আলবার্ট আইনস্টাইন জীবনী | Albert Einstein Biography in Bengali

আলবার্ট আইনস্টাইন জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Albert Einstein Biography in Bengali. আপনারা যারা আলবার্ট আইনস্টাইন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী আলবার্ট আইনস্টাইন এর জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

আলবার্ট আইনস্টাইন কে ছিলেন? Who is Albert Einstein?

আলবার্ট আইনস্টাইন (১৪ মার্চ ১৮৭৯ – ১৮ এপ্রিল ১৯৫৫) জার্মানিতে জন্মগ্রহণকারী একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি মূলত আপেক্ষিকতার তত্ত্ব (আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের দুটি স্তম্ভের একটি) এবং ভর-শক্তি সমতুল্যতার সূত্র, E = mc2 ( যা “বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত সমীকরণ” হিসেবে খেতাব দেওয়া হয়েছে) আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত। তিনি ১৯২১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে তার বিশেষ অবদান এবং আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া সম্পর্কিত গবেষণার জন্য তিনি এই পুরস্কার লাভ করেন।

আলবার্ট আইনস্টাইন জীবনী – Albert Einstein Biography in Bengali

নামআলবার্ট আইনস্টাইন
জন্ম14 মার্চ 1879
পিতাহারমান আইনস্টাইন
মাতাপলিন আইনস্টাইন
জন্মস্থানউলম, ওয়ার্টেমবার্গের রাজ্য, জার্মান সাম্রাজ্য
জাতীয়তাজার্মান (১৮৭৯-৯৬, ১৯১৪-৩৩)
রাষ্ট্রহীন (১৮৯৬-১৯০১)
সুইজারল্যান্ডীয় (১৯০১-৫৫)
অস্ট্রিয় (১৯১১-১৯১২)
মার্কিন (১৯৪০-৫৫)
পেশাপদার্থবিজ্ঞানী
মৃত্যু18 এপ্রিল 1955 (বয়স 76)

আলবার্ট আইনস্টাইন এর জন্ম: Albert Einstein’s Birthday

আলবার্ট আইনস্টাইন 14 মার্চ 1879 জন্মগ্রহণ করেন।

ইংরাজিতে একটা কথা আছে, সকাল দেখেই বোঝা যায় দিনটা কেমন যাবে। কথাটা যে পুরোপুরি ঠিক নয় তার জ্বলন্ত প্রমাণ হলেন বিশ্বের বিস্ময়কর বিজ্ঞান প্রতিভা আলবার্ট আইনস্টাইনের জীবন। ভবিষ্যৎকালে যিনি বিশ্ববিজ্ঞানকে নেতৃত্ব দেবেন, হয়ে উঠবেন মানব ইতিহাসের এক সুমহান পথপ্রদর্শক, তাঁর জীবনের শুরুটা ছিল অতি সাধারণেরও সাধারণ। সেদিন তার মধ্যে এমন কোন লক্ষণ ছিল না যা দেখে তার অসাধারণ প্রতিভার সামান্য পরিচয়ও পাওয়া যেতে পারে।

আলবার্ট আইনস্টাইন এর পিতামাতা ও জন্মস্থান: Albert Einstein’s Parents And Birth Place

দক্ষিণ জার্মানির বাভারিয়া রাজ্যের উল্ল্ম শহরে ১৮৯৭ খ্রিঃ ১৪ ই মার্চ এক ইহুদী ব্যবসায়ী পরিবারে আইনস্টাইনের জন্ম। তাঁর বাবার নাম হেরম্যান, মায়ের নাম পলিন। তিনি ছিলেন বাবামায়ের প্রথম সন্তান। আইনস্টাইনের জন্মের পরে পরেই তার বাবা ব্যবসায়ের প্রয়োজনে জার্মানির মিউনিখ শহরে এসে বাস করতে থাকেন।

আলবার্ট আইনস্টাইন এর ছোটবেলা: Albert Einstein’s Childhood

যেই বয়সে ছোটরা সঙ্গীদের সঙ্গে হুল্লোড় বাঁধায়, খেলাধুলোয় মেতে থাকতে ভালবাসে— ঘাস – পাতা – লতা – ফুল ছুঁড়ে প্রজাপতির পেছন নেয়, সেই বাল্য বয়স থেকেই আইনস্টাইন ছিলেন আশ্চর্য রকমের ব্যতিক্রম। এমন লাজুক আর মুখচোরা ছিলেন যে কারো সঙ্গে মিশতে পারতেন না। খেলাধুলো তো দূরের কথা। তাঁকে নিয়ে মা – বাবার দুশ্চিন্তার অবধি ছিল না।

আলবার্ট আইনস্টাইন এর শিক্ষাজীবন: Albert Einstein’s Educational Life

পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালই ছিল। কাজেই লেখাপড়ার জন্য ভালো স্কুলেই ভর্তি করিয়ে দেওয়া হল তাঁকে। দুবছরের ছোটবোন মাজাও যেত সেই সঙ্গে। পড়াশোনায় মোটেই ভাল ফল দেখাতে পারেননি আইনস্টাইন। সব পরীক্ষাতেই অল্পের জন্য কোন রকমে উৎরে যেতেন। কি অঙ্ক বা বিজ্ঞান অথবা ভাষা – সাহিত্য, কোন বিষয়ের প্রতি কোন রকম আগ্রহ ছিল না তার।

পড়তে হবে তাই যেন বাধ্য হয়ে পড়তেন। তবে একটা ব্যাপারে ছিল তার খুব আগ্রহ। হাতের নাগালে কোন যন্ত্র পেলে তার খুঁটিনাটি দেখার জন্য কৌতূহলের অন্ত থাকত না। মাথা খাটিয়ে খুঁটিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে বসে ঘন্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতেন। আইনস্টাইনের এক কাকা ছিলেন। তাঁর নাম জ্যাক। বাড়ির মধ্যে একমাত্র এই কাকার সঙ্গেই যত ভাব ছিল তাঁর। নানা বিষয় জানার জন্য কাকার কাছেই প্রশ্নের পর প্রশ্ন নিয়ে হাজির হতেন তিনি।

ছ’বছর বয়সে বাবা একটা কম্পাস কিনে দিয়েছিলেন। সেটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতেই আইনস্টাইন কাকার কাছ থেকে শেখেন চৌম্বক ধর্ম ও মাধ্যাকর্ষণ বলের কথা। দশ বছর বয়সে কাকা জ্যাকের কাছে প্রেরণা পেয়েছিলেন অঙ্ক শেখার। বীজগণিত পাটিগণিতের দরজায় এভাবেই পদার্পণ ঘটেছিল আইনস্টাইনের।

অঙ্কের বিষয়ে যে বইটি আইনস্টাইনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিল, তা হল ডক্টর স্পিকারের একটা জ্যামিতির বই। ডাক্তারি পড়া এক ছাত্র আসত তাঁদের বাড়িতে। তাঁর নাম ম্যাক্স টলমি। তার কাছ থেকে প্রকৃতিবিজ্ঞান ও অঙ্কের নানা বই চেয়ে নিয়ে পড়তেন কিশোর আইনস্টাইন ৷ এইভাবে একসময় দেখা গেল বিজ্ঞান ও গণিতকে দিব্যি ভালবেসে ফেলেছেন তিনি। আধুনিক জার্মান সাহিত্যেও ততদিনে মনোযোগ এসে গিয়েছিল।

এই সময়েই ধরে আর একটা নেশা, তা হল বেহালা। বালক আইনস্টাইনকে প্রায়ই দেখা যেত নিভৃতে বেহালা নিয়ে বসে সুরের মায়াজাল বিস্তার করে চলেছেন। মিউনিখের স্কুল থেকেই টেনেটুনে মাধ্যমিক পাশ করলেন। তারপর চলে এলেন সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহরে পলিটেকনিক আকাদেমিতে ভর্তি হবেন বলে। জুরিখের পলিটেকনিক ইউরোপের এক সেরা প্রতিষ্ঠান। সেখানে ভর্তির পরীক্ষাতেই আইনস্টাইন পাশ করতে পারলেন না।

অঙ্কে মোটামুটি ভাল ফল করলেও সবচেয়ে খারাপ নম্বর পেলেন প্রাণিবিদ্যা ও উদ্ভিদবিদ্যায়। অকৃতকার্য হয়ে সুইজারল্যান্ডের অ্যারাউ শহরে এসে একটা স্কুলে প্রাণিবিদ্যা ও উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে ছমাস পড়াশোনা করে নিজেকে তৈরি করলেন। তারপর আবার উপস্থিত হলেন পলিটেকনিকে। দ্বিতীয়বারে আর ব্যর্থ হতে হল না ভর্তির চেষ্টায় সফল হলেন। এই প্রতিষ্ঠানের খোলামেলা আবহাওয়াতে পড়াশোনায় দ্রুত উন্নতি ঘটল আইনস্টাইনের।

এখানেই তিনি অঙ্ক ও পদার্থবিদ্যা এই দুই বিষয়ে পরিণত হবার সুযোগ পেলেন। ১৯০০ খ্রিঃ পলিটেকনিক থেকে স্নাতক হলেন আইনস্টাইন। এবারে নামতে হল একটা চাকরির সন্ধানে। জাতে ইহুদী হওয়ায় অনেক চেষ্টা চরিত্র করে ব্যর্থতার সঙ্গে যা পেলেন তা হল অযাচিত উপদেশ আর অপমান।

আলবার্ট আইনস্টাইন এর বিবাহ জীবন ও পরিবার: Albert Einstein’s Marriage Life And Family

ইতিমধ্যে বাবার ব্যবসার অবস্থাও এসেছে পড়তির দিকে। তার ওপরে আইনস্টাইন বিয়েও করেছেন। স্ত্রী হাঙ্গেরির মেয়ে, নাম মিলেভা মারিৎস। কালক্রমে দুই শিশুর আগমন ঘটেছে সংসারে। কাজেই একটা চাকরি না হলেই যে নয়।

আলবার্ট আইনস্টাইন এর কর্ম জীবন: Albert Einstein’s Work Life

চেষ্টার ফল ফলল একদিন। ১৯০২ খ্রিঃ এক বন্ধুর সুপাবিশে সুইস পেটেন্ট আপিসে কেরানির একটা চাকরি জুটে গেল। সামান্য হলেও চাকরিটা যথেষ্টই আশ্বস্ত করল আইনস্টাইনকে। প্রথমতঃ আর্থিক দুশ্চিন্তার লাঘব, দ্বিতীয়তঃ নতুন কিছু করার যথেষ্ট অবসর। ততদিনে পদার্থবিদ্যার জটিল সব তত্ত্ব আইনস্টাইনের মাথায় গিসগিস করছে। সুযোগ পেলেই পাতার পর পাতা ভরিয়ে ফেলেন উচ্চতর গণিতের হিসাবে।

শাস্তশিষ্ট চেহারার এক কেরানীকে দেখে বাইরের কারোরই বুঝবার উপায় নেই তার মাথায় কি ঘুরছে। অফিসের যেটুকু কাজ, তার জন্য খুব বেশি সময় লাগত না। বাকি সময়ট। ডুবে যেতেন অঙ্ক সংক্রান্ত নিজের কাজ নিয়ে। অফিসের ওপরওয়ালা কেউ আসছেন শুনলেই গণিতের কাগজপত্র ড্রয়ারে ঢুকিয়ে পেটেন্ট সংক্রান্ত কাগজপত্র সামনে খুলে নিয়ে কাজে ডুবে আছেন এমন ভাব করতেন।

পেটেন্ট অফিসে বসে এভাবেই আইনস্টাইন তার বিখ্যাত আপেক্ষিকতার তত্ত্বটি আবিষ্কার করেন। বিশ শতকের সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কারটির এই নেপথ্যকাহিনী সত্যিই বিস্ময়কর। ১৯০৫ খ্রিঃ আইনস্টাইনের গাণিতিক গবেষণার ফল আপেক্ষিকতার সূত্রটি প্রথম প্রকাশিত হল। এই সময় তার বয়স মাত্র ছাব্বিশ বছর। এই বছরেই জুরিখের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পদার্থ বিজ্ঞানে ডক্টরেট হলেন।

ইতিপূর্বে দুই মার্কিন পদার্থবিদ মাইকেলসন ও মলি যুগ্মভাবে চেষ্টা করেছিলেন, সূর্যের চারদিকে পৃথিবী যে অভিমুখে ঘুরে বেড়ায় সেই অভিমুখে আলোকে পাঠিয়ে তার বেগ কতটা বাড়ে তা পরিমাপ করবার। তারা পরীক্ষা করে দেখেছিলেন পৃথিবীর আবর্তনের অনুকূলে ও প্রতিকূলে আলোর বেগ কতটা বাড়ে ও কতটা কমে। কিন্তু এই বেগ বৃদ্ধি ও হ্রাসের বিষয়টা আবিষ্কার করতে পারেন নি।

এই দুই বিজ্ঞানীর অসমাপ্ত কাজকেই সম্পূর্ণ করেছিলেন আইনস্টাইন কোন যন্ত্রপাতি নয় স্রেফ গণিতের সাহায্যে। পদার্থবিজ্ঞানী নিউটন ১৭-১৮ শতকে ঘোষণা করেছিলেন, কাল বা সময় সর্বদাই ধ্রুবক ও অপরিবর্তনীয়। নিউটনের এই ঘোষণা বিজ্ঞানীরা মেনে নিয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন। আইনস্টাইন প্রথম পূর্বসূরীর এই রায়কে ভ্রান্ত বলে ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন, কাল বা সময় অবশ্যই পরিবর্তনীয়। কখনোই ধ্রুবক নয়।

বিজ্ঞানীরা এতদিন বিশ্বের সমস্ত বস্তুর অবস্থানকেই সাধারণ তিনটি মাত্রা দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা দ্বারা ব্যাখ্যা করতেন। আইনস্টাইন এর সঙ্গে যোগ করলেন চতুর্থ একটি মাত্রা, তা হল কাল। এই কাল আবার গতি বা বেগের ওপর নির্ভরশীল। কাল বা সময় এই দুটির কারো অবস্থানের ওপর নির্ভর করেই বাড়বে বা কমবে। যেমন, বৃহস্পতির এক বছর, পৃথিবীর এক বছরের চেয়ে দীর্ঘ, কেননা বৃহস্পতি পৃথিবীর চাইতে অনেক বেশি সময় নিয়ে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে।

এই ব্যাখ্যার প্রতিবাদ করে আইনস্টাইন অন্য ব্যাখ্যা দিলেন। তার ব্যাখ্যাটি এই রকম — দূর থেকে যদি দেখা যায়, দুটি ট্রেন দুদিক থেকে প্রচন্ড বেগে পরস্পরের কাছে এগিয়ে আসছে, তাহলে বোঝা যাবে, ট্রেনের বেগ বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে দুটি ট্রেনের স্বাভাবিক আকারও হ্রস্ব থেক হ্রস্বতর হয়ে যাচ্ছে। এবারে সময়কে যদি স্কেল হিসাবে আলোর গতির কাছাকাছি দাঁড় করানো যায় তবে দেখা যাবে বেগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সময়ের নির্দিষ্টতা কমে আসছে।

আলোর গতিবেগে হাজির হওয়া মাত্র সময়ও একেবারে শূন্য হয়ে যাবে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদের আর একটি বৈশিষ্ট্য হল ওজন। এটি বেগের ওপর নির্ভরশীল। পদার্থের বেগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার ওজনও বাড়তে থাকে। তবে আলোকের বেগে না পৌঁছনো পর্যন্ত পদার্থের ওজন ততটা মারাত্মক রকমের বাড়ে না। মোটকথা আইনস্টাইন তার আপেক্ষিকতাবাদ গড়ে তুলেছিলেন অত্যন্ত জটিল এক গাণিতিক প্রক্রিয়ার সাহায্যে, যা কিনা সম্পূর্ণভাবেই বিশুদ্ধ গণিত।

এই গণিতের সাহায্যে তিনি যেই ফলাফলে পৌঁচেছিলেন, আধুনিক যুগে বিজ্ঞানীরা সর্বাধুনিক যন্ত্রে যাচাই করে একই ফলাফল লাভ করেছেন। আইনস্টাইনের গণনা ছিল এমনই নির্ভুল। ১৯০৫ খ্রিঃ আইনস্টাইন তাঁর প্রথম গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধেই তিনি আপেক্ষিকতার বীজ বপন করেন। প্রবন্ধের নামকরণ করেছিলেন On a Heuristic Point of View Concerning the Generation and Transfor mation of Light. এই প্রবন্ধের সুবাদেই আইনস্টাইন বিজ্ঞানী মহলে পরিচিতি লাভ করেন।

এই সূত্রেই ১৯০৯ খ্রিঃ তিনি জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের প্রধান অধ্যাপকের পদ লাভ করেন। একদিকে প্রাণখুলে বেহালা বাদন, অন্য দিকে বিজ্ঞানের গবেষণায় আত্মনিমগ্নতা এই দুটি কাজেরই প্রশস্ত সুযোগ এসে গেল চাকরির দৌলতে আর্থিক নিশ্চয়তা আসার পরে। প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশের দশ বছর পরে ১৯১৫ খ্রিঃ আইনস্টাইন প্রকাশ করেছিলেন তার দ্বিতীয় প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধে তিনি আপেক্ষিকতারই নানা দিক নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করেছেন এবং পুরনো মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বদলে নতুন তত্ত্ব উপস্থিত করেন।

অভিকর্ষজ আকর্ষণ বলের কথা বলতে গিয়ে নিউটন বলেছিলেন, বিশ্বের যে কোনও দুটি বস্তু পরস্পরকে আকর্ষণ করে। আইনস্টাইন সেই বক্তব্যের প্রতিবাদ করে জানালেন, অভিকর্ষজ আকর্ষণকে চরম বল বলা যুক্তিসঙ্গত নয়। কেননা, প্রত্যেক পদার্থেরই নিজস্ব ভরের অনুপাতে কার্যকরী বল থাকে; ফলে অন্য পদার্থকে নিজের দিকে টানার একটা প্রবণতা থাকে। পদার্থের এই আকর্ষণী বলই সৌর বিশ্বের বক্রতা ও নানা সৌরবস্তুর কক্ষপথের পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করে।

আইনস্টাইনের সিদ্ধান্ত হল, দুটি অতি নিকটবর্তী বিন্দুর দূরত্ব বক্ররেখ, কখনোই সরলরৈখিক নয়। দ্বিতীয় গবেষণা প্রবন্ধে এই সব আলোচনার সঙ্গে আইনস্টাইন ভর ও শক্তি সম্পর্কিত আলোচনাও করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, পদার্থ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। শক্তি ও পদার্থের রূপান্তরের সম্পর্কটিকে তিনি একটি সমীকরণে দাঁড় করিয়েছিলেন। সেটি এই রকম E = mc2। E হল শক্তি বা energy, M হল ভর বা mass C হল ধ্রুবক বা constant আলোর বেগ।

আইনস্টাইন প্রতি সেকেন্ডে আলোর গতিবেগ নির্ণয় করেন ২৯৯, ৭৭৬ কিলোমিটার বা ১৮৬,৩০০ মাইল। এটি ধ্রুবক বা অপরিবর্তনীয়। এই সমীকরণের সূত্র ধরেই পরমাণু বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন ইউরেনিয়াম পরমাণু থেক উদ্ভূত শক্তিকে মুক্ত ও নিয়ন্ত্রণের পন্থা। এই পথ ধরেই হয় পরমাণু শক্তির আবিষ্কার, পরে মহাঘাতক পরমাণু বোমার উদ্ভব। জুরিখে গবেষণা ও অধ্যাপনা পাশাপাশি চলতে লাগল। দুই বছর পর ১৯১২ খ্রিঃ আইনস্টাইন প্রুশিয়ার বিজ্ঞান আকাদেমিতে চলে এলেন।

এখানে নিজের গবেষণা ও অন্যান্য বিজ্ঞানীদের গবেষণার তত্ত্বাবধানের কাজের সঙ্গে তিনি কুড়ি বছর যুক্ত ছিলেন। ১৯১৪ খ্রিঃ ইউরোপ জুড়ে শুরু হল প্রথম মহাযুদ্ধ। হিটলার ঘোষণা করেছিল, জার্মানরা আর্যরক্তের মানুষ, ইহুদীদের রক্ত দূষিত। তারই প্ররোচনায় দেশ জুড়ে আরম্ভ হল ইহুদী নিধন যজ্ঞ। আইনস্টাইনের শরীরে খাঁটি ইহুদীর রক্ত। তার ওপর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের প্রতি তার বিতৃষ্ণার কথা ঘোষণা করে এই সময়ে বললেন, These war is a vicious and savage crime. I would rather be hacked to pieces than take part in such an abominable business.

জার্মানিতে ইহুদীদের মর্মান্তিক পরিণতি লক্ষ করে আইনস্টাইন শুরু করলেন মানবিক আন্দোলন। তিনি উপলব্ধি করলেন, আত্মরক্ষার প্রশ্নেই ইহুদীদের জন্য আলাদা একটি রাষ্ট্রের প্রয়োজন। ১৯৩৩ খ্রিঃ নরপশু হিটলারের প্ররোচনায় তথাকথিত জার্মানদের মধ্যে এমনই ইহুদী বিদ্বেষ তৈরি হয়েছিল যে নাৎসি সরকার আইনস্টাইনের বিখ্যাত আপেক্ষিকতা বাদকে কলঙ্কময় তত্ত্ব হিসাবে ঘোষণা করলেন।

ইহুদীদের যাবতীয় কাজকেই নিষিদ্ধ বলে প্রচার করা হল। জার্মানি হয়ে উঠল ইহুদী – বধ্যভূমি। নির্বিচারে ইহুদীদের নিধন চলতে লাগল। ইহুদী বিজ্ঞানী ও মনীষীদের নামও খতম তালিকায় উঠতে লাগল। আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন জার্মানিতে থাকার অর্থ যেচে মৃত্যু ডেকে আনা। তিনি ডাকযোগে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিলেন। আমেরিকাতেই থেকে যাবার সিদ্ধান্ত করে নিউ জার্সির প্রিসটন শহরের ইনসটিটিউট ফর অ্যাডভ্যান্স স্টাডিজ – এ প্রধান গবেষকের চাকরি নিলেন ১৯৩৩ খ্রিঃ শেষ দিকে।

কিছুদিনের মধ্যেই জানা গেল জার্মানিতে আইস্টাইনের স্থাবর অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। হিটলার তাতেই শান্ত হয় নি। আইনস্টাইনের মাথার জন্য কয়েক সহস্ৰ মুদ্ৰা পুরস্কার ঘোষণা করা হল। ১৯৪০ খ্রিঃ আইনস্টাইন মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেছিলেন। তিনি জার্মানিতে নির্যাতিত জার্মানদের জন্য গঠন করলেন কল্যাণ তহবিল। তার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ আইনস্টাইন ফান্ড ফর প্যালেস্টাইন ‘।

১৯৩৬ খ্রিঃ জার্মানি রাইনল্যান্ড দখল করল। তারপর ১৯৩৮ খ্রিঃ দখল করল অস্ট্রিয়া ও চেকোশ্লোভাকিয়া। চেকোশ্লোভাকিয়াতে ছিল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ খনি। জার্মান অধিকার কায়েম হতেই সেখানকার ইউরেনিয়াম বাইরে আসা বন্ধ হয়ে গেল। তা ব্যবহৃত হতে লাগল জার্মান পরমাণুবিজ্ঞানীদের গবেষণায়। হিটলারের স্বপ্ন সমস্ত পৃথিবীর অধিকার। তা করায়ত্ত করবার জন্য দরকার এমন এক শক্তি যা হবে অপ্রতিহত। সেই লক্ষ পূরণের উদ্দেশ্যে কাজ করে চলেছে জার্মান বিজ্ঞানীরা

১৯৩৯ খ্রিঃ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রাক – মুহূর্তে দুই আমেরিকান পরমাণু বিজ্ঞানী ফের্মি ও জিলার্ড পরমাণুবোমা তৈরির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেন। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য তারা প্রিন্সটনে এসে আইনস্টাইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। আইনস্টাইন মানবতাবাদী ও শান্তিকামী মানুষ। যুদ্ধবিরোধী মতবাদে বিশ্বাসী। তবু জার্মানির আগ্রাসন ও রণোন্মত্ততার পরিপ্রেক্ষিতে এবং মানবিকতার প্রশ্নে আমেরিকার পরমাণু বোমা তৈরির স্বপক্ষে বিজ্ঞানীদের বক্তব্যের যৌক্তিকতা অস্বীকার করতে পারলেন না।

ফের্মিও জিলার্ডের অনুরোধে আইনস্টাইন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি রুজভেল্টকে পত্র লিখতে বাধ্য হলেন। এই চিঠিতে তিনি জার্মানির চেকোশ্লোভাকিয়া দখল ও ইউরেনিয়ামের চালান বন্ধের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে শক্তিসম্পন্ন বোমা তৈরির আশু প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। ১৯৩৯ খ্রিঃ ৩০ শে সেপ্টেম্বর জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে অশুভ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হল। এই ঘটনার দু সপ্তাহ পরেই প্রেসিডেন্ড রুজভেল্টের হাতে পৌঁছল আইনস্টাইনের চিঠি।

চিঠির গুরুত্ব অনুধাবন করে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন তিনি এবং পরমাণু বোমা তৈরির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। উল্লেখযোগ্য যে বিজ্ঞানীদের এই বৈঠকে আইনস্টাইন ছিলেন অনুপস্থিত। বিজ্ঞানীদের সিদ্ধান্তের পরিণতি দেখা গেল ১৯৪৫ খ্রিঃ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সমাপ্তি লগ্নে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমার বিস্ফোরণের ধ্বংসকান্ডের মধ্যে। মহাযুদ্ধের পরিণতি — লক্ষ লক্ষ মানুষের হত্যালীলা, দেশের পর দেশ মহাশ্মশানে রূপান্তরিত হল।

মানব সমাজের অস্তিত্বের সংকটের চিন্তা আইনস্টাইনকে নতুন মানুষে রূপান্তরিত করল। তিনি পরমাণুশক্তিকে মানবকল্যাণের কাজে ব্যবহার করার আহ্বান জানালেন। যুদ্ধ নয়, মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসাই যে বিশ্বশান্তি ও বিশ্বসমস্যার সমাধানের উপায়, একথা তিনি বিশ্ববাসীকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন। মানবতার এই মহামন্ত্র পৃথিবীর দেশে দেশে বহন করে নিয়ে গেলেন মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন।

জাপানের নাগাসাকি ও হিরোশিমা শহর দুটির ভয়াবহ অবস্থার কথা জানতে পেরে আইনস্টাইন এতটাই ভেঙ্গে পড়েছিলেন যে, তীব্র মনোবেদনায় নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বলে উঠেছিলেন, ‘আবার যদি নতুন করে জীবন শুরু করা সম্ভব হত, তাহলে বিজ্ঞানের সাধনা না করে ছুতোর মিস্ত্রীই হতাম ‘। গোটা জীবনে আইনস্টাইন তিনশোরও বেশি প্রবন্ধ ও বই লিখেছেন। এর অধিকাংশই ছিল আপেক্ষিকতার ব্যাখ্যা ও শক্তি সম্পর্কিত। আলোক তড়িৎ ও আলোকের ফোটন তত্ত্ব বিষয়েও আইনস্টাইনের ত বদান রয়েছে। আধুনিক ইলেকট্রনিক্সের উৎস তাঁরই উদ্ভাবিত আলোকতড়িৎ নিঃসরণতত্ত্ব।

আলবার্ট আইনস্টাইন এর পুরস্কার ও সম্মান: Albert Einstein’s Awards And Honors

এই তত্ত্বের জন্য ১৯২১ খ্রিঃ তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম রূপকার আইনস্টাইন গোটা পৃথিবীতে বিজ্ঞানের প্রবাদপুরুষ রূপে খ্যাত। বিশ্ববিজ্ঞানে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য পৃথিবীর অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয় ও বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁকে বিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিজ্ঞান উভয় বিষয়েই দেওয়া হয়েছে অজস্র সাম্মানিক ডক্টরেট উপাধি। লন্ডনের রয়াল সোসাইটির ফেলো সিপ ছাড়াও তিনি পেয়েছিলেন কপলে পদক ও ফ্রাঙ্কলিন পদক।

আলবার্ট আইনস্টাইন এর রচনা: Written by Albert Einstein

আইনস্টাইন রচিত উল্লেখযোগ্য বইগুলি হল, Special theory of Relativity, Theory of Relativity, Investigation on theory of Brownian Movement প্রভৃতি। বিজ্ঞান বর্হিভূত বিষয় নিয়ে রচিত, Why war? My philosophy, ও Audit of later years প্রভৃতি। বিজ্ঞানী হয়ে সম্পূর্ণ সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে ধর্ম সম্পর্কিত বইও আইনস্টাইন রচনা করেছেন। মানবতাবাদই ছিল তার ধর্মচিন্তার মূল সুর।

আলবার্ট আইনস্টাইন এর মৃত্যু: Albert Einstein’s Death

১৯৫৫ খ্রিঃ ১৮ ই এপ্রিল মহাবিজ্ঞানী ও মানবমন্ত্রের অন্যতম প্রচারক আইনস্টাইন প্রিন্সটন হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

Leave a Comment