“এশিয়া এশিয়াবাসীদের জন্য”-এই শ্লোগানের উদ্দেশ্য কি ছিল? এই স্লোগান কার্যকর করতে গিয়ে জাপান কোন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল।

“এশিয়া এশিয়াবাসীদের জন্য”-এই শ্লোগানের উদ্দেশ্য কি ছিল? এই স্লোগান কার্যকর করতে গিয়ে জাপান কোন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল

ভূমিকা

1858 খ্রিস্টাব্দে মেইজি পুনরুত্থানের পর থেকে জাপানে অতি দ্রুত আধুনিকীকরণ ও পাশ্চাত্যকরণ ঘটলে জাপান পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির সমকক্ষ হয়ে ওঠে এবং পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির অনুকরণে সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এশিয়ার বিভিন্ন উপনিবেশ থেকে পশ্চিমী শক্তিগুলিকে বিতাড়িত করে জাপান নিজের উপনিবেশিক সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটানো সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই উদ্দেশ্যে জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিদেকি তোজো ঘোষণা করেন, “এশিয়া এশিয়াবাসীদের জন্য”। এই শ্লোগানের মধ্য দিয়ে জাপান স্পষ্ট করে দেয়-এশিয়ার ভূখণ্ডে পশ্চিমে দেশগুলির আধিপত্য জাপান স্বীকার করবে না। অর্থাৎ পশ্চিমে শক্তি গুলি নয়, এশিয়ায় কর্তৃত্ব করবে জাপান।

এশিয়া এশিয়াবাসীদের জন্য শ্লোগানের উদ্দেশ্য

এশিয়াবাসীদের জন্য এশিয়া শ্লোগানের মধ্য দিয়ে জাপান পশ্চিমী উপনিবেশিক শক্তিগুলির বিরুদ্ধে পূর্ব এশিয়ায় নিজেকে ত্রাতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। এই শ্লোগান প্রচারের পিছনে জাপানের বিশেষ কতগুলি উদ্দেশ্য ছিল। সেগুলি হল-

1)পশ্চিমী শক্তির প্রতিরোধ-এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যেসব ইউরোপীয় শক্তির উপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল তার অবসান ঘটানই ছিল এশিয়াবাসীদের জন্য এশিয়া শ্লোগানের প্রধান উদ্দেশ্য। জাপান মনে করতে এশিয়ার কোন অংশে ইউরোপীয় শক্তিগুলির উপনিবেশ স্থাপনের কোনো অধিকার নেই। কেবলমাত্র এশীয়রাই এশিয়া শাসন করার অধিকারী। তাই উক্ত শ্লোগানকে সামনে রেখে জাপান পশ্চিমী উপনিবেশিক শক্তিগুলিকে বিতাড়িত করে এশিয়ায় নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়।

2)জাপানী সম্প্রসারণ নীতি-এশিয়াবাসীদের জন্য এশিয়া শ্লোগান ঘোষণার আড়ালে জাপানের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ চরিতার্থ করা।1943 খ্রিষ্টাব্দে বৃহত্তর পূর্ব এশিয়া সম্মেলনে জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিদেকি তোজো তার বক্তৃতায় এশিয়াবাসীদের জন্য এশিয়ার শ্লোগানে এশিয়াবাসীদেরই আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে বলে দাবি করলেও জাপানের প্রকৃত বক্তব্য ছিল এশিয়া কেবল জাপানের জন্য এবং তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল জাপানি সাম্রাজ্যবাদী নীতির সম্প্রসারন ঘটানো।

3)এশিয়ার নেতৃত্ব গ্রহণ-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে অক্ষশক্তির জোটে যোগদান করেছিল। এই সময় জাপানের যুদ্ধনীতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মিত্রশক্তি জোটের নেতৃত্বাধীন এশীয় অঞ্চলটিতে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করা এবং পশ্চিমী আধিপত্য মুক্ত বৃহত্তর পূর্ব এশিয়ার আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক প্রভৃতি সব ক্ষেত্রেই নেতৃত্বের আসন গ্রহণ করা। তাই উক্ত শ্লোগানকে সামনে রেখে জাপান তার এশিয়ার নেতৃত্ব গ্রহণের উদ্দেশ্য সাধনে সচেষ্ট হয়েছিল।

4)এশীয় ঐক্য সাধন-এশিয়াবাসীদের জন্য এশিয়া এই স্লোগান তুলে জাপান এশীয় শক্তিগুলিকে একজোট করতে চেয়েছিলো। কারণগুলি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধে নিজেদের সাফল্য সুনিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও জাতিগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করে মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামিল করার প্রয়োজনীয়তা ছিলো।

5)প্রাকৃতিক সম্পদ লাভ-পশ্চিমী দেশগুলি পূর্বে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে নির্বিচারে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করে তা নিজেদের দেশে নিয়ে যেত এবং ওইসব সম্পদের উপর ভিত্তি করে সেখানে শিল্প কলকারখানা গড়ে তুলত। জাপান মনে করত এশীয়দের পক্ষে পশ্চিমীদের একাজ মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। কারণ একমাত্র পূর্ব এশিয়ার ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর এশীয়দেরই অধিকার আছে। পশ্চিমীদের কোন অধিকার নেই।

6)মূল ভূখণ্ডে আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা-প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও বৃহৎ দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত জাপানের অধিবাসীরা প্রকৃতিগতভাবে ছিল পরিশ্রমী ও সম্প্রসারণশীল।তারা দ্বীপরাষ্ট্র থেকে মূল ভূখণ্ডর দেশগুলিতে নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করত। এছাড়া জাপানের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার ভূমি সংস্থানের জন্য জাপানের নতুন ভূখণ্ড দখলের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এশিয়ার মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন স্থানে ছিল পশ্চিমী দেশগুলির একাধিপত্য। তাই জাপান “এশিয়াবাসীদের জন্য এশিয়া” শ্লোগানের মাধ্যমে এশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে পশ্চিমী শক্তিগুলিকে হটিয়ে সেখানে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় তৎপর হয়।

এশিয়াবাসীদের জন্য এশিয়া নীতির স্বপক্ষে গৃহীত পদক্ষেপ

এশিয়াবাসীদের জন্য এশিয়া-এই নীতি কার্যকর করার জন্য জাপান বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যেমন-

1)বৃহত্তর পূর্ব এশিয়া সম্মেলন-1943 খ্রিস্টাব্দের 5 ও 6ই নভেম্বর বৃহত্তর পূর্ব এশিয়ার সম্মেলনে পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সামনে জাপান “এশিয়াবাসীদের জন্য এশিয়া” শ্লোগানটি জোরালো ভাবে তুলে ধরে এবং পশ্চিমী বস্তুবাদী সভ্যতার তুলনায় আধ্যাত্মবাদী এশীয় সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের মতবাদ ব্যক্ত করে। এই সম্মেলনে বার্মার রাজনৈতিক নেতা বা-ম জাপানের এশীয় ঐক্যের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন জানিয়ে ঘোষণা করেন, “আমার দেহের এশীয় রক্ত সর্বদা অন্য এশিয়াবাসীকে আহ্বান জানায়।প্রাচ্য বনাম পাশ্চাত্যের রক্ত সম্পর্কের দ্বন্দ্বে জাপানের দৃষ্টিভঙ্গিকে এশিয়ার বহু নেতা সমর্থন জানান।

2)সামরিক বাহিনীর প্রচার-এশিয়াবাসীদের জন্য এশিয়া শ্লোগানকে সফল করার উদ্দেশ্যে জাপানী সামরিক বাহিনী “Read this and War is Won” নামক এক পুস্তিকার মাধ্যমে প্রচার করেন এশিয়ায় শোষণ চালিয়ে পশ্চিমী দেশগুলি বিলাস বৈভবে জীবন যাপন করছে এবং এশীয়রা প্রতিনিয়ত দুর্বল হচ্ছে। জাপানী সেনারা বিমান থেকে ইন্দোনেশিয়া, মালয়, ফিলিপাইন প্রভৃতি দেশে ওই প্রচারপত্র ফেলে সেখানকার জনগণকে পশ্চিমী উপনিবেশিক শক্তিগুলির বিরুদ্ধে জাপানের এই আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান।

3)সুসম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ-জাপান তাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য দুটো এশিয়ার ইউরোপীয় উপনিবেশগুলির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হন এবং সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে পারস্পরিক সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বিভিন্ন ভাষায় লেখা প্রচার পত্র দ্বারা প্রচার করা হয় যে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলকে পশ্চিমী শক্তিগুলির হাত থেকে উদ্ধার করে জাপান তাদের স্বাধীনতা দিয়েছে।

Leave a Comment