কার্ল মার্ক্স জীবনী | Karl Marx Biography in Bengali

কার্ল মার্ক্স জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Karl Marx Biography in Bengali. আপনারা যারা কার্ল মার্ক্স সম্পর্কে জানতে আগ্রহী কার্ল মার্ক্স এর জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

কার্ল মার্ক্স কে ছিলেন? Who is Karl Marx?

কার্ল হাইনরিশ মার্ক্স (জার্মান: Karl Heinrich Marx) (৫ই মে, ১৮১৮ – ১৪ই মার্চ, ১৮৮৩) একজন জার্মান দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, ইতিহাসবেত্তা, সমাজ বিজ্ঞানী, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী। সমগ্র মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন মার্ক্স। মার্ক্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলোর মাঝে রয়েছে তিন খণ্ডে রচিত পুঁজি এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের সাথে যৌথভাবে রচিত কমিউনিস্ট ইশতেহার (১৮৪৮)।

কার্ল মার্ক্স জীবনী – Karl Marx Biography in Bengali

নামকার্ল মার্ক্স
জন্ম5 মে 1818
পিতাহাইনরিশ মার্ক্স
মাতাHenriette née Pressburg
জন্মস্থানট্রিয়ের, প্রুশিয়া, জার্মান কনফেডারেশন
জাতীয়তাপ্রুশিয়ান (1818-1845)
রাষ্ট্রহীন (1845 সালের পর)
পেশাজার্মান দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, সাংবাদিক এবং বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক
মৃত্যু14 মার্চ 1883 (বয়স 64)

কার্ল মার্ক্স এর জন্ম: Karl Marx’s Birthday

কার্ল মার্ক্স 5 মে 1818 জন্মগ্রহণ করেন।

কার্ল মার্ক্স এর পিতামাতা ও জন্মস্থান: Karl Marx’s Parents And Birth Place

১৮১৮ খ্রিঃ ৫ ই মে, জার্মানির রাইসল্যান্ডের ট্রিয়েরে এক ইহুদী পরিবারে কার্ল মার্কসের জন্ম। তার বাবা ছিলেন একজন আইনজীবী। ফলে ছেলেবেলায় বাড়িতে পড়াশুনার উপযুক্ত পরিবেশই পেয়েছিলেন মার্কস। পরিবারটি ইহুদী হলেও পরে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল। এ বিষয়ে বালক মার্কসের কোনই তাপউত্তাপ ছিল না।

কার্ল মার্ক্স এর শিক্ষাজীবন: Karl Marx’s Educational Life

একেবারে বাল্য অবস্থা থেকেই তাঁর মধ্যে ফুটে ওঠে স্বাধীনচেতা, উদ্দাম ও বিদ্রোহী মানুষের মনোভাব। নিজের কাছে যা ভাল মনে হতো তার বাইরে তাকে দিয়ে কিছুই করানো বা মানানো যেত না। এই স্বভাবজাত গুণাবলীর গুণেই তিনি উত্তরকালে বিশ্বের অন্যতম স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব রূপে গণ্য হয়েছিলেন। তাঁর চিন্তা ও ব্যক্তিত্ব বিশ্বের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তনের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে চিহ্নিত হয়েছিল।

স্কুলের পড়া শেষ করে আইন পড়ার জন্য মার্কস ১৭ বছর বয়সে বন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, পরের বছরে চলে যান বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বয়স মাত্র আঠারো, এই সময়েই মার্কসের সম্পর্ক গড়ে ওঠে ব্যারন ভন ওয়েস্ট ফ্যালেন – এর মেয়ে জেনিস – এর সঙ্গে। হৃদ্যতা জমে উঠতেও বিলম্ব হয় না।

তখনো পড়াশুনোর পাট চোকেনি, উপার্জনের পথ তো দূর অস্ত, তার ওপরে সাধারণ এক মধ্যবিত্ত ঘরের সম্ভান, তবু এমনই মনোবল আর আত্মপ্রত্যয় যে মার্কস ব্যারন ভনকে চিঠি লিখে নির্দ্বিধায় জানালেন, তিনি তাঁর মেয়ে জেনিকে ভালবাসেন, বিয়ে করতে চান। মার্কসের ধৃষ্টতায় ব্যারন ভন ক্রুদ্ধ হলেও জেনির ভালবাসায় ছিল পবিত্রতা, আর মার্কসের প্রতি অনাবিল শ্রদ্ধা। তারই বলে এক সময় তিনি তাঁর বাবাকে তাঁদের বিয়েতে সম্মতি দিতে রাজি করান।

উত্তরকালের রাজনৈতিক জগতে যিনি বজ্রনির্ঘোষে নিজের আবির্ভাব ঘোষণা করে পৃথিবীকে চমকে দিয়েছিলেন, এটা আশ্চর্য নয় যে তারও জীবনে থাকতে পারে হৃদয়ানুভূতি ও আবেগের একটা স্বাভাবিক পর্যায়। নিজেকে প্রকাশ করবার তাগিদে মার্কস তার প্রণয় – পর্বে জনিকে একের পর এক কবিতা লিখে পাঠাতেন।

কার্ল মার্ক্স এর কর্ম জীবন: Karl Marx’s Work Life

১৮৪১ খ্রিঃ বার্লিনের অ্যাথেনিয়াম কাগজে প্রকাশিত দুটি কবিতাই মার্কসের প্রথম মুদ্রিত লেখা। কবি হিসেবেই প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছিলেন রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষেত্রের ধুরন্ধর তাত্ত্বিক কার্ল মার্কস। মার্কস ডক্টরেট করেছিলেন জেনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সেই সময়ে বার্লিনে নব্য হেগেলপন্থীরা প্রচলি কিছু ধ্যান – ধারণা এবং বাইবেলের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছিল। মার্কসের সম্পর্ক তাদের সঙ্গে এবং ব্রুনো বয়ার সঙ্গে ক্রমে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল।

তিনি এই সময়ে যে ধর্মবিরোধী আন্দোলনের সংস্পর্শে এলেন, সেই ধর্মবিরোধিতাই মূল ভিত্তি রূপে কাজ করেছিল উত্তরকালে তার প্রবর্তিত রাজনৈতিক দর্শনের মূলে। বন থেকে মার্কস চলে আসেন প্যারিসে। এখানে জেনির সঙ্গে তার বিয়ের কাজ চুকল। জেনি পুরোপুরি ভাবেই হয়ে উঠলেন মার্কসের জীবনসঙ্গিনী — জীবন, চিন্তা ও কর্ম সকল ক্ষেত্রেই। প্যারিসের ডোর ওরার্টস কাগজে প্রুশিয়া সরকারের বিরুদ্ধে মার্কস তীব্র আক্রমণাত্মক লেখা লিখতে শুরু করলেন। ফলে প্রুশিয়া সরকারের অনুরোধে ফরাসি সরকারকে মার্কসকে দেশ থেকে বহিষ্কারের আদেশ ঘোষণা করতে হল।

ফ্রান্স ছাড়বার আগেই মার্কসের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটল। ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। এঙ্গেলস ছিলেন এক জার্মান বস্ত্র ব্যবসায়ীর সন্তান। বয়সে মার্কসের চাইতে বছর দুয়েকের ছোট। মার্কসের মত তিনিও ছিলেন মনেপ্রাণে বিপ্লবী চিন্তাধারার অধিকারী। তিনি যখন ম্যাঞ্চেস্টারে তার বাবার ব্যবসার সূত্রে ছিলেন তখনই শ্রমিক আন্দোলনের নেতা রবার্ট ওয়েন প্রমুখের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।

এঙ্গেলসের সঙ্গে মার্কসের প্রথম আলাপ হয়েছিল বনেই। তখন রাইনস্কি জুটা নামে হেগেলপন্থীদের বিপ্লবী চিন্তা ধারা নিয়ে একটি পত্রিকায় তিনি তার আক্রমণাত্মক লেখা লিখতে শুরু করেছেন। সেই পরিচয় ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বে পরিণত হয় প্যারিসে ১৮৪৪ খ্রিঃ। এই ঘনিষ্ঠতার প্রভাব মার্কসের জীবনে ছিল অপরিমেয়। দার্শনিক ব্রুনো বয়ার সম্পর্কে মার্কস এবং এঙ্গেলস দুজনেরই মতামত ছিল এই রকম, তার মতবাদ নিতান্তই কেতাবী। বয়ার একজন শখের বিপ্লবী ছাড়া কিছু নয় ৷

১৮৪৪ খ্রিঃ তারা যুগ্মভাবে বয়ারের বিরুদ্ধে একটি প্রচারপত্র তৈরি করে দিয়েছিলেন। জীবনের পদযাত্রায় একসঙ্গে পা ফেলবার সেই হল শুরু, আমৃত্যু এই সম্পর্ক দুজনের মধ্যে অটুট ছিল। এঙ্গেলস হয়ে উঠেছিলেন মার্কসের বন্ধু, শিষ্য, সহযোগী, তার লেখার অনুবাদক এবং তার দর্শনের প্রচারক। এখানেই শেষ নয়, এঙ্গেলসের চেষ্টাতেই মার্কসের অর্থাগমের স্থায়ি ব্যবস্থা হয়েছিল। ১৯৪৫ খ্রিঃ এঙ্গেলস মার্কসকে ইংলন্ড নিয়ে আসেন।

এখানে তখন সদ্য গড়ে উঠেছে জার্মান ওয়ার্কার্স এডুকেশনাল ইউনিয়ন। এঙ্গেলস কর্মকর্তাদের সঙ্গে মার্কসের পরিচয় করিয়ে দেন। এখান থেকে ব্রাসেলসে ফিরে গিয়ে মার্কস গড়ে তোলেন জার্মান ওয়াকিং মেনস অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি সংস্থা। এই সংস্থার প্রধান কাজ হল কমিউনিজমের নীতি শিক্ষন ও প্রচার। মার্কস এই কাজে নেমে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা কমিউনিস্টদের একত্রিত করবার উদ্দেশ্যে একটি কমিটি গঠন করলেন। তার নাম দিলেন কমিউনিস্ট করেসপন্ডেন্স কমিটি। সেই সময়ে এঙ্গেলসের চেষ্টায় প্যারিসেও একই ধরনের একটি কেন্দ্র গড়ে উঠল।

তারপর ১৮৪৭ খ্রিঃ ব্রাসেলস, প্যারিস এবং লন্ডন কেন্দ্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে লন্ডনে হল প্রথম কংগ্রেস। এখানেই প্রথম গড়ে উঠল আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট লিগ। পরে এই লিগের পক্ষ থেকেই মার্কস এবং এঙ্গেলস প্রকাশ করেন বিখ্যাত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো যাকে বলা হয় মার্কসবাদের প্রথম অধ্যায়। এই ইস্তাহারের মূল ভিত্তি ছিল ইতিহাসের বাস্তববাদী চিন্তাধারা। মার্কসের এই উন্নত চিন্তাধারায় হেগেলের প্রভাব ছিল স্পষ্ট।

তাকে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে তিনি বললেন, অর্থনীতি হচ্ছে উৎপাদনের প্রক্রিয়ার সামাজিক ফসল। আর এই উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের সামাজিক প্রতিবিম্বই হচ্ছে শ্রেণী সংগ্রাম। বিত্তহীন শ্রমিক শ্রেণীর বিক্রি করবার মত আছে কেবল তাদের শ্রম, আর এই শ্রম ক্রয় করেই ঘটে ধনীক শ্রেণীর ক্রমোন্নতি। অথচ সংখ্যাগত দিক থেকে শ্রমিকশ্রেণীর তুলনায় ধনীকশ্রেণী হল সংখ্যালঘু। কিন্তু অর্থনৈতিক বলে বলীয়ান বলে তারা বিত্তহীন সংখ্যাগুরু শ্রেণীকে ক্রমাগত শোষণ করে যায়।

তবে এই শোষণের সূত্র ধরেই শ্রমিকশ্রেণী লাভ করে এমন একটি জীবন ও জীবনবিধি যার প্রভাবে তাদের মধ্যে জন্ম নেয় অভিন্ন লক্ষ। শেষ পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণী আর ধনীক সম্প্রদায়ের শর্ত মেনে চলতে সম্মত হবে না। এই ভাবেই পতন ঘটবে ধনীক শ্রেণীর এবং গড়ে উঠবে নতুন রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রই মেটাবে পরিবর্তিত উৎপাদন শক্তির প্রয়োজনকে। এই যে সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণী, কমিউনিস্টরা হল এদেরই শ্রেণীসচেতন অংশ। এই অংশ ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রমিক শ্রেণীর পৃথক স্বার্থ সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন, তাদের কাজের ব্যাপ্তি আন্তর্জাতিক স্তর পর্যন্ত।

এই প্রাথমিক বিবৃতির পরেই কমিউনিস্ট ইস্তাহারের কিছু সংস্কার মূলক দাবির শেষে বলা হল, কমিউনিস্টরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করছে, কেবলমাত্র রক্তাক্ত বিপ্লবের মধ্য দিয়েই প্রচলিত সমস্ত সামাজিক বিধির পতন ঘটানো সম্ভব হবে। সর্বহারাদের হারাবার মত যা আছে তা হল শৃঙ্খল, আর তাদের সামনে জয় করবার মত পড়ে আছে সমগ্র পৃথিবী। কমিউনিস্ট বিপ্লবের সামনে শাসক শ্রেণী কম্পিত হোক — বিশ্বের সর্বহারারা এক হও।

এই ইস্তাহার প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই মার্কসের বৈপ্লবিক চিন্তাধারা ইউরোপের চিন্তার জগতে কম্পন তুলল। বিপ্লবের সূত্রপাত হল ১৮৪৮ খ্রিঃ। মার্কসকে বেলজিয়াম থেকে বহিস্কার করা হল। ততদিনে তার স্বদেশভূমি জার্মানি ও প্যারিসে মার্কসবাদের দরজা খুলে গেছে। তিনি নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করলেন নিউ রাইনেসিক জুটা। কিন্তু বিপ্লব হল ক্ষণস্থায়ী। জার্মানি ও প্যারিস মার্কসের জন্য নিষিদ্ধভূমি হয়ে গেল ৷ এবারে মার্কসের স্থায়ি ঠিকানা হল লন্ডন। এখানে মার্কসের ছিল না আয়ের কোন উৎস।

ফলে পরিবারকে তীব্র দারিদ্র্যের মধ্য দিয়েই টেনে নিয়ে চলতে হল মার্কসকে — বছরের পর বছর। সংসারে ছিলেন প্রেমময়ী স্ত্রী, স্নেহময় সস্তান — দৈন্যের মধ্যেও এদের নিয়ে মার্কস তার ব্যর্থতাকে ভুলে থাকবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কতদিন সহ্য হয় দারিদ্র্যের নিষ্পেষণ। সোহোর ভিন স্ট্রিটের ছোট্ট দুটি ঘরে অকালেই মৃত্যুবরণ করল প্রিয় দুটি সন্তান। মার্কস নিজেও আক্রান্ত হলেন নানা রোগে। সন্তান হারা জননী দারিদ্র্যের জ্বালা, বেদনা সইতে না পেরে স্বামীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। কিন্তু স্থিরলক্ষ মার্কস রইলেন অবিচল।

সেই তীব্র প্রতিকূলতার বেষ্টনীর মধ্যে মার্কসের জীবনে একখন্ড মরূদ্যানের মত একমাত্র সান্ত্বনা ছিলেন এঙ্গেলস। এঙ্গেলস সেই সময় কাজ করছেন ম্যাঞ্চেস্টারে। সেখান থেকেই তিনি নিয়মিত অর্থ পাঠাতে থাকেন মার্কসকে। যখনই যা প্রয়োজন হত, মার্কস নির্দ্বিধায় একমাত্র এই বন্ধু ও ভক্তটির কাছেই চাইতে পারতেন। কখনো বিমুখ হতে হয়নি তাকে। কিন্তু মার্কসের জীবনের এ এক রহস্য যে, এঙ্গেলসের আন্তরিক বদান্যতাকে তিনি গ্রহণ করেছেন নিতান্তই ব্যবসায়িক আবেগে। নিজের সম্পর্কে গর্বও গরিমা তাঁকে মানবিক আবেগের বলয়ের বাইরেই নিক্ষেপ করেছিল। তবুও এঙ্গেলস চিরকালই ছিলেন মার্কসের অনুগত ও শ্রদ্ধাশীল শিষ্য।

১৮৫১ খ্রিঃ নিউইয়র্ক টাইম পত্রিকায় লেখার সুযোগ পেলেন মার্কস। এঙ্গেলস এগিয়ে এলেন তাঁর শিক্ষকের সহযোগিতায় ৷ তিনি মার্কসের হয়ে লেখা পাঠাতে লাগলেন, তাঁর লেখা জার্মান থেকে অনুবাদ করে চললেন। মার্কস তার নীতির প্রতি এতটাই অনুগত ছিলেন যে যাঁরা তা পুরোপুরি মানত না বা গ্রহণ করতে পারত না তিনি তেমন সহযাত্রীদের একেবারে বাতিল করে দিতেন।

এই সকল কারণে রাষ্ট্রনৈতিক ধননীতির ভাবনা ও সাংবাদিকতার বাইরে অবশিষ্ট সময় তার ব্যয় হত সহযাত্রীদের সঙ্গে বিতন্ডার মধ্য দিয়ে। আবেদন নিবেদনের স্বর কখনো ফুটত না তাঁর কন্ঠে। এমন ভাবে কথা বলতেন, যে মনে হত তিনি মানুষের ভাগ্যকে পাল্টে দেবার দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন, যা বলছেন সেটাই ধ্রুব সত্য। যাইহোক, সমস্ত ব্যস্ততার মধ্যেও মার্কস তাঁর ক্যাপিটাল ইন জেনারেলের গবেষণার কাজে কখনো অবহেলা দেখান নি।

১৮৫৯ খ্রিঃ তাঁর গবেষণার প্রথম পর্ব ‘এ ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকনমি ‘ প্রকাশিত হল। এরপর ১৮৬৭ খ্রিঃ থেকে ক্যাপিট্যাল – এর প্রকাশ আরম্ভ হল। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রথম খন্ড টিই তিনি দেখে যেতে পেরেছিলেন। ক্যাপিট্যালের দ্বিতীয় ও তৃতীয় খন্ড প্রকাশিত হয়েছিল এঙ্গেলসের সম্পাদনায়। মার্কসের মৃত্যুর পরে যথাক্রমে ১৮৮৫ এবং ১৮৯৪ খ্রিঃ। মার্কসের লেখার মধ্যেই সর্বহারা শ্রেণীর স্বার্থ, অধিকার, দায়িত্ব, শ্রেণীহীন সরকার ও ধননীতি ইত্যাদি বিষয়ে যে ব্যাখ্যা ও মতামত ব্যক্ত হয়েছে তাই মার্কসবাদ বা মার্কসিজম নামে অভিহিত।

এই মতবাদই অনুপ্রাণিত করেছে লেনিনকে, যিনি অভিহিত হন রুশ বিপ্লবের স্থপতি রূপে। মার্কসের মতে বিপ্লব অবধারিত। সর্বহারারা যেন তার জন্য নিজেদের প্রতিনিয়ত প্রস্তুত করে রাখার কথা ভেবে চলে। ক্যাপিট্যাল লেখার সময়েই ১৮৬৪ খ্রিঃ মার্কসের সক্রিয়তায় গড়ে উঠল ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং মেনস অ্যাসোসিয়েশান। তিনি হলেন এর সর্বেসর্বা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে অল্পকালের মধ্যেই বাকুনিন – এর সঙ্গে মতপার্থক্যগত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লেন।

কমিউনিস্ট লিগ গঠন করবার সময়ও একই ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী উইলিখ বাধা হয়ে উঠেছিলেন। মার্কস রাতারাতি সদর দপ্তরকে কোলোনে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে লিগকে আর বাঁচাতে পারেন নি তিনি। এবারেও একই কৌশল নিলেন মার্কস। তিনি ইন্টারন্যাশনালের জেনারেল কাউন্সিল নিউইয়র্কে স্থানান্তরিত করলেন। এবারেও এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বিলুপ্তি ঘটল প্রথম আন্তর্জাতিকের। ক্যাপিট্যাল – এর দ্বিতীয় খণ্ড রচনার কাজ চলেছে তখন। আর্থিক অনটন পূর্বের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। বাসও উঠিয়ে নিয়েছেন উত্তর লন্ডনে।

১৮৬৯ খ্রিঃ এঙ্গেলস তাঁর ব্যবসা থেকে অবসর নিয়েছেন। তিনি যথারীতি মার্কসের বার্ষিক সাড়ে তিনশ পাউন্ড বর করেছেন। কিন্তু এত সত্ত্বেও প্রকৃতির রোষ থেকে উদ্ধার পেলেন না মার্কস। দারিদ্র্যের দীর্ঘ পীড়ন শরীরকে নির্জীব করে এনেছিল। ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ এগিয়ে নিতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। মার্কস যে তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন তাতে শ্রমিক শ্রেণীর প্রাধান্য স্বীকৃত হয়েছে। শ্রমিকের শ্রমে যে পণ্য উৎপন্ন হয়, সেই শ্রমশক্তির মূল্য রূপে শ্রমিক তার সামান্য অংশই লাভ করে, মালিকেরা বিনা শ্রমে মুনাফা, সুদ ও খাজনারূপে বাকি অংশ উপভোগ করে।

তিনি আশা করেছিলেন যে শ্রমিক জাগরণের ফলে শোষক ধনীক শ্রেণীর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে এবং সমাজ বিকাশের শেষতম পর্যায়ে শ্রেণীহীন সমাজ ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটবে। ভারতে ব্রিটিশ শাসন ও শোষণ বিষয়েও মার্কস অবহিত ছিলেন। ব্রিটিশরা নিজেদের অজ্ঞাতেই যে ভারতে ধ্বংসাত্মক ভূমিকার সঙ্গে সঙ্গেই পুনঃসৃজনাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করেছিল, মার্কস তা লক্ষ করেছিলেন। মার্ক্সীয় মতবাদের ওপর ভিত্তি করেই পৃথিবীতে সর্ব প্রথম রাশিয়ায় সাম্যবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

পরবর্তীকালে পৃথিবীর আরও বহু দেশে মার্ক্সীয় দর্শনকে তত্ত্বরূপে গ্রহণ করে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করা হয়েছে। মার্কসের তত্ত্ব হল ইতিহাস দর্শন এবং বৈপ্লবিক পরিকল্পনার সংস্কারের তত্ত্ব। এই মতবাদের অন্তর্নিহিত ভিত্তি হল ডায়ালেকটিকাল বস্তুবাদ বা Dialectical materialism. ১৮৪৮ খ্রিঃ কমিউস্ট ম্যানিফেস্টোতে তিনি বলেছিলে— (১) ভূসম্পত্তির যথাযথ বিলি এবং ওই ভূসম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব থেকেই রাষ্ট্রের ব্যয় নির্বাহ (২) প্রগতিশীল ও উচ্চ পর্যায়ের আয়কর ব্যবস্থা পরবর্তন (৩) উত্তরাধিকার সংক্রান্ত অধিকারের বিলোপ সাধন। (৪) একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঋণদান ব্যবস্থার কেন্দ্রী করণ (৫) পরিবহন ব্যবস্থা জাতীয়করণ (৬) ভূমির নতুন বিলি ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কারখানার সংখ্যাবৃদ্ধি (৭) কর্মক্ষম প্রতিটি ব্যক্তির চাকরি (৮) রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে সকল শিশুকে শিক্ষাদান এবং শিল্পকারখানায় শিল্প শ্রমিকের শ্রমের অবলুপ্তি।

এই ম্যানিফেস্টোতে বলা হয়েছিল, কমিউনিস্টদের বিশ্বাস, সমসাময়িক যাবতীয় সামাজিক বিধিব্যবস্থার মূলোৎপাটন ঘটিয়ে এই লক্ষ পূরণ করা সম্ভব এবং মূলোৎপাটনের পদ্ধতিটি সশস্ত্র ও সহিংস হতে হবে। মার্কস এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী এঙ্গেলস ছিলেন এই ম্যানিফেস্টো সৃষ্টির মূল প্রবক্তা। মার্কসবাদী সমাজপন্থীরা মার্কসের ইতিহাস বিশ্লেষণকে স্বীকার করেন কিন্তু সশস্ত্র পন্থায় সরকার উচ্ছেদকরনে বিশ্বাসী নন।

কার্ল মার্ক্স এর মৃত্যু: Karl Marx’s Death

১৮৮৩ খ্রিঃ মার্কসের দেহান্তর ঘটে।

Leave a Comment