পর্বতের শ্রেনীবিভাগ – পর্বত কাকে বলে? পর্বত কয় প্রকার?

পর্বতের শ্রেনীবিভাগ – পর্বত কাকে বলে? পর্বত কয় প্রকার?: পৃথিবীর উপরের অংশটিকে ভূত্বক বা ভূপৃষ্ঠ বলা হয়ে থাকে। পৃথিবীর উপরিপৃষ্ঠ সব জায়গায় সম প্রকৃতির নেই কোথাও উঁচু বা কোথাও নিচু। পৃথিবীর উপরিপৃষ্ঠে যে ভূমিরূপগুলি দেখা যায় সেগুলিকে উচ্চতার উপর ভিত্তিকে করে প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়, যথা – সমভূমি, মালভূমি ও পাহাড় বা পর্বত। এখানে আমরা পর্বতের শ্রেনীবিভাগ সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করবো।

পর্বত বলতে পৃথিবীর উপরিভাগের সুউচ্চ অংশ গুলিকে বোঝানো হয়ে থাকে। সাধারনত পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ১০০০ মিটারের বেশি উচ্চতা বিশিষ্ট, বহুদূর বিস্তৃত, খাড়া ঢালযুক্ত ও উঁচু শৃঙ্গযুক্ত শিলাময় ভূমিরূপগুলিকে পাহাড় বা পর্বত হিসাবে গন্য করা হয়। একাধিক পর্বত পরস্পরের সমান্তরালে বিস্তৃত হলে তাকে পর্বতশ্রেনী বলে। যেমন – হিমালয় পর্বতশ্রেনী, আল্পস পর্বতশ্রেনী প্রভৃতি। তবে পাহাড়ের উচ্চতা পর্বতের উচ্চতার থেকে কম হয়ে থাকে।

পর্বতের শ্রেনীবিভাগ  – পর্বত গুলিকে তাদের উৎপত্তি, গঠন, উচ্চতা, আকৃতি ও ঢালের তারতম্যের উপর ভিত্তি করে পর্বত গুলিকে চারটি শ্রেনীতে ভাগ করা হয়ে থাকে, যথা – (ক) ভঙ্গিল পর্বত, (খ) স্তূপ পর্বত, (গ) আগ্নেয় পর্বত ও (ঘ) ক্ষয়জাত বা বিচ্ছিন্ন পর্বত। 

ভঙ্গিল পর্বত বা ভাঁজ পর্বত

পার্শ্বচাপের ফলে ভূপৃষ্ঠের উপরের নরম শিলা ভাঁজ পেয়ে  তরঙ্গের মতো যে বিশাল আকৃতির পর্বতের সৃষ্টি হয় তাকে ভঙ্গিল পর্বত বলে। 

যেমন – এশিয়ার হিমালয় (নবীনতম), দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বত, উত্তর আমেরিকার রকি পর্বত, ইউরোপের আল্পস পর্বতমালা ভঙ্গিল পর্বতের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। 

ভঙ্গিল পর্বতের বৈশিষ্ট্য 

  • মহীখাত অঞ্চলে সঞ্চিত পাললিক শিলায় ভাঁজ পরে ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি হয়ে থাকে। 
  • ভঙ্গিল পার্বত্য অঞ্চলে জীবাশ্মের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। 
  • ভাঁজ পর্বত গুলি বহু দূর অবধি বিস্তৃত, দীর্ঘায়িত ও সূউচ্চ পর্বতচূড়া বিশিষ্ট অনেক গুলি পর্বতশৃঙ্খলের সমন্বয়ের গঠিত হয়ে থাকে। তবে ভঙ্গিল পর্বত গুলির দৈর্ঘ্য প্রস্থের থেকে অনেক বেশি হয়ে থাকে। 
  • ভূমিকম্প প্রবন – ভঙ্গিল পর্বত গুলির গঠন এখনো চলতে থাকায় এই অঞ্চল গুলি ভূমিকম্প প্রবন হয়ে থাকে। 
  • পৃথিবীর পর্বত গুলির মধ্যে নবীনতম হল ভঙ্গিল পর্বত।
  • কিছু কিছু ভঙ্গিল পার্বত্য অঞ্চল অগ্ন্যুৎপাত সম্পন্ন হয়ে থাকে। যেমন – আন্দিজ, রকি পার্বত্য অঞ্চল।
  • উচ্চতার ভিত্তিতে হিমালয় পৃথিবীর উচ্চতম পর্বত এবং দৈর্ঘ্যের ভিত্তিতে আন্দিজ পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতমালা। 

ভঙ্গিল পর্বতের উৎপত্তি – ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টির কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত আছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – (ক) মহীখাত তত্ত্ব  ও (খ) পাতসংস্থান তত্ত্ব ।

ক) মহীখাত তত্ত্ব – বর্তমানে যে স্থানে বিশালাকার ভঙ্গিল পর্বতগুলি অবস্থান করছে, সেই স্থানে পর্বত সৃষ্টি পূর্বে ছিল এক বিশাল অগভীর সমুদ্র বা মহীখাত। হাজার হাজার বছর ধরে ঐসব মহীখাতে চারপাশের স্থলভাগের ক্ষয়প্রাপ্ত পলি সঞ্চিত হলে মহীখাতের তলদেশ ক্রমশ বসে যায়। মহীখাতের তলদেশ ক্রমশ বসে গেলে পার্শ্ববর্তী ভূখণ্ড ক্রমশ মহীখাতের দিকে সরে আস্তে থাকে এবং প্রবল চাপের ফলে মহীখাত ক্রমশ সরু ও গভীর হতে থাকে। এভাবে দুপাশের ভূখন্ড ক্রমশ পরস্পরের দিকে সরে আসতে থাকলে মহীখাতে সঞ্চিত পলিতে প্রবল পার্শ্বচাপের ফলে পাললিক শিলাস্তর সঙ্কুচিত হয় ও ভাঁজ প্রাপ্ত  হয়ে ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি করে। 

খ) পাতসংস্থান তত্ত্ব –  পাত সংস্থান তত্ত্ব অনুসারে পাশাপাশি অবস্থিত দুটি পাতের অভিসারী চলনের ফলে ঐ দুটি পাতের মধ্যবর্তী অগভীর সমুদ্র বা মহীখাতে পূর্বের সঞ্চিত পলিতে প্রবল পার্শ্বচাপের ফলে ভাঁজ পেয়ে ভঙ্গিল বা ভাঁজ পর্বতের সৃষ্টি হয়ে থাকে। এই পদ্ধতিতে হিমালয় পর্বতের সৃষ্টি হয়ে থাকে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে পাতের প্রান্তভাগের ভূমি ভাঁজ পেয়ে ভাঁজ পর্বতের সৃষ্টি হয়। যেমন – উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার রকি ও আন্দিজ পর্বত। 

হিমালয় পর্বত কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে ?

বর্তমানে যে স্থানে হিমালয় পর্বত অবস্থান করছে প্রায় দশ কোটি বছর আগে ওই স্থানে ছিল টেথিস নামক এক অগভীর সমুদ্র বা মহীখাত। এই মহীখাতের উত্তরে ছিল আঙ্গারাল্যান্ড নামক ভূমিভাগ যা ইউরোপ ও এশিয়ার মিলিত অংশ ইউরেশিয়া নামে পরিচিত এবং দক্ষিনে ছিল গন্ডোয়ানাল্যান্ড নামক সুপ্রাচীন ভূখণ্ড যা ভারত, আফ্রিকা প্রভৃতির সমন্বয়ে গঠিত। এই দুটি প্রাচীন ভূখণ্ডের ক্ষয়জাত পলি টেথিস মহীখাতে সঞ্চিত হতে থাকে। ওই প্রাচীন ভূখণ্ড দুটির মধ্যে গন্ডোয়ানাল্যান্ড পূর্বে থেকেই গতিশীল হওয়ায়, এটি দক্ষিণ দিক থেকে টেথিস মহীখাতে সঞ্চিত পলির উপর প্রবল পার্শ্বচাপ প্রদান করে যার ফলে পলিতে ভাঁজ পেয়ে বিশাল আকৃতির হিমালয় পর্বতমালার সৃষ্টি হয়। 

ভঙ্গিল পর্বতের শ্রেনীবিভাগ: ভূআলোড়নের প্রকৃতি ও বয়সের বিচারে ভঙ্গিল পর্বতকে দুভাগে ভাগ করা হয় – প্রাচীন ও নবীন ভঙ্গিল পর্বত। প্রাচীন ভঙ্গিল পর্বত – ভারতের আরাবল্লী, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপালেশিয়ান, ইউরোপের ক্যালিডোনিয়ান প্রভৃতি অন্যতম। নবীন ভঙ্গিল পর্বত – ভারতের হিমালয়, ইউরোপের আল্পস, উত্তর আমেরিকার রকি, দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ প্রভৃতি। 

স্তূপ পর্বত

পৃথিবীর অন্তর্জাত শক্তির ফলে সৃষ্ট টান বা প্রসারন এবং সংকোচন বা পার্শ্বচাপের ফলে ভূত্বকে যে ফাটল বা চ্যুতির সৃষ্টি হয় সেই ফাটল বা চ্যুতি বরাবর ভূত্বকের কোন একটি অংশ উপরে উঠে গিয়ে বা পার্শ্ববর্তী অংশ নিচে বসে গিয়ে যে পর্বতের সৃষ্টি হয়, তাকে স্তূপ পর্বত বলে। স্তূপ পর্বত গুলি হোর্স্ট পর্বত নামেও পরিচিত। তবে সব স্তূপ পর্বতই হোর্স্ট নয়। দুটি চ্যুতির মধ্যবর্তী কোন ভূখন্ড উল্লম্বভাবে উত্থিত হলে তাকে হোর্স্ট বলা হয়। আবার দুটি সমান্তরাল ফাটলের দুপাশের ভূমিরূপ অবনমিত হলে মাঝের অংশটি উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে স্তূপ পর্বতের সৃষ্টি করে। 

উদাহরণ – সারা পৃথিবীব্যাপী এই ধরনের স্তূপ পর্বতের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।ভারতের পশ্চিমঘাট পার্বত্য অঞ্চল ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের গ্রেট বেসিন অঞ্চল স্তূপ পর্বতের উদাহরন এবং ইউরোপের জার্মানির রাইন নদীর গ্রস্থ উপত্যকার পশ্চিমে অবস্থিত ব্ল্যাক ফরেস্ট পর্বত, ভারতের সাতপুরা, বিন্ধ্যপর্বত হোর্স্টের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। 

স্তূপ পর্বতের বৈশিষ্ট্য 

  • ভূত্বকের একটি বিশাল অংশের উত্থান বা অবনমনের ফলে এই ধরণের স্তূপ পর্বতের সৃষ্টি হয়ে থাকে।
  • দুটি  হোর্স্ট বা স্তূপ পর্বতের মাঝে যে নিচু অংশ থাকে তাকে গ্রাবেন বা গ্রস্ত উপত্যকা বলা হয়। যেমন – পূর্ব আফ্রিকার গ্রস্ত উপত্যকা, জার্মানির রাইন নদীর গ্রস্ত উপত্যকা, ভারতের নর্মদা নদীর গ্রস্ত উপত্যকা প্রভৃতি। 
  • স্তূপ পর্বত এক দিকের ঢাল খুব খাড়া হয় ও অন্যদিকের ঢাল মৃদু প্রকৃতির হয়। 
  • স্তূপ পর্বতের বিস্তৃতি খুব সামান্য হয়ে থাকে। 
  • স্তূপ পর্বতের উপরিভাগ প্রায় সমতল হয়ে থাকে। 

টানের ফলে সৃষ্ট স্তূপ পর্বত

পৃথিবীর অন্তর্জাত শক্তির ফলে সৃষ্ট মহীভাবক আলোড়ন যা ভূপৃষ্ঠে প্রধানত উল্লম্ব ভাবে কাজ করে। এই মহীভাবক আলোড়নের ফলে সৃষ্ট প্রবল উল্লম্ব টানের ফলে ভূত্বকে অসংখ্য ফাটল বা চ্যুতির সৃষ্টি হয়। চ্যুতির ফলে ভূত্বক অনেক গুলি খন্ডে ভাগ হয়ে যায়। ভূত্বকে টানের পরিমান বৃদ্ধি পেলে অনেক সময় দুটি চ্যুতির দুপাশে অংশ বা খণ্ড ফাটল বরাবর নিচে বসে গেলে মাঝের অংশটি উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে গিয়ে স্তূপ পর্বতের সৃষ্টি করে। 

সংকোচনের ফলে সৃষ্ট স্তূপ পর্বত

ভূ-অভ্যন্তরে সৃষ্ট গিরিজনি আলোড়নের ফলে ভূত্বকে প্রবল পার্শ্বচাপজনিত সংকোচনের ফলে প্রবল সংনমন বলের সৃষ্টি হয়। এই সংনমন বলের প্রভাবে ভূত্বকের কঠিন অংশগুলি নরমশিলার মতো ভাঁজ প্রাপ্ত না হয়ে ফেটে যায় অর্থাৎ ফাটলের সৃষ্টি হয় এবং এক সময় এই সংনমন বলের পরিমান এতো বেশি হয় যে ফাটল বরাবর ভূত্বকের কিছু অংশ পার্শ্ববর্তী অংশ থেকে উপরে উঠে যায় এবং স্তূপ পর্বতের সৃষ্টি করে। 

আগ্নেয় পর্বত

ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠের কোন দূর্বল অংশ বা ফাটল দিয়ে ভূপৃষ্ঠের বাইরে বেরিয়ে এসে ক্রমাগত সঞ্চিত হতে হতে যে পর্বতের সৃষ্টি করে তাকে, তাকে আগ্নেয় পর্বত বলে। লাভার সঞ্চয়ের ফলে এই ধরণের পর্বতের সৃষ্টি হয়ে থাকে বলে একে সঞ্চয়জাত পর্বতও বলা হয়ে থাকে। 

লাভার প্রকৃতির উপর এই ধরণের পর্বতের উচ্চতা নির্ভর করে। লাভা গুলি তরল ক্ষারকীয় প্রকৃতির হয় তাহলে অতি সহজেই চারিদিকে ছড়িয়ে পরে বলে মৃদু ঢাল বিশিষ্ট স্বল্প উচ্চতার পর্বতের সৃষ্টি হয়ে থাকে এবং কিন্তু লাভা সান্দ্র আম্লিক প্রকৃতির হলে তা অতি দ্রুত জমাটবদ্ধ হয়ে অনেক উঁচু আগ্নেয় পর্বতের সৃষ্টি করে থাকে। 

উদাহরন হিসাবে জাপানের ফুজিয়ামা, ভারতের ব্যারেন ও নারকোন্ডাম, ইতালির ভিসুভিসায় প্রভৃতি আগ্নেয়গিরির কথা বলা যায়। 

আগ্নেয় পর্বতের বৈশিষ্ট্য 

  • আগ্নেয় পর্বতের আকৃতি অনেকটা শঙ্কু বা মোচার মতো হয়। 
  • ভূপৃষ্ঠের দূর্বল স্থানসমূহে আগ্নেয় পর্বত অধিক দেখা যায়। 
  • আগ্নেয় পর্বতের ঢাল খুব বেশি হয় না। 
  • আগ্নেয় পর্বত থেকে লাভা নির্গত হওয়া কে অগ্ন্যুৎপাত বলে। 

ক্ষয়জাত পর্বত 

ভঙ্গিল পর্বত, স্তূপ পর্বত ও আগ্নেয়পর্বত বহুবছর ধরে বিভিন্ন বহির্জাত প্রক্রিয়া যেমন – বায়ু, বৃষ্টি, জলপ্রবাহ, হিমবাহ প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তির দ্বারা ক্রমাগত ক্ষয় প্রাপ্ত হয়ে যে অনুচ্চ বিচ্ছিন্ন  পর্বতের সৃষ্টি হয় তাকে ক্ষয়জাত পর্বত বলে। 

যেমন – ভারতের নীলগিরি, শুশুনিয়া, পূর্বঘাট, পরেশনাথ, রাজমহল পর্বত এই ধরণের ক্ষয়জাত পর্বতের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। 

ক্ষয়জাত পর্বতের বৈশিষ্ট্য 

  • ক্ষয়জাত পর্বতের উচ্চতা বেশি হয় না। 
  • এরূপ পর্বতের উপরিভাগ খুব উঁচু নিচু বা অসমতল হয় না। 
  • পর্বতের ঢাল মৃদু প্রকৃতির হয়। 
  • যে কোন পর্বত বা উঁচু ভূমি ক্ষয়ের ফলে ক্ষয়জাত পর্বতে পরিনত হতে পারে। 

Leave a Comment