খাদ্য শৃঙ্খল কাকে বলে? খাদ্য শৃঙ্খল কত প্রকার ও কি কি?

প্রশ্ন: খাদ্যশৃঙ্খল কাকে বলে? খাদ্যশৃঙ্খলের বৈশিষ্ট্য কী? খাদ্য শৃঙ্খলের গুরুত্ব গুলি লেখ? খাদ্যশৃঙ্খলের কত প্রকার উল্লেখ করো?

খাদ্যশৃঙ্খল – যে প্রক্রিয়ায় খাদ্যশক্তি নীচের পুষ্টি স্তর থেকে সর্বোচ্চ পুষ্টিস্তর পর্যন্ত অর্থাৎ উৎপাদক থেকে খাদ্যখাদক সম্পর্কীত বিভিন্ন জীবগোষ্ঠীর মধ্যে প্রবাহিত বা স্থানান্তরিত হয়, সেই শৃঙ্খলিত পর্যাক্রমিক শক্তির প্রবাহ বা স্থানান্তরকে খাদ্যশৃঙ্খল বলে। অন্যভাবে বলা যায় খাদ্য-খাদক সম্পর্কের ভিত্তিতে উৎপাদক স্তর থেকে ধাপে ধাপে বিভিন্ন জীবগোষ্ঠীর মধ্যে খাদ্য শক্তির ধারাবাহিক প্রবাহকে খাদ্যশৃঙ্খল বলে। 

খাদ্যশৃঙ্খলের উদাহরন – জলজ উদ্ভিদ (ফাইটোপ্লাংটন) – পতঙ্গ – মাছ – মানুষ (জলজ বাস্তুতন্ত্র) ও 

উদ্ভিদ – হরিন – বাঘ (অরন্যের বাস্তুতন্ত্র)।

খাদ্য শৃঙ্খলের বৈশিষ্ট্য গুলি হল

  • খাদ্যশৃঙ্খলের নীচের পুষ্টিস্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত শক্তির প্রবাহ একমুখী।
  • খাদ্যশৃঙ্খলের সবচেয়ে নীচের স্তরে থাকে  সবুজ উদ্ভিদ। 
  • কোনো কোনো খাদ্যশৃঙ্খল সবুজ উদ্ভিদ ছাড়াই শুরু হয়। যেমন – পরজীবী ও মৃতজীবী খাদ্যশৃঙ্খল। 
  • খাদ্যশৃঙ্খলের নিম্নস্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত জীবের সংখ্যা ও শক্তির পরিমান ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। 
  • যে বাস্তুতন্ত্রে জীববৈচিত্র্য যত বেশি সেই বাস্তুতন্ত্রে খাদ্যশৃঙ্খলের জটিলতাও তত বেশি, এক্ষেত্রে খাদ্যজাল সৃষ্টি হয়। 
  • খাদ্যশৃঙ্খলের জীববৈচিত্র্য অর্থাৎ প্রজাতির সংখ্যা কম থাকে। 
  • একটি খাদ্যশৃঙ্খলের পুষ্টিস্তরের সংখ্যা তিন থেকে পাঁচের মধ্যে থাকে। 

খাদ্য শৃঙ্খলের গুরুত্ব

বাস্তুতন্ত্রে জীবমণ্ডলের অস্তিত্ব রক্ষায় খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্ব অপরিসীম। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে স্বভোজী উদ্ভিদ থেকে শক্তি ও পুষ্টি পদার্থ অন্যান্য খাদ্যস্তরে স্থানান্তরিত হয়। তাই খাদ্যশৃঙ্খলের কোনো একটি স্তরের ক্রিয়াকলাপ বিঘ্নিত হলে সমগ্র বাস্তুতন্ত্র বিলুপ্ত হয়। 

খাদ্য শৃঙ্খলের শ্রেনীবিভাগ

খাদ্যখাদকের প্রকৃতির ভিত্তিতে বাস্তুতন্ত্রে তিন ধরনের খাদ্যশৃঙ্খল লক্ষ্য করা যায়। যথা – 

১. শিকারী খাদ্যশৃঙ্খল – এই রূপ খাদ্যশৃঙ্খল প্রাথমিক খাদক বা শাখাহারী প্রানী থেকে শুরু হয় এবং পর্যায়ক্রমে খাদ্য খাদক সম্পর্কের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তর মাংসাশীতে স্থানান্তরিত হয়। 

উদাহরণ – ঘাস – ফড়িং – ব্যাঙ – সাপ – ময়ূর 

২. পরজীবী খাদ্যশৃঙ্খল – এই রূপ খাদ্যশৃঙ্খলে প্রত্যেক পুষ্টিস্তরে জীবের আকার ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে থাকে অর্থাৎ বৃহত্তর জীবকে আশ্র্য করে পরজীবী খাদ্য শৃঙ্খল গঠিত হয়। এক্ষেত্রে বড়ো জীবকে হোস্ট ও ক্ষুদতর জীবকে পরজীবী বলে। 

উদাহরণ – মানুষ – কৃমি – আদ্যপ্রানী। 

৩. মৃতজীবী খাদ্যশৃঙ্খল -এরূপ খাদ্যশৃঙ্খলে মৃত ও গলিত জীবদেহ থেকে ক্রমান্বয়ে জীবানুর দিকে শক্তি প্রবাহিত হয় এবং শক্তি মৃত জীবি ও বিয়োজকের দেহে আবদ্ধ থাকে। 

উদাহরণ – মৃত উদ্ভিদ – ছত্রাক – ব্যাকটেরিয়া

খাদ্যশৃঙ্খলের ধরন অনুযায়ী খাদ্য শৃঙ্খলকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা – 

১. চারনভূমি বা গ্রেজিং খাদ্যশৃঙ্খল – যে খাদ্যশৃঙ্খল উৎপাদক থেকে শুরু হয় এবং প্রাথমিক খাদক রূপে তৃণভোজীরা চরে চরে খাদ্য গ্রহন করে, তাকে চারন ভূমি বা গ্রেজিং খাদ্যশৃঙ্খল বলে।

উদাহরণ – ঘাস – হরিন – বাঘ ( স্থলভাগ), উদ্ভিদ – পতঙ্গ – মাছ – বক ( জলভাগ) ।

২. বিয়োজক বা ডেট্রিটাস খাদ্যশৃঙ্খল – যে খাদ্যশৃঙ্খল অনুখাদক বা বিয়োজক স্তর থেকে শুরু হয়ে বড়ো প্রানীতে শেষ হয়, তাকে বিয়োজক বা ডেট্রিটাস খাদ্যশৃঙ্খল বলে। 

উদাহরণ – পচাপাতা – লার্ভা – ছোট মাছ – বড়ো মাছ। 

খাদ্যশৃঙ্খল ও খাদ্যজালের পার্থক্য 

সংজ্ঞা

যে পদ্ধতিতে খাদ্য শক্তি উৎপাদক থেকে খাদ্যখাদক সম্পর্ক যুক্ত বিভিন্ন প্রানী গোষ্ঠীর মধ্যে প্রবাহিত হয়, সেই শক্তিপ্রবাহের ক্রমিক পর্যায়কে খাদ্যশৃঙ্খল বলে।

বিভিন্ন প্রজাতির দ্বারা আন্তঃসম্পর্ক যুক্ত অনেক গুলি খাদ্যশৃঙ্খলকে একত্রে খাদ্যজাল বলে। 

সংখ্যা 

এক্ষেত্রে একটি খাদ্যশৃঙ্খল গড়ে ওঠে।

খাদ্যজাল একাধিক খাদ্যশৃঙ্খলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। 

প্রক্রিয়া 

খাদ্যশৃঙ্খল অপেক্ষাকৃত সরল প্রক্রিয়া।

খাদ্যজাল অপেক্ষাকৃত জটিল প্রক্রিয়া। 

শ্রেনীবিভাগ 

খাদ্যশৃঙ্খলকে প্রধানত গ্রেজিং খাদ্যশৃঙ্খল ও ডেট্রিটাস খাদ্যশৃঙ্খলে ভাগ করা হয়।

খাদ্যজালের সেই রকম কোনো শ্রেনীবিভাগ নেই। 

সম্পর্ক 

খাদ্যজাল ছাড়াই খাদ্যশৃঙ্খল গঠিত হয়।

খাদ্যশৃঙ্খল ছাড়া খাদ্যজাল গঠিত হওয়া সম্ভব না।

জীববৈচিত্র্য 

খাদ্যশৃঙ্খলে জীববৈচিত্র্য তুলনামূলক ভাবে কম।

বাস্তুতন্ত্রে জীববৈচিত্র্য বেশি হলে খাদ্যজাল গঠিত হয়। 

Leave a Comment