যীশু খ্রীষ্ট জীবনী | Jesus Christ Biography in Bengali

যীশু খ্রীষ্ট জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Jesus Christ Biography in Bengali. আপনারা যারা যীশু খ্রীষ্ট সম্পর্কে জানতে আগ্রহী যীশু খ্রীষ্ট র জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

যীশু খ্রীষ্ট কে ছিলেন? Who is Jesus Christ?

যীশু (আনু. ৪ খ্রি.পূ. – ৩০ বা ৩৩ খ্রি.) যিনি নাসরতীয় যীশু বা যীশু খ্রীষ্ট নামেও পরিচিত, ছিলেন প্রথম শতাব্দীর একজন যিহূদী ধর্মপ্রচারক ও ধর্মীয় নেতা। তিনি বিশ্বের বৃহত্তম ধর্ম খ্রীষ্টধর্মের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। অধিকাংশ খ্রীষ্টানদের বিশ্বাস মতে তিনি হলেন পুত্র ঈশ্বরের অবতার বা মাংসে মূর্তিমান বাক্য এবং পুরাতন নিয়মে ভাবোক্ত প্রতীক্ষিত মশীহ বা খ্রীষ্ট।

যীশু খ্রীষ্ট জীবনী – Jesus Christ Biography in Bengali

নামযীশু খ্রীষ্ট
জন্ম৪ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ
পিতাযোষেফ
মাতামেরি
জন্মস্থানবৈৎলেহম, যিহূদিয়া, রোমান সাম্রাজ্য
জাতীয়তাইহুদি
পেশাধর্মপ্রচারক ও ধর্মীয় নেতা
মৃত্যু৩০ বা ৩৩ খ্রীষ্টাব্দ (বয়স ৩৩–৩৬)

যীশু খ্রীষ্ট র জন্ম: Jesus Christ’s Birthday

যীশু খ্রীষ্ট ৪ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ জন্মগ্রহণ করেন।

প্যালেস্টাইনের একটি ছোট্টগ্রাম নাজারেথ। পাহাড় আর তৃণভূমি ঘেরা ছোট্ট সুন্দর গ্রাম। এখানে বাস করে এক সূত্রধর, তার নাম যোসেফ। সেই গ্রামেরই বাসিন্দা কুমারী মেরীর সঙ্গে যোসেফের বিয়ে স্থির ছিল। দুইজনেই প্রতীক্ষা করে আছে সেই শুভ দিনের যেদিন সমাজের সকলের সামনে পুরোহিত তাদের পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ করবেন। ইতিমধ্যে একদিন মেরী এক রাত্রে এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখলেন। এক আলোকময় পুরুষ, নিজেকে তিনি পরিচয় দিলেন দেবদূত গ্যাব্রিয়েল বলে, তিনি শিয়রে আবির্ভূত হলেন।

অভিভূত মেরি বিস্ময় বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইলেন সেই আলোকময় দিব্য পুরুষের দিকে। গ্যাব্রিয়েল বললেন, ঈশ্বরের এক বার্তা নিয়ে তোমার কাছে এসেছি। কিছুদিনের মধ্যেই তোমার কোলে জন্ম নেবেন এক দেবশিশু। তুমি তাঁর নাম রাখবে যিশু। তিনি হবেন দুঃখী মানুষের পরম পরিত্রাতা।

মেরী চমকে উঠলেন। তার তো এখনো বিয়ে হয়নি; তিনি সন্তানবতী হবেন কি করে ? সেকথা সবিনয়ে নিবেদন করলেন তিনি। দেবদূত তাকে অভয় দিয়ে বললেন, তোমার যিনি সন্তান হবেন তিনি ঈশ্বরেরই অংশ — তাঁর আত্মা থেকেই যিশুর জন্ম। তাঁকে নিয়ে তুমি চিন্তা করো না। বক্তব্য শেষ করে মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেলেন দেবদূত গ্যাব্রিয়েল। আনন্দে অভিভূত হলেন কুমারী মেরী।

কিন্তু এই আনন্দের বার্তা কি তিনি কারোর কাছে প্রকাশ করতে পারবেন ? মেরীর দিদি এলিজাবেথ থাকেন পার্শ্ববর্তী এক গ্রামে। তাঁর স্বামীর নাম জ্যাকারিয়াস। দুজনেই ধর্মপ্রাণ মানুষ। একটি সন্তানের জন্য দিবারাত্র তারা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানান। ঈশ্বর তাদের প্রার্থনা শুনতে পেলেন। একদিন দুজনে দৈববাণী শুনলেন — শীঘ্রই তোমাদের সন্তান হবে, তার নাম রাখবে যোহন।

মানুষের কল্যাণের জন্য জন্ম নিচ্ছেন ঈশ্বরপুত্র, যোহন হবে তার অগ্রদূত। দৈববাণী একদিন সত্য হয়ে দেখা দিল। সন্তান এল এলিজাবেথের গর্ভে। কয়েকমাস পরে মেরী এলেন তাঁদের বাড়ি। জানালেন তার স্বপ্নের কথা। সকলেই অনুভব করলেন — এ যোগাযোগ ঈশ্বর নির্দিষ্ট। কিছুদিন দিদির বাড়িতে কাটিয়ে আবার নাজারেথে ফিরে এলেন মেরী। তখন তিনি সন্তান সম্ভবা।

যোসেফ জানতে পারলেন বিয়ের আগেই মেরী মা হতে চলেছেন। লজ্জায় দুঃখে মুহ্যমান হয়ে পড়লেন তিনি। স্থির করলেন মেরীর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। কিন্তু সেই সঙ্কল্প রূপায়ণের আগেই একদিন স্বপ্নে দেখা দিলেন দেবদূত গ্যাব্রিয়েল। বললেন— কুমারী মেরী পরম পবিত্র, তাঁকে ত্যাগ করো না। মানব পরিত্রাতা ঈশ্বরপুত্র তার গর্ভে এসেছেন।

যোসেফের আর কোন সংশয় রইল না। ঈশ্বরপুত্রের গর্ভধারিণী যিনি হবেন তাঁকে পত্নী রূপে পাওয়া যে পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। নিঃসংশয়ে তিনি মেরীকে বিবাহ করলেন। কিছুকাল পরে রোমের সম্রাট অগস্টাস সীজার তার রাজ্যের সর্বত্র লোকগণনার নির্দেশ দিলেন। বলা হল, দেশের সমস্ত নারীপুরুষ যেন নিজ নিজ শহরে গিয়ে খাতায় নাম লিখিয়ে আসে। নাজারেথ থেকে নিকটবর্তী শহর বেথলেহেমের দূরত্ব সত্তর মাইল।

যোসেফ সেখানে এলেন মেরীকে নিয়ে। মেরী তখন আসন্ন প্রসবা। বেথলেহেমে অসংখ্য মানুষের ভিড়। অন্য কোথাও থাকার জায়গা না পেয়ে যোসেফ স্ত্রীকে নিয়ে এক আস্তাবলে আশ্রয় নিলেন। সেই রাত্রেই দীনহীন সেই আস্তাবলে জন্ম নিলেন যিশু। বেথলেহেমের কোন মানুষ জানতে পারল না মানবের পরিত্রাতা ঈশ্বরপুত্র যিশুর আবির্ভাবের কথা। কিন্তু সেই রাত্রেই বহুদূরে রাখাল বালকদের কাছে পৌঁছে গেল সেই শুভবার্তা।

সারাদিন মাঠে মাঠে ভেড়া চরিয়ে রাতের বেলা তারা সকলে জড়োসড়ো হয়ে ঘুমিয়ে ছিল মাঠে। গভীর রাতে চতুর্দিক আলোর দ্যুতিতে উদ্ভাসিত করে সেখানে আবির্ভূত হলেন দেবদূত। রাখাল বালকদের বললেন, দীনদরিদ্র লাঞ্ছিত মানুষের মুক্তিদাতা ঈশ্বরপুত্র যিশু বেথলেহেমে আস্তাবলে জন্মগ্রহণ করেছেন। তোমাদের সেই বার্তা জানাতে ঈশ্বর আমাকে পাঠিয়েছেন। রাখাল বালকেরা আনন্দে জয়ধ্বনি করে উঠল। রাত ভোর হতেই তারা এসে হাজির হল সেই আস্তাবলে।

মেরী মায়ের কোলে আলোর দীপ্তি মাখানো শিশু যিশুকে দেখে তারা নয়ন সার্থক করল। অন্তরের প্রণাম জানিয়ে তারা ফিরে গেল নিজেদের কাজে। ইহুদীদের প্রথা অনুযায়ী জন্মের আট দিন পরে মন্দিরে গিয়ে শিশুর নামকরণ করতে হয়। যোসেফ ও মেরী তাঁদের পুত্রের নাম রাখলেন যিশু। মেরী পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত যোসেফ সেই আস্তাবলেই রয়ে গেলেন। এমনি সময়ে একদিন পূর্বদেশের তিন পন্ডিত এসে উপস্থিত হলেন সেই আস্তাবলের দরজায়। তারা প্রণাম নিবেদন করতে এসেছেন ঈশ্বরপুত্রকে।

এই তিনি পন্ডিত একদিন আকাশে এক নতুন উজ্জ্বল তারা দেখতে পেয়ে গণনা করে জানতে পেরেছিলেন — ওই তারা কোন মহাপুরুষের আবির্ভাবের বার্তা নির্দেশ করছে। কিন্তু কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন সেই মহাপুরুষ ? আকাশের তারাকে লক্ষ করেই তাঁরা অগ্রসর হয়ে চললেন পশ্চিম দিকে। সেই সময় প্যালেস্টাইনে রাজত্ব করতেন ইহুদীদের অত্যাচারী রাজা হেরড। তিনি ছিলেন রোমের সম্রাট সীজারের অধীন। প্যালেস্টাইনের রাজধানী হল জেরুজালেম ৷

প্রাচ্য দেশের তিন পন্ডিত এসে পৌঁছলেন এখানে। তাঁরা রাজার কাছে এসে ইহুদীদের নতুন রাজা কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন জানতে চাইলেন। হেরড নতুন কোন প্রতিদ্বন্দ্বীর আবির্ভাব কল্পনা করে চমকে উঠলেন। কিন্তু মনের ভাব তিনি বুঝতে দিলেন না প্রাচ্যদেশের পন্ডিতদের। বললেন, রাজপরিবারে ইতিমধ্যে নতুন কোন শিশুর জন্ম হয়নি। পন্ডিতেরা জানালেন, প্রাচীন শাস্ত্র গ্রন্থে লেখা রয়েছে রাজার রাজা জন্মগ্রহণ করবেন বেথলেহেমে।

আমরা যে তাঁরই সন্ধানে বেরিয়েছি। হেরড বললেন, তবে বেথলেহেমেই তাঁর সন্ধান আপনারা পাবেন। তার দর্শন পেলে আমাকে জানাবেন, আমিও গিয়ে তাঁকে প্রণাম জানিয়ে আসব। সেই নতুন তারা তখনো আকাশে জুলজুল করছিল। তাকে অনুসরণ করে পন্ডিতেরা বেথলেহেমের পথে অগ্রসর হয়ে চললেন। একসময় তারা দেখতে পেলেন তারাটি একটি কুটিরের ওপরে এসে আকাশে স্থির হয়ে আছে।

তারা তখন বুঝতে পারলেন ওখানেই রয়েছেন রাজার রাজা ঈশ্বরপুত্র। কুটিরে মাতা মেরীর কোলে তখন শুয়েছিলেন শিশু যিশু। পণ্ডিতেরা তাঁর উজ্জ্বল কান্তি আর দিব্য রূপ দেখেই চিনতে পারলেন। তারা নতজানু হয়ে নানা উপহার দিয়ে অভিষেক করলেন মহামানবের। ফেরার পথে দৈববাণী শুনতে পেলেন তিন পণ্ডিত তোমরা জেরুজালেম যেও না — নিজেদের গৃহে ফিরে যাও। এদিকে ইহুদীদের নতুন রাজার কথা শোনার পর থেকে প্রচন্ড উদ্বেগের মধ্যেই ছিলেন ৷

আশা করেছিলেন, পন্ডিতদের কাছ থেকে সন্ধানটা জানা গেলে তিনি তার ভবিষ্যৎ প্রতিদ্বন্দ্বীর উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু পূর্বদেশের পন্ডিতদের ফিরে আসার সময় পার হয়ে যাবার পর সেনাপতিকে ডেকে নির্দেশ দিলেন, সদলবলে বেথলেহেমে গিয়ে যেন প্রতিটি নবজাত শিশুকে অবিলম্বে হত্যা করা হয়। হেরডের অনুচরদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হতে লাগাল বেথলেহেমের অসংখ্য অসহায় শিশু৷ মায়েদের বুক ফাটা কান্নায় ভারী হয়ে উঠল বেথলেহেমের আকাশ।

যোসেফ ও মেরী তাঁদের শিশু সন্তানকে রক্ষার জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন। তাঁরা হেরডের শাসনের সীমা ছড়িয়ে রাতারাতি শিশুপুত্রকে নিয়ে মিশরে পাড়ি জমালেন। মিশরে তারা নিরাপদেই রইলেন বছর কয়েক। ইতিমধ্যে অত্যাচারী শাসক হেরড মারা গেলেন। যোসেফ নিশ্চিন্ত হয়ে স্ত্রী পুত্রকে নিয়ে আবার নাজারেথে ফিরে এলেন। ইহুদীদের পবিত্র তীর্থস্থান হল জেরুজালেম।

প্রতিবছর নিস্তারপর্ব উপলক্ষে এখানে দেবতার মন্দিরে ইহুদীরা সমবেত হয়ে উৎসব পালন করে। বহুপূর্বে ইহুদীরা মিশরের অধীনতামুক্ত হয়ে প্যালেস্টাইনে নিজেদের স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছিল। স্বাধীনতা ফিরে পাবার দিনটিকে স্মরণ করেই প্রতিবছর নিস্তার উৎসব পালন করা হয়। বারো বৎসর বয়স হলে ইহুদীরা এই উৎসবে যোগ দেবার অধিকার পায়। মেরী আর যোসেফ নিজেরা কয়েকবার এই উৎসবে গেছেন।

সেবার তাঁরা বারো বছরের বালক যিশুকে নিয়ে জেরুজালেম গেলেন। মন্দিরে দেবতার সামনে পুজো হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ জড়ো হয়েছে সেখানে। মন্দিরের পশুবলির দৃশ্য দেখে বিচলিত হয়ে পড়লেন কিশোর যিশু, তার মনে হল, নিরপরাধ একটি প্রাণীকে হত্যা করে এ কেমন পুজো, এতে কার মঙ্গল হওয়া সম্ভব ? পুরোহিতরা এক জায়গায় বসে ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও ধর্মালোচনা করছিলেন। যিশু এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে তাদের আলোচনা শুনলেন। কিন্তু তার মন ভরলো না।

মনে হল, সবই যেন কেমন প্রাণহীন শুষ্ক আলোচনা। মানুষকে বাদ দিয়ে দেবতাকে ভালবাসার প্রসঙ্গ তার কাছে দুর্বোধ্য মনে হল। নিস্তার উৎসবের প্রথম স্মৃতি নিয়ে মা বাবার সঙ্গে যিশু বাড়ি ফিরে এলেন। যিশুর পরে যোসেফ ও মেরীর আরও কয়েকটি ছেলেমেয়ে হয়েছিল। যোসেফের একার পরিশ্রমেই সকলের ভরণপোষণ চলত। যিশুর কাজের বয়স হয়েছিল, এবারে তিনিও বাবার সঙ্গে ছুতোর মিস্ত্রীর কাজ শুরু করলেন।

এভাবেই কেটে গেল আরও কয়েকটি বছর। যিশুর যখন উনিশ বছর বয়স হল, সেই সময় রোমসম্রাট অগাস্টাস সিজারের মৃত্যু হল। তার সিংহাসনে বসলেন নতুন সম্রাট। দেশের রাজনীতিতেও ঘটল পরিবর্তন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যিশুর মধ্যেও ঘটেছিল আত্মিক পরিবর্তন। তিনি উপলব্ধি করতেন এই বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গে তিনিও যেন অচ্ছেদ্য বন্ধনে যুক্ত। চারপাশের মানুষের দুঃখ, বেদনা, দারিদ্র্য, মানুষে মানুষে বিভেদ, সবই তাঁকে ব্যথিত করে তোলে।

তার মনে হত, মানুষের এই দুঃখ পাপ, এসবই ঈশ্বরের কাছ থেকে তাদের দূরে সরিয়ে রেখেছে। এই কথা তাঁকেই সকলকে বুঝিয়ে বলতে হবে — তাদের দেখাতে হবে স্বর্গ ও শান্তির পথ। রোমের নতুন সম্রাটের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে জুডিয়াতেও নতুন শাসনকর্তা হলেন পন্টিয়াস পাইলেন ৷ এই নতুন শাসকের শাসনে অল্পদিনের মধ্যেই সৃষ্টি হল বিভীষিকা। এই সংকট সময়ে প্যালেস্টাইনে এক নতুন ধর্মগুরুর আবির্ভাব হল। তিনি হলেন মেরীর দিদি এলিজাবেথের পুত্র। যিশুর আগেই যাঁর জন্ম হয়েছিল।

অল্পবয়স থেকেই তিনি দেশের নানা অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন আর মানুষকে ঈশ্বরের বাণী শুনিয়েছেন। তিনি বললেন, মানুষের মুক্তির জন্য ঈশ্বরের পুত্র আবির্ভূত হয়েছেন, তিনিই সকলের সব পাপ দূর করে ঈশ্বরের পথে নিয়ে যাবেন। যোহনের কথা যিশুও শুনতে পেলেন। তিনি তাঁর সঙ্গে দেখা করবার জন্য একদিন এলেন জর্ডন নদীর তীরে। সেই সময় যোহন এক টুকরো পাথরের ওপরে দাঁড়িয়ে মানুষকে ঈশ্বরের কথা বলছেন ৷ বহু মানুষ চারপাশে জড়ো হয়ে তাঁর কথা শুনছে।

যিশু নিকটে এসে শুনতে পেলেন যোহন বলছেন তোমরা সকলে এসো, আমি জর্ডন নদীর পবিত্র জলে তোমাদের স্নান করিয়ে দীক্ষা দেব। আমার পরে যিনি আসবেন তিনি তোমাদের সব পাপ দূর করবেন। তোমরা তোমাদের পাপকর্মের জন্য অনুতাপ কর। শীঘ্রই সকলের মুক্তি হবে। দলে দলে মানুষ যোহনের কাছে এসে দীক্ষা নিতে লাগল। যিশুও অন্তরের প্রেরণায় এগিয়ে গিয়ে জর্ডনের জলে স্নান করলেন। তারপর যোহনের কাছে দীক্ষা নিলেন।

আর সেই সময়েই যিশু যেন শুনতে পেলেন এক অলৌকিক কন্ঠস্বর — তুমি আমার প্রিয়, তোমার মধ্যেই আমি আছি। তুমিই ঈশ্বরপুত্র। নিজের মধ্যে যেন এক নতুন প্রাণের সঞ্চরণ অনুভব করলেন যিশু। অবিশ্বাস্য এক স্বর্গীয়ভাবে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলেন তিনি। দীক্ষার পর ঘরে ফেরার প্রেরণা আর পেলেন না যিশু। এক আধ্যাত্মিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি চলে এলেন জুডিয়ার মরু প্রান্তরে এক ছোট্ট পাহাড়ে।

এখানেই এক পাথরের আড়ালে তিনি ধ্যানাবিষ্ট হলেন। শুরু হল যিশুর সাধনজীবন। দীর্ঘ চল্লিশ দিন একই ভাবে নিবিষ্ট ঈশ্বর চিন্তায় কেটে গেল। শুষ্ক মরুর প্রচন্ড সূর্যতাপ, কত ধূলিঝড়, রাতের হিমেল বায়ুপ্রবাহ বয়ে গেল শরীরের ওপর দিয়ে। কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার। একদিন জ্যোতির্ময় আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল তার অন্তরাকাশ। নিজের মধ্যে গভীরভাবে অনুভব করলেন ঈশ্বরের প্রকাশ। এক নতুন প্রজ্ঞার দিব্য প্রেরণা নিয়ে ধ্যান ভঙ্গ করলেন যিশু।

এবার তাকে পথে নামতে হবে — প্রচার করতে হবে ঈশ্বরের বাণী। পাপের পথ থেকে ঈশ্বরের পথে মুক্তি দিতে হবে মানুষকে। গ্রামের পথে চলতে চলতে যিশু শুনতে পেলেন গুরু যোহনকে বন্দি করেছেন অত্যাচারী রাজা এন্টিপাস। এই রাজা নিজের বৈমাত্রেয় ভাই ফিলিপের বিধবা স্ত্রীকে বলপূর্বক বিয়ে করে প্রজাদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। প্রজাদের কাছে নিজেকে নিষ্পাপ প্রতিপন্ন করবার উদ্দেশ্যে তিনি স্থির করেছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় সাধু যোহনকে দিয়ে তার নির্দোষিতার কথা বলিয়ে নেবেন। তাই ডাকিয়ে নিয়েছিলেন যোহনকে। ধর্মাত্মা যোহন কিন্তু রাজার পাপাচরণ সমর্থন করতে পারেন নি।

রাজার নানা প্রলোভন, শাস্তির ভয় কোন কিছুতেই তিনি কাতর না হয়ে সত্য পথেই অবিচল ছিলেন। ক্রুদ্ধ রাজা তাই তাঁকে বন্দি করে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন। বাবা ভাই বোন, আত্মীয় পরিজন সকলের মায়া ত্যাগ করে যিশু এগিয়ে চললেন অনির্দেশ পথে সত্যের বার্তা বহন করে। স্বর্গীয় জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে তাঁর দিব্য অবয়ব। পথে যেতে যেতে যাঁরা তাকে দেখতে লাগল তারাই আকৃষ্ট হল। গালিলেয়া পৌঁছলে এক মহিলা যিশুকে দেখে সকলকে বলতে লাগলেন, ইনিই সেই ঈশ্বর প্রেরিত পুরুষ। বহুদিন পূর্বে মহর্ষি ইসাইয়া এঁর আবির্ভাবের কথাই ঘোষণা করেছিলেন। গুরু যোহনও বলেছেন এঁর কথা।

হাঁটতে হাঁটতে যিশু এসে পৌঁছলেন সমুদ্রোপকূলবর্তী শহর কাপার্নাউমে। এখানে থেকেই তিনি শুরু করলেন তার ধর্মপ্রচার। তিনি সকলকে আহ্বান করে বললেন, শুভক্ষণ উপস্থিত হয়েছে, ঈশ্বরের স্বর্গরাজ্য তোমাদের দুয়ারে উপস্থিত। অনুতাপে পাপতাপ দূর হয়, তোমরা অনুতাপ কর। মানুষের পাপ ব্যাধি, কলুষতা মুক্ত করার উদ্দেশে যিশু এগিয়ে চললেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। বহু কুষ্ঠরোগী, খঞ্জ, আতুর তার অলৌকিক স্পর্শে সুস্থতা লাভ করল। তার অলৌকিক ক্ষমতার কথা জানতে পেরে দুঃখী তাপী মানুষ দলে দলে ছুটে আসতে লাগল যিশুর কাছে। পাত্র – অপ্রাত্র নির্বিশেষে তিনি সকলকে করুণা বিতরণ করতে লাগলেন। শিষ্যদের মধ্য থেকে যিশু দেশ দেশান্তরে তার বাণী প্রচারের জন্য বিশেষ বারোজনকে বেছে নিয়েছিলেন।

এঁরা হলেন, পীটার, অ্যান্ড্রু, যোহন, যাকোব, বার্থলোমিও, ফিলিপ, থোমা, মথি, যাকোব, সিমন, যিহুদা আর জুডাস। যিশু তার শিষ্যদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘ ইতিপূর্বে যে সব মহাপুরুষ মানব মুক্তির বাণী প্রচার করে গেছেন, আমি তাদেরই উত্তরসূরী। আমার কাছে যারা আসবে তারা মুক্তির পথ জানতে পারবে।’ তিনি আরও বললেন, ‘যারা অন্তরে দীনহীন তারাই স্বর্গরাজ্যের প্রকৃত অধিকারী। যারা অনুতাপ করে, তারাই সান্ত্বনা লাভ করবে। অন্যদের দয়া কর, বিনয়ী ও পবিত্র হও। যারা মানুষে মানুষে বিভেদ করবে না, তারাই ঈশ্বরের প্রকৃত সন্তান।’

যিশুর মানবপ্রেম ও অলৌকিক দয়ার জয়গানে মুখর হয়ে উঠল চতুর্দিক। তাঁর প্রচারিত প্রেমধর্ম ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করতে লাগল। প্রাচীন ইহুদী ধর্মমতে বিশ্বাসী ইহুদী পুরোহিতরা যিশুর জনপ্রিয়তা দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠল। তারা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল। তারা তাদের অনুগত অভিজাত সম্প্রদায়কেও প্ররোচিত করে তুলল। রোম সাম্রাজ্যের শাসকদের হাতে যিশুকে তুলে দেবার জন্য স্বার্থান্বেষী দল ঘোষণা করল, যে যিশুকে ধরিয়ে দিতে পারবে তাকে পুরস্কৃত করা হবে।

একবার যিশু বেথানি গ্রামে ভক্ত – শিষ্যদের মধ্যে উপদেশবাণী প্রচার করছেন। সেখানে এক কৃষক তাকে একটি গাধা দান করল। সেই গাধায় চেপে তিনি উপস্থিত হলেন জেরুজালেমে। যথারীতি জনগনের মধ্যে উপদেশ প্রচার করতে লাগলেন তিনি। এদিকে ফরাসি ও ইহুদী পুরোহিতরা যিশুকে বন্দি করবার জন্য চক্রান্তে লিপ্ত হল। তাদের সঙ্গে যোগ দিল যিশু – শিষ্য বিশ্বাসঘাতক যুডাস। যিশু রোমান প্রহরীদের হাতে বন্দি হলেন।

যিশু নিজেকে ইহুদীদের রাজা বলেছেন, ঈশ্বরপুত্র বলে প্রচার করে ঈশ্বরের অবমাননা করছেন এই অপরাধে ইহুদীদের প্রধান যাজক তাঁর মৃত্যু দন্ড বিধান করলেন। দন্ডাদেশ শুনে যিশু নির্বিকার রইলেন। সমস্ত নির্যাতন, বিদ্রূপ ও লাঞ্ছনা তিনি নির্বিবাদে সয়ে চললেন। প্রধান যাজকের বিচার ও দন্ডাদেশ সমর্থন জানাতে বাধ্য হলেন রোমান বিচারপতি পিলেত। স্থির হল ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হবে ঈশ্বরদ্রোহী যিশুকে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যিশুকেই বধ্যভূমিতে ক্রুশ বয়ে নিয়ে যেতে হল।

বধ্যভূমি হল গলগাথার মাঠে। রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত যিশু ক্রুশ বয়ে নিয়ে চললেন। তাঁকে প্রহরা দিতে লাগল সৈন্যরা। জলভরা চোখে তাদের অনুসরণ করে চলল অসংখ্য মানুষ। সৈন্যদের ভয়ে তাদের মুখে কোন কথা নেই। একজন চোর আর একজন দস্যুকেও যিশুর সঙ্গে দন্ড দেবার জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল বধ্যভূমিতে। কটিবাসমাত্র রেখে সমস্ত পোশাক খুলে নেওয়া হল যিশুর। ক্রুশে বেঁধে দুই হাতের তালু, গয়ের পাতা, কোমরে পুঁতে দেওয়া হল বড় বড় পেরেক।

মাথায় পরিয়ে দেওয়া কাঁটার মুকুট। রক্তাক্ত যিশু নির্বিকারে সহ্য করলেন সেই অমানুষিক যন্ত্রণা। পাপী তাপী দুঃখী অনাথ আতুরের উদ্ধারের জন্য, মানুষকে ভালবাসার কথা শেখাবার জন্য আবির্ভাব হয়েছিল তাঁর। তাই পাপীদের অবুঝ বিকার তিনি ক্ষমা সুন্দর মহিমায় সয়ে গেলেন। কেবল একবার আকাশপানে চোখ তুলে তিনি বললেন, ‘পিতা, এরা জানে না এরা কি করছে, এদের তুমি ক্ষমা করো।’

সকালবেলা ক্রুশবিদ্ধ করা হয় যিশুকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকজনও বাড়তে লাগল ৷ মা মেরী সংবাদ পেয়ে ছুটে এলেন। আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলেন তিনি। দুপুর হতেই আকাশ আচ্ছন্ন হয়ে গেল কাল মেঘে। যিশু মৃদুহাসি মুখে বললেন, ‘হে পিতা, আমাকে তুমি গ্রহণ করো।’ সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন যিশু। এই সময়ে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র বত্রিশ। বিচারপতি পিলেতের অনুমতি পেয়ে সৈন্যরা যিশুর মৃতদেহ নামিয়ে আনলে, যিশুর এক ভক্ত ইহুদী তা গ্রহণ করলেন সমাহিত করার জন্য।

পাহাড়ের গায়ে এক ছোট গুহায় যিশুর মৃতদেহ শুইয়ে দিয়ে বড় বড় পাথর দিয়ে গুহার মুখ ঢেকে দিলেন তিনি। গুহা পাহারা দিতে লাগল প্রহরীর দল। যিশুর কয়েকজন শিষ্য সমবেত হয়েছেন গুহার কাছে। সহসা এক জ্যোতির্ময় আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল গুহামুখ। দেখা গেল গুহামুখ উন্মুক্ত, ভেতরে যিশু নেই।

ক্রুশবিদ্ধ হবার চল্লিশ দিন পর গালিলির পর্বতে সমবেত শিষ্যদের দর্শন দিলেন যিশু। তিনি তাদের বললেন, ‘ সমস্ত মানুষের কাছে আমার উপদেশ পৌঁছে দাও, দীক্ষিত করো। যারা আমাকে বিশ্বাস করবে তারা অনন্ত শান্তির অধিকারী হবে। অনন্ত কাল আমি তোমাদের সঙ্গে থাকব। এরপরই যিশু অন্তর্ধান করলেন। ঈশ্বরপুত্র ফিরে গেলেন তার পিতার কোলে।

Leave a Comment