অরবিন্দ ঘোষ জীবনী | Sri Aurobindo Ghose Biography in Bengali

অরবিন্দ ঘোষ জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Sri Aurobindo Ghose Biography in Bengali. আপনারা যারা অরবিন্দ ঘোষ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী অরবিন্দ ঘোষ এর জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

অরবিন্দ ঘোষ কে ছিলেন? Who is Sri Aurobindo Ghose?

শ্রী অরবিন্দ বা অরবিন্দ ঘোষ (১৫ আগস্ট ১৮৭২ – ৫ ডিসেম্বর ১৯৫০) ভারতীয় বাঙালি রাজনৈতিক নেতা, আধ্যাত্মসাধক এবং দার্শনিক। তার পিতা কৃষ্ণধন ঘোষ এবং মাতামহ রাজনারায়ণ বসু। অরবিন্দ ঘোষ বাল্যকালে ইংল্যান্ডে লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে গমন করেন এবং কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হতে ট্রাইপস পাস করেন। দেশে ফিরে এসে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার অনুজ বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি কংগ্রেসের চরমপন্থী গ্রুপের নেতৃত্বে থাকাকালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে (১৯০৫–১৯১১) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

অরবিন্দ ঘোষ জীবনী – Sri Aurobindo Ghose Biography in Bengali

নামঅরবিন্দ ঘোষ
জন্ম15 আগস্ট 1872
পিতাকৃষ্ণধন ঘোষ
মাতাস্বর্ণলতা দেবী
জন্মস্থানকলকাতা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)
জাতীয়তাভারতীয়
পেশাভারতীয় রাজনীতিক, দার্শনিক, যোগ এবং আধ্যাত্মিক গুরু
মৃত্যু5 ডিসেম্বর 1950 (বয়স 78)

অরবিন্দ ঘোষ এর জন্ম: Sri Aurobindo Ghose’s Birthday

অরবিন্দ ঘোষ 15 আগস্ট 1872 জন্মগ্রহণ করেন।

“দেবতার দীপ হস্তে যে আসিল ভবে সেই রুদ্র দূতে, বলো, কোন রাজা কবে পারে শাস্তি দিতে, বন্ধন শৃঙ্খল তার চরণ বন্দনা করি করে অভ্যর্থনা।” কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ যাঁর উদ্দেশ্যে এই প্রশস্তি রচনা করেছিলেন, তিনিই ঋষি – কবি, অগ্নিযুগের মহানায়ক ও সিদ্ধযোগী শ্রীঅরবিন্দ। মুরারীপুকুরের গুপ্ত সমিতির সংবাদ পুলিশ জানতে পেরেছিল শ্রীরামপুরের নরেন গোঁসাই – এর কাছ থেকে। ফলে ইংরাজের রাজশক্তি মানিকতলা বোমা মামলায় কারারুদ্ধ করেছিল অরবিন্দ, উল্লাসকর, দেবব্রত, কানাই দত্ত, সত্যেন বসু, উপেন ব্যানার্জি, হেমচন্দ্র দাস (কানুনগো) ও বারীন ঘোষ প্রমুখ বিপ্লবীদের।

পরাধীন ভারতের সে এক গৌরবোজ্জ্বল দিন, যাঁরা এতদিন গ্যাবিবন্ডি, মাৎসিনী প্রভৃতির ত্যাগ ও কর্মসাধনার কথা বই পুস্তকে পড়ে মুগ্ধ ও চমৎকৃত হতেন, কৃতজ্ঞ চিত্তে বিনিদ্র রজনী যাপন করতেন, তাঁরা দেখতে পেলেন নবীন সম্ভাবনার অরুণিমা।

অরবিন্দ ঘোষ এর পিতামাতা ও জন্মস্থান: Sri Aurobindo Ghose’s Parents And Birth Place

অরবিন্দের জন্ম হয়েছিল লন্ডনের নরউড পল্লীতে ১৮৭২ খ্রিঃ আগস্টে। তার বাবা কালনানিবাসী ডাঃ কৃষ্ণধন ঘোষ আই.এম.এস. ছিলেন ইয়ং বেঙ্গলের উত্তর সাধক ৷ মা স্বর্ণলতা দেবী ছিলেন মনীষী ও স্বাধীন ভারতের মন্ত্রদ্রষ্টা রাজনারায়ণ বসুর কন্যা। বাল্যবয়সেই ১৮৭৯ খ্রিঃ অন্য দুই ভাই বিনয়কুমার ও মনোমোহনের সঙ্গে অরবিন্দ কৃষ্ণধন ও স্বর্ণলতা বিলেত রওনা হন। সমুদ্রবক্ষে জাহাজেই জন্ম হয় বাংলার অন্যতম অগ্নিশিশু বারীন্দ্রকুমারের।

অরবিন্দ ঘোষ এর শিক্ষাজীবন: Sri Aurobindo Ghose’s Educational Life

অরবিন্দ ছিলেন পিতার পাশ্চাত্য ভাবধারা ও মাতার ভারতীয় সাধনা ও সংস্কৃতি এই দুই ধারার সম্মিলিত পরিণতি। সাত বছর বয়সে অরবিন্দকে ম্যানচেস্টারের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। দুবছর পর সেন্টপলস স্কুলে। সেখান থেকে কেমব্রিজ ও কিংস কলেজে পড়াশোনা করে ট্রাইপোস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর পিতার ইচ্ছানুযায়ী আই.সি.এস পরীক্ষা দেন ১৮৯০ খ্রিঃ।

একটি বিষয়ে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন ও দ্বিতীয় স্থান পান তাঁর সতীর্থ। ক্রফট। এই মিঃ বীচ ক্রফট আলিপুর বোমার মামলায় অন্যতম বিচারক ছিলেন। ঘোড়ায় চড়া পরীক্ষা ছিল আই.সি.এস. এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরীক্ষার দিন অরবিন্দ উপস্থিত না হওয়ায় আই.সি.এস – এর সার্টিফিকেট তাঁর জুটল না। সেই সময় ভারতের বরোদা রাজ্যের গাইকোয়াড় গিয়েছিলেন লন্ডনে।

তিনি অববিন্দের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বরোদা রাজ্যে নিয়ে এলেন। শুরু হল অরবিন্দের কর্মজীবন। এই সময়ে সাহিত্যিক দীনেন্দ্রকুমার রায় ছিলেন বরোদায়। তার কাছে অববিন্দ বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। পরে ভারতীয় দর্শন ও শাস্ত্রাদিতে তিনি বিশেষ ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন।

অরবিন্দ ঘোষ এর প্রথম জীবন: Sri Aurobindo Ghose’s Early Life

বরোদা স্টেটে কিছুদিন কাজ করার পর অরবিন্দ বরোদা কলেজে ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপকের চাকরি গ্রহণ করেন। প্রচুর উপার্জন করলেও তিনি খুবই সাধারণ ভাবে থাকতেন। সংসার ইত্যাদি বিষয়ে তিনি বরাবরই ছিলেন উদাসীন। এই সময়ে অরবিন্দর মামা যোগীন্দ্রনাথ বসুর নিকট সাহিত্য ও সংস্কৃতি শিক্ষা করেন। অবসর সময়ে যোগাভ্যাস করতেন মহাযোগী শ্রীবিষ্ণু ভাস্কর লেলে – এর সান্নিধ্যে। বরোদা অবস্থানকালেই অরবিন্দ মৃণালিনী দেবীকে বিবাহ করেন। তাঁর ত্যাগ ও সাহচর্য ছিল অরবিন্দের রাজনৈতিক জীবন ও তপশ্চর্যার অন্যতম প্রেরণা স্বরূপ।

সেইকালে ভারতের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চলেছে প্রচণ্ড আলোড়ন। অরবিন্দ বোম্বাইয়ের ইন্দুপ্রকাশ পত্রিকায় এ বিষয়ে কয়েকটি সুচিন্তিত প্রবন্ধ লিখে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। কংগ্রেসের আবেদন নিবেদনের রাজনীতির অন্তঃসারশূন্যতা বিষয়ে তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ ছিল এই প্রবন্ধগুলির প্রতিপাদ্য। মানবমুক্তির সাধক ও মহাযোগী অরবিন্দ বরোদায় ১৩ বৎসর অতিবাহিত করে নিজেকে প্রস্তুত করেন।

১৯০৬ খ্রিঃ ৩৪ বছর বয়সে তিনি কলকাতায় আসেন। সেই সময় কার্জন – ফুলারের বঙ্গ ব্যবচ্ছেদের প্রতিবাদে রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ার চলেছে বাংলায়। ইংরাজ রাজশক্তির রক্তমাখা রাজনীতিতে নির্যাতীত ও পর্যুদস্ত হচ্ছেন বাংলার জনগণ। কলকাতায় এসে অরবিন্দ জাতীয় কলেজের অধ্যক্ষের পদে চাকরি গ্রহণ করেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধের জন্য কিছুদিন পরেই অধ্যক্ষের পদ ত্যাগ করেন।

অরবিন্দ ঘোষ এর কর্ম জীবন: Sri Aurobindo Ghose’s Work Life

এরপরেই অরবিন্দ প্রকাশ করেন বন্দেমাতরম পত্রিকা। সেই সময় তাঁর অগ্নিবর্ষী লেখাগুলো ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের নব দিশারী। কিছুদিনের মধ্যেই বন্দেমাতরম পত্রিকায় যোগ দিলেন শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী, বিপিনচন্দ্র পাল ও হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ প্রমুখ। এভাবেই অরবিন্দর যোগাযোগ ঘটল ভারতের বিপ্লববাদীদের সঙ্গে। অরবিন্দ দেশাত্মবোধের জাগরণে ভগবদসত্তার প্রেরণা অনুভব করতেন। তাই মুরারীপুকুরের গুপ্ত সমিতিতে প্রত্যহ গীতাপাঠ ও চন্ডীপাঠ হত।

পরবর্তীকালে গীতা বুকে নিয়ে শহীদরা হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে উঠেছেন। মেদিনীপুর কংগ্রেস অধিবেশনে ও সুরাট কংগ্রেসে নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের বিসম্বাদে অরবিন্দ ব্যথিত হন। বালগঙ্গাধর তিলকের ১৮৯৮ খ্রিঃ মান্দালয় জেলে কারাবাস ও চাপেকরের আত্মত্যাগ তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। পাঞ্জাবও জেগে উঠেছে সেই সময়। সর্দার অজিত সিংহের পাশে তাঁর দুই ভাই কিষেণ সিং ও সরণ সিং, অন্যদিকে লালা পিত্তিদাস, সুফী অম্বাপ্রসাদ, লালা বাঁকে দয়াল ও ডঃ ঈশ্বরীপ্রসাদ সর্দার অজিত সিং ও অম্বাপ্রসাদ গেলেন ইরানে মুক্তিসংগ্রামের ব্রত নিয়ে।

ইংরাজ রাজশক্তি ভাবতের এই নবজাগরণকে নিশ্চিহ্ন করবার জন্য চরম দমননীতির আশ্রয় গ্রহণ করল। অরবিন্দর মাতামহ মনীষী রাজনারায়ণ বসু ঠাকুর বাড়িতে যুবকদের সংগঠিত করে গঠন করেছিলেন গুপ্ত সমিতি। ঋকবেদের পুঁথি, মড়ার মাথার খুলি ও মুক্ত তলোয়ার সাক্ষী রেখে ভারত উদ্ধারের শপথ নিতেন তারা। ১৯০২ খ্রিঃ সিস্টার নিবেদিতা গোপনে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। দেওঘরের উপকন্ঠে রোহিনী পাহাড়ে বিপ্লবী যুবকগণ বোমা তৈরি করে কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে গিয়ে সহকর্মী প্রফুল্ল চক্রবর্তীকে হারালেন।

তিনিই বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের প্রথম শহীদ। অরবিন্দ তার বন্দেমাতরম পত্রিকায় লিখলেন “The buruacracy has thrown the gauntlet, we take it up.” ইতিমধ্যে প্রফুল্লচাকী ও যতীন বসু দার্জিলিঙে ঘুরে এলেন। তারপর প্রফুল্ল ও ক্ষুদিরাম গেলেন মজঃফরপুর – কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে। শহীদ হন প্রফুল্ল, ধরা পড়ে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়ে আত্মবলিদান করলেন ক্ষুদিরাম। ভাগ্যবিধাতা অরবিন্দকে বেশিদিন রাজনীতি ক্ষেত্রে রাখেন নি। হঠাৎ মুরারীপুকুরের গুপ্তসমিতির সংবাদ পুলিশ পেল শ্রীরামপুরের নরেন গোসাইয়ের জবানবন্দীতে। ফলে কারারুদ্ধ হলেন অরবিন্দ সহ উল্লাসকর দত্ত, উপেন বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র দাস, বারীন্দ্রকুমার, সত্যেন বসু ও কানাইলাল দত্ত প্রভৃতি।

১৯০৮ খ্রিঃ ৫ ই মে অরবিন্দ কারারুদ্ধ হলেন আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। বিচারে কানাইলাল ও সত্যেনের ফাঁসির হুকুম হল ! বাকি যাঁরা রইলেন তাদের নিয়ে মামলা চলতে লাগল এডিশনাল জজ মিঃ বীচ ক্রফট – এর আদালতে। মামলার রায় জানা গেল ১৯০৯ খ্রিঃ ৬ ই মে। বারীন ঘোষ ও উল্লাসকরকে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদন্ড। অন্যান্য অনেকেরই একবছর থেকে দশ বছর পর্যন্ত কারাদন্ডের আদেশ হল। অরবিন্দ মুক্তি পেলেন, তবে তখন তিনি আর শুধু বিপ্লবী নায়ক অরবিন্দ নন।

কারাজীবনের অবকাশে ইতিমধ্যেই কখন বিপ্লবী অরবিন্দের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে এক জ্যোতির্ময় পুরুষ, তাঁর নাম ঋষি অরবিন্দ। অরবিন্দর মুক্তির ব্যাপারে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অবদান ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আসামী পক্ষের প্রধান কৌসুলী হিসেবে অরবিন্দকে সমর্থন করতে গিয়ে তিনি যে সওয়াল করেছিলেন, তা ইতিহাস হয়ে আছে। কারাগারের নির্জনতায় অরবিন্দের ভগবদদর্শন হয়। একইরকম সৌভাগ্য হয়েছিল বিপিনচন্দ্র পালের।

বক্সার জেলে নির্বাসন কালে কৃষ্ণকুমার মিত্ররও ভগবদ দর্শনলাভ হয়। বরোদায় থাকতেই অরবিন্দের যৌগিক জীবন শুরু হয়েছিল। আলিপুর জেলে ঘটেছিল তার পূর্ণ পরিণতি। দক্ষিণেশ্বরের শ্রীরামকৃষ্ণ সম্বন্ধে অরবিন্দ বলেছিলেন, তিনি জাতীয় জীবনের উৎস। দক্ষিণেশ্বরের মাটি পরমশ্রদ্ধায় একটি কাগজের প্যাকেটে নিজের সঙ্গে রেখেছিলেন। ক্লার্ক সাহেব তার ঘরখানা তল্লাসী করবার সময় সেই মাটিকেই বিস্ফোরক দ্রব্য মনে করে মহা হাঙ্গামা বাঁধিয়েছিলেন।

আলিপুর জেলে পাশাপাশি তিনখানা ঘরের একটি ছোট সেলে অরবিন্দকে রাখা হয়েছিল। তিনি লিখেছেন, “ এইখানে ক্ষুদ্র ঘরের দেওয়াল সঙ্গী – স্বরূপ, যেন নিকটে আসিয়া ব্রহ্মময় হইয়া আলিঙ্গন করিতে উদ্যত। আলিপুরের নির্জন কারাবাসে অপূর্ব প্রেম – শিক্ষা পাইলাম। ” কারাজীবনে অরবিন্দর ভাবান্তর দেখে এমারসন সাহেব বাড়ি থেকে ধুতি, জামা ও পড়বার বই আনবার অনুমতি দিয়েছিলেন। তখন বাড়িতে চিঠি লিখে গীতা ও উপনিষদ আনান হয় তার জন্য। অরবিন্দ বরোদায় থাকতেই আধ্যাত্মিক শক্তিবলে পরাধীন ভারতের মুক্তির সন্ধান পেয়েছিলেন।

তাই ১৯০৩ খ্রিঃ তিনি দেশের দিকে দিকে ভবানী মন্দির স্থাপন করেন। কর্মযোগীর আশ্রম গড়ে তুলবার নির্দেশ দিয়েছিলেন নর্মদা তীরে গঙ্গোনাথ আশ্রমে ও কলকাতার মুরারী পুকুরের বাগানে। যোগী শ্রীবিষ্ণু ভাস্কর লেলে যোগশিক্ষা দিয়েছিলেন তাঁকে। বন্ধুবর দেশপান্ডে ও শ্রীমাধবরাও ওঁকারমন্ত্র জপ শিক্ষা দেন। এর ফলেই অরবিন্দ হয়েছিলেন স্থিতধী। সুরাট কংগ্রেস অধিবেশনে যখন লোকমান ৷ তিলকও অরবিন্দের নেতৃত্বের জন্য সকলে আকুল তখন অনুনয় – বিনয়ের নরম – পন্থীগোষ্ঠী সেই সভা ভন্ডুল করে দিয়েছিলেন।

অববিন্দ বললেন, “আমাদের এই জাতীয়তার আন্দোলন …. এ হচ্ছে একটি ধর্ম, যাকে আশ্রয় করে আমরা বাঁচতে চেষ্টা করব। এ একটা ধৃতি, যার সাহায্যে আমরা জাতির মধ্যে দেশবাসীর মধ্যে ভগবানকে প্রত্যক্ষ করতে চাই ”। মুক্তিযজ্ঞের ঋত্বিক দেশকে দিলেন নতুন পথ। রানাডেকে অরবিন্দ লিখেছিলেন, “যে যোগাবস্থা প্রার্থী তাহার পক্ষে জনতা নির্জনতা সমান হওয়া উচিত। শ্রদ্ধা ও আত্মসমর্পণই সিদ্ধিলাভের পন্থা— প্রাণপণে ভগবানকে ডাকিলাম — সমস্ত অন্তঃকরণে শান্তি আসিল।”

অরবিন্দের ভাবান্তর দেখে জেলের ডাক্তার ডাঃ ভেলি সকালে ও বিকালে তাঁর বেড়াবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। অরবিন্দ জেল থেকে মুক্ত হয়ে দেখলেন চিদাম্বরম পিলে ১৯০৭ খ্রিঃ থেকে সাত বছরের জন্য কারারুদ্ধ, কৃষ্ণকুমার মিত্র, অশ্বিনীকুমাব দত্ত প্রভৃতি নয় জন নেতা নির্বাসনে। লোকমান্য তিলক মান্দালয়ের কারাগারে, বিপিনচন্দ্র পাল ইংলন্ডের প্রবাসী। কিন্তু কংগ্রেসের মধ্যপন্থীরা স্যার রাসবিহারী ঘোষকে সভাপতি করে ইংরাজদের করুণালাভের প্রত্যাশায় দিন গুণছেন। অরবিন্দ ইংরাজিতে কর্মযোগীন ও বাংলায় ধর্ম নামে পত্রিকা প্রকাশ করলেন।

তিনি ধর্ম পত্রিকায় লিখলেন, “যাঁহারা দেশের জন্য সমস্ত জীবন উৎসর্গ করিতে প্রস্তুত, যাঁহারা ভয়ের পরিচয় রাখেন না, ভগবান ও বঙ্গজননী ভিন্ন কাহাকেও জানেন না ও মানেন না, তাহারা অগ্রসর না হইলে বঙ্গের ভবিষ্যৎ অন্ধকারময় হইবে। ” কিন্তু ফল কিছুই হল না। মধ্যপন্থীগণের এমনই অবস্থা যে তারা সভাসমিতি পর্যন্ত সাহস করে করতে পারেন না। ৩০ শে আশ্বিন রাখীবন্ধন উৎসবে নেতারা জাতীয় ঘোষণাপত্র পাঠ ও বিদেশী বস্ত্র বর্জন করলেন।

এদিকে ব্রিটিশ রাজশক্তি দমননীতি এমনই দৃঢ় করল যে দেশবাসীর মনোবল ভেঙ্গে পড়বার মত অবস্থা। দেশের এই অবস্থা দেখে অরবিন্দ ধর্ম পত্রিকায় লিখলেন, “নিজের মধ্যে আত্মার বিশাল নীরবতায় ভগবান ও জীবের সংযোগ যে গভীর, অবিচলিত, অভ্রান্ত, শুদ্ধ, সুখ – দুঃখ জয়ী, পাপ – পুণ্যবর্জিত শক্তি সম্ভৃত হয়, সেই মহাসৃষ্টিকারিণী, মহা প্রলয়কারী, মহাস্থিতিশালিনী, জ্ঞানদায়িনী মহাসরস্বতী, ঐশ্বর্যদায়িনী, মহালক্ষ্মী শক্তিদায়িনী মহাকালী, সেই তেজের সংযোজনে একীভূতা চন্ডী প্রকটিত হইয়া ভারতের কল্যাণে ও জগতের কল্যাণে কৃতোদ্যম হইবেন।”

অরবিন্দের বিপ্লববাদ মানবমুক্তির প্রেরণায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিকারের জন্য। যে ব্রত নিয়ে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয়েছিল সেই ব্রত নিয়েই অরবিন্দ বাণীর কমল বন থেকে কঙ্করময় – রক্তঝরা বিপ্লবের পথে নেমেছিলেন। ভাবতের তারুণ্য শক্তিকে উদ্বুদ্ধ করে মহামন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন। অরবিন্দ তাঁর দিব্য জীবন গ্রন্থে লিখেছেন “একটি অখন্ড সোমধারা শুধু ব্যক্তি জীবন নহে, সমগ্র বিশ্ব – জীবনের মধ্যে নিরত্তর প্রবাহিত হইতেছে। সেই ধারা হইল দিব্য জ্যোতিঃ ও দিব্য আনন্দধারা।

সেই দিব্য জ্যোতিঃ ও দিব্য আনন্দকে লাভ কবিতে হইবে এবং তাহাকে ব্যবহার করিতে হইবে। এই দিব্য আনন্দই সকল অস্তিত্বের মূল আনন্দ-আনন্দময় পরমপুরুষ।” ভারত – জননী ছিল অরবিন্দের চিন্ময়ী সত্তা। তাই তিনি বলেছেন, “Mother India is not piece of earth, she is power, a Godhead, for all nations have such a Devi supporting their separate existence and keeping it in being.” তিনি মহাশক্তি লাভের জন্য প্রার্থনা করেছেন, “Mother Durga ! Giver of force and love and knowledge . in he battle of life in India’s battle, we are worriors commisssioned by thee.”

ইতিমধ্যে বিপ্লবীরা বিচারক শামসুল আলমকে হত্যা করলেন। এই হত্যার মামলায় ইংরাজ সরকার অরবিন্দকে জড়িত করবার মতলব করল। বিশ্বস্ত সূত্রে এই সংবাদ জানতে পেরে অরবিন্দ নিবেদিতাকে জানালেন। তারপর বাগবাজার বোসপাড়া লেনের বাড়িতে ভগিনী নিবেদিতার সঙ্গে আলোচনা করে তিনি চন্দননগরে মতিলাল রায়ের বাড়িত চলে যান। চন্দননগর হল ফরাসী সরকারের শাসনাধীন ৷

ইংরাজ সরকারের নাগালের বাইরে। চন্দননগর থেকে ১৯১০ খ্রিঃ ৪ ঠা এপ্রিল জলপথে ফরাসী অধিকৃত পন্ডীচেরীতে পৌঁছালেন অরবিন্দ। এই যাত্রায় তার সঙ্গী ছিলেন নলিনীকান্ত গুপ্ত, সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী, সৌরীন্দ্রনাথ বসু ও বিজয়কুমার নাগ। অরবিন্দ তখন যোগী। বিপ্লবের মাটি থেকে তিনি কর্মবন্ধন ছিন্ন করে গেলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, তাঁর রোপিত বীজ শুধু অঙ্কুরিতই নয়, ভাবীকালে মহীরুহ হয়ে উঠবার সম্ভাবনায় উজ্জ্বল।

পরবর্তীকালের বিপ্লববাদ ব্রিটিশ রাজশক্তির মূলে যে চরম আঘাত করেছিল তাই তার প্রমাণ। পন্ডীচেরী চলে যাবার চার বছর পরে অধ্যক্ষ গিরিশচন্দ্র বসুর বাসভবনে মৃণালিনী দেবী ইহলোক ত্যাগ করেন। পন্ডীচেরীতে অরবিন্দের ৪২ তম জন্মদিনে আর্যপত্রিকা প্রকাশিত হয়। ধীরে ধীরে তাঁকে কেন্দ্র করে সেখানে যোগাশ্রম গড়ে উঠল। নিজের যোগলব্ধ শক্তির প্রভাবে দেশের মুক্তি ও মানবাত্মার আত্মিক বিকাশ সাধনেই অরবিন্দ আত্মনিয়োগ করলেন ৷ মানব – সমাজকে দিব্যজীবনের আদর্শ গ্রহণে তিনি আহ্বান জানালেন।

এই সময় ফরাসী – কন্যা মাদাম মীরা ও মঁসিয়ে পল রিসার অরবিন্দের দিব্যানুভূতিতে আকৃষ্ট হয়ে স্থায়ীভাবে পন্ডীচেরীতে বসবাস করতে থাকেন। তাঁরাই আশ্রমের পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অরবিন্দ তার তত্ত্ব সম্পর্কে বলেছেন, “মানুষ যদি নিছক প্রাণধর্ম ও মনোধর্মকে আশ্রয় করে থাকে, তাহলে মানব – সমাজে দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ দূর হবে না। চাই নীতির আদর্শ — ধর্মের আদর্শ ……… সমষ্টিগত ভাবে যদি আমাদের লক্ষ্য হয় ভাগবত উপলব্ধি; তাহলে মানব জাতির বিবর্তন অসম্ভব। তখনই মানুষে মানুষে ভেদজ্ঞান লুপ্ত হবে, উপলব্ধি করব একই হয়েছেন ‘বহু’, ‘বহু’ রয়েছেন ‘ একে ’। ”

রবীন্দ্রনাথ ১৯২৮ খ্রিঃ ২৯ শে মে ইউরোপে ভ্রমণে যাচ্ছিলেন। যাবার পথে পন্ডীচেরীতেনেমে পুরাতন বন্ধু অরবিন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁদের তখনকার কথোপকথন ১৩৩৫ সনের শ্রাবণ সংখ্যার প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “শ্রীঅরবিন্দ আত্মাকেই সব চেয়ে সত্য করে চেয়েছেন। ‘সত্য করে পেয়েছেন। সেই তাঁর দীর্ঘ তপস্যার চাওয়া ও পাওয়ার দ্বারা তার সত্তা ওতপ্রোত। ইনি এঁর অন্তরের আলো দিয়েই বাইরের আলো জ্বালাবেন। …. অরবিন্দকে তাঁর যৌবনের মুখে ক্ষুব্ধ আন্দোলনের মধ্যে যে তপস্যার আসনে দেখেছিলুম, সেখানে তাঁকে জানিয়েছি — অরবিন্দ। রবীন্দ্রের লহ নমস্কার। আজ তাঁকে দেখলুম তাঁর দ্বিতীয় তপস্যার আসনে অপ্রগলভ স্তব্ধতায়। আজও তাঁকে মনে মনে বলে এলুম অরবিন্দ, রবীন্দ্রের লহ নমস্কার।” – অরবিন্দ তার বিশ্বাসের কথা জগদ্বাসীকে জানিয়েছেন, ‘পৃথিবীতে অতিমানবের মহাপ্রকাশ হবে। আবার ধর্ম সংস্থাপন হবে, সবার হবে ভাগবত জীবন।’

অরবিন্দ ঘোষ এর মৃত্যু: Sri Aurobindo Ghose’s Death

১৯৫০ খ্রিঃ ৫ ই ডিসেম্বর এই মহাপ্রাণ ঋষি নিত্যলীলায় প্রবেশ করেন।

Leave a Comment