মীরে অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে পাকিস্তান ওই সরকারের বিরোধিতা করে এবং তার দখলকৃত কাশ্মীরে একটি সমান্তরাল সরকার প্রতিষ্ঠা করে, যা আজাদ কাশ্মীর নামে পরিচিত।এখান থেকে পাকিস্তান ভারত ভুক্ত কাশ্মীরের উপর নানাভাবে আক্রমণ চালাতে থাকে।

রাষ্ট্রসঙ্ঘের হস্তক্ষেপ

ভারত ও পাকিস্তানের সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু মাউন্টব্যাটেনের পরামর্শে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীর সমস্যা উত্থাপন করেন এবং এই সমস্যার সমাধানের জন্য রাষ্ট্রসঙ্ঘের হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করেন।

যুদ্ধ বিরতি

দীর্ঘ আলাপ আলোচনার পর 1948 খ্রিস্টাব্দের 31শে ডিসেম্বর রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধ বিরোধী ঘোষণা করে এবং নিয়ন্ত্রণ রেখা (LOC) বরাবর সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের পরিদর্শক নিয়োগ করে। ইউরোপীয় শক্তিবর্গের প্ররোচনায় রাষ্ট্রসংঘ গণভোটের প্রস্তাব দেয় এবং অ্যাডমিডাল নিমিজকে গণভোট নেয়ার জন্য কাশ্মীরে পাঠানো হয়। কিন্তু পাকিস্তানের বিরোধিতার কারণে কাশ্মীরে গণভোট আজও অনুষ্ঠিত হয়নি।

উপসংহার

রাষ্ট্রসঙ্ঘের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কাশ্মীর সমস্যার যে সুষ্ঠ সমাধান আশা করা হয়েছিল, কার্যক্ষেত্রে তা বাস্তবায়িত হয়নি। আজও কাশ্মীরের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধ চলছে। আর এই বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে 1947, 1965, 1970 ও 1999 খ্রিস্টাব্দে উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে।

Leave a Comment