সমুদ্র জলের লবনতা তারতম্যের কারণ

সমুদ্র জলের লবনতা তারতম্যের কারণ: সমুদ্র জলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এর লবনতা। সমুদ্র জল নানা প্রকার লবণের উৎস। পানাপুকুর লবণ সমুদ্র জলে দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। যার মধ্যে সোডিয়াম ক্লোরাইড, ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইড, ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ও ক্যালসিয়াম সালফেট জাতীয় লবণের পরিমাণ থাকে সব থেকে বেশি। সমুদ্র জলের লবনতা পরিমাপ সাধারণত প্রতি হাজার অংশে প্রকাশ করা হয়। সমুদ্র জলের গড় লবনতা হলো 35 % । কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের সর্বত্র সমুদ্র জলের লবনতা সমান নয়। পৃথিবীর সাগর মহাসাগর গুলির বিভিন্ন অংশের জলের লবনতা পরিমাণের দিক দিয়ে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। সমুদ্র জলের লবনতার তারতম্যের কারণগুলি নিম্নে আলোচনা করা হল – 

1) বাষ্পীভবন – সমুদ্র জলের বাষ্পীভবনের ওপর লবনতা পরিমাণ নির্ভর করে। বাষ্পীভবনের হার বেশি হলে জলের পরিমাণ কমে যায় কিন্তু সমুদ্র জলের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় লবনতা পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। প্রখর সূর্য রশ্মি, বৃষ্টি বিরল দিনের সংখ্যা ও বায়ু প্রবাহের তীব্রতা প্রভৃতি বাষ্পীভবনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে। ক্রান্তীয় অঞ্চলে উষ্ণতার আধিক্য হেতু বাষ্পীভবনের হার বেশি ফলে লবনতা বেশি, যেমন – লোহিত সাগর। অন্যদিকে মেরু অঞ্চলে বাসভবনের স্বল্পতার দরুন সমুদ্রের জল লবণাক্ত। যেমন – বাল্টিক সাগর। 

2) অধঃক্ষেপণ – অধঃক্ষেপণ অর্থাৎ বৃষ্টিপাত তুষারপাত কোন কোন অঞ্চলে সমুদ্র জলের লবনতা র পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে। অধঃক্ষেপণ এর পরিমাণ বাড়লে সমুদ্রে স্বাদু জলের পরিমাণ বাড়ে, ফলে লবণতার ঘনত্ব ক্রমশ কমতে থাকায় সমুদ্রের জল লবণাক্ত হয়। যেমন নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রখর সূর্য রশ্মির প্রভাব থাকা সত্ত্বেও বৃষ্টিপাতের আধিক্য হেতু সমুদ্রের জল উষ্ণ এবং অপেক্ষাকৃত কম বৃষ্টিপাত যুক্ত অঞ্চলের তুলনায় কম লবণাক্ত। মেরু ও মেরু বৃত্ত অঞ্চলে তুষারপাত সংঘঠনের কারণে সমুদ্রের জলে বরফ গলা স্বচ্ছ জলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় বলে লবনতা হ্রাস পায়।

3) নদীবাহিত জলের পরিমাণ – সমুদ্রে য সকল অংশে বড় বড় নদী এসে মেশে সেখানে সমুদ্র জলে লবনতা পরিমাণ কম হয়। যেমন – গঙ্গা, আমাজন, ইয়াংসিকিয়াং নদীর মোহনার নিকটবর্তী অঞ্চলে সমুদ্র জলের লবনতা কম। অন্যদিকে লোহিত সাগরে কোন নদী মোহনা না থাকায় সমুদ্রের জল বেশি লবণাক্ত হয়।

4) সমুদ্র জলের সঞ্চালন – উন্মুক্ত সমুদ্রের কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকায় সমুদ্রের জল অনায়াসে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলাচল করতে পারে। এই কারণে অধিক লবণাক্ত জল অপেক্ষাকৃত কম লবণাক্ত জলের সাথে সংমিশ্রণে ফলে লবনতার পরিমানে সমতা বজায় থাকে। অন্যদিকে স্থলবেষ্টিত বা আংশিক আবদ্ধ সমুদ্রে জলের অবাধ সঞ্চালনা থাকায় লবনতা পরিমাণ বেড়ে যায়। যেমন – উন্মুক্ত ভারত ও আটলান্টিক মহাসাগরে তুলনায় আংশিকভাবে আবদ্ধ সাগরের জল বেশি লবণাক্ত। 

5) বায়ুর চাপ ও বায়ু প্রবাহ – বায়ুচাপ ও বায়ু প্রবাহ সমুদ্র জলে লবণতা র তারতম্য ঘটায়। উচ্চচাপ বিশিষ্ট অঞ্চল থেকে বায়ু সব সময় নিম্নচাপ বিশিষ্ট অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। উদাহরন – উত্তর সাগর উচ্চচাপ যুক্ত অঞ্চলের অবস্থিত হওয়ায় এখান কার অধিক লবণাক্ত জল বায়ু প্রবাহ দ্বারা নিম্নচাপ যুক্ত অঞ্চলে অবস্থিত বাল্টিক সাগরের দিকে প্রবাহিত হয়ে বাল্টিক সাগরের লবনতা সামান্য পরিমাণে বাড়িয়ে দেয়।

6) জোয়ার ও ভাটার প্রভাব – জোয়ারের জলে পুষ্ট নদী গুলিতে জোয়ারের সময় লবণের পরিমাণ বাড়ে, অন্যদিকে ভাটার টানে নদীর স্বাদু বা মিষ্টি জল সমুদ্রে মিশে গেলে সমুদ্রজল কম লবণাক্ত হয়। 

Leave a Comment