জোন অব আর্ক জীবনী | Joan of Arc Biography in Bengali

জোন অব আর্ক জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Joan of Arc Biography in Bengali. আপনারা যারা জোন অব আর্ক সম্পর্কে জানতে আগ্রহী জোন অব আর্ক এর জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

জোন অব আর্ক কে ছিলেন? Who is Joan of Arc?

জোন অফ আর্ক (জানুয়ারি ৬, ১৪১২ – মে ৩০, ১৪৩১) পরাধীন ফ্রান্সের মুক্তিদাত্রী বীরকন্যা এবং রূপকথাতুল্য এক নেত্রী। জান্ দার্ক(Jeanne ď Arc), যিনি ইংরেজিতে Joan Of Arc নামে পরিচিত। ইংরেজদের সঙ্গে শতবর্ষ ব্যাপী যুদ্ধ এর(১৩৩৭-১৪৫৩) সময় তিনি ফ্রান্সের সৈন্যবাহিনীকে নেতৃত্ব দেন। তার স্মরণে ফ্রান্সে অনেক স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে।

জোন অব আর্ক জীবনী – Joan of Arc Biography in Bengali

নামজোন অব আর্ক
জন্ম৬ জানুয়ারি ১৪১২
পিতাজ্যাক ডি’আর্ক
মাতাইসাবেল রোমি
জন্মস্থানডমরেমি, বার ডাচি, ফ্রান্সের রাজ্য
জাতীয়তাফরাসি
পেশাপরাধীন ফ্রান্সের মুক্তিদাত্রী বীরকন্যা
মৃত্যু৩০ মে ১৪৩১

জোন অব আর্ক এর জন্ম: Joan of Arc’s Birthday

জোন অব আর্ক ৬ জানুয়ারি ১৪১২ জন্মগ্রহণ করেন।

জোন অব আর্ক জীবনী – Joan of Arc Biography in Bengali

জোয়ান অব আর্ক ফ্রান্সের মুক্তিদাত্রী বীরাঙ্গনাও সন্ন্যাসিনী জোয়ান অব আর্ক – এর জন্ম ফ্রান্সের সীমান্ত প্রদেশের ছোট্ট গ্রাম ডমবেরিতে, পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে। সকলে তাকে ডাকতো জানেৎ নামে। গৃহস্থ চাষী পরিবারের মেয়ে, শিশু বয়স থেকেই ঘরকন্নার কাজে মাকে সাহায্য করতেন জানে। কখনো ভাইদের সঙ্গে মেষের পাল নিয়ে চরাতে যেতে হতো।

সংসারের নানান কাজে ব্যস্ত থাকলেও সকলের সঙ্গে গীর্জায় প্রার্থনা সভায় নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন তিনি। ক্রশবিদ্ধ যিশুর বেদীর নিচে নতজানু হয়ে প্রার্থনায় বসে তন্ময় হয়ে যেতেন জানেৎ। শিশু বয়স থেকেই তিনি নিজের মধ্যে অনুভব করতেন এক আশ্চর্য পবিত্রতা। এইভাবেই গ্রামের মুক্ত পরিবেশে সকলেব স্নেহ ভালবাসার মধ্যে বড় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। যখন তেরো বছরের কিশোরী, একদিন গ্রীষ্মকালে বাড়ির বাগানে বসে আছেন। চারদিক নির্জন নিস্তব্ধ। এমনি সময়ে হঠাৎ তার মনে হল, কে যেন তাঁকে ডাকছে।

চমকে তাকিয়ে দেখেন মাথার ওপরে সূর্যের আলোকে ম্লান করে দিয়ে অপূর্ব উজ্জ্বল আলোকচ্ছটা। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন এক দেবদূত। তাকিয়ে আছেন জোয়ানের দিকে। হাতদুটি প্রার্থনার ভঙ্গিতে বুকের ওপর তুলে তন্ময় জোয়ান উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মনে হল দেবদূত যেন কিছু বললেন। তারপরই আকাশের গায়ে মিলিয়ে গেলেন। কয়েক মুহূর্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিছুই বুঝতে পারলেন না। চোখের ভুল দেখলেন তা – ও ভাবতে পারছেন না। জোয়ান ছুটে গেলেন বাড়ির ভেতরে। সকলকে বললেন তাঁর অলৌকিক দর্শনের কথা। কিন্তু কেউই বিশ্বাস করলেন না তার কথা, চোখের ভুল বলেই সিদ্ধান্ত করলেন।

কয়েকদিন পরেই জোয়ান আবার দেখলেন দিব্য আলোর বুকে সেই দেবমূর্তি। ওখানেই শেষ হয় না। প্রায়ই ঘটতে লাগল এমনি দর্শন। দেবদূতের উপদেশও শুনতে পেতে লাগলেন। একাগ্র মনে জোয়ান শুনতেন সেসব কথা। একদিন গীর্জা থেকে ফেরার পথে দেবদূত তাঁর সামনে আবির্ভূত হয়ে বললেন, “জোয়ান, তোমার কাজের সময় উপস্থিত হয়েছে। যুবরাজ ডফিন রাজ্যচ্যুত। তুমি তাঁর কাছে যাও, হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করে তাঁকে রাজপদে অভিষিক্ত কর।” নতজানু জোয়ান করজোড়ে জানালেন, প্রভু, আমি এক সাধারণ গ্রাম্য বালিকা, যুদ্ধবিদ্যা জানি না। আমি কি করে যুবরাজের হৃতরাজ্য উদ্ধার করব? তা ছাড়া তার কাছে যাবার পথও আমি চিনি না।

দেবদূত অভয় দিয়ে বললেন, “ তোমার পক্ষে কিছুই অসম্ভব হবে না। প্রভুর আশীর্বাদ রয়েছে তোমাকে ঘিরে। ভয় করো না, তুমি গিয়ে সেনাপতি রবার্টের সঙ্গে দেখা করো। সেই তোমাকে ডফিনের কাছে পৌঁছে দেবে। ‘ জোয়ান বাড়ি ফিরে সকলকে জানালেন দেবদূতের নির্দেশের কথা। কিন্তু কেউই তাঁর কথা বিশ্বাস করল না। কেবল এক কাকা ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি জোয়ানকে আশ্বাস দিয়ে জানালেন, দেবদূতের নির্দেশ মত নিয়ে যাবেন সেনাপতির কাছে। পরদিনই এক ভাই আর কাকার সঙ্গে জোয়ান রওনা হলেন রবার্টের দুর্গের পথে। সেখানে পৌঁছে সব কথা জানালেন সেনাপতিকে।

জোয়ানের পবিত্র চেহারা, কথাবার্তা শুনে তাঁকে অনেকেই অবিশ্বাস করতে পারলেন না। তাঁদের অনুরোধেই সেনাপতি রবার্ট কয়েকজন সৈন্য সঙ্গে দিয়ে জোয়ানকে পাঠিয়ে দিলেন যুবরাজের কাছে। সেই সময়ে ফ্রান্সের ঘোরতর দুর্দিন। ইংরাজদের সঙ্গে শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধে বিপর্যস্ত। দেশের বেশির ভাগ অংশই ইংরাজদের দখলে চলে গেছে। রাজা ষষ্ঠ চার্লস শেষ বয়সে হঠাৎ উন্মাদ হয়ে গেছিলেন। তাঁর পুত্র ডফিন নাবালক। রাজ্যের হাল ধরবার মত কেউ নেই। চারদিকে বিশৃঙ্খলা।

এই অবস্থায় ফ্রান্সের সামন্ত রাজারা যোগ দিয়েছে ইংরাজদের সঙ্গে। এমনকি পরলোকগত রাজা ষষ্ঠ চার্লসের বিধবা পত্নী ইসা বিউ ও বার্গান্ডির ডিউক ভিড়েছেন ইংরাজদের পক্ষে। যুবরাজ ডফিন কোনক্রমে ইংরাজদের ঠেকাবার চেষ্টা করে চলেছেন। পিছু হটতেহটতে তিনি ফ্রান্সের দক্ষিণে চিনন শহরে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর আশা ভরসা নিঃশেষিত। সৈন্য মুষ্টিমেয়, ফলে তিনি শক্তিহীন। প্রতি মুহূর্ত শঙ্কায় কাটছে, কখন ইংরাজ সৈন্য এসে হানা দেয়। তারা অবরোধ করে রয়েছে অরলিয়েন্স শহর। তাঁর অনুচররাও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। ফ্রান্সের স্বাধীনতা – সূর্য বুঝি ইংরাজদের হাতে অস্তমিত হয়।

এমনি যখন অবস্থা, সতেরো বছরের কিশোরী জোয়ান ১৪২৯ খ্রিঃ জানুয়ারী মাসে এসে দাঁড়ালেন যুবরাজের সামনে। তাঁর গায়ে পুরুষের পোশাক, চোখে মুখে সরলতা মাখানো অপূর্ব দীপ্তি। জোয়ান নির্ভীক অকম্পিত কণ্ঠে বললেন, হে যুবরাজ, আমি ফ্রান্সের গ্রামের নগণ্য এক গ্রাম্য বালিকা। ঈশ্বরের আদেশ পেয়ে আমি এসেছি দেশ থেকে শত্রু সৈন্যদের বিতাড়িত করবার জন্য। আপনি অবিশ্বাস করবেন না, আমার ওপরে আদেশ হয়েছে, আপনাকে রেইম শহরে সিংহাসনে অভিষিক্ত করবার জন্য। ঈশ্বরের ইচ্ছা, আপনিই হোন মহান ফ্রান্সের শাসনকর্তা।” যুবরাজ শুনলেন জোয়ানের কথা।

উপস্থিত অনেকেই তাঁর কথা অবিশ্বাস করল। নানা প্রশ্ন করতে লাগল তাঁকে। ধীরে ধীরে সব কথার জবাব দিয়ে জোয়ান নতজানু হয়ে যুবরাজকে বললেন, হে যুবরাজ সব প্রশ্নের জবাব আমি দেব অরলিয়েন্সের যুদ্ধক্ষেত্রে। আপনি আমাকে সৈন্য দিন। ডফিন ভাবলেন, সবই তো হারাতে বসেছেন। কে বলবে হয়তো সত্যি সত্যিই মেয়েটি দৈব – নির্দিষ্টা। দেখাই যাক না কি হয়। তিনি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধযাত্রার আদেশ দিলেন। কয়েকজন সেনাপতির অধীনে চারহাজার সৈন্যের এক ক্ষুদ্র বাহিনী রওনা হয়ে পড়ল অরলিয়েন্সের দিকে। পথচলার অসুবিধা দূর করবার জন্য আগেই পুরুষের পোশাক পরে নিয়েছিলেন জোয়ান ৷

এখন এক কালো ঘোড়ায় সওয়ারী হয়েছেন। তার কোমরে তরোয়াল, হাতে সাদা পতাকা। জোয়ান সসৈন্যে অরলিয়েন্সের রণাঙ্গনে এসে পৌঁছলেন ১৯২৯ খ্রিঃ ৩ রা মে। ক্লান্ত সৈন্যরা বিশ্রাম নিতে লাগল। সেনাপতিরা স্থির করলেন, কয়েকটা দিন বিশ্রাম নিয়ে পরে যুদ্ধ আরম্ভ করবেন। পরদিন, ৪ ঠা মে, জোয়ান নিজের তঁাবুতে ঘুমিয়ে আছেন। এমন সময় দেবদূতের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে উঠে বসলেন। দেবদূত তাকে অবিলম্বে যুদ্ধ আরম্ভ করবার আদেশ দিলেন। জোয়ানের নির্দেশে শিবিরের সমস্ত সৈন্য প্রস্তুত হয়ে নিল। তারপর সেনাপতিদের পরিচালনায় অতর্কিতে ঝাপিয়ে পড়ল ইংরাজ সৈন্যের ওপরে।

জোয়ান হাতে পতাকা নিয়ে, তেজোদ্দীপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে চললেন সৈন্যদের সঙ্গে৷ তাঁকে দেখাতে লাগল যেন স্বর্গলোক থেকে নেমে আসা কোন দেবী। ফরাসী বাহিনীর প্রচন্ড আক্রমণে মুহূর্তে ইংরাজসৈন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল তাদের মধ্যে— এক মায়াবিনী অশুভ শক্তির সাহায্য নিয়ে ফরাসীরা শক্তিমান হয়ে উঠেছে। তারা সভয়ে প্রাণ নিয়ে পালাতে লাগল। বিজয়ী সৈন্যদল নিয়ে জোয়ান ৭ তারিখে প্রবেশ করলেন অরলিয়েন্সে। মুক্তির আনন্দে উদ্বেল জনতা চারদিক থেকে ছুটে এসে নতজানু হল তাদের মুক্তিদাত্রীর পদপ্রান্তে। জোয়ানের জয়ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠল চারদিক।

জোয়ান সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, এ জয় আমার নয়, জয় দাও ঈশ্বরের, আর যুবরাজ ডফিনের নামে। জয়ের আনন্দে নতুন শক্তিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠল ফরাসী সৈন্যদল। অরলিয়েন্সের পর একের পর এক শহর তারা ইংরাজদের কবলমুক্ত করল। অবশেষে তারা এসে পৌঁছল পেটেয়ার (Pata) প্রান্তরে। সামনেই বিশাল ইংরাজ বাহিনী। এবারে তাদের সঙ্গে লড়তে হবে মরণপণ শেষ লড়াই ! ইংরাজ সৈন্যের তুলনায় ফরাসী বাহিনী অতীব নগণ্য। কিন্তু উদ্দীপনায় উদ্বেল তারা, মনে অদম্য বল। মূর্তিমতি প্রেরণার মত জোয়ান তাদের সঙ্গে। পেটেয়ার রণাঙ্গণে সেদিন দুই অসম বাহিনীর যে মরণপণ যুদ্ধ হল, তাতে প্রাণ হারাল অধিকাংশ ইংরাজ সৈন্য।

তাদের মনোবল একেবারে ভেঙ্গে পড়ল। অসংখ্য আহতের আর্তনাদ আর মুমূর্যের কাতর ধ্বনির মধ্যে একসময় যুদ্ধ শেষ হল, বিধ্বস্ত পরাজিত হল ইংরাজ সৈন্য। যুদ্ধের বীভৎসতা সহ্য করতে পারলেন না জোয়ান। দুহাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। আহতদের মাঝখানে ঘোড়া থেকে নেমে সকলের আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করলেন। এমনি সময়ে জোয়ান দৈববাণী শুনতে পেলেন- “জোয়ান, এবারে তোমার কাজ যুবরাজকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করা।” জোয়ান এবারে ঘুরে দাঁড়ালেন। সৈন্যবাহিনী সঙ্গে নিয়ে রওনা হলেন যুবরাজের প্রাসাদের দিকে। যুবরাজ সপারিষদ এগিয়ে এসে অভিনন্দন জানালেন জোয়ানকে।

তারপর সকলে মিলে বিজয় উল্লাসে এগিয়ে চললেন রেইম শহরের দিকে। এখানেই সুদূর প্রাচীনকাল থেকে ফ্রান্সের রাজারা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজপদে অভিষিক্ত হয়েছেন। যুবরাজ ডফিন সদলে এসে রাইম শহরে পৌঁছলেন ১৪২৯ খ্রিঃ ১৪ ই জুলাই। তিনদিন পরে গীর্জায় যুবরাজের কপালে পবিত্র তেল স্পর্শ করে তাকে ফ্রান্সের নতুন সম্রাট বলে ঘোষণা করলেন প্রধান যাজক। তার নতুন নামকরণ হল — সপ্তম চার্লস। জোয়ান বেদীমূলে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করলেন। তারপর সম্রাটের কাছে করজোড়ে আবেদন জানালেন, প্রভু, আমার কাজ শেষ হয়েছে, এবার আমাকে ঘরে ফিরে যাবার অনুমতি দিন।

গ্রামে আমার পিতামাতা ভাইরা রয়েছে, আমি তাদের কাছে ফিরে যেতে চাই। চার্লস কিন্তু জোয়ানকে গ্রামে ফিরবার অনুমতি দিলেন না ৷ তখনো পর্যন্ত রাজধানী প্যারিস ও কয়েকটি অঞ্চল ইংরাজদের দখলে রয়েছে। জোয়ানের সাহায্য ছাড়া সেসব অঞ্চল উদ্ধার করা যে সম্ভব নয় তা তিনি বুঝতে পারছিলেন ৷ সে কথা জোয়ানকে জানিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত করলেন প্যারিস আক্রমণ করবেন। প্যারিস আক্রমণের প্রশ্নে জোয়ান কিন্তু এবারে অন্তরের সাড়া পেলেন না। তিনি সম্রাটকে নিরস্ত করবার চেষ্টা করলেন। চার্লস জোযানের কথায় কর্ণপাত করলেন না। তিনি অবিলম্বে সৈন্যবাহিনী সজ্জিত করে অগ্রসর হলেন এবং ইংরাজদের আক্রমণ করলেন।

এবারের যুদ্ধে কিন্তু ফল বিপরীত হল। ইংরাজ সৈন্য ও বার্গান্ডির ডিউকের সম্মিলিত বাহিনীর আক্রমণে চার্লস পরাজিত হলেন। যাজক সম্প্রদায় ইতিপূর্বেই জোয়ানের জনপ্রিয়তাকে বিষনজরে দেখতে আরম্ভ করেছিল। তারা এবার সুযোগ বুঝে প্রচার করতে শুরু করল, জোয়ানের ধৃষ্টতার জন্যই ফরাসীবাহিনীকে পরাস্ত হতে হল। জোয়ান নিতান্তই সাধারণ মেয়ে তার কোন অলৌকিক ক্ষমতা নেই। যাজক সম্প্রদায়ের সুরে সুর মেলাল সমাজের অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা। জোয়ান সবই শুনলেন।

কোন প্রতিক্রিয়া তাঁর মধ্যে প্রকাশ পেল না। তিনি অন্তর থেকে বুঝতে পারছিলেন, ঈশ্বর যে কাজের জন্য তাকে পাঠিয়েছিলেন, তা তিনি সম্পন্ন করেছেন, এবারে তাকে বিদায় নিতে হবে। বার্গান্ডির ডিউক ইতিমধ্যে আর একটি ফরাসী শহর অবরোধ করেছেন খবর এল। সেখানকার বিপন্ন মানুষ সাহায্যের জন্য আকুল আবেদন জানাল জোয়ানের কাছে। বিচলিত জোয়ান সম্রাটকে শহরবাসীর সাহায্যের জন্য সৈন্য পাঠাবার জন্য আবেদন জানালেন। চার্লস কিন্তু নতুন করে যুদ্ধে নামবার সাহস পেলেন না। সভাসদদের প্ররোচনায় তিনি সৈন্য পাঠাতে অসম্মত হলেন। জোয়ান স্থির থাকতে পারছিলেন না।

তিনি নিজের চেষ্টায় সামান্য কিছু সৈন্য যা সংগ্রহ করতে পারলেন তাই নিয়ে ইংরাজ সৈন্যের শিবিরের দিকে রওনা হলেন। অসংখ্য শত্রুসৈন্যের ব্যূহ ভেদ করে রাতের অন্ধকারে জোয়ান শহরে প্রবেশ করলেন। ইংরাজ আর ফরাসী সৈন্যের মধ্যে আরম্ভ হয়ে গেল খন্ডযুদ্ধ। বিপুল সংখ্যক ইংরাজ সৈন্যের আক্রমণে অল্পসময়ের মধ্যেই জোয়ানের বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। শহরের বাইরে যাবার তিনটি পথই শত্রু সৈন্য অবরোধ করে রেখেছিল। কাজেই পালাবার কোন উপায় ছিল না। তবু জোয়ান দ্রুত ঘোড়া চালিয়ে সৈন্যদের নিয়ে পালাবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সহসা ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন।

শেষ মুহূর্তে জোয়ান বন্দি হলেন বার্গান্ডির ডিউকের সেনাপতি জাঁ দ্য লুক্সেমবার্গের হাতে। জোয়ানের অলৌকিক ক্ষমতার কথা ইংরাজ সৈন্যদের মধ্যেও প্রচারিত হয়েছিল। এবারে তাঁর বন্দিত্বের কথা প্রচারিত হতে জোর সাড়া পড়ে গেল। ইংরাজরা জোয়ানকেই তাদের পরম শত্রু বলে গণ্য করেছিল। এবারে তাকে হাতের মুঠোয় পাওয়া গেছে। সকলে সিদ্ধান্ত করল তার জন্য এমন শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে যাতে সকলের মন থেকে তার সম্পর্কে অমূলক ভয় ভীতি মুছে যায়। ইতিপূর্বেই ইংরাজরা জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় জোয়ানকে ধরে দেবার জন্য ১০,০০০ হাজার স্বর্ণ মুদ্রা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। বার্গান্ডির ডিউক পুরস্কারের লোভে জোয়ানকে তুলে দিল ইংরাজদের হাতে।

ইংরাজদের লোক দেখানো ভাল মানুষির অভিনয়ের তুলনা হয় না। সব অপরাধীর ক্ষেত্রেই তারা একটা প্রহসনমূলক বিচারের আযোজন করে। জোয়ানের ক্ষেত্রেও শুরু করল বিচারের প্রহসন। বিচার শুরু হল ১৪৩১ খ্রিঃ ২১ শে ফেব্রুয়ারি। ইংরাজদের সাহায্য করতে এগিয়ে এলো প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা আর নানা অঞ্চলের ঈর্ষাকাতর ধর্মযাজকরা। এদের নিয়ে গঠিত হল বিচারক মন্ডলী। জোয়ানের বিরুদ্ধে দুইটি প্রধান অভিযোগ দাঁড় করানো হলো। সেগুলো হল— (১) সে শয়তানের প্রতিনিধি ডাইনি হয়ে নিজেকে ঈশ্বরের আদেশপ্রাপ্তা বলে প্রচার করেছে (২) সে ধর্মীয় অনুশাসনের বিরুদ্ধাচরণ করে পাদ্রীদের অবজ্ঞা করেছে। এছাড়াও নানান রকমের ৭২ টি অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

প্রতিটি অভিযোগেরই এক এক করে জবাব দিয়েছিলেন জোয়ান অকল্পিত দৃপ্ত কণ্ঠে ৷ তাকে সাহায্য করবার জন্য সেদিন একটি প্রাণীও এগিয়ে আসেনি। এমনকি যেই চার্লসকে সম্রাটের আসনে বসাবার জন্য জোয়ানকে অভিযুক্ত হতে হল তিনিও ছিলেন সম্পূর্ণ নীরব।। সেদিন তিনি যদি সচেষ্ট হতেন তাহলে হয়তো জোয়ানকে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড় করানো মিথ্যা অভিযোগের শিকার হতে হতো না। জোয়ানকে বলা হল, তিনি যে ঈশ্বরের অনুগ্রহপ্রাপ্তা এবং যে দৈব বাণীর কথা তিনি বলেছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা একথা স্বীকার করবার জন্য। তা না হলে তাঁকে পুড়িয়ে মারা হবে। – জোয়ান জবাবে জানালেন, “আমি ঈশ্বরের অনুগ্রহের কথা অস্বীকার করি কি করে— তাহলে যে ঈশ্বরকেই অস্বীকার করতে হয়। আমি তা করতে পারি না, যা নিজের চোখে দেখেছি সবই অকপটে বলেছি, তার প্রতিটি কথা সত্য। কোন শাস্তির ভয়েই আমি সত্য থেকে বিচ্যুত হব না।” বিচারের রায় হল, জোয়ানকে পুড়িয়ে মারা হবে।

জোন অব আর্ক এর মৃত্যু: Joan of Arc’s Death

১৪৩১ খ্রিঃ ৩০ শে মে, সকালবেলা সৈন্য ছাউনিতে ১৯ বছরের তরুণী জোয়ানকে ইংরাজরা বিশ্বাসঘাতক ফরাসী ও যাজকসম্প্রদায়ের সহযোগিতায় নির্মম ভাবে আগুনে দগ্ধ কবে হত্যা করল। কিন্তু সত্য চিরজয়ী। তার মর্মান্তিক মৃত্যু সেদিন ফরাসী জাতির অস্তরে যে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তাই ইংরাজদের ফ্রান্সের মাটি ছেড়ে আসতে বাধ্য করেছিল জোয়ানের মৃত্যুর কয়েক বছরের মধ্যেই।

১৪৫৫ খ্রিঃ সপ্তম চার্লসের উদ্যোগে পোপ জোয়ানের বিচারের সমস্ত নথিপত্র খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে ঘোষণা করেন, অন্যায় এবং মিথ্যা অভিযোগ দাঁড় করিয়ে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে জোয়ানকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। আরও পরে ১৯১১ খ্রিঃ পোপ ঘোষণা করেন জোয়ান ছিলেন দেশপ্রেমিক বীরাঙ্গনা এবং একজন খ্রিস্টান সাধিকা। তিনি প্রত্যক্ষভাবেই ঈশ্বরের অনুগ্রহ ও প্রত্যাদেশ লাভ করেছিলেন।

Leave a Comment