নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু জীবনী | Netaji Subhas Chandra Bose Biography in Bengali

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু জীবনী: Gksolve.in আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে Netaji Subhas Chandra Bose Biography in Bengali. আপনারা যারা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কে জানতে আগ্রহী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু র জীবনী টি পড়ুন ও জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করুন।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কে ছিলেন? Who is Netaji Subhas Chandra Bose?

সুভাষচন্দ্র বসু (২৩ জানুয়ারি ১৮৯৭ – ?) ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক চিরস্মরণীয় কিংবদন্তি নেতা। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তিনি হলেন এক উজ্জ্বল ও মহান চরিত্র যিনি এই সংগ্রামে নিজের সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি নেতাজি নামে সমধিক পরিচিত। ২০২১ সালে ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার জন্মবার্ষিকীকে জাতীয় পরাক্রম দিবস বলে ঘোষণা করেন। সুভাষচন্দ্র পরপর দুইবার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু গান্ধীর সঙ্গে আদর্শগত সংঘাত, কংগ্রেসের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতির প্রকাশ্য সমালোচনা এবং বিরুদ্ধ-মত প্রকাশ করার জন্য তাকে পদত্যাগ করতে হয়।

সুভাষচন্দ্র মনে করতেন, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর অহিংসা এবং সত্যাগ্রহের নীতি ভারতের স্বাধীনতা লাভের জন্য যথেষ্ট নয়। এই কারণে তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিলেন। সুভাষচন্দ্র ফরওয়ার্ড ব্লক নামক একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন এবং ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতের সত্বর ও পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানাতে থাকেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাঁকে এগারো বার কারারুদ্ধ করে। তার বিখ্যাত উক্তি “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো।” দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরেও তার মতাদর্শের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি; বরং এই যুদ্ধকে ব্রিটিশদের দুর্বলতাকে সুবিধা আদায়ের একটি সুযোগ হিসেবে দেখেন। যুদ্ধের সূচনালগ্নে তিনি লুকিয়ে ভারত ত্যাগ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন, জার্মানি ও জাপান ভ্রমণ করেন ভারতে ব্রিটিশদের আক্রমণ করার জন্য সহযোগিতা লাভের উদ্দেশ্যে।

জাপানিদের সহযোগিতায় তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজ পুনর্গঠন করেন এবং পরে তিনি নেতৃত্ব প্রদান করেন। এই বাহিনীর সৈনিকেরা ছিলেন মূলত ভারতীয় যুদ্ধবন্দি এবং ব্রিটিশ মালয়, সিঙ্গাপুরসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে কর্মরত মজুর। জাপানের আর্থিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তায় তিনি নির্বাসিত আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্বদান করে ব্রিটিশ মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে ইম্ফল ও ব্রহ্মদেশে (বর্তমান মায়ানমার) যুদ্ধ পরিচালনা করেন। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নাৎসি ও অন্যান্য যুদ্ধবাদী শক্তিগুলির সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনের জন্য কোনো কোনো ঐতিহাসিক ও রাজনীতিবিদ সুভাষচন্দ্রের সমালোচনা করেছেন; এমনকি কেউ কেউ তাকে নাৎসি মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন বলে অভিযুক্ত করেছেন।

তবে ভারতে অন্যান্যরা তার ইস্তাহারকে রিয়েলপোলিটিক (নৈতিক বা আদর্শভিত্তিক রাজনীতির বদলে ব্যবহারিক রাজনীতি)-এর নিদর্শন বলে উল্লেখ করে তার পথপ্রদর্শক সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবাদর্শের প্রতি সহানুভূতি পোষণ করেছেন। উল্লেখ্য, কংগ্রেস কমিটি যেখানে ভারতের অধিরাজ্য মর্যাদা বা ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাসের পক্ষে মত প্রদান করে, সেখানে সুভাষচন্দ্রই প্রথম ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে মত দেন। জওহরলাল নেহরুসহ অন্যান্য যুবনেতারা তাকে সমর্থন করেন। শেষ পর্যন্ত জাতীয় কংগ্রেসের ঐতিহাসিক লাহোর অধিবেশনে কংগ্রেস পূর্ণ স্বরাজ মতবাদ গ্রহণে বাধ্য হয়। ভগৎ সিংয়ের ফাঁসি ও তার জীবন রক্ষায় কংগ্রেস নেতাদের ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ সুভাষচন্দ্র গান্ধী-আরউইন চুক্তি বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। তাকে কারারুদ্ধ করে ভারত থেকে নির্বাসিত করা হয়। নিষেধাজ্ঞা ভেঙে তিনি ভারতে ফিরে এলে আবার তাকে কারারুদ্ধ করা হয়।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু জীবনী – Netaji Subhas Chandra Bose Biography in Bengali

নামনেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু
জন্ম23 জানুয়ারী 1897
পিতাজানকীনাথ বসু
মাতাপ্রভাবতী দত্ত
জন্মস্থানকটক, উড়িষ্যা বিভাগ, বঙ্গ প্রদেশ, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান কটক, কটক জেলা, ওড়িশা রাজ্য, ভারত )
জাতীয়তাভারতীয়
পেশাভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতা, রাজনীতিবিদ ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী
মৃত্যু

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু র জন্ম: Netaji Subhas Chandra Bose’s Birthday

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু 23 জানুয়ারী 1897 জন্মগ্রহণ করেন।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু র পিতামাতা ও জন্মস্থান: Netaji Subhas Chandra Bose’s Parents And Birth Place

ওড়িশার কটক শহরে ১৮৯৭ খ্রিঃ ২৩ শে জানুয়ারী নেতাজী সুভাষচন্দ্রের জন্ম। তাঁর বাল্যজীবনও কেটেছিল এই শহরেই। তাঁর পিতার নাম জানকীনাথ বসু, মাতার নাম প্রভাবতী দেবী। এঁদের আদি বাড়ি ছিল চব্বিশ পরগনার অন্তর্গত কোদালিয়া গ্রামে। সুভাষচন্দ্র ছিলেন তাঁর পিতামাতার ষষ্ঠ সন্তান।

জানকীনাথ নিজে ছিলেন গরীবের ছেলে। কঠোর পরিশ্রমের ফলে তিনি আইন পরীক্ষায় পাশ করে ওড়িশার কটক শহরে আইন ব্যবসা আরম্ভ করেন। তিনি ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাশালী ও উদ্যোগীপুরুষ। কিন্তু উকিল হিসাবে আইনের মধ্যেই তিনি তাঁর প্রতিভা ও কর্মশক্তিকে আবদ্ধ করে না রেখে জনসাধারণের কল্যাণকর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও নিজেকে জড়িত করেন।

বিভিন্ন জনহিতকর কর্মের জন্য তিনি সমগ্র ওড়িশায় বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। বিভিন্ন গঠনমূলক কাজের জন্য জানকীনাথ ইংরাজ সরকারের কাছ থেকে রায়বাহাদুর খেতাবে সম্মানিত হয়েছিলেন। জানকীনাথ ছিলেন অত্যন্ত তেজস্বী প্রকৃতির মানুষ। সরকারী উকিল হলেও তিনি সরকারের অন্যায় অবিচারের সমালোচনা করতে দ্বিধা করতেন না। দেশে আইন অমান্য আন্দোলনের সময় সরকারের দমন নীতির প্রতিবাদে জানকীনাথ সরকারের দেওয়া রায় বাহাদুর খেতাব বর্জন করে লাঞ্ছিত দেশভক্তদের শ্রদ্ধা অর্জন করেন।

সুভাষচন্দ্রের জননী প্রভাবতীও ছিলেন স্বামীর মতই আত্মসচেতন মহিলা। সকল ব্যাপারেই তার আত্মমর্যাদাজ্ঞান ও তেজস্বিতা সকলের মনে সম্ভ্রমের উদ্রেক করত। প্রতিবেশী ও অন্যান্য সকল শ্রেণীর মানুষের দুঃখ দুর্দিনে হৃদয়ভরা সহানুভূতি ও দরদ এই দম্পতির মধ্যে প্রকাশ পেত।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু র শিক্ষাজীবন: Netaji Subhas Chandra Bose’s Educational Life

সুভাষচন্দ্রের প্রাথমিক শিক্ষা আরম্ভ হয়েছিল কটক শহরের প্রোটেস্ট্যান্ট স্কুলে — সাহেবদের ছেলেদের সঙ্গে। কিন্তু বালক বয়স থেকেই সুভাষচন্দ্র স্বাধীন ইচ্ছা ও রুচি মেনে চলতে অভ্যস্থ হয়েছিলেন। তাঁর বিদ্রোহী প্রকৃতির অংকুর শৈশব জীবনেই ফুটে উঠেছিল। সাহেবী স্কুলের পরিবেশ ভাল না লাগায় তিনি সেখান থেকে নাম কাটিয়ে ভর্তি হলেন ব্যাভেনস কলেজিয়েট স্কুলে।

বিখ্যাত শিক্ষাব্রতী বেনীমাধব দাস ছিলেন র্যাভেনস স্কুলের বিশিষ্ট শিক্ষক। তার অমায়িক আচরণ, শিক্ষার ধারা, সর্বোপরি বাঙালীসুলভ পরিচ্ছদ সুভাষের মনের ওপর গভীর প্রভাব সৃষ্টি করেছিল। নেতৃত্বের স্বাভাবিক প্রতিভা নিয়েই জন্মেছিলেন সুভাষচন্দ্র। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি ক্লাশের ছেলেদের নিয়ে একটা দল গড়ে তুললেন। তার ক্লাশের ছেলেরা ছাড়াও অন্যান্য ক্লাশের ছেলেরাও তার দলে যোগ দিল।

বিভিন্ন বয়সের ছেলেদের পরিচালনা করার ক্ষমতা সেই বয়সেই তিনি তাঁর দল গঠনের মাধ্যমে লাভ করেছিলেন। সুভাষচন্দ্র কেবল তার ক্লাসেই নয়, সারা স্কুলের মধ্যেই ছিলেন সেরা ছেলে। বন্ধু প্রীতি ছিল গভীর। একবার যাঁরা তাঁর সংস্পর্শে আসতেন, তাঁর সহৃদয়তায় মুগ্ধ ও আকৃষ্ট না হয়ে পাড়তেন না। জীবনে তিনি অনেক বন্ধু লাভ করেছিলেন। ক্লাশে ছাত্ররা বরাবরই তার অনুগামী থাকতো। ছাত্র – শিক্ষক সকলের সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক ভালবাসা ও শ্রদ্ধায় আত্মীয়তার রূপ লাভ করেছিল।

কটক কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক বেনীমাধব মহাশয়ের আদর্শ, প্রকৃতি ও শিক্ষকোচিত গুণাবলী সুভাষকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। স্কুলের ছাত্রজীবনেই তার সংস্পর্শে সুভাষের আধ্যাত্মিক ভাবের উন্মেষ ঘটে। বিবেকানন্দের তেজস্বীতা, গভীর স্বদেশপ্রাণতা, ভারতকে জগৎসভায় উচ্চস্থানে প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা, আত্মজ্ঞান, আত্মশক্তিতে বিশ্বাস ও নির্ভরতা, জীবনে কুমার ব্রতের সৃজনীশক্তি — ছাত্রজীবনেই সুভাষচন্দ্রের মানসিক গঠন তৈরি করেছিল। বা

ঙ্গালীর ঐক্যবন্ধনকে দুর্বল করার হীন উদ্দেশ্যে লর্ড কার্জন শাসনকার্যের সুবিধার অজুহাতে ১৯০৫ খ্রিঃ বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করার উদ্যোগ নেন। বঙ্গ ব্যবচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বাঙ্গালী জাতি জাতীয়তার তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে। ব্রিটিশের সঙ্গে অসহযোগ ঘোষণা করে বাংলায় হল রাখীবন্ধন উৎসব।

১৯০৫ খ্রিঃ ৭ ই আগস্ট কলকাতায় এক বিরাট জনসভায় গৃহীত হল বিলাতী বর্জন প্রস্তাব। দলে দলে বাঙ্গালী নেমে পড়ল রাজনীতির সমরক্ষেত্রে। এই আন্দোলনকে অবজ্ঞা করে, দাম্ভিক শাসক কার্জন ১৯০৫ খ্রিঃ ১৬ ই আগস্ট বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করল। ১৯০৫ খ্রিঃ বারাণসীতে কংগ্রেসের অধিবেশনে গোপাল কৃষ্ণ গোখলে বললেন, “বঙ্গভঙ্গের ফলে যে বিরাট আন্দোলনের উদ্ভব হয়েছে, বাংলায় জাতীয় উন্নতির ইতিহাসে তা স্মরণীয়। ব্রিটিশ শাসন প্রবর্তনের পর এদেশে এই প্রথম জাতিধর্মনির্বিশেষে জনগণ অনুপ্রাণিত হয়েছে একই উদ্দেশ্যে। সমগ্র দেশ আজ বাংলার নেতাদের পশ্চাতে দন্ডায়মান ……….। ”

ভারতের জাতীয় আন্দোলন এইভাবে বাংলার মাটিতে লালিত হয়ে বাঙ্গালীর চেষ্টায় ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র ভারতে। পিতার মুখে সরকারী দমননীতির প্রতিবাদ শুনে কিশোর সুভাষের মনেও ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে বিরাগের ভাব সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁর ছাত্রজীবনের এই বিরাগ ক্রমশঃ বিদ্বেষে পরিণত হয়ে ওঠে। এই সময় একদিন সুভাষ জানতে পারলেন, স্বদেশী আন্দোলনের সহায়ক বিবেচনা করে ইংরাজ সরকার সরকারী কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব দাসকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সুভাষ স্কুল ও কলেজের ছাত্রদের সংগঠিত করে সরকারী আদেশের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানালেন। সরকারী হাইস্কুলের শিক্ষক বেণীমাধব দাস, তাঁকে শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে বদলী হতে হল। সুভাষ তখন দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র। পরের বছরেই ১৯১৩ খ্রিঃ র্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুল থেকেই সুভাষচন্দ্র প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে বৃত্তি লাভ করলেন। এরপর কলকাতায় এসে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন।

আই.এ.পড়তে পড়তেই সুভাষ কয়েকজন সঙ্গীর সঙ্গে সদগুরুলাভের উদ্দেশ্যে হিমালয়ের পথে বেরিয়ে পড়েছিলেন, ব্যর্থ হয়ে কিছুদিন পরে ফিরেও এলেন। ১৯১৫ খ্রিঃ আই.এ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে দর্শনে অনার্স নিয়ে সুভাষ প্রেসিডেন্সিতেই বি.এ পড়তে লাগলেন। এখানেই তিনি উদ্ধত বিদেশী অধ্যাপক ই.এফ.ওটেনকে উপযুক্ত শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা করে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। পরে স্যার আশুতোষের সৌজন্যে স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে দর্শন বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে বি.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

ছাত্রাবস্থায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। এই সময় তিনি এমন কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন যা উত্তরকালে তার জীবনে কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছিল। বি.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর সুভাষকে আই.সি.এস পরীক্ষার জন্য বিলেত পাঠানো হলো। বিলাতে তখন ভারতীয়দের ইন্ডিয়ান মজলিস নামে একটি সমিতি ছিল। এই সমিতিতে সরোজিনী নাইডুর বক্তৃতা শুনে সুভাষ মুগ্ধ হয়েছিলেন। সুভাষ তার ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রবলে ভারতীয় ছাত্রদের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেত সমর্থ হয়েছিলেন।

আই.সি.এস পরীক্ষায় সুভাষ চতুর্থ স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স সহ বি.এ ডিগ্রিলাভ করে দেশে ফিরে আসেন। দেশসেবার দুরন্ত আকাঙ্ক্ষা সুভাষকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে তিনি সরকারী উচ্চপদের চাকরির প্রলোভন ত্যাগ করে দেশে ফিরেই মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি সুভাষকে পরামর্শ দেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে দেখা করতে। দেশবন্ধু তখন বাংলা তথা ভারতবর্ষের সকলের প্রিয় নেতা। তাঁর অসামান্য ত্যাগ, বাগ্মীতা ও রাজনৈতিক প্রতিভা সম্পর্কে সুভাষও বিলক্ষণ অবগত ছিলেন।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু র প্রথম জীবন: Netaji Subhas Chandra Bose’s Early Life

তিনি দেশবন্ধুর কাছে দেশসেবার ব্রতে দীক্ষা নিলেন। দেশে শিক্ষা বিস্তারের জন্য দেশবন্ধু তখন ন্যাশনাল কলেজ গড়ে তুলেছেন। তিনি সুভাষকে সেই কলেজের অধ্যক্ষপদের দায়িত্ব দিলেন। সেই সঙ্গে তাঁকে দেওয়া হল বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির প্রচার বিভাগের দায়িত্ব। এই সময়ে দেশ জুড়ে স্বেচ্ছাসেবক গঠনের আন্দোলন আরম্ভ হয়েছে। সুভাষের নেতৃত্বে অল্প সময়ের মধ্যেই সুনিয়ন্ত্রিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে উঠল।

কিছুদিনের মধ্যেই গান্ধীজীর ডাকে দেশব্যাপী শুরু হল অসহযোগ আন্দোলন। ১৯২১ খ্রিঃ ১০ ই ডিসেম্বর, দেশবন্ধু, মৌলানা আজাদ, দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল প্রমুখ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সুভাষচন্দ্রকেও গ্রেপ্তার করা হল। দেশবন্ধু ও সুভাষের প্রায় তিন মাসকাল কারাদন্ড ভোগ করতে হয়। ১৯২২ খ্রিঃ উত্তরবঙ্গে প্রবল বন্যায় অসংখ্য মানুষ গৃহহীন ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেই সুভাষ বন্যাদুর্গতদের সাহায্যের কাজে ঝাপিয়ে পড়লেন। উত্তরবঙ্গ – প্লাবন – সাহায্য – সমিতির সম্পাদক রূপে এই সময় তিনি আর্ড ও দুর্গতের সেবায় যে নিষ্ঠা ও তৎপরতার পরিচয় দেন তার জন্য বাংলার গভর্নর লর্ড লিটন তাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। সমস্ত দেশে সুভাষের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু র রাজনৈতিক জীবন: Netaji Subhas Chandra Bose’s Political Life

১৯২২ খ্রিঃ ডিসেম্বর মাসে নীতিগত প্রশ্নে মত বিরোধের জন্য দেশবন্ধু পন্ডিত মতিলাল নেহেরুর সাহচর্যে কংগ্রেসের বাইরে স্বরাজ্যদল গঠন করেন। দেশবন্ধুর সহকারী রূপে সুভাষ এই নবগঠিত দলের কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। দেশবন্ধু স্বরাজ্যদলের মুখপত্র ফরোয়ার্ড পত্রিকা প্রকাশ করলে, সুভাষের পরিচালনায় এই পত্রিকার খ্যাতি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯২৩ খ্রিঃ বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সুভাষের অসাধারণ সাংগঠনিক প্রতিভাবলে নির্বাচনে স্বরাজ্যদল জয়লাভ করল।

এই সময়ে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। ১৯২৪ খ্রিঃ ১৪ এপ্রিল সুভাষচন্দ্র কর্পোরেশনের প্রধান কর্মকর্তা নিযুক্ত হন। ইংরাজ সরকার কিন্তু সুভাষের নিয়োগ সুনজরে দেখলেন না। ফলে তাঁর পক্ষে বেশিদিন এই পদে থাকা সম্ভব হয়নি। ছয়মাসের মধ্যেই সরকার নতুন এক অর্ডিন্যান্স বলে সুভাষচন্দ্রকে গ্রেপ্তার করলেন। এই অর্ডিন্যান্সের ক্ষমতাবলে এই সময় দেশের বিভিন্নস্থানে সন্দেহভাজন বহু যুবককেও গ্রেপ্তার করা হয়।

প্রথমে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে, পরে মুর্শিদাবাদের বহরমপুর জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হল সুভাষকে। কয়েকদিন পরেই পাঠিয়ে দেওয়া হল ব্রহ্মদেশের মান্দালয়ে ৷ সরকারের দমননীতির শিকার হয়েও সুভাষচন্দ্র ব্যবস্থাপক সভার জনসাধারণের প্রতিনিধি নির্বাচিত হলেন। লাঞ্ছিত জননায়ককে সেদিন এই নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশবাসী তাঁদের অন্তরের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সম্মানিত করেছিলেন। সুভাষচন্দ্রের মান্দালয়ে কারাবাস কালেই ১৯২৫ খ্রিঃ ১৬ ই জুন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ দার্জিলিংয়ে দেহত্যাগ করেন।

জেলে বসেই নিদারুণ দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে সুভাষ অনুভব করলেন দেশবন্ধুর আরব্ধ কার্য তাকেই সম্পূর্ণ করতে হবে। বাংলাকে পরিচালনা করার দায়িত্ব নিতে হবে তাঁকেই। মান্দালয়ের নির্জন কারাবাসে সুভাষের শরীর ভেঙ্গে পড়ল। দেশের জন্য উদ্বেগ ও দেশবন্ধুর অকাল প্রয়াণ তাঁর শরীরকে আরও বেশি জীর্ণ করল। কিছুদিনের মধ্যেই চল্লিশ পাউন্ডের বেশি ওজন কমে গেল তার। দেহে প্রকাশ পেল ক্ষয়রোগের লক্ষণ। ১৯২৭ খ্রিঃ শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন তিনি।

সরকারী মেডিক্যাল অফিসার সুভাষের শরীরের অবস্থা আশংকাজনক বলে মত প্রকাশ করলে সরকার পক্ষ থেকে মোবার্লি সাহেব প্রস্তাব করলেন, স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য যদি তিনি ইউরোপ চলে যান তবে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে। ইংরাজ সরকার তাকে নির্বাসনে পাঠাবার কৌশল করেছে বুঝতে পেরে সুভাষ ঘৃণাভরে সরকারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। ইতিমধ্যে বাংলার গভর্নর হয়ে এলেন স্যার স্ট্যানলি জ্যাকসন। দীর্ঘ আড়াই বছর পরে ১৯২৭ খ্রিঃ ১৪ ই মে সরকার সুভাষকে শর্তহীন মুক্তির আদেশ দিলেন।

এই সংবাদে সারা দেশে বিপুল আনন্দের সাড়া পড়ে গেল। কারামুক্ত হয়ে পাটনার এক সভায় অসুস্থ সুভাষ বললেন, ‘ দেশের বর্তমান অবস্থায় আমাদের অসুস্থ থাকা সাজে না। ‘ যথার্থই অসুস্থতা অগ্রাহ্য করেই তিনি আবার কর্মক্ষেত্রে ঝাপিয়ে পড়লেন। দেশের জনজাগরণকে আয়ত্বে আনার নতুন কৌশল নিল ইংরাজ সরকার। ভারতের শাসন পদ্ধতি, শিক্ষা বিস্তার, প্রতিনিধি – মূলক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন সম্পর্কে সুপারিশ করার জন্য সরকার সাইমন তদন্ত কমিশন নিয়োগ করে। এই কমিশনে কোন ভারতীয়কে স্থান দেওয়া হয়নি।

ভারতবাসী সাইমন কমিশন বর্জন করে সারা ভারতে তুমুল বয়কট আন্দোলন শুরু করল। সুভাষ বাংলা জুড়ে আন্দোলন সংগঠন করলেন। সেদিন স্কুল – কলেজের ছাত্ররা স্বেচ্ছায় কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ আন্দোলনে যোগ দিলেন। নানা স্থানে গড়ে উঠল ছাত্র ও যুব প্রতিষ্ঠান। এই সময় শ্রমিক আন্দোলন সংগঠন করে সুভাষ দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেন। কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের মধ্যে শ্রমিক আন্দোলন সমর্থনে সুভাষচন্দ্রই পথ প্রদর্শক।

১৯২৮ খ্রিঃ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ৪৭ তম অধিবেশন উপলক্ষে কলকাতায় সুভাষ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর জেনারেল কমান্ডিং অফিসার রূপে সামরিক পোশাকে যে শোভাযাত্রা করেছিলেন তা এককথায় ছিল অভূতপূর্ব। “এই অধিবেশনে মহাত্মাগান্ধী আপোশ – রফামূলক স্বায়ত্বশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সুভাষ এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বললেন, ‘আমরা কখনো এই প্রস্তাব মেনে নিতে পারি না, আমরা চাই স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা আমাদের দূর ভবিষ্যতের আদর্শ নয়, বর্তমানেই আমাদের দাবী হচ্ছে স্বাধীনতা”।

সুভাষচন্দ্রের এই প্রস্তাব ১৩৫০-৯৭২ ভোটে অগ্রাহ্য হয়ে যায়। কিন্তু পরের বছরেই কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু ঘোষণা করেন, পূর্ণ স্বাধীনতাই কংগ্রেসের লক্ষ। এরপর সুভাষচন্দ্র গঠন করেন নিখিল ভারত স্বাধীনতা লীগ। তাঁকে সহযোগিতা করলেন জওহরলাল, শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার ও অন্যান্য কয়েকজন নেতা। সঙ্ঘের আদর্শ, পূর্ণ স্বাধীনতার আদর্শ প্রচার ৷ ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ খ্রিঃ মধ্যে সুভাষ ছিলেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ও নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির সাধারণ সম্পাদক।

এই সময় সর্বদল সমিতি নামে যে সমিতি গঠিত হয় সুভাষ তারও একজন বিশিষ্ট সদস্য হন। এই সমিতি নেহেরু কমিটি নামেই সমধিক পরিচিত। ১৯২৯ খ্রিঃ সুভাষচন্দ্র নির্বাচিত হলেন নিখিল ভারতট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সভাপতি। ১৯৩১ খ্রিঃ পর্যন্ত তিনি এই পদ অলঙ্কৃত করেন। ১৯২৯ খ্রিঃ এপ্রিল মাসে বাংলার লাট অকস্মাৎ বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভা ভেঙ্গে দিলে জুন মাসে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। দেখা গেল, কংগ্রেস প্রার্থীরা হয় বিনা বাধায় না – হয় বিপুল ভোটাধিক্যে জয়ী হয়েছেন। সুভাষেরই জয়জয়কার হল।

এই বছরই আগষ্ট মাসে নিখিল ভারত লাঞ্ছিত রাজনীতিক দিবস পালন উপলক্ষ্যে সুভাষ কলকাতায় বিরাট শোভাযাত্রা পরিচালনা করলেন। সরকার ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪ ধারা বলে সুভাষচন্দ্র প্রমুখ নেতাদের রাজদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করল। এই সময় লাহোর সেন্ট্রাল জেলে লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম বন্দি যতীন্দ্রনাথ দাস প্রমুখ কয়েকজন বন্দি রাজবন্দিদের প্রতি জেলবিভাগের অত্যাচারের প্রতিবাদে অনশন আরম্ভ করেন।

এই নিয়ে সারা দেশ তোলপাড় হতে লাগল। টানা ৬৩ দিন অনশন করার পর বাংলার সন্তান বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ দাসের মৃত্যু হল। যতীন্দ্রনাথের মৃতদেহ আনা হল কলকাতায়। সুভাষ এই মহান শহীদের মৃতদেহ নিয়ে কলকাতায় যে শোভাযাত্রা পরিচালনা করেন –কেবল দেশবন্ধুর শবযাত্রার সঙ্গেই তার তুলনা হতে পারে। ১৯২৯ খ্রিঃ ২৯ শে সেপ্টেম্বর পাঞ্জাব ছাত্র সম্মেলনের সভাপতির ভাষণে সুভাষচন্দ্র বলেন, “পৃথিবীতে বিপ্লব আনতে হলে আমাদের চোখের সামনে এমন একটা আদর্শ তুলে ধরতে হবে যা বিদ্যুতের মত আমাদের শক্তিকে করবে সচকিত। এই আদর্শ স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতার অর্থ সকলে সমান বুঝেন না। আমাদের দেশেও স্বাধীনতার অর্থের দেখা যাচ্ছে ক্রমঃবিবর্তন। স্বাধীনতা অর্থে আমি বুঝি ব্যক্তি ও সমাজ, নর ও নারী, ধনী ও দরিদ্র সকলের স্বাধীনতা। স্বাধীনতা শুধু রাষ্ট্রীয় বন্ধন মুক্তিই নয়।। ভারত স্বাধীন হবেই তাতে এতটুকু সন্দেহ নেই। রাত্রির পর দিবাগমের ন্যায় স্বাধীনতা আসবেই আসবে। আজ পৃথিবীতে এমন শক্তি নেই যা বেঁধে রাখতে পারে ভারতকে।

ভারতের স্বাধীনতা সম্পর্কে সুভাষ যে ধারণা পোষণ করতেন, কংগ্রেসের অন্যান্য নেতাদের মতামত ছিল তা থেকে ভিন্ন। এই প্রশ্নেই সুভাষ কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য পদে ইস্তফা দিলেন। লাহোর কংগ্রেসে ১৯২৯ খ্রিঃ মহাত্মা গান্ধী স্বায়ত্বশাসন সমর্থক প্রস্তাব উত্থাপন করলে সুভাষচন্দ্র তার বিরোধিতা করে সংশোধন প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি জানালেন, স্বরাজের অর্থ পূর্ণ স্বাধীনতা; ঔপনিবেশিক স্বায়ত্বশাসন নয়। কিন্তু অধিবেশনে সুভাষের প্রস্তাব অগ্রাহ্য হল, গ্রাহ্য হয় গান্ধীজির প্রস্তাব।

সুভাষের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পাঞ্জাবের ছাত্র ও যুবসমাজে বিরুপ উদ্দীপনার সঞ্চার করল। লাহোর থেকে ফিরে এসে ১৯৩০ খ্রিঃ ৪ ঠা জানুয়ারী সুভাষ ব্যবস্থাপক সভার সদস্যপদ ও কর্পোরেশনের অলডারম্যানের পদ পরিত্যাগ করলেন। জানুয়ারীর ২৩ তারিখেই রাজদ্রোহের অভিযোগে সুভাষ ধৃত হলেন ও নয় মাস সশ্রম কারাদন্ড ভোগ করেন। কারাগারে থাকা কালেই ১৯৩০ খ্রিঃ ২২ শে আগষ্ট তারিখের নির্বাচনে সুভাষ কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হলেন। ২৩ শে সেপ্টেম্বর মুক্তি লাভের পর তিনি মেয়রের কার্যভার গ্রহণ করেন।

১৯৩১ খ্রিঃ ২৬ শে জানুয়ারীতে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে কলকাতার পুলিশ কমিশনার আদেশ করেছিলেন যে শহরে কোন প্রকার সভা – শোভাযাত্রা করা চলবে না। সুভাষ এই আদেশ অমান্য করে এক শোভাযাত্রা বার করলেন। ময়দানের কাছে পুলিশের লাঠি চালনার ফলে সুভাষচন্দ্র আহত হন। তার ছয় মাস কারাদন্ডের আদেশ হয়। ভারতের বড়লাট আরউইন ও কংগ্রেসের তরফ থেকে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে এক চুক্তি হয় ওই বছরেই ৮ ই মার্চ। চুক্তির শর্ত অনুসারে বিভিন্ন জেলে বন্দি অন্যান্য রাজবন্দি এবং সুভাষচন্দ্র মুক্তি পেলেন।

১৯৩১ খ্রিঃ কংগ্রেসের অধিবেশন হয় করাচিতে। এই অধিবেশনে যোগ দিয়ে সুভাষচন্দ্র গান্ধী – আরউইন চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেন। এই সময়েই হিজলী বন্দিশালায় পুলিশ নির্মমভাবে গুলি চালালে দুজন বন্দি নিহত ও অনেকে আহত হলেন। ক্ষুব্ধ সুভাষ বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটি ও কলকাতা কর্পোরেশনে অল্ডারম্যান পদে ইস্তফা দিলেন। বন্দিদের ওপরে পুলিশের নির্মম আচরণে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এই সময়ে সুভাষচন্দ্র তৃতীয়বার বেঙ্গল রেগুলেশনে বন্দি হন।

এক বছরের মধ্যেই জেলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার জন্য সরকার তাঁকে ইউরোপ পাঠালে তিনি সেই সুযোগে ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানীতে যোগাযোগ স্থাপন করেন। ১৯৩৬ খ্রিঃ দেশে ফিরে এলে পুনরায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং একবছর পরেই মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৩৮ খ্রিঃ সুভাষচন্দ্র হরিপুরা কংগ্রেসে সভাপতি নির্বাচিত হন। পুনরায় ১৯৩৯ খ্রিঃ ত্রিপুরী কংগ্রেসে গান্ধিজীর সমর্থিত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে পরাজিত করে সভাপতিপদে নির্বাচিত হন।

কিন্তু পূর্ণ স্বরাজের প্রশ্নে দক্ষিণপন্থী জোটের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দিলে সুভাষচন্দ্র পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই সময়েই সুভাষচন্দ্র মহাজাতি সদন প্রতিষ্ঠার আয়োজন করেন। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে এসে রবীন্দ্রনাথ সুভাষচন্দ্রকে দেশগৌরব উপাধি দেন। কংগ্রেসের মধ্যে থেকেই সুভাষচন্দ্র ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করে বাংলার বিপ্লবীদলগুলিকে সংগঠিত করার চেষ্টা করলে, কংগ্রেস দল থেকে তাকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কৃত কর হয়। ১৯৪০ খ্রিঃ সুভাষচন্দ্র একটি অস্থায়ী জাতীয় সরকার গঠনের দাবি জানান। এই সময় হল ওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের দাবিতে সত্যাগ্রহ শুরু করেন এবং গ্রেপ্তার হন। এই বছরেই কারাগারে অনশন করলে তাকে মুক্ত দিয়ে গৃহে অন্তরীণ অবস্থায় রাখা হয় ৷

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু র কর্ম জীবন: Netaji Subhas Chandra Bose’s Work Life

অত্যন্ত বিশ্বস্ত কিছু সহযোগীর সহযোগিতায় পুলিশের চোখকে ফাকি দিয়ে সুভাষচন্দ্র ১৯৪১ খ্রিঃ ২৬ শে জানুয়ারী ছদ্মবেশে দেশত্যাগ করেন। উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মধ্য দিয়ে সুভাষচন্দ্র কাবুল হয়ে রাশিয়া প্রবেশ করেন। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে শক্তি সংগ্রহের জন্যই তিনি রাশিয়া হয়ে জার্মানীতে আসেন। এখানে এক শক্তিশালী বেতারকেন্দ্র থেকে তিনি ভারতের উদ্দেশে প্রচারকার্য চালাতে থাকেন। ইতিপূর্বে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে মহাবিপ্লবী রাসবিহারী বসু দক্ষিণ – পূর্ব এশিয়ায় একটি অস্থায়ী স্বাধীন ভারত সরকার গঠন করেছিলেন। তরুণ সুভাষকে তিনি তার আরব্ধ কার্য সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব তুলে দেন।

আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতে ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে রাসবিহারী বসু ও ক্যাপ্টেন মোহন সিং গঠিত এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু পরিচালিত রাজনৈতিক সৈন্যবাহিনীরই নাম আজাদ হিন্দ ফৌজ। ১৯৪২ খ্রিঃ। দুনিয়া কাঁপানো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন চলছে পুরোদমে। এই সালের ২৮ শে মার্চ খ্যাতনামা বিপ্লবী রাসবিহারী বসু টোকিওতে ভারতের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সভায় মিলিত হন। এই সভায় স্থির হয় যে, জাপানের অধিকৃত সমস্ত স্থানের ভারতীয় অধিবাসীদের নিয়ে ভারতীয় স্বাধীনতা সঙ্ঘ বা Indian Independence League স্থাপন করা হবে।

সেই সঙ্গে ভারতীয় সেনানায়কদের অধীনে ভারতের একটি জাতীয় সেনাবাহিনী বা Indian National Ariny গঠন করা হবে। এই সিদ্ধান্তের ওপর ১৯৪২ খ্রিঃ ১৫ ই জুন ব্যাঙ্ককে একটি বিরাট সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং এই সম্মেলনে ভারতীয় স্বাধীনতা সঙ্ঘ গঠিত হয়। রাসবিহারী বসু উক্ত সঙ্ঘের সভাপতি পদে বৃত হন। ক্যাপ্টেন মোহন সিং আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাপতি পদে নির্বাচিত হন। এই সম্মেলনে ৩৫ টি প্রস্তাবের মধ্যে একটিতে সুভাষচন্দ্র বসুকে দক্ষিণ – পূর্ব এশিয়ায় আগমনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু ঘটনাচক্রে টোকিও ও ব্যাঙ্কক সম্মেলনের পূর্বেই ক্যাপ্টেন মোহন সিং এর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজের সূচনা হয়েছিল।

১৯৪১ খ্রিঃ ডিসেম্বর মাসে মালয় উপদ্বীপে জাপানীরা ইংরাজ সৈন্যকে পরাস্ত করে। এর ফলে ১৪ নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন মোহন সিং আর একজন ভারতীয় এবং একজন ইংরাজ সেনানায়ক সৈন্যসহ জঙ্গলে পথ হারিয়ে জাপানীদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ১৯৪২ খ্রিঃ ১৫ ফেব্রুয়ারী সিঙ্গাপুরের পতন হয়। সেই সময় ব্রিটিশ সেনানায়ক ৪০,০০০ ভারতীয় সৈন্যকে জাপান সরকারের প্রতিনিধি মেজর ফুজিয়ারার হাতে সমর্পণ করেন। ক্যাপ্টেন ফুজিয়ারা এইসব সৈন্যকে মুক্তি দিয়ে মোহন সিং – এর হাতে সমর্পণ করেন।

ক্যাপ্টেন মোহন সিং ভারতীয় সৈন্যদের সেই সময়েই আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠনের উদ্দেশ্য ভালভাবে বুঝিয়ে দেন এবং যারা স্বেচ্ছায় এই দলে যোগদান করতে ইচ্ছুক কেবল তাদের নিয়েই ফৌজ গঠন করেন। এইভাবে ব্যাঙ্কক সম্মেলনের পূর্বেই অন্ততঃপক্ষে ২৫,০০০ ভারতীয় সৈন্য ক্যাপ্টেন মোহন সিং – এর অধীনে আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দেয়। ১৯৪২ খ্রিঃ আগস্ট মাসের শেষ পর্যন্ত এই সংখ্যা বেড়ে ৪০,০০০ দাঁড়ায়। টোকিও সম্মেলন থেকে ফিরে এসেই মোহন সিং ভারতীয় সামরিক নায়কগণকে নিয়ে এক সভা করেন এবং ১৯৪২ খ্রিঃ এপ্রিল মাসে আজাদ হিন্দ ফৌজ বিধিবদ্ধভাবে গঠিত হয়।

১৯৪২ খ্রিঃ ১ লা সেপ্টেম্বর আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতিষ্ঠা প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম পরিকল্পনা নেতাজী সুভাষচন্দ্রই করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতায় গৃহে অন্তরীণ থাকাকালে সুভাষচন্দ্র ১৯৪১ খ্রিঃ ১৭ ই জানুয়ারী গোপনে কলকাতা ত্যাগ করেন এবং আফগানিস্তান ও রাশিয়ার মধ্য দিয়ে জার্মানীতে উপস্থিত হন। ওই বছরের ২২ শে জুন জার্মানী রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে সুভাষচন্দ্র প্রস্তাব করেন, জার্মানদের হাতে বন্দি ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ে তিনি একটি সেনাদল গঠন করবেন এবং জার্মান সৈন্যের সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়ার মধ্য দিয়ে ভারতের অভিমুখে অগ্রসর হবেন।

জার্মান সরকার এই প্রস্তাবে সম্মত হলে সুভাষচন্দ্র বন্দি ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ে সেনাদল গঠন করেন এবং জার্মান কর্মচারীদের সাহায্যে তাদের বিশেষভাবে সামরিক শিক্ষা দেন। এটিই ছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম পকিল্পনা। এই সময়েই জার্মানীর ভারতীয় সম্প্রদায় সুভাষচন্দ্রকে নেতাজী উপাধি দেন এবং জয়হিন্দ বলে অভ্যর্থনার পদ্ধতি প্রচলন করেন। সুভাষচন্দ্র কিন্তু বুঝতে পেরেছিলেন বার্লিনের মত একটি দূরবর্তী কেন্দ্র থেকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রত্যক্ষভাবে পরিচালনা সম্ভব নয়।

তাই তিনি ব্যাঙ্কক সম্মেলনের আহ্বান গ্রহণ করেন এবং এক দুঃসাহসিক অভিযানে জার্মান সাবমেরিনে আফ্রিকার পূর্বদিকের সমুদ্র এবং সেখানে থেকে জাপানী সাবমেরিনে সুমাত্রা হয়ে টোকিও উপস্থিত হন ১৯৪৩ খ্রিঃ ১৩ ই জুন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোজো তাকে সাদরে গ্রহণ করেন। ১৯৪৩ খ্রিঃ ২ রা জুলাই নেতাজী সিঙ্গাপুরে এলে তিনি বিপুলভাবে সম্বর্ধিত হন। রাসবিহারী বসু নিজে ৪ ঠা জুলাই পদত্যাগ করে সুভাষচন্দ্রকে ভারতীয় স্বাধীনতা সঙ্ঘের সভাপতি পদে বৃত করেন। ওই বছরেই ২৫ শে আগস্ট নেতাজী আনুষ্ঠানিকভাবে আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাপতিপদ গ্রহণ করেন।

১৯৪৩ খ্রিঃ ২১ শে অক্টোবর সুভাষচন্দ্র সমবেত পূর্ব এশিয়ার প্রতিনিধিগণের সমক্ষে অস্থায়ী আজাদ হিন্দ অর্থাৎ স্বাধীন ভারত সরকারের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করেন। ১৯৪৪ খ্রিঃ ১৯ শে মার্চ আজাদ হিন্দ ফৌজ ব্রহ্মদেশের সীমানা পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করে এবং ২১ শে মার্চ জাপানের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন যে ভারতের যে সব অংশ থেকে ইংরাজ সৈন্য বিতাড়িত হয়েছে সেসব স্থান নেতাজীর প্রতিষ্ঠিত অস্থায়ী স্বাধীন ভারত সরকারের শাসনাধীন হবে। মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের পতন হলে আজাদ হিন্দ বাহিনীর কোহিমায় অবস্থানের সিদ্ধান্ত হয় যাতে প্রয়োজন মতো তারা ব্রহ্মপুত্র নদ অতিক্রম করে বঙ্গদেশ আক্রমণ করতে পারে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আজাদ হিন্দ ফৌজের এই পরিকল্পনা সাফল্যমন্ডিত হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ইতিমধ্যে পরিবর্তিত হয় এবং আমেরিকা বিপুল সৈন্য নিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের পথে জাপানের দিকে অগ্রসর হলে জাপান ভারত আক্রমণের আশা ত্যাগ করে স্বদেশভূমি রক্ষার জন্য ব্রহ্মদেশের মধ্য দিয়ে পশ্চাদপসরণ করতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে আজাদ হিন্দ ফৌজকেও পিছু হটতে হয় এবং এরপর ইংরাজ ও আমেরিকার বিপুল সেনাদল ব্রহ্মদেশ আক্রমণ করলে কিছুকাল যুদ্ধ করার পর আজাদ হিন্দ ফৌজ আত্মসমর্পণ করে। আজাদ হিন্দ ফৌজ নেতাজী সুভাষচন্দ্রের অসাধারণ সাংগঠনিক এবং সামরিক প্রতিভার স্বাক্ষর।

এই বাহিনী ভারত সীমান্তের মধ্যে ২৪১ কিলোমিটার পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল। ইংরাজ সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধেআজাদ হিন্দ ফৌজের ৪,০০০ সৈন্য নিহত হয়েছিল। যদিও নেতাজীর আজাদ হিন্দ ফৌজ প্রত্যক্ষভাবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জন করতে সমর্থ হয়নি, তথাপি এই বাহিনীর অতুল পরাক্রম ও দেশপ্রেম, কষ্টসহিষ্ণুতা, ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গ ভারতের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। ১৯৪৫ খ্রিঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান আত্মসমর্পণ করলে নেতাজী তার বাহিনীকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হন। এই সময় তাইহোকু বিমান বন্দরে একটি বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়েছে বলে প্রচার করা হয়।

Leave a Comment