জনসংখ্যার বিবর্তন বা পরিবর্তন তত্ত্বটি আলোচনা করো।

জনসংখ্যার বিবর্তন বা পরিবর্তন তত্ত্বটি আলোচনা করো: জনসংখ্যার বিবর্তন বা পরিবর্তন বলতে সাধারণত কোন দেশের জনসংখ্যা পরিবর্তনের ক্রমপর্যায়কে বোঝায়, যা ওই দেশের মানুষের জন্ম, মৃত্যু ও পরিব্রাজনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় এবং ওই দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা প্রতিফলনে সক্ষম হয়।

জনসংখ্যার বিবর্তন তত্ত্বের মূল কথা: জনসংখ্যার বিবর্তন তত্ত্বের মূল কথা হলো কোন দেশের জনসংখ্যার ধারাবাহিক পরিবর্তন, যা মূলত ওই দেশের জন্মহার ও মৃত্যুহার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই পরিবর্তন কোন দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা মানব উন্নয়ন অবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কযুক্ত। কোন দেশের জন্মহার, মৃত্যুহার, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সমাজ ও অর্থনীতির মধ্যে পাঁচ ধরনের সম্পর্ক রয়েছে। সেগুলি হল-

১)উচ্চ জন্মহার- উচ্চ মৃত্যুহার=জনসংখ্যার স্বল্প বৃদ্ধি⇋কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি⇋দুর্বল সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা।

২)উচ্চ জন্মহার- নিম্ন মৃত্যুহার=জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি⇋শিল্প উন্নয়নের সূচনা⇋সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের শুরু।

৩)নিম্ন জন্মহার- নিম্ন মৃত্যুহার=জনসংখ্যার বৃদ্ধি হ্রাস⇋আধুনিক কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যভিত্তিক অর্থনীতি⇋সরল আর্থসামাজিক অবস্থা।

৪) নিম্ন জন্মহার: অতি নিম্ন মৃত্যুহার=জনসংখ্যার শূন্য বৃদ্ধি বা স্থিতিশীল জনসংখ্যা⇋অতি উন্নত আর্থসামাজিক অবস্থা

৫)নিম্ন জন্মহার: নিম্ন জন্মহার অপেক্ষা কম মৃত্যুহার=জনসংখ্যা ঋণাত্মক বৃদ্ধি⇋প্রয়োজনের তুলনায় জনসংখ্যা হ্রাস⇋সবল অর্থনীতি দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা।

জনসংখ্যা বিবর্তনের পর্যায়: ওয়ার্নার থম্পসন, বিজু গার্নিয়ার, হ্যাগেট প্রমুখ ভূগোলবিদগণ জনসংখ্যার হ্রাস বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে যে পারস্পরিক সম্পর্ক লক্ষ্য করেছেন তার ওপর ভিত্তি করে জনসংখ্যার বিবর্তন বা পরিবর্তনকে চারটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। জনসংখ্যা বিবর্তনের সেই চারটি পর্যায় হল-

A)প্রথম পর্ব বা প্রাক শিল্প পর্যায়: জনসংখ্যা বিবর্তনের প্রথম পর্ব বলতে শিল্প বিপ্লবের পূর্বেকার সময়কে বোঝানো হয়। এই পর্যায়ের বৈশিষ্ট্যগুলি হল-

১)এই পর্যায়ে জন্মহার ও মৃত্যুহার উভয়ই খুব বেশি। তবে জন্মহার মৃত্যুহার অপেক্ষা বেশি হওয়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ঊর্ধ্বগামী।

২)এই পর্যায়ে জনসংখ্যার পরিমাণ খুব কম এবং মানুষের গড় আয়ুও খুব কম‌, বয়ঃপ্রাপ্তি ও কর্মক্ষম হয়ে ওঠার আগেই অনেকের মৃত্যু ঘটে।

৩)চিকিৎসা বিদ্যার উন্নতি না হওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী, দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধের কারণে এই পর্যায়ে মৃত্যুহার সব সময় বেশি।

৪)এই পর্যায়ে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা বিকাশ লাভ করে এবং আর্থসামাজিক পরিকাঠামো অত্যন্ত দুর্বল হয়।

৫)এই পর্যায়ে অপুষ্টিজনিত রোগ ও দারিদ্র্য মানুষের নিত্য সঙ্গী, অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার মন্থর এবং মানুষের জীবন যাত্রার মান অনুন্নত হয়।

উদাহরণ-বর্তমানে এই পর্যায়ের দেশ পৃথিবীতে প্রায় নেই বললেই চলে। তবে আফ্রিকা মহাদেশের কয়েকটি দেশে তথা জাম্বিয়া, গ্যাবন, সোয়াজিল্যান্ড, চাদ প্রভৃতি দেশে আংশিক হলেও এই পর্যায়ের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

B)দ্বিতীয় পর্ব বা নবীন পাশ্চাত্য পর্যায়: শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে দ্বিতীয় পর্ব বা নবীন পাশ্চাত্য পর্যায়ের সূচনা হয়। এই পর্যায়ের বৈশিষ্ট্যগুলি হল-

১)অধিকাংশ ক্ষেত্রে জন্মহার অনিয়ন্ত্রিত থাকায় এই পর্যায়ে জন্মহার খুব বেশি।

২)আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি ও চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এই পর্যায়ে মৃত্যুহার অনেক কম।

৩)এই পর্যায়ে জন্মহার মৃত্যুহার অপেক্ষা বেশি হওয়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ঊর্ধ্বমুখী।

৪)মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রিত এবং জন্মহার অনিয়ন্ত্রিত হওয়ার ফলে এই পর্যায়ে জনবিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

৫)এই পর্যায়ে মিশ্র প্রকৃতির অর্থনীতি পরিলক্ষিত হয়। তবে সমাজ ও অর্থনীতির মূল ভিত্তি হল কৃষি ব্যবস্থা।

৬)এই পর্যায়ে দেশীয় বা আঞ্চলিক আর্থসামাজিক পরিকাঠামো ধীরে ধীরে মজবুত হয় এবং মানুষের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

৭)এই পর্যায়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটে বলে জীবনযাত্রার মান মধ্যম শ্রেণীর হয়।

উদাহরণ-এশিয়া মহাদেশের অন্তর্গত ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং ইউরোপ মহাদেশের অন্তর্গত রোমানিয়া গ্রীস ইত্যাদি হল নবীন পাশ্চাত্য পর্যায়ের দেশ। তবে নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে ভারত বর্তমানে তৃতীয় পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।

C)তৃতীয় পর্ব বা আধুনিক পাশ্চাত্য পর্যায়: শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময়কে তৃতীয় পর্ব বা আধুনিক পাশ্চাত্য পর্যায়ে বলে। এই পর্যায়ের বৈশিষ্ট্যগুলি হল-

১)এই পর্যায়ে শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং শিল্পের উপর ভিত্তি করে অনেক নতুন নতুন শহর ও নগর গড়ে ওঠে।

২)এই পর্যায়ে জন্মহার অনেকটা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং তা ধীরে ধীরে কমে আসে।

৩)এই পর্যায়ে চিকিৎসা বিদ্যার উন্নতি ও তা প্রয়োগের ফলে মৃত্যুহার অনেক কম হয়।।

৪)এই পর্যায়ে উন্নত আর্থসামাজিক পরিকাঠামো গড়ে ওঠে।

৫)শ্রম শক্তি ও সম্পদের পূর্ণ সদ্ব্যবহারের ফলে এই পর্যায়ে মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নত হয়।

উদাহরণ-আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, জাপান, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশ এই পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।

D)চতুর্থ পর্ব বা পরিণত পর্যায়: জনসংখ্যা বিবর্তনের সর্বশেষ পর্যায় হল চতুর্থ পর্ব বা পরিণত পর্যায়।এই পর্যায়ে জন্মহার মৃত্যুহার অপেক্ষা কম হওয়ায় এবং শিল্পায়ন ও নগরায়ণ দ্রুত হওয়ায় দেশের সর্বাধিক উন্নতি ঘটে। এই পর্যায়ের বৈশিষ্ট্যগুলি হল-

১)জন্মহার সুনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এই পর্যায়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার খুব কম। কখনো কখনো জন্মহার মৃত্যুহারের থেকেও কম।

২)এই পর্যায়ে জন্মহার ও মৃত্যুহার প্রায় সমান সমান হওয়ায় জনসংখ্যা বাড়ে না, স্থিতিশীল থাকে।

৩)এই পর্যায় উন্নত অর্থনীতি ও সচেতন সমাজ ব্যবস্থার পরিচয় বহন করে।

৪)এই পর্যায়ে মানুষের জীবনযাত্রার মান খুব উন্নত হয়।

৫)ক্ষণস্থায়ী এই পর্যায়ে জন্ম নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

উদাহরণ-নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশ এই পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। এই দেশগুলির জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার খুব কম বা শূন্য।

Leave a Comment