উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস জীবনী – ডব্লিউ. জি. গ্রেস | William Gilbert Grace Biography in Bengali

উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে William Gilbert Grace Biography in Bengali. আপনারা যারা উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস (ডব্লিউ. জি. গ্রেস) সম্পর্কে জানতে আগ্রহী উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস এর জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস (ডব্লিউ. জি. গ্রেস) কে ছিলেন? Who is William Gilbert Grace?

উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস (18 জুলাই 1848 – 23 অক্টোবর 1915) ছিলেন একজন ইংরেজ অপেশাদার ক্রিকেটার যিনি খেলার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন এবং ব্যাপকভাবে এটির অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত হন। তিনি 1865 থেকে 1908 সাল পর্যন্ত রেকর্ড-সমান 44 মৌসুমের জন্য প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট খেলেছিলেন , যে সময়ে তিনি ইংল্যান্ড, গ্লুচেস্টারশায়ার , জেন্টলম্যান, মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি), ইউনাইটেড সাউথ অফ ইংল্যান্ড ইলেভেন (ইউএসইই) এবং অন্যান্য বেশ কয়েকটি দলের অধিনায়ক ছিলেন।

উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস জীবনী – ডব্লিউ. জি. গ্রেস – William Gilbert Grace Biography in Bengali

নামউইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস (ডব্লিউ. জি. গ্রেস)
জন্ম18 জুলাই 1848
পিতাহেনরি মিলস গ্রেস
মাতামার্থা গ্রেস
জন্মস্থানডাউনেন্ড, ব্রিস্টল, ইংল্যান্ড
জাতীয়তাইংরেজ
পেশাক্রিকেটার
মৃত্যু23 অক্টোবর 1915 (বছর বয়স 67)

উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস এর জন্ম: William Gilbert Grace’s Birthday

উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস 18 জুলাই 1848 জন্মগ্রহণ করেন।

উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস এর পিতামাতা ও জন্মস্থান: William Gilbert Grace’s Parents And Birth Place

ইংলন্ডের ক্রিকেট ইতিহাসের নবযুগের প্রবর্তক ও বিশ্বক্রিকেটের অবিস্মরণীয় প্রতিভা ডবলিউ জি গ্রেস ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি খেলার যা কিছু সৌন্দর্যও দর্শনীয় সকল কিছুর অধিকারী। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান রূপেই স্বীকৃত। এই দুরন্ত খেলোয়াড় দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে একের পর এক সেঞ্চুরী করে ক্রিকেটের ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সেই খেলোয়াড়কে কি বলা যায়, যিনি ৪৭ বছর বয়সে এক মাসের মধ্যে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দলগুলির বিরুদ্ধে হাজার রান করবার কৃতিত্ব লাভ করেন !

তাঁর অবিশ্বাস্য প্রতিভা ও অদম্য প্রাণশক্তির তুলনা কোথায় ? ইংলন্ডে যখন ক্রিকেট খেলা ছিল বিশেষ জনসাধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ সেই সময় তাঁর খেলার কলানৈপুণ্য লর্ডস মাঠ থেকে শুরু করে পল্লীর নিভৃত প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল। কেবল তাই নয়, যেই সময় ক্রিকেট খেলায় বোলারদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত, তাদের সেই একচ্ছত্র অধিকারকে উপেক্ষা করে ডব্লিউ জি গ্রেস নিজের খুশিমত অবাধে রান সংগ্রহ করে দর্শকদের স্তম্ভিত করে দিতেন।

প্রথম শ্রেণীর খেলায় ১২৬ টি সেঞ্চুরী ও মোট ৫৪,৮৯৬ রান সংগ্রহ এই অমর প্রতিভার কৃতিত্ব প্রমাণ করে। তবে কেবল শ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান বললেই গ্রেস – এর পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না। তার সাফল্য সমানভাবে স্মরণীয় বোলিং ও ফিল্ডিং – এও। ক্রিকেটের ক্রীড়া কৌশল ছিল তার নখদর্পণে। তিনি কোন খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে ঠিক সেই ধরনের বল করতেন যে ধরনের বলে তিনি খেলতে অপটু। আর এভাবেই গোটা জীবনে ২,৮৭৬ টি উইকেট লাভ করেছেন।

কৌতুকের হলেও একথা সত্য যে বহু ব্যাটসম্যানই তার নিখুঁত বল ধরা ও অব্যর্থ বল ছোঁড়ার কৌশলে ব্যাট করার সুযোগই করে উঠতে পারেন নি। গ্রেস ছিলেন একাধারে ব্যাটসম্যান, বোলার ও ফিল্ডার। সর্বোপরি তিনি ছিলেন মনেপ্রাণে খেলোয়াড়, সুন্দর ও আদর্শের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। খেলায় তার কোন বিচারের বিরুদ্ধে কোনদিন কেউ অভিযোগ করার সুযোগ পায়নি।

ক্রিকেট খেলার আইন – কানুন তিনি নিখুঁতভাবে মেনে চলতেন। তাঁর খেলোয়াড়ি মনোভাব কেবল যে খেলার মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকত তা নয়, তাঁর প্রতিদিনের জীবনের কাজের মধ্যেও সেই ভাব সব সময় বজায় থাকতে দেখা গেছে। সম্পূর্ণ নাম উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস। তার জন্ম ১৮৪৮ খ্রিঃ ১৮ ই জুলাই। পিতার নাম ছিল হেনরী মিলস। তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান খ্রিস্টান। পেশা ছিল ডাক্তারি। সঙ্গত ভাবেই দরিদ্র আর্ত মানুষের সেবাতেই একরকম জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তিনি।

উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস এর ছোটবেলা: William Gilbert Grace’s Childhood

গ্রেস তাঁর ক্রিকেটের প্রতিভা পিতার কাছ থেকে লাভ করেছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে। ক্রিকেট খেলায় মিলসের কেবল উৎসাহই ছিল না, তিনি নিজেও ছিলেন দক্ষ খেলোয়াড়। গ্লসেস্টার কাউন্টি ক্রিকেট দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। গ্রেসের মায়ের নাম ছিল মাথা পোকক। তাঁর আগ্রহেই গ্রেস ক্রিকেটের প্রতি অনুরক্ত হয়েছিলেন বাল্য বয়স থেকেই। মা উপহার দিয়েছিলেন একটি ছোট্ট ব্যাট।

শিশু গ্রেস সেটি বাগিয়ে ধরে বাড়ির ফুলবাগানের এবড়ো – খেবড়ো রাস্তার ওপর দাঁড়াতেন আর বল ছুঁড়ে দিতো পরিচারিকা। এভাবেই ক্রিকেট খেলাকে ভালবাসতে শিখেছিলেন গ্রেস। বাল্যবয়সের হাজারো কাজ – অকাজের মধ্যেও তার মন পড়ে থাকতো ব্যাট আর বলের দিকে। কোন অবস্থাতেই এক দিনের জন্যও ক্রিকেট খেলা বাদ পড়ত না। অনেক দিনই এমন হয়েছে, খেলতে যাবার আগে উইকেট খুঁজে পাওয়া গেল না কিংবা বল করবার মত কাউকে জোগাড় করা গেল না।

কিন্তু গ্রেস দমতেন না অতটুকু। দেয়ালের গায়ে খড়ি দিয়ে উইকেট এঁকে নিতেন। তারপর তার সামনে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে পড়তেন। এরপর ওই অবস্থাতেই পাড়ার ছেলেদের কেউ না কেউ নয়তো আস্তাবলের কোন সহিসকে বল করবার জন্য হাঁকডাক করে জুটিয়ে নিতেন। মোটকথা প্রতিদিনই প্রেসকে ক্রিকেট খেলতে হবে তা যে করেই হোক না কেন। ধর্মভীরু পরিবারে শাস্তির অভাব ছিল না।

বাইরের ঝড়ঝাপ্টা সেখানে আঁচড় কাটতে পারত না। কাজেই বাবা ও মার কাছে ক্রিকেট খেলার উৎসাহ ও প্রেরণা অবিচ্ছিন্নভাবেই লাভ করেছেন গ্রেস। তার এক দাদা ছিল — একরকম পিঠোপিঠি দুভাই যখন একটু বড় হল, তাদের বাবা নিজে ব্যাট হাতে নিয়ে তাদের খেলা শেখাতে লাগলেন। ক্রিকেট পিচ তৈরি করবার জন্য বাড়ির বাগানের ফুলন্ত গাছগুলি উপড়ে ফেলা হল।

ছেলেদের খেলার সুবিধার জন্য নিজহাতে লাগানো গাছ উপড়ে ফেলতেও ইতস্ততঃ করেননি তিনি। বাড়ির ভাইবোনরা মিলে মার্চ মাস থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত নিয়মিত বাড়ির পিচে বাবার কাছে ক্রিকেট খেলার শিক্ষা নিতেন। খেলার প্রয়োজনে অনেক সময় বাড়ির চাকরবাকরদেরও হাতের কাজ ফেলে এসে জুটতে হতো।

বয়স যখন নয় হল, গ্রেস জীবনে প্রথম ম্যাচ খেলার সুযোগ পেলেন ৷ খেলা হয়েছিল পশ্চিম গ্লসেস্টারের বিরুদ্ধে, নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাবা। সেই খেলায় বালক গ্রেস মাত্র তিন রান করেছিলেন। কিন্তু বিপক্ষদলের কোন বোলারই সেদিন তাকে আউট করতে পারেনি। গ্রেসের বড় ভাইয়ের নাম এডওয়ার্ড মিলন গ্রেস।

উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস এর কর্ম জীবন: William Gilbert Grace’s Work Life

ইংলন্ডের ক্রিকেটের ইতিহাসে তিনিই নামেই বিখ্যাত। কিশোর বয়সেই সেরা ক্রিকেট খেলোয়াড় হিসেবে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশে। কিন্তু প্রথম তিন বছরে ১৯ ইনিংসে খেলে গ্রেস মাত্র ২২ রান সংগ্রহ করলেন। ফলে তাঁকে নিয়ে মা বাবা দুজনেই ভাবনায় পড়লেন। ক্রিকেট খেলোয়াড়দের পরিবারে এই হতাশাজনক ব্যাপারটা মেনে নেওয়া হবে কেন ? ফলে মায়ের কাছে বরাদ্দ হয়ে গেল নিত্য বকুনি।

শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেল যে আত্মীয় পরিজনরা পর্যন্ত গ্রেসের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে চিন্তান্বিত হয়ে পড়লেন। গ্রেসের বাবা কিন্তু হাল ছাড়লেন না। মাঝে মাঝে দলে লোক কম হলেও ভালো ফিল্ডিং করার জন্য তিনি তাঁকে দলে নিতে লাগলেন। এইভাবে ক্রমে গ্রেস ১২ বছরে পা দিলেন। এই সময় ১৮৬০ খ্রিঃ ক্রিফটনেব বিরুদ্ধে খেলে তিনি ৫০ রান করলেন।

এই ঘটনা হতাশার মধ্যে আশার আলো জাগিয়ে তুলল। পরিবারের সকলের মনই কিছুটা হাল্কা হল গ্রেস – এর সম্বন্ধে। কিন্তু আশার আলো স্থায়ী হল না। পরবর্তী তিন বছরে আবার সেই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি। এর পরে কারোর পক্ষেই গ্রেস সম্বন্ধে আর কোন আশা ভরসা ধরে রাখা সম্ভব হল না। তাঁকে তাঁরা একরকম হিসেবের খাতা থেকে বাদ দিয়ে দিলেন।

কিন্তু পৃথিবীতে ঘটনা সংঘটন যেমন কালের অনিবার্য নিয়ম তেমনি অঘটনও সেই নিয়মের সঙ্গেই বাঁধা। পৃথিবীতে অঘটন কিছু কম ঘটে না। কিন্তু কোনটা ঘটনা আর কোনটা অঘটন তার হিসেব কে করবে ? যে ছেলে ছেলেবেলায় বইখাতার ধার ঘেঁষতে চায় না — শিক্ষকমশাইরা জবাব দিয়ে দেন এই বলে যে এ ছেলের কোনকালে লেখাপড়া হবে না, পরবর্তী জীবনে দেখা যায় সেই ছেলেই বিশ্বের জ্ঞানীগুণী মহলে বিশিষ্ট স্থান লাভ করেছে। অঙ্কে যে ছেলের মাথা মোটে খেলে না, সেই ছেলেই কি বিশ্বের অদ্বিতীয় গণিতজ্ঞ হয়ে ওঠেনি ? পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নজিরের অভাব নেই।

Morning shows the day প্রবাদবাক্যটি অবশ্যই কথার কথা। সবসময়েই যে এই কথা সত্য হয় না গ্রেস – এর মত প্রতিভাবানদের জীবনই তার বড় প্রমাণ। পনের বছর বয়সে গ্রেস হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। রোগটা কঠিন নিউমোনিয়া ৷ দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী হয়ে থাকতে হলো তাঁকে। সময়টা ১৮৬৩ খ্রিঃ।। রোগভোগের পর যখন সুস্থ হয়ে উঠলেন, তাঁর শরীরে দেখা গেল অদ্ভুত পরিবর্তন। ছিলেন ক্ষীণকায়, হয়ে উঠলেন বিরাটকায় বলশালী এক পুরুষমানুষ। অসুস্থতার জন্য খেলা বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

এবারে কোমর বেঁধে নেমে পড়লেন পিচে। এই বছরেই প্রথম খেলায় ৩০০ – এর কাছাকাছি রান সংগ্রহ করে ফেললেন। বছর শেষ হবার মুখেই প্রতিভার চমক দেখতে পেল সকলে। ইংলন্ডের শ্রেষ্ঠ দলগুলির বিরুদ্ধে খেলে প্রতি ইংনিংসে গ্রেসের গড় রান সংখ্যা দাঁড়াল ২৬ এইভাবেই ইংলন্ডের ক্রিকেট খেলার আকাশে নতুন জ্যোতিষ্কের শুভাবির্ভাব ঘোষিত হল। সেই যুগে ছিল বোলারদের প্রাধান্য। তাঁরা হতেন ব্যাটসম্যানদের চাইতে অনেক বেশি পারদর্শী।

কাজেই একশত রান সংগ্রহ করা যে রীতিমত কঠিন ব্যাপার ছিল তা না বললেও চলে। সেকারণেই শতরানের গৌরবও ছিল তেমনি। যিনি তা সংগ্রহ করতে পারতেন তিনি লাভ করতেন অকুন্ঠ অভিনন্দন। গ্রেস – এর দাদা ই এম.যখন এম . সি.সি. – এর হয়ে কেন্টের বিরুদ্ধে ১৯২ রান করে ইংলন্ডের ঘরে ঘরে আলোচ্য হয়ে উঠলেন, এই ঘটনা গভীর প্রভাব বিস্তার করল গ্রেসের মনে। তিনি মনে মনে শপথ নিলেন, তাকে আরও বড় হতে হবে — আরও বড় কৃতিত্ব অর্জন করতে হে সন্তানের প্রতিভা বিলম্বে হলেও মা – ই বুঝতে পারেন প্রথম।

গ্রেসের জীবনেও সেই ঘটনাই ঘটল। একদিন তার মা ইংলন্ডের অধিনায়ক জর্জ পারকে একটি চিঠিতে জানালেন, “ ই এম . আজ একজন দক্ষ ও কুশলী খেলোয়াড়। ইংলন্ডের দলে নিয়মিত স্থানলাভ করলে, আমার বিশ্বাস সে দেশের সুনামকে বাড়িয়ে তুলতে পারবে। কিন্তু আমার আরো একটি ছেলে আছে, ই এম. – এর ছোট সে। তার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আমি আরও বেশি আশা রাখি। তার ব্যাক প্লে – এর তুলনা হয় না ”।

মায়ের কাছ থেকে তার ছেলে সম্পর্কে এমন নিশ্চিত বিশ্বাসে ভরা চিঠিটি যে সেদিন এম.সি.সি দলের অধিনায়ককে স্তম্ভিত করেছিল তাতে আর সন্দেহ কি। যাইহোক, দেখা গেল মাত্র ১৬ বছর বয়সেই গ্রেস ‘ জেন্টলম্যান ’ দলের অন্তর্ভুক্ত হলেন। তাঁকে খেলতে হবে ‘ প্লেয়ার’দের বিরুদ্ধে। সেইকালে পেশাদারী খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত ‘প্লেয়ার’দল ছিল অসম্ভব শক্তিশালী। জেন্টলম্যান দল কখনোই তাদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারত না।

নানাভাবেই তারা জয়ী হবার চেষ্টা করত। কখনো ১৫/১৬ ফিল্ডিং করে, উইকেট ছোট করে, এমনকি প্লেয়ারদলের কয়েকজনকে নিজেদের দলে টেনে নিয়েও অধিকাংশ খেলাতেই জেন্টলম্যান দলকে হার স্বীকার করতে হত। তাদের পরাজয়ের ইতিহাস বড়ই দীর্ঘ। ১৮০৬ খ্রিঃ থেকে ১৮৬৫ খ্রিঃ মধ্যে ৬০ বারের প্রতিযোগিতায় মাত্র ১৪ বার জেন্টালম্যান দল বিজয়ী হতে পেরেছে। কিন্তু গ্রেসের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই প্লেয়ার দলের সাফল্যের ক্ষেত্রে ধস নামতে দেখা গেল।

গ্রেস ছিলেন একাধারে ব্যাটসম্যান, বোলার ও ফিল্ডার। পেশাদারী খেলোয়াড়দের প্লেয়ার দলের বিরুদ্ধে তিনি এক স্তম্ভ হয়ে দাঁড়ালেন। এই দুই দলের সাফল্যের ইতিহাসের মোড় ঘুরে গেল। ১৮৬৫ খ্রিঃ থেকে ১৮৮৩ খ্রিঃ – এর মধ্যে দুই দলে খেলা হয়েছে ৪১ বার। জেন্টলম্যান দল তার মধ্যে বিজয়ী হয় ২৯ বার। বলাই বাহুল্য যে এই অভূতপূর্ব সাফল্য সম্ভব হয়েছিল গ্রেসের অসাধারণ ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং – এর ফলেই। লর্ডস মাঠে শক্তিশালী এম.সি.সি. দলের বিরুদ্ধে প্রথম খেলায় গ্রেস সংগ্রহ করেছিলেন ৫০ রান।

এই খেলার মধ্যেই নিহীত ছিল তার উত্তর জীবনের উজ্জ্বল সাফল্যের ইঙ্গিত। বিজয় অভিযানের সূত্রপাত হয়েছিল সেই খেলা থেকেই। ১৮৬৬ খ্রিঃ গ্রেস চারবার সেঞ্চুরী ও একবার ডবল সেঞ্চুরী করেন। তিনিই ছিলেন শৌখিন খেলোয়াড়দের মধ্যে প্রথম যিনি এই কৃতিত্বের অধিকারী হন। ১৮৬৯ খ্রিঃ গ্রেসকে ইংলন্ডের শ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান রূপে স্বীকৃতি জানানো হলো। এই সময়ে তাঁর বয়স একুশ। ক্রমেই বোলারদের চোখের ঘুম কেড়ে নিতে লাগলেন গ্রেস।

তাঁর রক্ষণকৌশল ভেদ করে উইকেট লাভ করা বোলারদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। দেখা গেল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রেসকে ক্যাচ আউট হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। একবার এক খেলায় গ্রেস দুশ রান করার পর উইকেটরক্ষক দুঃখ প্রকাশ করলেন এই বলে যে, মাত্র তিনবার তিনি বল ধরবার সুযোগ পেয়েছেন। সমসাময়িক সময়ে শ্রেষ্ঠ বোলার ছিলেন জে.সি.স। তিনি কেবল সবচেয়ে বেশি ২০ বার গ্রেসের উইকেটে বল লাগাতে পেরেছিলেন।

গ্রেসের অবিশ্বাস্য ব্যাটিং কৌশল সম্বন্ধে তিনি বলেছিলেন— “I put the ball where I please, and Mr. Grace puts it where he please .” মেলবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবের অনুরোধে গ্রেস ১৮৭৩ খ্রিঃ একটি দল নিয়ে অস্ট্রেলিয়া সফর করেন। এই সফরে ব্যাটিং – এ তারই ছিল প্রাধান্য। ১৮৭৮ খ্রিঃ কেন্টারবেরী মাঠে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন গ্রেস। এই বছর ১১ ই ও ১২ ই আগস্ট কেন্টের বিরুদ্ধে গ্লসেস্টারশায়ারের হয়ে খেলে ৩৪৪ রান করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন। তা কেবল সমসাময়িক কালের নয়।

সর্বযুগের খেলোয়াড়দের কাছেই চিরবিস্ময় রূপে স্মরণীয় হয়ে থাকবার যোগ্য ৷ এই ঐতিহাসিক খেলার একদিন পরেই খেললেন নটসের বিরুদ্ধে। গ্রেস সংগ্রহ করেন ১৭৭ রান। এর পরেই ছিল শেফিল্ডে ইয়র্কসায়ারের বিরুদ্ধে খেলা। এই খেলায় ৩১৮ রানে অপরাজিত থাকেন। এই নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি সংগ্রহ করেন ৮৩৯ রান। কিছুদিন পরেই গ্রেস খেললেন গ্রিমস বি দলের সঙ্গে। উভয় দলেই ২২ জন করে খেলোয়াড় ৷

গ্রেসকে আউট করবার জন্য বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের চেষ্টার ত্রুটি ছিল না ৷ একে একে প্রত্যেকেই বল করলেন। কিন্তু দুর্ভেদ্য রক্ষণব্যূহে থেকে গ্রেস ঝড়ের গতিতে রান সংখ্যা বাড়িয়ে গেলেন। বিপক্ষ দলের কোন খেলোয়াড়ের হাতই প্রাণপণ চেষ্টা করেও তার বলের গতি রুদ্ধ করতে পারেনি। উইকেটে অবিচল গ্রেস একমুখ দাড়ি নিয়ে সকৌতুকে দেখেন একে একে ২২ জন খেলোয়াড়ই আউট হয়ে গেলেন। সেদিন গ্রেস খেলা শেষ করলেন ৪০০ রানের সঞ্চয় বৃদ্ধি করে।

সেদিন খেলোয়াড়, দর্শক, সমর্থক যারাই মাঠে উপস্থিত ছিলেন, সকলেই গ্রেসকে ‘ক্রিকেট খেলার অতিমানব’ বলে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হন। সেই সময়ে ইংলন্ডের সিংহাসনে মহারানী ভিক্টোরিয়া অধিষ্ঠিতা। রানীর দরবারে রাজ্যের সকল ক্ষেত্রের প্রতিভাধরই যথাযোগ্য স্বীকৃতি লাভ করে। ইংলন্ডের ক্রিকেট খেলায় যিনি প্রাণ প্রতিষ্ঠা করলেন, যাঁর প্রতিভার স্পর্শে ইংলন্ডের ক্রিকেট খেলায় নবযুগের উদ্বোধন হল, তার প্রতিভা কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে মহামান্য রানীর দরবারে কোন মর্যাদাই পায়নি।

এই নিয়ে দেশের পত্রপত্রিকায় সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাতেও কোন ফল হয় নি। এ যেন নিয়তিরই এক নিষ্ঠুর পরিহাস — কোন মর্যাদাসূচক পদবীই গ্রেসের নামের সঙ্গে যুক্ত হয়নি। আমৃত্যু কেবল ডবলিউ.জি . গ্রেসই থেকে গিয়েছিলেন তিনি। একত্রিশ বছর বয়সে ১৮৭৯ খ্রিঃ গ্রেস এডিনবরা থেকে এল.আর.সি.পি এবং ডারহাম থেকে এফ.আর.সি. এস উপাধি লাভ করেন।

চারটি সন্তানের জনক গ্রেসের ডাক্তারী পরীক্ষায় এই সাফল্যের পর ইংলন্ডের সমর্থকেরা তাঁকে ৪০ গিনির একটি ঘড়ি, সেই সঙ্গে ১,৪৫৮ পাউন্ডের চেক উপহার দেন। দাতার তালিকায় অন্যতম ছিলেন প্রিন্স অব ওয়েলস, যিনি পরবর্তীকালে হন এডওয়ার্ড দি সেভেন। ১৮৯৫ খ্রিঃ ৪৭ বছর বয়সে তাঁর দেহ যখন অশক্ত হয়ে আসতে থাকে, সেই সময় তিনি এক মাসের মধ্যে সহস্র রান করে ইংলন্ডের ক্রিকেটের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সৃষ্টি করেন।

একান্ন বছর বয়সেও গ্রেস অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট খেলায় অংশ গ্রহণ করেছিলেন। গ্রেসের জীবনের সর্বশেষ খেলা ১৯১৪ খ্রিঃ ২৫ শে জুলাই। তখন তার বয়স ৬৭ বছর। রীতিমত তিনি বার্ধক্যে উপনীত। এই খেলায় আউট না হয়ে ৬৯ রান করতে সমর্থ হন। মাত্র ৯ বছর বয়সে জীবনের প্রথম খেলায় অপরাজিত থেকে যে জীবনের সূত্রপাত হয়েছিল, গৌরবদীপ্ত যৌবনের পরে বার্ধক্যে সেই খেলা থেকে অবসর গ্রহণের সময় পর্যন্ত তার বিজয়ের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ ছিল। এই কারণেই ডবলিউ জি গ্রেস সর্বকালের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের তালিকায় সসম্মানে স্থান করে নিয়েছেন।

উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস এর মৃত্যু: William Gilbert Grace’s Death

১৯১৫ খ্রিঃ ২৩ শে অক্টোবর ৬৭ বছর বয়সে ক্রিকেটবীর গ্রেস অন্তিম নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বিশ্ববাসীর কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে গ্রেসের অমর প্রতিভার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ইংলন্ডের বিখ্যাত পত্রিকা ক্রিকেট অ্যান্ড ফুটবল ’ লিখেছিল— ”In history’s volumes his famous renown, The fame of the Grace brothers three May time immemorial serve as a crown To honour great W.G.”

Leave a Comment