ভগিনী নিবেদিতা জীবনী – মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল – Sister Nivedita Biography in Bengali

ভগিনী নিবেদিতা জীবনী – মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল – Sister Nivedita Biography in Bengali:  Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Sister Nivedita Biography in Bengali. আপনারা যারা ভগিনী নিবেদিতা মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল (Margaret Elizabeth Noble) সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ভগিনী নিবেদিতা র জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

ভগিনী নিবেদিতা কে ছিলেন? Who is Sister Nivedita?

ভগিনী নিবেদিতা (মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল) (২৮ অক্টোবর, ১৮৬৭ – ১৩ অক্টোবর, ১৯১১) ছিলেন একজন অ্যাংলো-আইরিশ বংশোদ্ভুত সমাজকর্মী, লেখিকা, শিক্ষিকা এবং স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে লন্ডন শহরে তিনি স্বামী বিবেকানন্দের সাক্ষাৎ পান এবং ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতে চলে আসেন। একই বছর ২৫ মার্চ তিনি ব্রহ্মচর্য গ্রহণ করলে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর নামকরণ করেন “নিবেদিতা”।

ভগিনী নিবেদিতা জীবনী – মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল – Sister Nivedita Biography in Bengali

নামভগিনী নিবেদিতা (মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল) (Margaret Elizabeth Noble)
জন্ম28 অক্টোবর 1867
পিতাস্যামুয়েল রিচমন্ড নোবেল
মাতামেরি ইসাবেলা
জন্মস্থানটাইরন, আয়ারল্যান্ড
জাতীয়তাআইরিশ
পেশাসমাজ সংস্কারক, লেখক, শিক্ষক, সেবিকা
মৃত্যু13 অক্টোবর 1911 (বয়স 43)

ভগিনী নিবেদিতার জন্ম: Sister Nivedita’s Birthday

ভগিনী নিবেদিতা 28 অক্টোবর 1867 জন্মগ্রহণ করেন।

পাশ্চাত্যের মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল নামক এক বিদুষী তরুণীকেই নিবেদিতা নাম দিয়ে ভারতবাসী আপনার করে নিয়ে ভগ্নী সম্বোধন করেছেন। নিবেদিতা অনাগত ভবিষ্যতেও আপামর ভারতবাসীর হৃদয়ে শ্রদ্ধা – ভক্তি – ভালবাসার আসনে ভগ্নীরূপেই বিরাজিতা থাকবেন। কর্মই মানুষের প্রকৃষ্ট পরিচয়। কাজের মাধ্যমেই জীবন – সত্য হয় পরিস্ফুট। জীবন হয়ে ওঠে ইতিহাস।

যে মানুষের কর্ম ও জীবন প্রবাহের প্রভাব বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কর্মজগৎ ও জীবনকে পরিচালিত করে তিনিই মহান ব্যক্তিত্ব, মহাকালের খাতায় তাঁর জীবনই ঐতিহাসিক মহিমা লাভ করে। ভারতের মাটিতে পাশ্চাত্যের মার্গারেট নিবেদিতা নামে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব লাভ করেছেন। অসামান্য প্রতিভার অধিকারী মার্গারেট ভারতপথিক বিবেকানন্দের সংস্পর্শে এসে নিজের জীবনের মুক্তির পথ খুঁজে পেয়ে ভারতকেই নিজের দেশ, ভারতবাসীকেই আপন দেশবাসী রূপে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর অসামান্য জীবনের দ্যুতি ভারত ভূমির ইতিহাসকে গৌরবান্বিত করেছে।

ভগিনী নিবেদিতার পিতামাতা ও জন্মস্থান: Sister Nivedita’s Parents And Birth Place

উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডাঙ্গাসন নামক ছোট্ট শহরে ১৮৬৭ খ্রিঃ ২৮ শে অক্টোবর মার্গারেটের জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম স্যামুয়েল এবং মায়ের নাম মেরী হ্যামিলটন। মার্গারেট যখন বালিকা, সেই সময়ে মা – বাবা জীবিকার সন্ধানে চলে আসেন লন্ডনে ৷ ঠাকুমার কাছেই মানুষ হতে থাকেন তিনি। তৎকালে আয়ারল্যান্ড ছিল ইংলন্ডের শাসনাধীন। ইংলন্ডের শাসন ও শোষণ থেকে মুক্ত হবার জন্য আয়ারল্যান্ডে ঘটেছে গণজাগরণ; ফলে দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়া খুবই উত্তপ্ত।

এই আবহাওয়ার মধ্যে বেড়ে ওঠার সুযোগে মার্গারেটের মন প্রস্ফুটিত হয়েছিল বিপ্লবের স্বপ্নে। সেই স্বপ্ন লালিত হয়েছে ঠাকুমার আদর্শ ও প্রেরণায়। জীবন সম্পর্কে তার গভীর ভাবনার উন্মেষ হয়েছিল বাড়ির বৈপ্লবিক ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে।

ভগিনী নিবেদিতার শিক্ষাজীবন: Sister Nivedita’s Educational Life

মার্গারেটের বয়স যখন মাত্র তেরো, তিনি তখন হ্যালিফ্যাকস বিদ্যায়তনের ছাত্রী। এই সময় একদিন সাহিত্যের শিক্ষিকা কলিনকে একটি প্রশ্ন করে চমকে দিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, জীবনের শেষ কোথায় ? মৃত্যুই কি জীবনের পরিসমাপ্তি ? অতটুকুন মেয়ের মুখে গভীর জীবনবোধের এমন প্রশ্ন মোটেই স্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু প্রতিভা তো এমনি বিশেষ পথ ধরেই এগোয় — গতানুগতিকতার পথ তো তার নয়। ওই একটা প্রশ্নের মধ্য থেকেই সেদিন তার প্রতিভার পরিচয় লাভ করেন দূরদর্শিনী শিক্ষিকা। তার চিন্তাশক্তি দেখে তিনি বিস্মিত না হয়ে পারেন নি। কিন্তু মার্গারেটের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেন নি তিনি।

নিজেই হয়তো বিমূঢ় হয়েছিলেন নিজের চিন্তার দৈন্য দেখে। সেই শিক্ষিকাকে আর একদিন মার্গারেট জানালেন, ঈশ্বর যে আছেন তা বিশ্বাস করতে ভাল লাগে, আমি তাকে জানতে চাই, বুঝতে চাই। কি করে ঈশ্বরকে জানা যায় ? সাহিত্যের শিক্ষিকা কলিনস সেদিন আপ্লুত হয়েছিলেন প্রশ্ন শুনে। তিনি বললেন, তার সম্পর্কে জান, তাঁকে উপলব্ধি করবার চেষ্টা কর। তার মাধ্যমেই তোমার বিশ্বাস সুদৃঢ় হবে।

ঈশ্বর তো স্বচ্ছ স্বয়ংপ্রকাশ, অজানার অন্ধকার দূর হলেই তার প্রকাশ প্রত্যক্ষ হয়। তোমার মধ্যে তাঁর লীলা মূর্ত হয়ে উঠুক। সেদিনের শিক্ষিকার আন্তরিক অভিপ্রায় উত্তরকালে মার্গারেটের জীবনে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছিল। ঈশ্বরের অহৈতুকী প্রসাদ লাভে তিনি ধন্য হয়েছিলেন। এমনি গভীর জীবন – জিজ্ঞাসার মধ্য দিয়েই মার্গারেটের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটতে লাগল। আয়ারল্যান্ডের বিপ্লব চেতনাও একই সঙ্গে তাঁর মধ্যে ক্রিয়া করে চলল। দেশের আহ্বানে তিনি অবিচল থাকেন কি করে ? তীব্র ভাবে অনুভব করলেন তারও কিছু করবার আছে, দেশকে কিছু দেবার দায়িত্ব তারও রয়েছে।

ইংরাজের অন্যায় শাসন ও শোষণ থেকে দেশকে মুক্ত করতে না পারলে, আইরিশ জাতির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে। এই সব চিন্তার মধ্য দিয়েই বিপ্লবী মার্গারেটের সত্তা জেগে উঠল। তিনি আইরিশ হোমরুল আন্দোলনে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়লেন। ক্রমেই মার্গারেট উপলব্ধি করলেন জাতিকে জাগিয়ে তুলতে হলে, দেশে জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটাতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন শিক্ষা। শিক্ষাই তৈরি করে জাতির মেরুদন্ড।

ভগিনী নিবেদিতার কর্ম জীবন: Sister Nivedita’s Work Life

১৮৮৪ খ্রিঃ স্কুলের শেষ পরীক্ষা সমাপ্ত করে মার্গারেট শিক্ষকতার জীবনই বেছে নিলেন। চাকরি নিয়ে চলে এলেন কেসউইকে। কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও অন্তরের আধ্যাত্মিক অনুভব তার মধ্যে নিরন্তর আত্মজিজ্ঞাসার আলোড়ন তুলেই চলল। শান্তির সন্ধানে অন্তর থেকে থেকে আকুল হয়ে উঠতে লাগল। ফল হল অস্থিরতা। শিক্ষকতার কাজও মন দিয়ে করতে পারলেন না। ১৮৮৬ খ্রিঃ খনি শহর রেক্সাহামে এসে শিক্ষকতার কাজ নিলেন শহরের সেন্ট মার্কস চার্চে।

শিক্ষকতার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে নিয়োজিত করলেন সমাজ সেবার কাজে। এখানকার মানুষের জীবিকা শ্রম নির্ভর। শ্রমিক শ্রেণীর নিত্যসঙ্গী দারিদ্র্য। অভাব অনটনের মধ্যে মানুষগুলো যেন নিষ্পেশিত হচ্ছে। মার্গারেট নিজের উদ্যোগেই এই দুঃখী মানুষদের মধ্যে নিজের কাজ আরম্ভ করলেন। ব্রতমানবসেবার হলেও চার্চের নিয়মে তার আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন আছে। মার্গারেট নিজের প্রাণের তাগিদেই কাজ করছিলেন। ফলে বাধা এলো চার্চের পক্ষ থেকে। আশ্চর্য হলেও এই ঘটনার মধ্য দিয়েই এক চরম অভিজ্ঞতা লাভ করলেন মার্গারেট। বুঝতে পারলেন চার্চের জনসেবার ব্রত হল অন্তরের সম্পর্ক বর্জিত নেহাতই পোশাকি ৷

ধর্মকে বাদ দিয়ে এরা দল নিয়েই মত্ত। চার্চের সংশ্রব ভাল লাগল না মার্গারেটের। তিনি স্থির করলেন প্রতিষ্ঠানিকতার বাইরে থেকে তাকে কাজ করতে হবে। তার লক্ষ যশ প্রশংসা নয়। দেশ সেবাই তার উদ্দেশ্য। জনতার মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন মার্গারেট ; বিভিন্ন গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। দুর্গতের পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষুধার্তকে অন্ন জোগাবার ব্যবস্থা করলেন। সেই সঙ্গে শিক্ষার ব্যবস্থা। দেশবাসীর দুঃখমোচনের আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখতে লাগলেন প্রবন্ধ ৷

অল্পসময়ের মধ্যেই সাড়া জেগে উঠল। দেশবাসীর চেতনার তন্ত্রীতে নতুন সুরের মূর্চ্চনা অনুরণিত হতে লাগল। এই সময়েই মার্গারেটের সঙ্গে পরিচয় হলওয়েলসবাসী এক তরুণ ইঞ্জিনিয়ারের। নাম গেলোয়াক। তার সাহচর্যে নতুন প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে উঠলেন মার্গারেট। বৃহত্তর কর্মকান্ডে ঝাপিয়ে পড়ার সংকল্প নিলেন তিনি— সেই কাজে সঙ্গী করবেন গেলোয়াককে। এই তরুণ যুবককে ঘিরেও স্বপ্ন রচনার বিরাম নেই তাঁর অন্তরে।

এক অনাস্বাদিত আনন্দে ভরে উঠল মার্গারেটের অন্তর। কিন্তু বাদ সাধলেন বিধাতা। আকস্মিকভাবে মৃত্যু হল গেলোয়াকের। সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল। বেদনা সম্বরণ করে নীরবে চোখের জন মুছলেন মার্গারেট। শূন্য হৃদয়ে স্মৃতিটুকু সম্বল করে নতুন ভাবে জনসেবার কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। তারই মধ্যে ১৮৯৫ খ্রি: অ্যাংলিকান চার্চের Free thinker -এর দলের সঙ্গে যুক্ত হলেন। আত্মপ্রকাশের পথ ক্রমাগত খুঁজে চলেছিল মার্গারেটের প্রতিভা।

কিন্তু উপযুক্ত ক্ষেত্রের অভাবে বারবার প্রতিহত হচ্ছিল তাঁর উদ্যোগ। সমাজের গোঁড়ামি এবং সংকীর্ণতা কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলেন না। কিন্তু এখানেও দেখলেন মুক্তচিন্তার পরিবেশ প্রতিবন্ধকহীন নয়। অসহিষ্ণুতা আর গোঁড়ামি পদে পদে। সেবাধর্মের এমন অস্তঃসারশূন্যতা দেখে পীড়িত হলেন তিনি। আত্মপ্রচারের হীন স্বার্থ সেবাকে মর্মহীন ভন্ডামিতে পরিণত করেছে, এ কি করে মেনে নেন মার্গারেট। হৃদয়ের হাহাকার ও আর্তি নিয়ে পথ হাতড়ে চলেন তিনি। কোথায় পাবেন তিনি মুক্ত উদার বাধাবন্ধহীন পথ— যে পথ তাকে পৌঁছে দেবে পরম সত্যের দুয়ারে।

ইতিপূর্বে ১৮৯৩ খ্রিঃ শিকাগোতে বিশ্বধর্মমহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সারা ইউরোপ আলোড়িত হয়ে উঠেছে ভারতীয় হিন্দুসন্ন্যাসী বিবেকানন্দের জয়কারে। সংবাদপত্রের পাতা জুড়ে কেবল তাঁরই সংবাদ। স্বামী বিবেকানন্দ ইংলন্ডে এসেছেন, মার্গারেট এই সংবাদ পেলেন তাঁর বন্ধু কুক – এর কাছে। তিনি জানতে পারলেন, মার্গসনের বাড়িতে একজন হিন্দুসন্ন্যাসী আসছেন। সেই উপলক্ষে তাঁর কিছু বন্ধুদের সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। মার্গারেট ইচ্ছে করলে সেখানে যেতে পারেন। অন্তর জুড়ে আছে অতৃপ্তি আর মন জুড়ে অন্বেষণ। কোথাও স্থির হতে পারছিলেন না মাগারেট। সানন্দে তিনি সম্মত হলেন।

১৮৯৫ খ্রিঃ নভেম্বরের এক রোববারের সন্ধ্যায় মার্গসনের বৈঠকখানায় তেজোদৃপ্ত ভারতীয় সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দকে প্রথম দর্শন করলেন মার্গারেট। শহরের কিছু বিদগ্ধ ব্যক্তির সমাগম হয়েছে বিবেকানন্দের বাণী শুনবার জন্য। মার্গারেট তৃষিত চাতকের মত মুখোমুখি গিয়ে বসলেন বিবেকানন্দের। অলৌকিক দিব্য জ্যোতিতে উদ্ভাসিত স্বামীজির মুখমন্ডল। সেই দ্যুতিতে আলোকিত হয়ে উঠল পরিবেশ। মুগ্ধ বিস্ময়ে স্বামীজির কথা শুনতে লাগলেন মার্গারেট।

স্বামীজি বললেন, পূর্ব ও পশ্চিমের আদর্শ বিনিময়ের জন্যই তার পাশ্চাত্যে আসা। প্রাচ্যের বাণী সর্বকালের সর্বদেশের মর্মবাণী আর তা হল, সর্বং খগ্বিদং ব্রহ্ম — সবকিছুতেই সেই অনন্ত সত্যের প্রকাশ। অদ্বৈত সত্তাই দ্বৈত হয়ে সব হয়েছেন। সেই পরম সত্তাকে জানার জন্য চাই ত্যাগ। সেই ত্যাগের মাধ্যমেই মানুষ সর্বমুক্ত অবস্থায় সত্য থেকে সত্যে উত্তীর্ণ হতে পারে। কোন সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীতে জন্মানো ভাল, কিন্তু বেরিয়ে আসতে হবে সেই গন্ডির বাইরে। হতে হবে দ্বিধাহীন, যেখানে দ্বিধা সেখানেই দ্বৈত, দ্বিধাহীন তাই অদ্বৈত। সব আমির মধ্যেই আমার আমিকে উপলব্ধি করতে হবে। বন্ধনই মায়া।

বন্ধন ছাড়িয়ে এলেই আলোর জগৎ – আলোকে উত্তরণই আনন্দ। জ্ঞান, কর্ম, ভক্তি — এই তিনই হল সনাতন সাধনা। এভাবেই মানুষ পরম সত্যকে চিরকাল নিবিড় ভাবে জেনে এসেছে। সেদিনই মুগ্ধ বিমোহিত মার্গারেটের প্রতিভা আত্মমুক্তির সন্ধান পেল স্বামীজির কথায়। আকৃষ্ট হলেন ভারতীয় সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি। গ্রহণ করলেন স্বামীজির শিষ্যত। মানব জীবনের মহৎ আদর্শে উদ্বুদ্ধ নিবেদিতা আদর্শকে বাস্তবে রূপ দেবার সংকল্প নিয়ে চলে এলেন ভারতবর্ষে।

স্বামীজি তাঁর নতুন নামকরণ করলেন নিবেদিতা। দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুসংস্কার ও পরাধীনতায় জর্জরিত ভারতবর্ষের মুক্তির উপায় স্বামীজি দেখেছিলেন নারী জাতির জাগরণের মধ্যে। জাতির জাগতিক মুক্তির জন্যই নারী শিক্ষা ও নারী জাগরণের কথা প্রচার করেছিলেন তিনি। প্রয়োজন মহীয়সী নারী ৷ নিবেদিতার মধ্যে সেই মহীয়সী নারীকেই প্রত্যক্ষ করেছিলেন স্বামীজি।

১৮৯৮ খ্রিঃ ২৮ শে ফেব্রুয়ারীতে ভারতে এসে পৌঁছলেন নিবেদিতা। ইতিমধ্যে স্বামীজি সেবা ও ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করার সংকল্প নিয়েছেন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। স্বামীজির সান্নিধ্যে এসে নিবেদিতা লাভ করলেন তার আদর্শের কর্মক্ষেত্র। বিদেশিনী নিবেদিতাকে সেবার অধিকার দিতে হলে আগে তাঁকে প্রতিষ্ঠা করা দরকার দেশের মানুষের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের আসনে। জাতন্চিারের নিরর্থকতা বুঝিয়ে দিতে হবে সকলকে।

তাই মার্গারেটকে পরিচিত করিয়ে দেবার জন্য স্বামীজি ১৮৯৮ খ্রিঃ ১১ ই মার্চ স্টার থিয়েটারে এক সভা আহ্বান করলেন। স্বামীজি নিজেই সভাপতিত্ব করলেন এই সভায় ৷ করতালি মুখরিত সভায় অভিনন্দিত হলেন নিবেদিতা। অভিভূত হলেন তিনি। বললেন, পৃথিবীর মহত্তম আধ্যাত্মিক সম্পদ রয়েছে ভারতবর্ষের সঞ্চয়ে। যুগ যুগ ধরে ভারতবাসী এই সম্পদকে ধারণ ও বহন করে আসছে।

সেই মহান সম্পদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে তিনি ভারতবর্ষের সেবায় জীবন উৎসর্গ করার সঙ্কল্প নিয়ে ভারতবর্ষে এসেছেন ৷ সকলের সহানুভূতি ও সহায়তা তিনি কামনা করেন। সেদিন স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহে মুহুর্মুহু করতালির মধ্য দিয়ে নিবেদিতাকে বরণ করে নিলেন ভারতবাসী। মার্গারেট হলেন ভারতের প্রতি নিবেদিত প্রাণ সিস্টার নিবেদিতা। স্বামীজিই এই নামকরণ করলেন তাঁর। এরপর ভারতবর্ষকে আরো ঘনিষ্ঠভাবে চেনার পালা। আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্যে ঐশ্বর্যমণ্ডিত সনাতন ভারতবর্ষ।

দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুসংস্কারে আচ্ছন্ন পরাধীন ভারতবর্ষ। সশিষ্য স্বামীজি নিবেদিতাকে নিয়ে সমগ্র ভারতবর্ষ পরিভ্রমণ করলেন। নিবেদিতা মনে প্রাণে উপলব্ধি করলেন বহু বছরের আত্মবিস্মৃতি ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন জাতিকে জাগিয়ে তুলতে হবে শিক্ষার সোনার কাঠি স্পর্শে। তবেই জেগে উঠবে.জাতীয় চেতনা— স্বাজাত্যবোধ। ঘুচবে পরাধীনতার আগল। নিবেদিতা নামলেন কর্মক্ষেত্রে। বাগবাজারে বোসপাড়া লেনে প্রতিষ্ঠা করলেন বালিকা বিদ্যালয়।

নারীশিক্ষায় অনাগ্রহী সমাজ থেকে বাড়ি বাড়ি ঘুরে একটি একটি করে সংগ্রহ করতে লাগলেন ছাত্রী। কর্মক্ষেত্রের উপযুক্ত করে গড়ে তুলবার জন্য নিবেদিতার প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নিজের হাতেই তুলে নিয়েছিলেন স্বামীজি। ১৮৯৮ খ্রিঃ ডিসেম্বর মাস থেকে সপ্তাহে একদিন বেলুড় মঠ থেকে বাগবাজারে তাঁকে আসতে হত। ইতিহাস, উদ্ভিদবিদ্যা, চিত্রবিদ্যা, শরীরতত্ত্ব ও সূচীশিল্পের শিক্ষা নিতে হত নিবেদিতাকে। ধীরে ধীরে নিবেদিতার কর্মক্ষেত্র প্রসারিত করলেন স্বামীজি।

মঠ বা মিশনের নির্দিষ্ট কর্মসূচীর বাইরে ব্রাহ্মসমাজের সভাতেও যোগ দিতে লাগলেন তিনি। সপ্তাহে একদিন সমাজে মহিলাদের সভায় বক্তৃতা দিতেন নিবেদিতা। এই সভায় অন্যান্য বিদুষী প্রতিভাবান মহিলাদের সঙ্গে উপস্থিত থাকতেন ব্রহ্মবান্ধব কেশব সেনের কন্যা, ঠাকুর পরিবারের ইন্দিরাদেবী, সরলাদেবী, বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রের বোন লাবণ্যপ্রভা প্রমুখ। নিজের দেশে ইংরাজের শাসন শোষণ ও অত্যাচারের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল নিবেদিতার। ইংরাজের বিরুদ্ধে বিপ্লব সংগঠিত করবার অভিজ্ঞতাও তার ছিল। ভাবতবর্ষে ইংরাজের বিদ্বেষমূলক শাসনব্যবস্থায় থেকে একই সুরে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে লাগল নিবেদিতার মন।

তিনি স্থির করলেন, এখানেও ইংরাজ শক্তির বিরুদ্ধে বিপ্লব সংগঠিত করার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে ঝাপিয়ে পড়বেন কাজে। তখনো ভারতবর্ষে স্বাধীনতার জাগরণ সেভাবে প্রকাশ পায়নি বলে প্রতীক্ষায় থাকতে হল তাঁকে। ইতিমধ্যে ১৮৯৯ খ্রিঃ কলকাতায় দেখা দিল মারাত্মক প্লেগ রোগের মহামারী। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাতে লাগল। পথেঘাটে মৃতদেহ পড়ে থাকলেও রোগ সংক্রমণের ভয়ে কেউ এগিয়ে আসে না সৎকারের কাজে।

উপযুক্ত চিকিৎসা, শুশ্রুষা ও পথ্যের অভাবে উজাড় হয়ে যেতে লাগল দরিদ্র বস্তি। মঠের সন্ন্যাসীদের পুরোভাগে থেকে নিবেদিতা আর্তের সেবায় অক্লান্ত পরিশ্রম করতে লাগলেন। পিছিয়ে থাকল না দেশবাসী — স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এগিয়ে এলো তার সাহায্যে ! নিবেদিতার করুণামাখা হাতের স্পর্শে দূর হল একদিন প্লেগের আতঙ্ক। নিবেদিতার আসন প্রতিষ্ঠিত হল ভারতবাসীর অন্তরের অন্তস্থলে। অসংবৃতা করালী, রুধিরপিপাসায় লেলিহান জিহ্বা যে কালীমুর্তি — এই মূর্তির সাধনার মধ্যেই যে রয়েছ বৈপ্লবিক চেতনা, ক্রমে তা অনুভব করলেন নিবেদিতা।

ভগিনী নিবেদিতার রচনা: Written by Sister Nivedita

ভারতীয় আধ্যাত্মিক সাধনায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি একে একে রচনা করলেন, Kali the Mother, The story of Kali, The Vision of Siva, The Voice of Mother প্রভৃতি গ্রন্থ। ১৯০০ খ্রিঃ নিবেদিতা আমেরিকায় পরিভ্রমণে এলেন। ভোগবাদী পাশ্চাত্যে ভারতের ত্যাগের আদর্শ প্রচার করলেন তিনি। প্রকৃত শান্তির পথ যে নিষ্কাম কর্মের পথ একথা ঘোষণা করলেন। ভারতে ফিরে এসে ব্যাপক কর্মক্ষেত্রে নিজেকে উপস্থাপন করলেন নিবেদিতা।

তাঁর প্রতিভার গুণে সমাজের অগ্রগণ্য প্রতিভাধরদের মধ্যে নিজের স্থানটি নির্দিষ্ট করে নিলেন তিনি। আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠল রবীন্দ্রনাথ, কেশব সেন, গিরিশ ঘোষ, জগদীশচন্দ্র প্রমুখ মনীষীর সঙ্গে। ঘনিষ্ঠ সংযোগ স্থাপিত হল বিপ্লবী মহানায়ক অরবিন্দর সঙ্গে। যুক্ত হয়ে পড়লেন বহুবিচিত্র কর্মপ্রবাহের সঙ্গে।

ভগিনী নিবেদিতার মৃত্যু: Sister Nivedita’s Death

এদিকে অবিশ্রান্ত কাজের চাপে অসুস্থ হয়ে পড়লেন বিবেকানন্দ। ১৯০২ খ্রিঃ ৪ ঠা জুলাই মহাসমাধি লাভ করলেন তিনি। একটা দুরন্ত ঝড়ে ভারত তথা সমগ্র বিশ্বে নতুন প্রাণের স্পন্দন জাগিয়ে যেন চলে গেলেন মহাত্যাগী বীর সন্ন্যাসী। নিবেদিতার মন্ত্রগুরু, আদর্শ পুরুষ স্বামীজি। তাকে হারিয়ে মুহ্যমান হয়ে পড়লেন তিনি।

সমস্ত কাজের নির্দেশ উপদেশ এতদিন আসত যাঁর কাছ থেকে, তিনি অনুপস্থিত, এবারে তাঁর কর্তব্য ও কর্মপন্থা নির্দেশ করবেন কে ? উদ্দেশ্য ও আদর্শের প্রশ্নে ধীরে ধীরে মঠের সঙ্গেও সম্পর্ক শিথিল হয়ে এল। নিবেদিতার কর্মক্ষেত্র কেন্দ্রীভূত হল ভারতীয় রাজনীতিক্ষেত্রে। এবারে তাঁর সাধনা হল স্বামীজির স্বপ্নের ভারতকে পুনর্গঠন করা। অরবিন্দ তখন বরোদায় কর্মরত। নিবেদিতার Kali the Mother পড়ে তিনি ভারত বিপ্লবের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হলেন।

তার প্রেরণায় বাংলার মাটিতে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হল গুপ্তসমিতি। মুক্তিকামী যুবকদের সংগঠিত করে ভারতের স্বাধীনতার লক্ষে দেশব্যাপী গড়ে তুললেন বিপ্লবী আন্দোলন। প্রত্যক্ষে এবং পরোক্ষে নিবেদিতা জড়িয়ে রইলেন এই আন্দোলনের সঙ্গে। বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলনে তিনি বিপ্লবীদের শোনালেন মাভৈঃ মন্ত্ৰ ৷ অরবিন্দের সম্পাদনায় প্রকাশিত হল বন্দেমাতরম পত্রিকা। নিবেদিতা জোগালেন শক্তি ও প্রেরণা। ঘোষণা করলেন ইংবাজদের বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে সক্রিয় প্রতিরোধ।

জেগে উঠল বিপ্লবী বাংলা, ঘুম ভাঙ্গল ভারতবর্ষের। নিবেদিতার সমস্ত কর্মপ্রচেষ্টার মূলেই নিহিত ছিল গুরুর আদর্শকে বাস্তবায়িত করার সঙ্কল্প। তাই তিনি ছিলেন ক্লান্তিহীন। দীর্ঘ চার বছরের পরিশ্রমে নিবেদিতা সম্পূর্ণ করলেন তার স্মৃতিকথা। প্রকাশিত হল সেই অসামান্য গ্রন্থ The Master as I saw him ইতিমধ্যে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে স্বাধীনতাকামী ভারত। ইংরাজ শাসনকে উচ্ছেদের লক্ষে অকাতরে প্রাণবলি দিতে লাগলেন বিপ্লবী তরুণের দল। কেঁপে উঠল ব্রিটিশের সিংহাসন। ইংরাজের দমন – পীড়ন যত বাড়তে লাগল, পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলল বিপ্লবীদের আক্রমণ ও আত্মদানের পালা।

১৯০২ খ্রিঃ থেকে ১৯১১ খ্রিঃ ভারতের ইতিহাসের এক রক্তলিপ্ত অধ্যায় ৷ এই দীর্ঘ সময়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে শরীর ভেঙ্গে পড়ল নিবেদিতার। স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য ১৯১১ খ্রিঃ জগদীশচন্দ্র বসুর পরিবারের সঙ্গে নিবেদিতা এলেন দার্জিলিঙে। কিছুদিন ভালই কাটল। কিন্তু একদিন অসুস্থতা বৃদ্ধি পেল। প্রখ্যাত চিকিৎসক ডাঃ নীলরতন সরকারের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে ১৯১১ খ্রিঃ ১৩ ই অক্টোবর সকাল ৭ টায় সাধনোচিত ধামে মহাপ্রয়াণ করলেন নিবেদিতা।

ভারতের সেবায় নিবেদিত প্রাণ মার্গারেটের নাম বিবেকানন্দ দিয়েছিলেন নিবেদিতা। রবীন্দ্রনাথ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন লোকমাতা বলে। জগদীশচন্দ্র নাম দিয়েছিলেন শিখাময়ী। কিন্তু ভারতবাসীর প্রাণে বিবেকানন্দের নিবেদিতা — সিস্টার নিবেদিতা হয়েই বিরাজ করবেন চিরকাল।

Leave a Comment