পৃথিবীর জনঘনত্বের তারতম্যের কারণগুলি আলোচনা করো।

পৃথিবীর জনঘনত্বের তারতম্যের কারণগুলি আলোচনা করো: পৃথিবীর জনসংখ্যা সব দেশে ও সব অঞ্চলে সমানভাবে বিন্যস্ত নয়। পৃথিবীর কোথাও প্রচুর মানুষ বসবাস করেন, আবার কোথাও বা আদিগন্ত জনহীন বিস্তীর্ণ প্রান্তর লক্ষ্য করা যায়। ভৌগোলিক পটভূমিতে জনঘনত্বের এই তারতম্য বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ের উপর নির্ভর করে। নিম্নে জন ঘনত্বের তারতম্যের সেই কারণগুলি আলোচনা করা হলো-

A)প্রাকৃতিক কারণ

1)ভূ প্রকৃতি-জনঘনত্বের তারতম্যের অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক হলো ভূ-প্রকৃতি। বন্ধুর পার্বত্য ও মালভূমি অঞ্চল, ধ্বস প্রবন ঢালু জমি, জলমগ্ন ভূমি ভাগ ইত্যাদি জনঘনত্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। এই সমস্ত ভূমিভাগ মানুষের জীবিকা অর্জন তথা সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্রিয়া-কলাপ পরিচালনার ক্ষেত্রে অসুবিধা জনক। এই কারণে হিমালয়, আল্পস, রকি, আন্দিজ ইত্যাদি পার্বত্য অঞ্চল জনবিরল। আবার বিস্তীর্ণ নদী অববাহিকার সমভূমি ও উপকূলবর্তী সমভূমি, নদী মঞ্চের উপরিভাগের বন্যা থেকে সুরক্ষিত অঞ্চল এবং শৈলশিরা আর মধ্যবর্তী সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল উপত্যকা মানুষের জীবন ধারণে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। তাই এইসব অঞ্চল স্বাভাবিকভাবেই জনবহুল হয়।

2)জলবায়ু-জন বন্টনের স্থানিক তারতম্য সৃষ্টিতে জলবায়ুর ভূমিকা অনুষ্ঠিকার্য। প্রচন্ড উষ্ণ ও শীতল, প্রচুর বৃষ্টিপাত, অনিয়মিত সূর্যালোক ইত্যাদি জলবায়ুর প্রতিকূল অবস্থা জনবসতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অসুবিধা। এই কারণে নিরক্ষীয় বৃষ্টি অরণ্যের উষ্ণ-আর্দ্র পরিবেশ অথবা আলাস্কার হিমশীতল জলবায়ু অঞ্চল জনবিরল। অন্যদিকে সমভাবাপন্ন জলবায়ু মানুষের কায়িক পরিশ্রম লাঘবে, মানসিক বিকাশে এবং সাংস্কৃতিক মান উন্নয়নে সাহায্য করে। অর্থাৎ সমভাবাপন্ন জলবায়ু মানুষের জীবনধারণের অনুকূল পরিবেশ রচনা করে। এই কারণে নাতিশীতোষ্ণ স্নিগ্ধ শীতল ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত যুক্ত দেশগুলির জনঘনত্ব অধিক হয়।

3)মৃত্তিকা-ভূপৃষ্ঠের যে সমস্ত অঞ্চলের মৃত্তিকা উর্বর সেই সমস্ত অঞ্চলে কৃষি কাজের উন্নতির জন্য জনঘনত্ব বেশি হয়। অন্যদিকে অনুর্বর মৃত্তিকা যুক্ত অঞ্চল কৃষি কাজের অনুপযোগী বলে সেখানকার জনঘনত্ব কম হয়। প্রধানত নদী গঠিত প্লাবন ভূমির পলিমৃত্তিকা, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের চার্নোজেম মৃত্তিকা, দক্ষিণ ভারতের কৃষ্ণ মৃত্তিকা কৃষিকাজের উপযোগী হওয়ায় কৃষিকাজ ও কৃষিভিত্তিক শিল্পকে কেন্দ্র করে উক্ত অঞ্চলগুলিতে প্রচুর সংখ্যক মানুষ বসবাস করেন। অন্যদিকে মধ্য অক্ষাংশের পডজল মৃত্তিকা ও নিম্ন অক্ষাংশের ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা কৃষিকাজের অনুপযোগী হওয়ায় ওই সমস্ত অঞ্চল তুলনামূলক ভাবে জনবিরল।

4)জলসম্পদ-শুধুমাত্র পানীয় হিসাবেই নয়, কৃষি, শিল্প ও পরিবহনের ক্ষেত্রেও জলের ভূমিকা অপরিসীম। তাই বহু ক্ষেত্রেই হ্রদ, সরোবর, পুষ্কোরিণী ও নদী তীরবর্তী সমতল ভূমিকে কেন্দ্র করে জনবসতি বিস্তার লাভ করে। কিন্তু জল বিহীন উষ্ণ ও শুষ্ক মরু অঞ্চল এবং শীতল মেরু অঞ্চলে প্রধানত জলের অভাবের কারণেই জনঘনত্ব কম হয়।

5)বনভূমির অবস্থান-বনভূমির অবস্থানও জনঘনত্বকে প্রভাবিত করে। বনভূমির কাঠ, মধু, মোম, লাক্ষা, ভেষজ উদ্ভিদ ইত্যাদি বনজ সম্পদকে ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ক্রিয়া-কলাপ পরিচালিত হয় বলে অধিকতর অর্থনৈতিক গুরুত্ব যুক্ত স্বাভাবিক উদ্ভিদ অঞ্চলের জনঘনত্ব অপেক্ষাকৃত বেশী। এই কারণে উত্তর আমেরিকা ও ইউরেশিয়ার তৈগা বনভূমির নিকটবর্তী অঞ্চলের জনঘনত্ব বেশি। তবে অনেক সময় ঘন অরণ্য জন বিরলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন-আমাজন ও কঙ্গো নদী অববাহিকার সেলভা অরণ্যের উষ্ণ ও আর্দ্র অস্বাস্থ্যকর জলবায়ু, বিভিন্ন বিষাক্ত কীটপতঙ্গের উপদ্রব মনুষ্য বসবাসের ক্ষেত্রে আদৌ সুখকর নয়। তাই এই অরণ্য অঞ্চল জনবিরল।

6)খনিজ সম্পদ প্রাপ্তি-খনিজ সম্পদের প্রাপ্তি জনসংখ্যার বন্টন তথা জনঘনত্বকে বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করে। উষ্ণ মরু অঞ্চলে ও বন্ধুর মালভূমি অঞ্চলে জনবসতি গড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ না থাকলেও ‌ কোন কোন স্থানে খনিজ সম্পদ প্রাপ্তির জন্য জনবসতি গড়ে ওঠে। শুধুমাত্র খনিজ সম্পদের উপস্থিতির জন্য অরণ্যে ঢাকা বন্ধুর মালভূমি অঞ্চলের অন্তর্গত কি কিরিবুরু, মেঘাতাবুরু ও বোলানিতে জনঘনত্ব কিছুটা বেশি। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার মরু অঞ্চলে কেবলমাত্র সোনার খনিকে কেন্দ্র করে কালগুর্লি শহর গড়ে উঠেছে।

B)অপ্রাকৃতিক কারণ

১)অর্থনৈতিক অবস্থা-অর্থনৈতিক উন্নতি ও অনুন্নতি জনঘনত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে। যেসব অঞ্চলে কৃষি, শিল্প, পশুপালন, খনিজ সম্পদ আহরন, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি অর্থনৈতিক কাজকর্মের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, সেই সকল অঞ্চলের জনঘনত্ব বেশি হয়। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক দিক থেকে পশ্চাৎপদ অঞ্চলগুলিতে জনঘনত্ব কম হয়। যেমন-কলকাতা, মুম্বাই, নিউইয়র্ক ইত্যাদি শহরগুলিতে প্রধানত অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণেই জনঘনত্ব বেশি।

২)সামাজিক পরিকাঠামো-শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পকলা, উন্নত প্রযুক্তির সুযোগ, উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়গুলি যেকোনো দেশ বা অঞ্চলের সামাজিক অবস্থা বা পরিকাঠামোকে নির্দেশ করে। এই সমস্ত পরিকাঠামোর জন্য মানুষ সুখ সমৃদ্ধি লাভ করে। তাই উন্নত সামাজিক পরিকাঠামো যে সমস্ত অঞ্চলে আছে সেই সমস্ত অঞ্চলের জনঘনত্ব বেশি হয়। এই সামাজিক অবস্থা আবার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং পরিব্রাজনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে ঘনবসতি গড়ে ওঠে। যেমন-পুরী, গয়া, কাশী, বৃন্দাবন, মক্কা, জেরুজালেম ইত্যাদি। আবার মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরিবিদ্যা, শিক্ষা-সংস্কৃতির উন্নতির ফলেও বিশেষ বিশেষ অঞ্চল খ্যাতি লাভ করে এবং ওই খ্যাতিসম্পন্ন অঞ্চলগুলিতে ঘনবসতি গড়ে ওঠে। যেমন আলীগড়, শান্তিনিকেতন ইত্যাদি। এছাড়া পরিব্রাজনের প্রভাবে কোথাও জনসমষ্টির অভিবাসন ঘটলে সেখানকার জনঘনত্ব বেড়ে যায় এবং প্রবাসন ঘটলে সেখানকার জনঘনত্ব কমে যায়।যেমন- উদ্বাস্তুদের অভিবাসনের ফলে দণ্ডকারণ্য অঞ্চলের জনঘনত্ব বেড়ে গিয়েছিল। আবার সুলতানি যুগে মোহাম্মদ বিন তুঘলক দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে রাজধানী স্থানান্তর করলে প্রবাসনের ফলে দিল্লির জনঘনত্ব কমে গিয়েছিল।

৩)রাজনৈতিক অবস্থা-সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থাগুলির মতো রাজনৈতিক অবস্থাও জনঘনত্বের তারতম্যের অন্যতম কারণ। সরকারি নীতি, যুদ্ধবিগ্রহ, জাতিদাঙ্গা, ধর্মীয় অনুদারতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ইত্যাদি কারণে মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়। ফলে জনঘনত্বের তারতম ঘটে। যেমন-1947 খ্রীঃ দেশভাগের সময় এবং তার পরবর্তীকালে তৎকালীন পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান থেকে দলে দলে শরণার্থী ভারতে আসার ফলে ভারতের জনঘনত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।

Leave a Comment