কোল বিদ্রোহ কী? কোল বিদ্রোহের কারণ, ফলাফল এবং গুরুত্ব কী?

কোল বিদ্রোহ কী? কোল বিদ্রোহের কারণ, ফলাফল এবং গুরুত্ব কী?: ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে ভারতে সংঘটিত বিভিন্ন কৃষক ও উপজাতি বিদ্রোহগুলির মধ্যে অন্যতম হলো কোল বিদ্রোহ। বিহারের অন্তর্গত ছোটনাগপুর, সিংভূম, রাঁচি, মানভূম প্রভৃতি অঞ্চলে বসবাসকারী কৃষিজীবী আদিবাসীগণ কোল নামে পরিচিত। বনজ সম্পদের উপর নির্ভরশীল, অরণ্যচারী স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহে অভ্যস্থ উপজাতিদের ইংরেজরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে কোল বিদ্রোহের সূচনা হয়। 1820-21খ্রীঃ এবং 1831-32 খ্রীঃ-এই দুটি পর্যায়ে কোল বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল।

কোল বিদ্রোহের কারণ

কোল বিদ্রোহের উল্লেখযোগ্য কারণগুলি হল:

১)রাজস্ব বৃদ্ধি: ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের শাসন প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসাবে ছোটনাগপুরে হিন্দু মুসলমান ও শিখ মহাজনদের ওপর রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেয়।এই মহাজনরা কোলদের কাছ থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের চেষ্টা করলে কোলরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, রাজস্ব আদায়ের জন্য কোলদের ওপর নানাভাবে নিপীড়ন করা হতো। পুরুষদের বন্দি করে রাখা হতো, মহিলাদের নানা ভাবে অপমান করা হতো এবং সরকারি রাস্তা তৈরির কাজে তাদের বেগার খাটানো হতো। এই সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল।

২)ইজারাদারি ব্যবস্থা: ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছোটনাগপুর অঞ্চলকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। বহিরাগত মহাজন বা দিকুরা নিজেদের স্বার্থে ওই সমস্ত অঞ্চল ইজারা নিতো। এই ইজারাদাররা অধিক লাভের লোভে বিভিন্ন উপায়ে ও উচ্চহারে রাজস্ব আদায় শুরু করলে কোলরা অসন্তুষ্ট হয়।কোলদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিশেষত মদের উপর অতিরিক্ত কর চাপানো নিয়েই কোলদের মধ্যে অসন্তোষের সূত্রপাত হয়।

৩)নগদ খাজনা প্রদান: ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কোলদের কাছ থেকে নগদ অর্থে খাজনা আদায় করার জন্য আইন প্রণয়ন করলে কোলরা মনোক্ষুন্ন হয়। কারণ নগদ অর্থে খাজনা দেওয়ার রীতি ও ক্ষমতা তাদের ছিল না।

৪) জাতিগত ঐতিহ্য আঘাত: কোলড়রা স্বাধীনভাবে বংশপরম্পরায় সামাজিক রীতিনীতি মেনে জীবন যাপন করত। কিন্তু ইংরেজরা কোল অধ্যুষিত অঞ্চলে কোম্পানির শাসন, বিচার ও রাজস্ব সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করলে কোলদের জাতিগত ঐতিহ্যে আঘাত লাগে। শুধু তাই নয়, কোলদের চিরাচরিত কৃষিকাজ বন্ধ করে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের আফিম চাষ করতে বাধ্য করে।ফলে তাদের জীবিকাগত ঐতিহ্যেও আঘাত লাগে।

এইভাবে বহিরাগত ইংরেজ কর্তৃক জমি দখল, উচ্চ হারে রাজস্ব আদায়, বেগার শ্রম গ্রহণ, কল দের প্রতি শোষণমূলক আচরণ ও অত্যাচার এবং জাতিগত ও পেশাগত ঐতিহ্যে আঘাত ইত্যাদি কারণে কোল উপজাতির মানুষরা রুষ্ঠ হয় এবং বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়।

কোল বিদ্রোহের নেতৃবৃন্দ

কোল বিদ্রোহের উল্লেখযোগ্য নেতৃবৃন্দ ছিলেন বুদ্ধ ভগত, জোয়া ভগত, সুই মুন্ডা, ঝিনদাই মানকি, সিংরাই মানকি প্রমুখ।

কোল বিদ্রোহের প্রসার

1801 খ্রীঃ, 1817খ্রীঃ, 1820 খ্রীঃ ও 1823 খ্রীঃ কোল উপজাতির মানুষরা ছোট ছোট বিদ্রোহ সংঘটিত করে অন্যায়ের প্রতিবাদ জানায়। কিন্তু 1831-32 খ্রিস্টাব্দে কোল বিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারণ করে। ছোটনাগপুর, রাঁচি, সিংভূম, মানভূম, হাজারীবাগ, পালামৌ প্রভৃতি অঞ্চলে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। এই বিদ্রোহে কোলদের পাশাপাশি হো, মুন্ডা, ওঁরাও প্রভৃতি উপজাতি এবং সাধারণ কৃষক, কামার, কুমোর, গোয়ালা প্রভৃতি নিম্নবর্গীয় শোষিত মানুষরাও এই বিদ্রোহের শামিল হয়। বিদ্রোহের প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে কোল বিদ্রোহীরা দিকুদের ওই অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে বলে এবং তা না করলেই মৃত্যু অনিবার্য বলে ঘোষণা করে। বিদ্রোহ চলাকালে কোলরা বহু দিকুকে তাদের দেবতা সামনেই বলি দেয়।

কোল বিদ্রোহের অবসান

কোল বিদ্রোহীদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিল বহিরাগত মহাজন বা দিকু, জমিদার, জোতদার ও ইংরেজ কর্মচারীরা। তাদের আক্রমণে বেশ কয়েক হাজার বহিরাগত মহাজন, জমিদার ও ইংরেজ কর্মচারী নিহত হয়। পরিস্থিতি আয়ত্বের বাইরে আয়ত্বের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসন বিদ্রোহ দমনে তৎপর হয়ে ওঠে। ক্যাপ্টেন উইলকিনসনের নেতৃত্বে এক বিশাল সেনাবাহিনীর সাহায্যে কোম্পানি সরকার নিষ্ঠুরভাবে ও বলপূর্বক এই বিদ্রোহ দমন করে(1833 খ্রীঃ)।

কোল বিদ্রোহের ফলাফল ও গুরুত্ব

কোল বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এই বিদ্রোহের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকার কোল উপজাতিদের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি নামে একটি নতুন ভূখন্ড নির্দিষ্ট করে দেয়।

২)ছোটনাগপুর অঞ্চলে এক নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় এবং ওই অঞ্চলের জন্য স্বতন্ত্র নিয়ম-কানুন প্রবর্তিত হয়।

৩) জমিদারদের কাছ থেকে জমি কেড়ে নিয়ে গ্রামপ্রধানদের জমি ফেরত দেওয়া হয় এবং জমিদাররা যাতে আবার জমি দখল করতে না পারে তার ব্যবস্থা করা হয়।

৪) জমি জরিপ করার ব্যবস্থা করা হয় এবং সেই মতো ভূমি বন্টন ও রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।

উপরিলিখিত ব্যবস্থাগুলি গ্রহণ করা সত্ত্বেও প্রকৃতপক্ষে কোলদের সমস্যার সমাধান হয়নি। তাদের উপর জমিদার ও মহাজনদের অব্যাহত থাকে। এই কারণে প্রায় সমগ্র উনবিংশ শতাব্দী ধরে মাঝে মধ্যেই কোলরা বিদ্রোহ সংঘটিত করে।

Leave a Comment